Story

অন্তিম পর্যায়

November 6, 2026

8 views

আজ আমার গায়ে হলুদ। কাল বিয়ে। এই লেখাটা লিখছি হলুদের শাড়ি পরেই, হাতে মেহেদির দাগ এখনো ভেজা। হাসিমুখে সবার সাথে ছবি তুলেছি সারাদিন। কিন্তু গতকাল রাত থেকে আমার ভেতরটা পুড়ছে।

যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে তাকে আমি চিনি মাত্র দুই মাস। পারিবারিকভাবে দেখা, ছেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অফিসার, ঢাকায় পোস্টিং। ভদ্র, কম কথা বলে। আমার কোনো অভিযোগ নাই তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ যা আছে, আমার নিজের অতীতের ওপর।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চার বছরের একটা সম্পর্ক ছিল। থার্ড ইয়ার থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত। দুজনে মিলে কত স্বপ্ন দেখা হতো — চাকরি হবে, ছোট একটা বাসা হবে। মাস্টার্সের পর আমি আরও দেড় বছর অপেক্ষা করেছি। ও চাকরির পরীক্ষা দিত, প্রতি বারই একটু একটুতে আটকে যেত। আমি বারবার বলতাম, তুমি আমার বাসায় কথা বলো, চাকরি পরে হোক, অন্তত কথা পাকা থাকুক। ও বলতো, খালি হাতে তোমার বাবার সামনে দাঁড়াবো কীভাবে, আরেকটু সময় দাও। সেই “আরেকটু”টা দেড় বছর ধরে শুনলাম।

তারপর বাসা থেকে প্রস্তাব আসা শুরু হলো, বাবা রিটায়ারের কাছে চলে এসেছেন, মা বললেন আর কতদিন। একদিন রাগ আর অভিমানে — সত্যি বলতে ওর ওপর অভিমান করেই — আমি এই বিয়েতে হ্যাঁ বলে দিলাম। ও তখন কিছুই বলে নাই। শুধু বলেছিল, তুমি ভালো থাকো। মাস তিনেক পর শুনলাম ও জার্মানি চলে গেছে, চাকরি নিয়ে। খবরটা শুনে বুকের ভিতর হালকা একটা টান লেগেছিল, তারপর নিজেকে বুঝালাম সব শেষ।

শেষ হয় নাই। গতকাল রাতে, হলুদের আগের রাতে, ওর মেসেজ এলো। সে দেশে এসেছে। বন্ধুর কাছে বিয়ের খবর শুনে সাত দিনের ছুটি নিয়ে ফ্লাইট ধরেছে। ফোনে কথা হলো ছাদে গিয়ে, নিচে তখন ঢাক বাজছে, মেহমান হাসছে। ওর গলা কাঁপছিল। বললো, আমি ভুল করেছি, সময় চাইতে চাইতে তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু কাল বিয়ে হতে দেবো না। রাত বারোটায় বাসার পেছনের গলিতে গাড়ি থাকবে, তুমি শুধু বের হয়ে এসো। কালই কাজী অফিসে বিয়ে করবো আমরা, তারপর দুই পরিবারকে জানাবো। মেনে নিলে ভালো, না মানলে আমরা আমাদের মতো থাকবো।

আমার প্রথম প্রশ্নটাই এইখানে। দেড় বছর ধরে যে মানুষটা একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে নাই, আমার বাবার সামনে দাঁড়ানোর সাহস পায় নাই — সে হঠাৎ বিয়ের আগের রাতে এত বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কেন? এটা ভালোবাসা, নাকি আমাকে হারানোর ভয়? ভয় দিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত বিয়ের পরের জীবনে টেকে তো? গাড়িতে উঠে যাওয়া সহজ — তারপর? কাজী অফিসে বিয়ে মানে দুই পরিবারের সাথে সম্পর্ক শেষের শুরু। আমার বাবা এই বিয়ের জন্য রিটায়ারের জমানো টাকার প্রায় সবটা খরচ করে ফেলেছেন। কাল বরযাত্রী আসবে, পাড়ার লোক জড়ো হবে। আমি না থাকলে ওই উঠানে আমার বাবা-মা মুখ দেখাবেন কীভাবে? ছোট দুইটা ভাইবোন আছে — তাদের বিয়ের বেলায় এই গল্পটা সারাজীবন শুনতে হবে।

আবার অন্যদিকে — যেই মানুষটার কাছে কাল থেকে আমি “স্ত্রী” হবো, তাকে আমি ভালোই বাসি না। তা নিয়ে কি সংসার চলে? অনেকেরই তো চলে, শুনি বিয়ের পর মায়া হয়। কিন্তু আমার মনটা যেখানে পড়ে আছে সেটা অস্বীকার করি কীভাবে। ও আজ রাতে সত্যিই গাড়ি নিয়ে এলে, হলুদের শাড়ি পরা অবস্থায় আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকবো — এই দৃশ্যটা ভাবলেই বুক ধড়ফড় করে।

(1)

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login