শীতের শুরুতেই কুয়াশার একটা অদ্ভুত স্বভাব থাকে,সে নিঃশব্দে চারপাশের পরিচিত পৃথিবীকে অচেনা বানিয়ে ফেলে। চুনতি পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে যখন সেই কুয়াশা সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে নামতে শুরু করে, তখন বিকেল চারটাতেই অন্ধকার নেমে আসে। সৈকত, অর্ক আর শুভ,এই তিন বন্ধু মিলে স্কুল ছুটির এই দিনগুলোতে চুনতির ফরেস্ট রেস্ট হাউসে এসে উঠেছিল। সৈকতের মামা বন বিভাগের একজন বড় কর্মকর্তা। তিনি সরকারি কাজে চট্টগ্রাম শহরে গেছেন দুদিনের জন্য, আর সেই সুযোগে রেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার কাশেম আলীর জিম্মায় এই পাহাড়ি নিস্তব্ধতার স্বাদ নিতে এসেছে তারা। কিন্তু প্রকৃতি দেখতে এসে যে তারা এমন এক অন্ধকারে পা বাড়াবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি।
সবকিছুর শুরু হয়েছিল ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায়। রেস্ট হাউসের পেছনের কাঠের বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল তিনজন। ঠিক তখনই পেছনের পাইন বন আর মেহগনির ঘন ঝোপের সীমানায় আলো-আঁধারির ভেতর প্রথম দেখা যায় লোকটিকে। গায়ে ঝুলছে একখানা অদ্ভুত মেঝেকবচ কালো আলখাল্লা। মুখমণ্ডল একখানা ভারী হুড বা আলখাল্লার বাড়তি কাপড়ের আড়ালে ঢাকা, শুধু ভেতরের দুটো চোখ জংলি বিড়ালের চোখের মতো চকচক করছিল। লোকটির উচ্চতা অস্বাভাবিক, সাধারণ মানুষের চেয়ে অন্তত এক বিঘত বেশি লম্বা। কুয়াশার ভেতর সে দাঁড়িয়ে ছিল একেবারে পাথরের মূর্তির মতো নিঃশব্দে। অর্ক বাইনোকুলার তুলে দেখার আগেই ছায়ার মতো মিলিয়ে গেল সে জঙ্গলের ঢালে।
কাশেম আলীকে জিজ্ঞেস করতেই বৃদ্ধ কেয়ারটেকারের মুখে ভয়ের এক গাঢ় ছায়া নেমে এসেছিল। হাত থেকে চায়ের কেটলিটা নামিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় সে বলেছিল, "ওদিকে নজর দিয়ো না ছোটবাবুরা। ও হইলো কালাপাহাড়ের ছায়া। বহু বছর ধইরা এই বনে ঘোরে। যার সামনে পড়ে, তার দিন শেষ।"
কিশোর মনের রক্তে ভূতের চেয়ে রহস্যের প্রতি টান সবসময়ই তীব্র। সৈকত বিজ্ঞানের ছাত্র, ভূত-প্রেতে তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। সে অর্ক ও শুভর দিকে তাকিয়ে চোখে এক চিলতে কৌতূহলের ঝিলিক ফুটিয়ে বলেছিল, "ভূত কোনোদিন কাচের মতো শক্ত বুট পরে হাঁটে না। কাল সন্ধ্যায় আমি লক্ষ্য করেছি, লোকটা যখন সরছিল, তখন শুকনো পাতায় ভারী সামরিক বুটের মড়মড় শব্দ হয়েছিল।"
