এক সময় ভাবতাম,
প্রাইমারির বন্ধুদের ছাড়া জীবনটাই অচল;
টিফিনের এক টুকরো পাউরুটি ভাগ করে খাওয়া,
ধুলোমাখা মাঠে গোল্লাছুট আর ভাঙা স্লেটের দাগে
যাদের মুখ আঁকা ছিল প্রতিটা ভোরে,
ভেবেছিলাম, এই বন্ধনটাই বুঝি আজীবন ধ্রুব।
কিন্তু হাইস্কুলে পা রাখতেই চেনা আকাশটা বদলে গেল,
পুরোনো মুখগুলো দূরে সরে ভুল প্রমাণ করল সেই শৈশবকে।
হাইস্কুলের নতুন ছেলেরাই হয়ে উঠল জানের জিগার দোস্ত;
এক সাইকেলে তিনজনের সওয়ারি হওয়া,
প্রথম প্রেম আর পালিয়ে যাওয়া বিকেলের সব গোপন ডায়েরি
নির্দ্বিধায় জমা পড়ল ওদের বিশ্বস্ত হাতের তালুতে।
তখন মনে হতো, এই তো আমার আসল পৃথিবী!
তারপর এল কলেজের রঙিন দিনগুলো,
নতুন আড্ডা, কাঠের বেঞ্চির গভীর তর্ক আর কড়া চায়ের ধোঁয়া;
পুরোনো সেই প্রাণের দোস্তরাও ধীরে ধীরে ব্যাকবেঞ্চের ছায়া হয়ে
হারিয়ে গেল স্মৃতির একচিলতে ফ্রেমে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে পৌঁছাতেই বদলে গেল সংজ্ঞার পরিধি,
ক্যারিয়ারের হিসাব, রাজনীতির মিছিল আর বড় হওয়ার তাড়া;
একে একে কত শত বন্ধু যে এল আর গেল,
ঠিক যেন ট্রেনের জানালায় দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া চেনা স্টেশন।
আজ জীবনের এই নিঃসঙ্গ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বুঝি,
বন্ধু তো কোনো চিরস্থায়ী ঠিকানা নয়,
ওরা আসলে এক একটি ঋতুর মতো ক্ষণিক অতিথি।
সময়ের প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে দেওয়া সহযাত্রী,
গতির তোড়ে যারা বারবার বদলায় নিজেদের প্ল্যাটফর্ম।
এখন আর কারো চলে যাওয়াতে চোখ ভেজে না,
হারিয়ে যাওয়া নামগুলো নিয়ে জাগে না কোনো গভীর ক্ষোভ।
বিবর্তনের এই দীর্ঘ মেঠোপথ শুধু একটা সত্যই শিখিয়ে দিল,
মানুষ আসলে একা আসে, একাই হাঁটে,
আর বন্ধুত্বের ভিড় শুধুই ক্ষণিক মায়ার এক মায়াবী কুয়াশা।