Critic

আমার স্বামী

November 6, 2026

6 views

আমার চাচাতো বোন মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। সে যখনই আমার স্বামীকে দেখত, চিৎকার করে বলত, ‘ছিঃ! ছিঃ!’, আর ভয়ে নিজের কাপড়চোপড় শক্ত করে জড়িয়ে ধরত। তার এমন আচরণ দেখে যে কেউ আমার স্বামীর চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করতে বাধ্য হতো। একদিন আর সহ্য করতে না পেরে আমার স্বামী রাগের মাথায় তাকে ঘর থেকে বের করে দিল। কিন্তু তখনই মেয়েটি একটা লাঠি হাতে নিয়ে মেঝেতে এমন কিছু আঁকল, যা দেখে আমি আর আমার স্বামী দুজনেই শিউরে উঠেছিলাম! কারণ, এতদিন সে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিল, তা বুঝতে পেরে আমাদের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গিয়েছিল!

আমার বিয়ে হয়েছে পরিবারেরই এক আত্মীয়ের সঙ্গে। আমার স্বামী রায়হান আমাকে ভীষণ ভালোবাসে, আর আমিও তাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। আমাদের সংসারটা ছিল খুব সুন্দর। আল্লাহর রহমতে আমাদের দুটি ফুটফুটে ছেলে রয়েছে। স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটছিল। সংসারে তেমন কোনো অশান্তি ছিল না। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আর সম্মান নিয়েই আমাদের ছোট্ট পরিবারটি এগিয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু মানুষের জীবন তো সব সময় একভাবে চলে না। কখন যে সুখের সংসারে অশান্তির ছায়া নেমে আসে, তা কেউ আগে থেকে বুঝতে পারে না।

আমাদের জীবনে সেই অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল আমার চাচাতো বোন—তাসনিম।

তাসনিমের বয়স প্রায় বিশ বছর। কিন্তু মানসিক বিকাশ স্বাভাবিকভাবে না হওয়ায় তার আচরণ অনেকটা ছোট শিশুদের মতো ছিল। পরিবারের সবাই জানত, সে মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক কিছুই ঠিকভাবে বুঝতে পারে না। তবে মেয়েটার মন ছিল ভীষণ সরল। কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত না, কাউকে কষ্ট দেওয়ার মতো কোনো চিন্তাও তার মধ্যে ছিল না। বরং সবার প্রতি তার ছিল অগাধ ভালোবাসা।

পরিবারের প্রত্যেকেই তাকে খুব আদর করত। আমিও তাকে নিজের ছোট বোনের মতো ভালোবাসতাম।

তাসনিম আমাকে ভীষণ পছন্দ করত। আমার দুই ছেলের সঙ্গেও তার খুব ভাব ছিল। বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করত, তাদের নিয়ে হাসাহাসি করত। আমাকে ছাড়া যেন তার একদমই চলত না। আমাদের বাড়ি থেকে তাদের বাড়ি খুব বেশি দূরে ছিল না। তাই প্রায় প্রতিদিনই সে আমাদের বাসায় চলে আসত। কখনো আমার সঙ্গে গল্প করত, কখনো বাচ্চাদের নিয়ে খেলত।

আমার স্বামী রায়হানকেও সে খুব পছন্দ করত।

রায়হানও কখনো তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি। বরং তাসনিমকে দেখলেই আদর করে কথা বলত। মাঝেমধ্যে তার জন্য খেলনা, চকলেট কিংবা পছন্দের খাবার নিয়ে আসত। তাসনিমও তার সঙ্গে বেশ আনন্দে সময় কাটাত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার পাশে বসে নিজের মতো করে কথা বলত, হাসত আর খেলাধুলা করত।

এমনকি কোনো দিন আমার বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন হলে কিংবা বাড়ির বাইরে কোনো কাজে যেতে হলে তাসনিম আমাদের বাসায় থেকে যেত। তখন রায়হান বাসায় থাকলেও আমার মনে কোনো ধরনের অস্বস্তি হতো না। কারণ, আমি জানতাম, আমার স্বামী তাকে নিজের ছোট বোনের মতোই স্নেহ করে।

সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু প্রায় এক বছর আগে হঠাৎ করেই আমাদের জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটতে শুরু করল, যার কোনো ব্যাখ্যা আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

কোনো কারণ ছাড়াই তাসনিমের আচরণ সম্পূর্ণ বদলে গেল।

আগে যে মেয়েটি রায়হানকে দেখলে আনন্দে ছুটে আসত, সেই মেয়েটিই এখন তাকে দেখামাত্র অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করল।

রায়হান ঘরে ঢুকলেই তাসনিম কেমন যেন ভয় পেয়ে যেত। তার পুরো শরীর কাঁপতে থাকত। কখনো চিৎকার করে কাঁদত, কখনো ভয়ে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করত। আর বারবার শুধু একটি কথাই বলত—

— ছিঃ! ছিঃ! এ কেমন কাজ!

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, সে চিৎকার করার পাশাপাশি নিজের কাপড়চোপড় এমনভাবে শক্ত করে জড়িয়ে ধরত, যেন কেউ তার সঙ্গে ভয়ংকর কিছু করার চেষ্টা করছে!

তার এই আচরণ দেখে যে কেউ ভুল বুঝতে পারত। বিশেষ করে রায়হানের সামনে তার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগত—আমার স্বামী কি তাহলে এমন কিছু করেছে, যার কারণে মেয়েটি তাকে দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে?

প্রথম দিকে আমরা কেউই বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারিনি।

আমার বাবা-মা, চাচা-চাচি, পরিবারের অন্য সদস্যরা সবাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। তাসনিমের মা-বাবাও তাকে বারবার জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, রায়হান তার সঙ্গে কী করেছে? কেন তাকে দেখলেই এমন ভয় পায়?

কিন্তু তাসনিমের কাছ থেকে কোনো পরিষ্কার উত্তর পাওয়া যেত না। সে শুধু কাঁদত, চিৎকার করত আর নিজের কাপড় শক্ত করে ধরে রাখত।

এদিকে রায়হান নিজেও ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

সে বারবার সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করত যে, তাসনিমের সঙ্গে সে কখনো খারাপ কিছু করেনি। কিন্তু মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকে গেলে শুধু কথা দিয়ে সেই সন্দেহ দূর করা কতটা কঠিন, তা তখন আমরা বুঝতে পারছিলাম।

সত্যি বলতে, প্রথম দিকে আমার মনেও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।

একজন স্ত্রী হিসেবে নিজের স্বামীকে বিশ্বাস করতে চাইলেও, চোখের সামনে এমন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে থাকলে মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক।

একদিন আমি রায়হানকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলাম। সে আমার দুই সন্তানের মাথায় হাত রেখে কসম করে বলল—

— নুসাইবা, তুমি আমাকে এতদিন ধরে চেনো। তাসনিম আমার কাছে তোমার ছোট বোনের মতো। আমি কখনো ওকে খারাপ চোখে দেখিনি, ওর সঙ্গে খারাপ কোনো আচরণও করিনি। বিশ্বাস করো, ও হঠাৎ এমন করছে কেন, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। আমি যদি কোনো অন্যায় করে থাকি, তাহলে আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা না করেন।

রায়হানের চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, সে সত্যিই কিছু জানে না।

আমার স্বামী কখনো মিথ্যা কথা বলে সন্তানদের কসম খেত না। তাছাড়া এতদিনের সংসারে তার চরিত্র কিংবা আচরণে এমন কিছু দেখিনি, যা আমাকে তার ওপর অবিশ্বাস করতে বাধ্য করবে।

তাই শেষ পর্যন্ত আমি তাকে বিশ্বাস করলাম।

কিন্তু সমস্যা দিন দিন আরও বাড়তে লাগল।

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আপাতত তাসনিমকে আমাদের বাসায় আসতে দেওয়া হবে না। কারণ, তার এমন আচরণের কারণে আমাদের সংসারে অযথা অশান্তি তৈরি হচ্ছিল। তার মা-বাবাকেও বিষয়টি বুঝিয়ে বললাম।