পরদিন সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। পাহাড়ি বাতাসে তীব্র এক হিমেল ভাব। দুপুরের পর পরই তিন বন্ধু বের হলো বনের ভেতরে ট্রেকিংয়ের উদ্দেশ্যে। সৈকতের কাঁধে ছিল একটা ছোট ব্যাকপ্যাক, যাতে টর্চলাইট, সুইস নাইফ, কম্পাস আর দড়ি রাখা। অর্কর গলায় ঝুলছিল তার প্রিয় ডিজিটাল ক্যামেরা, আর শুভ তার স্বভাবসুলভ সতর্কতায় পকেটে রেখেছিল একটা শক্ত লোহার রেঞ্চ। রেস্ট হাউস থেকে প্রায় দুই মাইল গভীরে গিয়ে তারা পৌঁছাল এক পুরোনো পরিত্যক্ত রেলটানেলের মুখে। ব্রিটিশ আমলে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের পাথর ও কয়লা পরিবহনের জন্য এই লাইনটি ব্যবহৃত হতো, যা বহু দশক আগেই পাহাড়ি ধসের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। টানেলের মুখটা ঢেকে গেছে বুনো ফার্ন আর বিষাক্ত লতায়।
"সৈকত, মামা কিন্তু এই জঙ্গলটার এত ভেতরে আসতে মানা করেছিলেন," শুভ একটু দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলল।
"ভয় পাস না শুভ," সৈকত টর্চের মুখ ঘুরিয়ে বলল। "মামা যে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নকশার কথা বলছিলেন, সেটা এই লাইনের আশেপাশেই কোথাও আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা,ওই আলখাল্লা পরা লোকটা ঠিক এই পথেই এসেছে। দেখ, কাদার ওপর নতুন বুটের দাগ।"
অর্ক ঝুঁকে পড়ে ক্যামেরা অন করল। কাদার ওপর ভারী বুটের স্পষ্ট দাগ। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বুটের সোলের নিচের নকশাটা খুব আধুনিক এবং খাঁজকাটা,কোনো সাধারণ পাহাড়ি কাঠুরে বা চোর-ডাকাতের এমন দামি বুট পরার কথা নয়। তারা সাবধানে টানেলের ভাঙা মুখে ঢুকল। টানেলের ভেতরে ঢোকা মাত্রই বাইরের কুয়াশা যেন উধাও হয়ে গেল, তার জায়গা নিল এক গাঢ়, জমাটবাঁধা অন্ধকার। ছাদ থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঠান্ডা জল তাদের কাঁধে পড়ছিল,‘টপ... টপ...’। টর্চের সরু আলোর বৃত্ত ছাড়া কোথাও কোনো আলো নেই। বাতাসের ভেতরে ভেজা চুন আর কর্পূরের মতো এক তীব্র ঝাঁজালো রাসায়নিক গন্ধ।
"কীসের গন্ধ এটা?" অর্ক নাকে রুমাল চাপা দিল।
"সালফার আর ফসফরাস," সৈকত ফিসফিস করল। "এখানে কোনো সাধারণ জিনিস নেই।"
টানেলের প্রায় একশ গজ ভেতরে গিয়ে লাইনটা ভেঙে পড়া বড় বড় পাথরের চাঁইয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সৈকতের চোখ গেল বাম দিকের পাথুরে দেওয়ালে। সেখানে একটি প্রাকৃতিক ফাটলকে কৃত্রিমভাবে কেটে একটা সরু দরজার রূপ দেওয়া হয়েছে। দরজার মুখে ঝুলছে একখানা লোহার শিকল, তবে তার তালাটা খোলা!ভেতরে পা বাড়াতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য তাদের চোখে পড়ল। এটি কোনো সাধারণ গুহা নয়; এটি একটি প্রাচীন ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার বা বাঙ্কার। চারপাশের দেওয়ালে মরচে ধরা পুরোনো তেলের ড্রাম, কাঠের বড় বড় বাক্স, আর মেঝের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা কাচের টিউব ও আধুনিক ব্যাটারি। দেওয়ালের এক কোণে ঝুলছে কিছু আধুনিক মনিটর আর ওয়াকিটকি সেট!
"তার মানে এই লোকটা কোনো ভূত নয়, এটা কোনো আধুনিক চক্রের গোপন আস্তানা!" শুভ চোখ বড় বড় করে বলল।
"একদম ঠিক," সৈকত একটি কাঠের বাক্সের কাছে গেল। বাক্সের গায়ে লাল রঙে আঁকা একটি বিপজ্জনক সংকেত,তেজস্ক্রিয়তা বা বিষাক্ত রাসায়নিকের চিহ্ন। বাক্সের ভেতরে খড় দিয়ে মোড়ানো কয়েকটি ধাতব সিলিন্ডার।
অর্ক দ্রুত ক্যামেরার শাটার চাপল। ‘ক্লিক... ক্লিক...’।
ঠিক তখনই গুহার প্রবেশপথ থেকে একটা ভারী ধাতব শব্দ ভেসে এল,‘খটাস!’
তিন কিশোর নিমেষে জমে গেল। টর্চের আলো নিভিয়ে দিল সৈকত। চারপাশ এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে ভারী বুটের মন্থর, নিয়মিত শব্দ এগিয়ে আসতে লাগল,‘ঠক... ঠক... ঠক...’। প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে সাথে বাতাসের সেই অদ্ভুত রাসায়নিক গন্ধটা তীব্র হতে লাগল।
গুহার ভেতর জ্বলে উঠল একটি শক্তিশালী হ্যালোজেন টর্চের আলো। আলোর প্রতিফলনে তিন কিশোর কোনোমতে আড়াল নিল দুটি বড় ড্রামের পেছনে।
আলোর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই আলখাল্লাধারী লোক। কাছ থেকে এবার লোকটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কালো মোটা জলরোধী আলখাল্লার নিচে তার শরীরে সামরিক বেল্ট বাঁধা, যাতে ঝুলছে একটি ভারী পিস্তলের হোলস্টার। আলখাল্লার হুডের ভেতর থেকে একটি বিশেষ গ্যাস-মাস্কের ফিল্টার দেখা যাচ্ছে। সে কোনো অশরীরী ছায়া নয়, সে এক আধুনিক ও অত্যন্ত প্রশিক্ষিত আন্তর্জাতিক অপরাধী। লোকটি মেঝের কাদার দিকে তাকাল। তার হাতে ধরা আলোটি স্থির হলো কিশোরদের বুটের নতুন ছাপের ওপর।
হুডের নিচ থেকে ভেসে এল এক বিকৃত, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর,"ইঁদুর ঢুকেছে দেখছি। বাচ্চারা, তোমরা ড্রামের আড়াল থেকে যদি নিজের ইচ্ছায় বের হয়ে না আসো, তবে এই টানেলটি তোমাদের কবরস্থান হবে।"
শুভর হাত কাঁপছিল। অর্ক নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল। সৈকত বুঝল, লুকোচুরি খেলে এই পেশাদার শিকারীর হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। সে ড্রামের আড়াল থেকে শান্তভাবে দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল।
"বেরিয়ে আয় অর্ক, শুভ। লুকানোর লাভ নেই।" সৈকতের গলা ছিল আশ্চর্যরকম শান্ত।
শুভ ও অর্ক ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। লোকটি এক পা এগিয়ে এল। হ্যালোজেন আলোর তীব্রতায় কিশোরদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। লোকটির ডান হাত চলে গেল কোমরের হোলস্টারের দিকে।
"তোমরা বন বিভাগের সেই মেহমান, তাই না?" লোকটির কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না, ছিল ঠান্ডা বরফের মতো নির্মমতা। "তোমাদের বয়স কম, কিন্তু কৌতুহলটা বড্ড বেশি। যে জিনিস তোমাদের দেখার কথা ছিল না, তা তোমরা দেখে ফেলেছ।"
"আপনি চুনতি অভয়ারণ্যের সংরক্ষিত পাহাড়ি এলাকা থেকে ইউরেনিয়াম এবং বিরল খনিজ পদার্থ পাচার করছেন," সৈকত সরাসরি লোকটির মুখের গ্যাস-মাস্কের দিকে তাকিয়ে বলল। "মামার ফাইলে আমি এই কোডনেমের কথা পড়েছিলাম,'প্রজেক্ট ব্ল্যাকহুড'। আপনি সেই চোরাচালান চক্রের লোক!"