কিন্তু তাসনিম ছিল ভীষণ জেদি। ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে আসার অভ্যাস ছিল তার। আমাদের বাসা তাদের বাড়ির একদম কাছেই হওয়ায় পরিবারের লোকজন নিষেধ করলেও সে সুযোগ পেলেই কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে আসত।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, রায়হান নিজেই একটা ব্যবস্থা করল।

তাসনিম বাসায় এলে সে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে যেত। আমি তাকে জানাতাম, তাসনিম চলে গেছে। তারপরই সে বাড়ি ফিরত।

এভাবে বেশ কিছুদিন চলল।

কিন্তু একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল, যার পর থেকে রায়হান মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছিল।

সেদিন আমাদের বড় ছেলের জন্মদিন ছিল। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং পরিচিত অনেক মানুষকে দাওয়াত করেছিলাম। সকাল থেকেই বাড়িতে আনন্দের পরিবেশ। বাচ্চারা খেলাধুলা করছিল, অতিথিরা আসছিলেন, সবাই মিলে সুন্দর একটা সময় কাটাচ্ছিলাম।

এমন সময় তাসনিম তার মায়ের সঙ্গে আমাদের বাড়িতে এল।

আমি তাকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই কথা বললাম। সেও হাসিমুখে আমার কাছে এসে দাঁড়াল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর রায়হান যখন ঘরে ঢুকল, তখনই আবার সেই একই ঘটনা ঘটল।

তাসনিম রায়হানকে দেখামাত্র ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। বারবার বলতে লাগল—

— ছিঃ! ছিঃ! এ কেমন কাজ!

তার মা আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। দ্রুত মেয়েকে ধরে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেলেন।

কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।

বাড়িতে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষের চোখ তখন রায়হানের দিকে।

কেউ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল, কেউ আবার এমনভাবে তাকে দেখছিল, যেন সে কোনো ভয়ংকর অপরাধ করে ফেলেছে।

রায়হান সবার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার নিজের নির্দোষ হওয়ার কথা বলতে লাগল।

— আপনারা আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি সত্যি বলছি, আমি ওর সঙ্গে কখনো কোনো খারাপ আচরণ করিনি। আমি নিজেও বুঝতে পারছি না, ও কেন এমন করছে!

কেউ তার কথা বিশ্বাস করল। কারণ, অনেকেই তাকে ছোটবেলা থেকে চিনতেন এবং তার স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে জানতেন।

আবার কেউ কেউ এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন, যেন তাদের মনে সন্দেহের কোনো শেষ নেই।

সেদিনের আনন্দের অনুষ্ঠানটা মুহূর্তের মধ্যে অস্বস্তিকর হয়ে উঠল।

অতিথিরা চলে যাওয়ার পর রায়হানকে আর আগের মতো দেখাচ্ছিল না। তার মুখটা একেবারে মলিন হয়ে গিয়েছিল। সে কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলছিল না।

পরদিন সকালে সে অফিসেও গেল না।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেন অফিসে যাচ্ছে না?

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

— নুসাইবা, আজ আমি কারও সামনে যেতে পারব না। অফিসে গেলেই সবাই কালকের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করবে। কেউ হয়তো সরাসরি কিছু বলবে না, কিন্তু তাদের চোখের ভাষা আমি বুঝতে পারব। আমি আর এসব সহ্য করতে পারছি না।

আমি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, সে ভেতরে ভেতরে কতটা ভেঙে পড়েছে।

সেদিন রায়হান ঘরেই বসে ছিল। টেলিভিশন চালু থাকলেও তার মনোযোগ ছিল না। সে একদৃষ্টিতে পর্দার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল।

হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

আমি দরজা খুলতে গেলাম।

দরজা খুলতেই দেখি, তাসনিম!