লোকটি এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর হুডের ভেতর থেকে এক কর্কশ হাসির আওয়াজ বের হলো। "বুদ্ধিমান ছেলে। কিন্তু অতিরিক্ত বুদ্ধিমানরা বেশিদিন বাঁচে না। তোমাদের মামা শহরে গেছে আমার পাতা এক ভুয়া তদন্তের ফাঁদে। আর কাল সকালের আগেই আন্তর্জাতিক সীমানা পার হয়ে এই মাল পৌঁছে যাবে জাহাজে। তোমাদের বেঁচে থাকা আমার জন্য একটা মারাত্মক ঝুঁকি।"
লোকটি পিস্তল বের করল। ধাতব নলটি সরাসরি তাক করা হলো সৈকতের কপাল বরাবর। "দৌড়া!"
সৈকত হঠাৎ এক অভাবনীয় কাজ করল। সে কথা শেষ না হতেই তার ব্যাকপ্যাকের সবচেয়ে শক্তিশালী এমার্জেন্সি স্ট্রোব-লাইটটি বের করে এক ঝটকায় লোকটির চোখের ওপর অন করে দিল।
স্ট্রোব-লাইটের অতি-তীব্র, ঝলকানিযুক্ত ফ্ল্যাশ লাইটটি লোকটির রাতের অন্ধকারে অভ্যস্ত চোখ এবং গ্যাস-মাস্কের স্বচ্ছ গ্লাসে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করল। কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের জন্য লোকটি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেল। সে যন্ত্রণায় গর্জে উঠে অনির্দিষ্টভাবে গুলি চালাল,‘গুড়ুম!
বুলেটটি পাথরের দেওয়ালে লেগে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে ছিটকে গেল। সেই ভগ্নাংশের সময়ে শুভ তার পকেট থেকে লোহার ভারী রেঞ্চটি পুরো শক্তিতে লোকটির গোড়ালি লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল। রেঞ্চটি ঠিক জায়গায় আঘাত হানল। লোকটি ভারসাম্য হারিয়ে এক হাঁটুতে বসে পড়ল।
"টানেলের বাইরে চল! দ্রুত!" সৈকত চিৎকার করল।
তিন কিশোর অন্ধকারের ভেতর দিয়ে টানেলের মূল মুখের দিকে পাগলের মতো ছুটতে লাগল। পেছনে তখন লোকটির গর্জন আর বুটের তাড়া করার শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বাইরে বেরিয়ে আসতেই তারা দেখল কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। আকাশ ভেঙে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পাহাড়ি পথ পিছল হয়ে গেছে।
"রেস্ট হাউসের দিকে গেলে ও আমাদের মাঝপথেই ধরে ফেলবে!" অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। "ওর কাছে বন্দুক আছে!"
"ঠিক," সৈকত জঙ্গলের খাড়াই ঢালের দিকে তাকাল। "আমরা ওয়াচটাওয়ারের দিকে যাব। ওখানকার ওয়্যারলেস স্টেশনটা সচল থাকে। আমরা সিগন্যাল পাঠাব।"
তারা মূল পাহাড়ি ট্রেইল ছেড়ে গভীর অরণ্যের ভেতর ঢুকে পড়ল। কাঁটাঝোপ তাদের জামা ছিঁড়ে ফেলল, পাথরে পা লেগে শুভর হাঁটুর চামড়া ছড়ে রক্ত বের হতে লাগল, কিন্তু থামার কোনো উপায় ছিল না। পেছনে আলখাল্লার খসখস শব্দ আর গাছের ডাল ভাঙার আওয়াজ বুঝিয়ে দিচ্ছিল,শিকারী তাদের ঠিক পিছু পিছু আসছে। তার গতি অস্বাভাবিক দ্রুত।
পাহাড়ের চূড়ায় কুয়াশার চাদর চিরে দাঁড়িয়ে ছিল কাঠ ও লোহার পুরোনো ফরেস্ট ওয়াচটাওয়ারটি। তিন বন্ধু মই বেয়ে তরতর করে টাওয়ারের প্ল্যাটফর্মে উঠে গেল। সৈকত দ্রুত কেবিনের কাঠের ভারী পাল্লাটা বন্ধ করে ভেতর থেকে কাঠের শক্ত অর্গল তুলে দিল। কেবিনের ভেতরটা অন্ধকার। অর্ক টর্চ জ্বেলে দেখল, টেবিলে রাখা ওয়্যারলেস সেটটির লাল বাতি টিমটিম করে জ্বলছে। কিন্তু সৈকত যখন সেটের রিসিভার তুলে বোতাম চাপল, তখন কোনো সিগন্যাল পাওয়া গেল না,কেবল স্থির ঘড়ঘড় শব্দ।
"অ্যান্টেনা কাটা!" শুভ জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে আঁতকে উঠল। "লোকটা আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল!"
ঠিক তখনই দরজায় সজোরে এক লাথি পড়ল,‘ধড়াম!’ পুরো কাঠের টাওয়ারটা কেঁপে উঠল। দরজার বাইরে থেকে আলখাল্লাধারীর ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
"দরজা খোলো বাচ্চারা। আর কোনো বাঁচার পথ নেই। এই টাওয়ারের নিচে কুড়ি ফুটের খাদ।"
সৈকতের চোখ দ্রুত কেবিনের ভেতর ঘুরল। তার মস্তিষ্কে তখন বিজ্ঞানের নানা সমীকরণ ঘুরপাক খাচ্ছে। সে দেখল কোণে রাখা রয়েছে একটি বড় ডিসি ব্যাটারি, কিছু তামার তার এবং আগের বনপ্রহরীদের ফেলে যাওয়া কেরোসিনের এক গ্যালন বোতল।
"অর্ক, শুভ, আমার কথা মন দিয়ে শোন," সৈকত দ্রুত ফিসফিস করল। "শুভ, তুই তেলের গ্যালনটা দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে ঢালতে শুরু কর। পুরো মেঝেটা যেন পিচ্ছিল হয়ে যায়। আর অর্ক, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ক্যাপাসিটরের সাথে এই ব্যাটারির তার দুটো পেঁচিয়ে রাখ।"
তারা দ্রুত কাজে লেগে গেল। শুভ পুরো গ্যালনের তেল দরজার তলা দিয়ে বাইরের কাঠের পাটাতনে ঢেলে দিল।
দ্বিতীয়বারের মতো লাথি পড়তেই দরজার পাল্লার ওপরের কব্জাটা মট করে ভেঙে গেল। আলখাল্লাধারী লোকটি এবার কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিতে লাগল। আর এক ধাক্কাতেই দরজা ভেঙে পড়বে।
"এখন!" সৈকত চিৎকার করল।
সৈকত নিজেই এক ঝটকায় দরজাটি টেনে পুরো খুলে দিল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আলখাল্লাধারী লোকটি প্রস্তুত ছিল না দরজা এত সহজে খুলে যাওয়ার জন্য। সে নিজের ওজনের চাপে হুমড়ি খেয়ে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু মেঝেতে কেরোসিনের তেল ঢালা থাকায় তার ভারী বুটের গ্রিপ কাজ করল না; সে তীব্র গতিতে পা পিছলে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। তার হাত থেকে পিস্তলটি ছিটকে গিয়ে কেবিনের এক কোণে পড়ে গেল। লোকটি বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় আবার উঠতে চাইল। কিন্তু ততক্ষণে অর্ক তার ক্যামেরার উন্মুক্ত হাই-ভোল্টেজ ওয়্যারটি লোকটির ভেজা আলখাল্লার কলারের মেটাল জিপারে ছুঁইয়ে দিল।
এক তীব্র নীল স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল,‘চড়চড়!’ ব্যাটারি ও ক্যাপাসিটরের সম্মিলিত শক খেয়ে লোকটি যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে আবার মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। তার শরীর আক্ষেপে কেঁপে উঠল এবং কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে অসাড় হয়ে গেল।