সে আগের মতোই হাসিমুখে ভেতরে ঢুকে পড়ল। দেখে মনে হচ্ছিল, গতকাল কিছুই ঘটেনি। যেন সবকিছু স্বাভাবিক।

কিন্তু ঘরে ঢুকেই যখন তার চোখ রায়হানের ওপর পড়ল, তখন আবারও সেই একই কাণ্ড!

সে চিৎকার করে উঠল—

— ছিঃ! ছিঃ! এ কেমন কাজ!

তারপর নিজের কাপড় শক্ত করে ধরে ভয়ে কাঁপতে লাগল।

এবার আর রায়হান নিজেকে সামলাতে পারল না।

গতকালের ঘটনার পর থেকে সে এমনিতেই প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিল। সবার সামনে অপমানিত হওয়ার কষ্ট, মানুষের সন্দেহভরা দৃষ্টি আর নিজের নির্দোষিতা বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা—সব মিলিয়ে তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।

সে হঠাৎ বসা থেকে উঠে দাঁড়াল।

রাগে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। দ্রুত তাসনিমের কাছে গিয়ে তার জামার অংশ শক্ত করে ধরে ফেলল।

উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে বলল—

— কী হয়েছে তোমার? আমাকে দেখলেই এভাবে চিৎকার করো কেন? আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি? বলো! আমার সঙ্গে তোমার কী হয়েছে? কেন প্রতিবার আমাকে দেখলেই এমন করো?

তাসনিম তার এমন রাগী চেহারা দেখে আরও বেশি ভয় পেয়ে গেল। সে রায়হানের হাতের মধ্যে কাঁপতে লাগল আর আতঙ্কিত কণ্ঠে বারবার বলতে লাগল—

— ছিঃ! ছিঃ! এ কেমন কাজ!

রায়হান এবার আরও উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠল—

— ছিঃ? কীসের ছিঃ? আমি কী করেছি যে তুমি আমাকে এভাবে অপমান করছ? এতদিন ধরে চুপ করে আছি বলে যা ইচ্ছা তাই করবে?

কথা বলতে বলতে সে তাসনিমকে ধরে দরজার বাইরে নিয়ে গেল।

তারপর প্রচণ্ড রাগের মাথায় তাকে ঘরের বাইরে ঠেলে দিয়ে বলল—

— আর কোনো দিন এই বাড়িতে আসবে না! শুনতে পাচ্ছ? আর একবার যদি তোমাকে এই বাড়িতে দেখি, তাহলে খুব খারাপ হবে! আমার বাড়িতে তোমার আসা একেবারে বন্ধ!

আমি তখন পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আমি কখনো রায়হানকে এভাবে রাগ করতে দেখিনি। দ্রুত তার কাছে গিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে তখন রাগে এতটাই অস্থির ছিল যে, কোনো কথাই শুনতে চাইছিল না।

অন্যদিকে তাসনিম দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।

রায়হান আবারও চিৎকার করে বলল—

— যাও এখান থেকে! আর কোনো দিন এসো না! যদি আসতেই হয়, তাহলে আগে বলবে আমি কী করেছি! কেন আমাকে দেখলে এমন করো, সেটা বুঝিয়ে বলবে!

রায়হানের কথা শুনে তাসনিম হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।

সে কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল, যেন মেঝেতে কিছু একটা খুঁজছে।

আমরা দুজনেই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

কিছুক্ষণ পর দরজার পাশেই পড়ে থাকা একটি ছোট কাঠের লাঠি তার চোখে পড়ল। সে সঙ্গে সঙ্গে লাঠিটা হাতে তুলে নিল।

এরপর মেঝেতে বসে লাঠির মাথা দিয়ে ধীরে ধীরে কিছু একটা আঁকতে শুরু করল।

প্রথমে আমরা বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম, হয়তো নিজের মতো করে কিছু একটা আঁকছে।

কিন্তু তার আঁকার ধরন দেখে আমি আর রায়হান দুজনেই কৌতূহলী হয়ে উঠলাম।

আমরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম, সে আসলে কী আঁকছে।

তাসনিম একমনে মেঝেতে আঁকতেই থাকল।

কিছুক্ষণ পর তার আঁকাটা স্পষ্ট হতে শুরু করল।

আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি। কিন্তু রায়হান যখন পুরো বিষয়টা ভালো করে দেখল, তখন তার মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেল।

আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।

সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমাদের দুজনের চোখেই তখন একই রকম আতঙ্ক আর অবিশ্বাস!

কারণ, তাসনিম এতদিন ধরে রায়হানকে দেখলেই যে কথাগুলো বলত, যে ভয়ংকর আচরণ করত, তার পেছনের কারণটা যেন সেই মেঝের আঁকাতেই লুকিয়ে ছিল!

আমরা দুজনেই বুঝতে পারলাম, এতদিন মেয়েটি আমাদের কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার কথার অর্থ বুঝতে না পারায় আমরা সবাই তাকে ভুল বুঝেছি।

কিন্তু সেদিন তাসনিমের আঁকা ছবি দেখে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।

তাসনিমের আঁকা শেষ হতেই আমার পা দুটো যেন আর শরীরের ভার নিতে পারছিল না। পাশে তাকিয়ে দেখি, রায়হানও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে এক ফোঁটা রক্ত নেই।

মেঝের ধুলোয় লাঠির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে একটা ছবি। একটা মেয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। তার দুই চোখ কাপড়ে বাঁধা। পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ, যে মেয়েটার জামা টেনে ধরার চেষ্টা করছে!

ছবিটা দেখে আমার দম বন্ধ হয়ে এল। এতদিন ধরে তাসনিম যে কাপড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরত, যে কথা বারবার বলত, তার মানে এখন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমরা কেউ বুঝিনি। আমরা শুধু ওকে পাগল ভেবেছি, জেদি ভেবেছি। আর ও কী ভয়ংকর কষ্ট বুকে নিয়ে ঘুরছিল!

রায়হান ধীরে ধীরে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল। ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে তাসনিমের দিকে ফিরল। একটু আগে যে মানুষটা রাগে চিৎকার করছিল, এখন তার গলা একদম নরম।

— তাসনিম, মা... তুমি এটা কী এঁকেছ? কেউ কি তোমার সঙ্গে এমন করেছে?

তাসনিম কিছুক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপা হাতে আঁকা মেয়েটার দিকে আঙুল দেখিয়ে নিজের দুই চোখে হাত চেপে ধরল। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল—

— দেখতে পাচ্ছি না... ছিঃ... ছিঃ!

আমার বুকের ভেতরটা কেউ যেন মুচড়ে ধরল। আমি তার পাশে বসে পড়লাম। তার ঠান্ডা হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম—

— কে তোমার চোখ বেঁধেছিল, সোনা? কে এমন করেছে? ... আমার স্বামী? রায়হান?

আমার মুখে "স্বামী" শব্দটা শুনেই তাসনিমের চোখ ঘুরে গেল রায়হানের দিকে। তারপর সে হুহু করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।

ঘরের ভেতর যেন বাজ পড়ল।

রায়হান দুই হাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল। তার গলা দিয়ে অস্ফুট একটা শব্দ বেরোল—

— ইয়া আল্লাহ! আমি এখন বুঝতে পারছি... সব বুঝতে পারছি!

আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।

— কী বুঝতে পারছ?

সে কাঁপা গলায় বলল—

— নুসাইবা, ও আমাকে দোষী ভাবছে। কারণ যে লোকটা ওর সঙ্গে এই জঘন্য কাজ করেছে, সে ওর চোখ বেঁধে রেখেছিল। ও তার মুখটা দেখতে পায়নি। ও শুধু এটুকু জানে যে লোকটা আপনজনদের কেউ। আর ও সবসময় জানত, আমি তোমার স্বামী! তাসনিম আমাকে দেখলেই সেই ভয়ংকর দিনটার কথা মনে করে কেঁপে ওঠে। ও আমাকে দেখে চিৎকার করে বলে, "ছিঃ! ছিঃ! এ কেমন কাজ!" কারণ ও মনে করে, ওই কাজটা আমিই করেছি।

আমি তাসনিমের দিকে তাকালাম। এই ছোট্ট, সরল মেয়েটা কতদিন ধরে একা এই ভয়ের বোঝা টানছে! কাউকে বলতে পারেনি। বললেও কেউ বোঝেনি। উল্টো আমরা ওকে ধমক দিয়েছি, ওর জন্য অশান্তির কথা বলেছি, ওকে বাড়িতে আসতে নিষেধ করেছি। আর একটু আগেও রায়হান ওকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে!

আমার চোখ ফেটে পানি এল। আমি তাসনিমকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। সে আমার কাঁধে মুখ গুঁজে কেঁপে কেঁপে কাঁদছিল। বুঝতে পারছিলাম, এই কান্না একদিনের নয়। এ কান্না জমে ছিল এক বছর ধরে।

আমি কাঁপা গলায় আবার জিজ্ঞেস করলাম—

— সোনা, সে কি প্রথমে তোমার চোখ বেঁধেছিল? তারপর...?

তাসনিম মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।

— আর সে কি তোমাকে বলেছিল যে সে আমার স্বামী?

সে আবারও মাথা নাড়ল। আরও জোরে কেঁদে উঠল।

আমার শরীরটা অবশ হয়ে এল। রায়হান উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে অস্থির পায়ে পায়চারি করতে লাগল। তার হাত দুটো কাঁপছিল।

— আমি সবসময় বুঝতাম, ওর মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। আমার মন বলত, কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু এতটা যে ভয়ংকর, তা কোনোদিন ভাবিনি! আর সবচেয়ে বড় কথা, এটা আমাদের এই বাড়িতেই ঘটেছে! তাই ও আমাকেই...

তার গলা আটকে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে আবার বলল—

— কিন্তু কে? কে আমাদের ঘরে ঢুকে এমন একটা কাজ করতে পারল?

আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম। তারপর ধীরে ধীরে দুজনেই একসঙ্গে ভাবতে শুরু করলাম।

তাসনিমকে আমরা কখনো একা রাখিনি। হয় সে আমার সঙ্গে থাকত, নয়তো রায়হানের সঙ্গে। আমাদের বাসায় যেই আসত, আমরা দুজনের কেউ না কেউ ঘরে থাকতামই। বাইরের কেউ এসে আমাদের চোখের আড়ালে তাসনিমের সঙ্গে একা সময় কাটাবে, এটা ভাবাই যায় না।

আমি মনে করার চেষ্টা করলাম, গত এক বছরে কারা আমাদের বাসায় এসেছে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিতজন। কাকে কখন দেখেছি, কে কতক্ষণ ছিল। কে কখন তাসনিমের সঙ্গে কথা বলেছে। যে সময়টাতে তাসনিমের আচরণ বদলে গিয়েছিল, ঠিক সেই সময়ের ঘটনাগুলো একটা একটা করে আমরা মনে করার চেষ্টা করছিলাম।

রায়হান বারবার কপালে হাত দিয়ে বলছিল—

— এক বছর আগে... ঠিক এক বছর আগে থেকেই ও বদলে গেছে। ওই সময় কে এসেছিল? কে এসেছিল আমাদের বাড়িতে?

আমি আঙুল গুনে গুনে মনে করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কোনো মুখ স্পষ্ট হচ্ছিল না। ঘরের মধ্যে শুধু তাসনিমের চাপা কান্নার শব্দ।

হঠাৎ রায়হান থেমে গেল।

সে পায়চারি বন্ধ করে একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো কোথাও আটকে গেছে, যেন মনের ভেতর কোনো পুরোনো স্মৃতি এইমাত্র ভেসে উঠেছে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম—

— কী হলো?

সে ধীরে ধীরে আমার দিকে ফিরল। তার ঠোঁট কাঁপছিল। ফিসফিস করে বলল—

— দাঁড়াও... নুসাইবা, তোমার কি খালিদের কথা মনে আছে?

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login