সুযোগ হাতছাড়া করল না শুভ। সে কোণে রাখা মোটা পাটাতনের শক্ত তক্তাটা তুলে নিয়ে লোকটির পিঠের ওপর সজোরে চেপে বসল। সৈকত তার ব্যাকপ্যাক থেকে শক্ত নাইলনের দড়ি বের করে লোকটির দুই হাত পিঠমোড়া করে এমন শক্ত গিঁট দিল, যা খোলা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব।
দশ মিনিট পর। লোকটি মেঝেতে বাঁধা অবস্থায় গোঙাচ্ছিল। সৈকত এগিয়ে গিয়ে এক টানে তার মাথার হুড আর মুখের গ্যাস-মাস্কটা খুলে ফেলল।
গ্যাস-মাস্কের আড়াল থেকে যে মুখটি বেরিয়ে এল, তা দেখে তিন কিশোরের চোখ কপালে উঠল। সে কোনো অচেনা বিদেশি নয়। সে খোদ রেস্ট হাউসের সেই নিরীহ কেয়ারটেকার,কাশেম আলী! তার আসল রূপ ছিল এক দুর্ধর্ষ ছদ্মবেশ। বয়োবৃদ্ধের কুঁজো ভাবটা ছিল কৃত্রিম; আলখাল্লার ভেতরে সে উচ্চতা বাড়ানোর বিশেষ প্যাডেড জুতো এবং বডি-আর্মার পরে থাকত, যাতে তাকে এক দানবীয় ভৌতিক অবয়ব মনে হয় এবং গ্রামের বা পর্যটকদের কেউ ভয়ে গভীর জঙ্গলে পা না বাড়ায়!
"কাশেম চাচা!" শুভ অস্ফুট স্বরে বলল। কাশেম আলী তার আসল শক্ত ও হিংস্র গলায় থুতু ফেলে বলল, "তোমরা আমার বিশ বছরের সাজানো সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিলে। ওই বুড়ো সাজার নাটকটা যদি না করতাম, তবে বন বিভাগ কবেই এই পাহাড়ে খনন কাজ শুরু করে দিত।"
ভোরের প্রথম আলো যখন কুয়াশা ভেদ করে চুনতির পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ল, তখন দূর থেকে শোনা গেল সাইরেনের শব্দ। সৈকতের মামা এবং পুলিশের একটি বিশেষ দল জিপ নিয়ে ওয়াচটাওয়ারের নিচে এসে থামল। রাতে কিশোরদের ফোনে নেটওয়ার্ক চলে যাওয়ার আগে সৈকত যে এক লাইনের জিপিএস লোকেশন মেসেজ পাঠিয়েছিল, তাতেই কাজ হয়েছিল।
পুলিশ যখন আন্তর্জাতিক চোরাচালানের প্রধান হোতা কাশেম আলীকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে জিপে তুলল, তখন বন বিভাগের কর্মকর্তা মামা এসে তিন কিশোরের কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর চোখে তখন অবিশ্বাস আর গভীর গর্ব।
"তোমরা যা করেছ, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না," মামা বললেন। "দেশের এক অমূল্য খনিজ সম্পদ আর নিরাপত্তা রক্ষা পেয়ে গেল তোমাদের সাহসে।"
অর্ক তার ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করতে করতে হাসল। "মামা, ছবিগুলো কিন্তু দারুণ উঠেছে। পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপার মতো!"
সৈকত ভোরের নির্মল বাতাস টেনে নিল ফুসফুসে। কুয়াশা ধীরে ধীরে কাটছে। চুনতির পাহাড় এখন আর কোনো ভয়ের বা অন্ধকারের প্রতীক নয়; সূর্যের সোনালি আলোয় সে যেন আবার এক শান্ত, চিরসবুজ সৌন্দর্যে জেগে উঠছে। আর সেই আলোর নিচে তিন কিশোর দাঁড়াল এক নতুন বিজয়ের হাসি নিয়ে,যাদের কাছে ভীতি কোনোদিন সত্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারেনি।