Story

পাওনাদার

November 6, 2026

16 views

গ্রামের নাম শালিখাপুর। ছোট্ট একটি গ্রাম, চারদিকে সবুজ ধানের মাঠ, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, পুকুরের ধারে তালগাছ আর সন্ধ্যা নামলেই দূরের বাঁশবাগান থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। গ্রামের মানুষগুলো বেশিরভাগই কৃষক। কারও দুই বিঘা জমি, কারও এক বিঘা, আবার কারও নিজের বলতে কিছুই নেই। অন্যের জমিতে কাজ করে, দিনমজুরি করে, কিংবা ফসলের ভাগ নিয়ে তাদের সংসার চলে। এই গ্রামেই বাস করত আবদুল করিম। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। গায়ের রং রোদে পোড়া, শরীর শুকনো, চোখে একরাশ ক্লান্তি। তার সংসারে স্ত্রী রহিমা, মেয়ে ময়না আর ছেলে রফিক। ময়নার বয়স বারো, রফিকের আট। করিমের নিজের কোনো জমি ছিল না। গ্রামের মাতবরের তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করত সে। ফসলের অর্ধেক জমির মালিক পেত, বাকি অর্ধেক দিয়ে করিমের সংসার চলত। কিন্তু কৃষকের সংসার কি শুধু ফসলের ওপর চলে? কখনো বৃষ্টি হয় না, কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো পোকায় ধান নষ্ট হয়। কখনো বাজারে ধানের দাম কমে যায়। আর অসুখ-বিসুখ তো গরিবের ঘরে দরজায় কড়া নেড়ে আসে না, হঠাৎ করেই ঢুকে পড়ে।

করিমের জীবনও তেমনই ছিল। পরিশ্রম করত, কিন্তু অভাব তার পিছু ছাড়ত না। গ্রামে একজন মহাজন ছিল। নাম তার হরিপদ সাহা। সবাই তাকে হরিপদ মহাজন বলেই ডাকত। গ্রামের বাজারের মাথায় তার বড় দোকান। দোকানের সামনে কাঠের বেঞ্চ, ভেতরে চাল-ডাল-তেল-লবণ, আর দোকানের পেছনে একটি ছোট ঘর। সেই ঘরেই বসে সে গ্রামের মানুষের টাকা ধার দিত। হরিপদ মহাজনের টাকা ছিল, কিন্তু তার হৃদয়টা যেন পাথরের তৈরি। গ্রামের মানুষ বিপদে পড়লেই তার কাছে ছুটে যেত। কেউ মেয়ের বিয়ে দিতে, কেউ চিকিৎসা করাতে, কেউ জমিতে বীজ কিনতে, কেউ আবার সংসারের চাল কিনতে টাকা ধার নিত। মহাজন টাকা দিত। কিন্তু সেই টাকার সঙ্গে জুড়ে দিত সুদের এমন এক শিকল, যা একবার গলায় পড়লে খুলে ফেলা সহজ ছিল না। করিম কখনো মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেনি। সে জানত, মহাজনের টাকা নেওয়া মানে নিজের ঘাড়ে বোঝা চাপানো। কিন্তু মানুষ সব সময় নিজের ইচ্ছামতো চলে না। কখনো পরিস্থিতি মানুষকে এমন জায়গায় দাঁড় করায়, যেখানে সামনে আর কোনো পথ থাকে না।

সেদিন ছিল আষাঢ় মাসের শেষ দিক। আকাশে কালো মেঘ জমেছিল। দুপুর থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল থেমে থেমে। করিমের ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ছিল। রহিমা মাটির হাঁড়ি সরিয়ে সেই পানির নিচে একটি বাটি রেখে দিল।

“এই চাল আর কত দিন টিকবে গো?” রহিমা উদ্বিগ্ন গলায় বলল।

করিম চুপ করে বসে ছিল।

“ময়নার স্কুলের বেতনও বাকি। রফিকের বই কিনতে হবে। আর ঘরের চালটা যদি এবার না সারাই, বর্ষায় সব ভিজে যাবে।”

করিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“ধান উঠুক, তারপর দেখি।”

রহিমা একটু থেমে বলল,

“ধান উঠতে তো অনেক দেরি। এর মধ্যে কী খেয়ে থাকব?”

করিম কোনো উত্তর দিল না। তার চোখের সামনে তখন জমির দৃশ্য ভেসে উঠছিল। বর্গা নেওয়া জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছে। কিন্তু বীজ, সার আর কীটনাশকের জন্য আরও টাকা দরকার। জমির মালিক আগেই বলে দিয়েছে, ফসল ভালো না হলে তার ভাগ কমবে না। সেই রাতে করিম ঘুমাতে পারেনি। একদিকে সংসারের অভাব, অন্যদিকে চাষের খরচ। ভোরে সে সিদ্ধান্ত নিল,মহাজনের কাছে যাবে। পরদিন সকালে করিম বাজারের দিকে রওনা হলো। তার পায়ে পুরোনো স্যান্ডেল, গায়ে মলিন গামছা। বাজারে পৌঁছে হরিপদ মহাজনের দোকানের সামনে দাঁড়াল। মহাজন তখন হিসাবের খাতায় চোখ রেখে বসে ছিল।

“কী করিম? কী চাই?”

করিম মাথা নিচু করে বলল,

“মহাজন, একটু টাকা ধার দরকার।”

হরিপদ চশমার ওপর দিয়ে তাকাল।

“কত?”

“পাঁচ হাজার টাকা।”

মহাজন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।

“পাঁচ হাজার! কী করবি?”

“জমিতে সার কিনব। ঘরের চালও একটু সারাতে হবে। ছেলেমেয়েদের স্কুলের খরচ আছে।”

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

“টাকা দেব। কিন্তু সুদ দিতে হবে। মাসে পাঁচ টাকা প্রতি একশো টাকায়।”

করিম হিসাবটা ঠিক বুঝল না। সে বলল,

“মহাজন, ফসল উঠলে টাকা শোধ করে দেব।”

“ফসল উঠলে? ফসল তো উঠতে ছয় মাস। তার আগে সুদ চলবে। আর সময়মতো না দিলে সুদের ওপর সুদ।”

করিমের বুকের ভেতর কেমন একটা কাঁপুনি উঠল।

“মহাজন, একটু কম করেন। আমি গরিব মানুষ।”

হরিপদ খাতাটা বন্ধ করে বলল,

“গরিব বলেই তো টাকা দিচ্ছি। টাকা কি গাছে ধরে? নিতে হলে শর্ত মানতে হবে।”

করিমের সামনে তখন আর কোনো রাস্তা ছিল না। সে রাজি হলো।

হরিপদ একটি কাগজ বের করল। সেখানে করিমের নাম, ধার নেওয়া টাকা, সুদের হার ও শর্ত লেখা হলো। করিমের পড়তে জানা ছিল না। সে কাগজের লেখা বুঝল না। মহাজন বলল,

“এখানে আঙুলের ছাপ দে।”

করিম আঙুলের ছাপ দিল।

পাঁচ হাজার টাকা হাতে নিয়ে সে বাড়ি ফিরল। টাকা হাতে পেয়ে রহিমা কিছুটা স্বস্তি পেল। সার কেনা হলো, চাল মেরামত করা হলো, ময়নার স্কুলের বেতন দেওয়া হলো। কয়েক দিনের জন্য সংসারে একটু স্বস্তি ফিরে এল। কিন্তু করিম জানত না, সেই পাঁচ হাজার টাকা তার জীবনে এক দীর্ঘ অন্ধকারের দরজা খুলে দিয়েছে। মাস গড়িয়ে গেল। ধানের জমিতে সবুজ চারা বড় হতে লাগল। করিম সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমিতে কাজ করত। কাদা মাখা পা, ঘামে ভেজা শরীর, তবু মনে আশা,এবার ফসল ভালো হবে। কিন্তু প্রকৃতি সব সময় মানুষের আশা পূরণ করে না। একদিন গভীর রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হলো। নদীর পানি বেড়ে গেল। গ্রামের নিচু জমিগুলো পানিতে ডুবে গেল। করিমের ধানের জমিরও অনেকটা অংশ পানির নিচে চলে গেল। সকালে জমিতে দাঁড়িয়ে করিম দেখল, তার ধানের চারা কাদার মধ্যে মিশে গেছে। বুকের ভেতর যেন কেউ পাথর চাপা দিল।

রহিমা জমির পাশে এসে দাঁড়াল।

“এখন কী হবে?”

করিম মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,

“আল্লাহ জানেন।”

ফসলের ক্ষতি হওয়ায় জমির মালিকও করিমের ওপর চাপ দিল। সে বলল, তার ভাগের ধান ঠিকই দিতে হবে। করিম অনেক অনুরোধ করল, কিন্তু জমির মালিক রাজি হলো না। এদিকে মহাজনের সুদের সময়ও ঘনিয়ে এল। একদিন হরিপদ মহাজন নিজেই করিমের বাড়িতে এসে হাজির হলো।

“করিম, টাকা শোধের সময় হয়েছে।”

করিম উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে কাস্তে, গায়ে ঘাম।

“মহাজন, ফসল নষ্ট হয়েছে। একটু সময় দেন।”

হরিপদ বলল,

“সময়? আমি কি দান-খয়রাত করি? টাকা নিয়েছিস, শোধ করবি।”

“ফসল উঠলে দেব।”

“ফসল উঠবে কবে? আর সুদ তো চলছেই।”

করিমের স্ত্রী রহিমা দরজার আড়াল থেকে সব শুনছিল। সে বাইরে এসে বলল,

“মহাজন, আমরা গরিব মানুষ। একটু দয়া করেন। এবার ফসল নষ্ট হয়েছে।”

হরিপদ রহিমার দিকে তাকিয়ে বলল,

“দয়া দিয়ে ব্যবসা চলে না। টাকা না দিলে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে।”

এই কথা বলে সে চলে গেল।

সেদিন রাতে করিমের ঘরে ভাত ছিল না। রহিমা সামান্য আলু দিয়ে পাতলা ঝোল রান্না করেছিল। ময়না আর রফিক চুপচাপ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। করিম উঠোনে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, গরিব মানুষের দুঃখের কোনো শেষ নেই। সে পরিশ্রম করে, তবু তার মাথার ওপর ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। কয়েক সপ্তাহ পর করিম মহাজনের কাছে আবার গেল। এবার সে টাকা চাইতে নয়, সুদের হিসাব জানতে।

“মহাজন, আমি পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। এখন কত হয়েছে?”

হরিপদ খাতা খুলে দেখাল।

“সুদসহ এখন ছয় হাজার পাঁচশো টাকা।”

করিম অবাক হয়ে বলল, “এত টাকা! আমি তো পাঁচ হাজার নিয়েছিলাম!”

হরিপদ গম্ভীর গলায় বলল,

“সুদ বুঝিস না? সময়মতো শোধ করিসনি। তাই বেড়েছে।” করিম মাথা চুলকাল। সে হিসাব জানত না। মহাজনের খাতায় কী লেখা আছে, তা পড়তেও পারত না।

“মহাজন, আমি একটু একটু করে দিতে পারি?”

“পারিস। কিন্তু সুদ আগে দিতে হবে।”

করিমের চোখে অসহায়তা ফুটে উঠল।

“আমি দিনমজুরি করব। যা পাব, আপনাকে দেব।”

হরিপদ বলল,

“ঠিক আছে। তবে মনে রাখিস, টাকা শোধ না হওয়া পর্যন্ত তোর হিসাব বন্ধ হবে না।”

করিম সেদিন থেকে দিনমজুরি শুরু করল। কখনো অন্যের জমিতে কাজ, কখনো বাজারে মাল টানা, কখনো বাড়ি নির্মাণের কাজে মাটি কাটা। দিনে যা আয় করত, তার একটা অংশ মহাজনকে দিত। কিন্তু সুদের কারণে মূল টাকা খুব কমই কমত। মাস শেষে হরিপদ বলত,

“তুই টাকা দিচ্ছিস, কিন্তু ঋণ তো কমছে না।”

করিম অবাক হয়ে ভাবত, সে তো পরিশ্রম করছে, টাকা দিচ্ছে। তবু ঋণ কমছে না কেন?

ধীরে ধীরে তার মনে সন্দেহ জন্মাল। গ্রামে করিমের এক বন্ধু ছিল,আবুল। আবুল কিছুটা লেখাপড়া জানত। সে বাজারের একটি দোকানে হিসাব রাখত। একদিন করিম তাকে সব কথা খুলে বলল।

“আবুল, আমি মহাজনের কাছে পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। এখন সে বলছে ছয় হাজার পাঁচশো। আমি টাকা দিয়েছি, তবু হিসাব কমে না।” আবুল মন দিয়ে শুনল।

“তুই কি কাগজটা দেখেছিস?”

“না। আমি তো পড়তে পারি না। আঙুলের ছাপ দিয়েছি।”

আবুল বলল,

“একদিন কাগজটা নিয়ে আসিস। আমি দেখে দেব।”

করিম পরদিন মহাজনের দোকানে গেল। সে কাগজ দেখতে চাইল।

হরিপদ প্রথমে দিতে চাইল না।

“কাগজ কেন?”

“আমি হিসাব বুঝতে চাই।”

মহাজন বিরক্ত হয়ে কাগজটি বের করল। করিম সেটি নিয়ে আবুলের কাছে গেল। আবুল কাগজ পড়ে দেখল। সেখানে সুদের হার, জরিমানা এবং আরও কিছু শর্ত লেখা ছিল। কিছু শর্ত এমনভাবে লেখা, যাতে ঋণগ্রহীতার পক্ষে বোঝা কঠিন হয়। আবুল করিমকে বলল, “তোর ঋণটা খুব বেশি সুদে হয়েছে। আর মহাজন হিসাবের মধ্যে কিছু অতিরিক্ত টাকা যোগ করেছে বলে মনে হচ্ছে।”

করিমের মুখ শুকিয়ে গেল। “তাহলে আমি কী করব?”

আবুল বলল, “প্রথমে সব টাকা দেওয়ার হিসাব লিখে রাখ। মহাজনকে যে টাকা দিবি, তার রসিদ নেবি। আর গ্রামের সালিশে বিষয়টা তুলতে হবে।”

করিমের মনে প্রথমবারের মতো একটু সাহস জন্মাল। কিন্তু মহাজন সহজে ছাড়ার মানুষ ছিল না।

একদিন সে করিমকে বাজারে ডেকে বলল, “শুনেছি তুই আমার হিসাব নিয়ে লোকজনের কাছে ঘুরছিস?”

করিম মাথা নিচু করল। “আমি শুধু হিসাব বুঝতে চাই।”

হরিপদ চোখ রাঙিয়ে বলল, “হিসাব বুঝতে হলে টাকা শোধ কর। বেশি কথা বলিস না।”

করিম এবার ধীরে বলল, “আমি টাকা নিয়েছি, শোধ করব। কিন্তু যত টাকা নিয়েছি, তার সঠিক হিসাব চাই।”

হরিপদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তোর মতো গরিব মানুষের এত সাহস!”

করিমের বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু সে আর আগের মতো চুপ করে থাকল না। “গরিব মানুষ বলেই তো হিসাবটা বুঝতে চাই, মহাজন।”

সেদিন বাজারের কয়েকজন লোক কথাগুলো শুনেছিল। কেউ কিছু বলল না, কিন্তু তাদের চোখে করিমের প্রতি সহানুভূতি দেখা গেল।এরপর করিম গ্রামের সালিশে বিষয়টি তুলে ধরল। গ্রামের মসজিদের পাশের বটগাছের নিচে সালিশ বসত। সেখানে গ্রামের মাতবর, কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি এবং স্থানীয় মানুষ উপস্থিত ছিল। করিম তার কথা বলল। আবুল কাগজের শর্তগুলো পড়ে শোনাল। হরিপদও উপস্থিত ছিল। সে বলল, “আমি কাউকে জোর করে টাকা দিই না। করিম নিজেই ধার নিয়েছে। কাগজে আঙুলের ছাপ দিয়েছে।”

গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক মজিদ মাস্টার বললেন,

“ধার নেওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু ঋণের হিসাব স্বচ্ছ হতে হবে। মানুষ বিপদে পড়ে টাকা নেয়। তাকে এমনভাবে সুদের জালে আটকে রাখা ঠিক নয়।”

সালিশের লোকেরা হিসাব যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিল। করিম যত টাকা দিয়েছিল, তার তালিকা তৈরি করা হলো। আবুলের সাহায্যে মূল টাকা, সুদ এবং পরিশোধের হিসাব আলাদা করা হলো। দেখা গেল, মহাজনের খাতায় কিছু অতিরিক্ত সুদ ও জরিমানা যোগ করা হয়েছে, যার সঠিক ব্যাখ্যা সে দিতে পারছে না। গ্রামের মাতবর বললেন,

“হরিপদ, করিম গরিব মানুষ। সে টাকা নিয়েছে, তাই শোধ করবে। কিন্তু অন্যায় হিসাব চলবে না। সঠিক হিসাব করে যা পাওনা, তা নির্ধারণ করতে হবে।”

হরিপদ মুখ গোমড়া করে বসে রইল। অবশেষে নতুন করে হিসাব করা হলো। করিমের বাকি ঋণ আগের তুলনায় অনেক কম দাঁড়াল। তাকে কয়েক মাস সময় দেওয়া হলো। সুদের হিসাবও সীমিত করা হলো। করিমের চোখে জল এসে গেল। সে বুঝল, একা অসহায় হলেও মানুষ যদি ন্যায়ের পাশে দাঁড়ায়, তবে তার কণ্ঠস্বর একদিন শোনা যায়। সালিশের পর করিম আরও বেশি পরিশ্রম করতে লাগল। এবার সে শুধু অন্যের জমিতে কাজ করত না, গ্রামের বাজারে সবজি বিক্রির কাজও শুরু করল। রহিমা বাড়ির উঠোনে শাকসবজি চাষ করত। ময়না স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি মাকে সাহায্য করত। রফিকও ছোট ছোট কাজে সহযোগিতা করত।

করিম বুঝেছিল, শুধু ঋণ শোধ করলেই হবে না; ভবিষ্যতে যেন আবার এমন বিপদে পড়তে না হয়, তার জন্যও ব্যবস্থা করতে হবে।

সে প্রতিদিনের আয়ের একটি অংশ আলাদা করে রাখত। আবুল তাকে হিসাব লিখতে শেখাল। প্রথমে অক্ষরগুলো বুঝতে কষ্ট হতো, কিন্তু ধীরে ধীরে সে নিজের নাম লিখতে শিখল। একদিন নিজের খাতায় সে লিখল,

“আজ মহাজনকে দুইশো টাকা দিলাম।”

তারপর খাতার দিকে তাকিয়ে সে হাসল। এই ছোট্ট বাক্যটি তার কাছে বড় অর্জন ছিল।

ছয় মাস পর করিম মহাজনের বাকি টাকা শোধ করল। সে শেষ কিস্তির টাকা নিয়ে হরিপদের দোকানে গেল।

“মহাজন, এই নিন আপনার পাওনা।”

হরিপদ টাকা গুনে নিল। তারপর খাতায় করিমের নামের পাশে একটি দাগ টেনে দিল।

“তোর ঋণ শেষ।”

করিম কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন তার কাঁধ থেকে বহু দিনের বোঝা নেমে গেছে। সে বলল,

“মহাজন, টাকা ধার নেওয়ার দিন আমি খুব অসহায় ছিলাম। আজ টাকা শোধ করে মনে হচ্ছে, আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলাম।”

হরিপদ কোনো উত্তর দিল না। করিম দোকান থেকে বেরিয়ে এল। বাজারের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো, আজকের বাতাস যেন অন্য রকম। আকাশটা যেন একটু বেশি নীল। বাড়িতে ফিরে রহিমাকে বলল,

“ঋণ শেষ হয়েছে।”

রহিমা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না।

“সত্যি?”

করিম মাথা নাড়ল। রহিমার চোখে জল এসে গেল। ময়না আর রফিক বাবার পাশে এসে দাঁড়াল। তাদের ছোট্ট ঘরে সেদিন কোনো বড় ভোজ ছিল না, কোনো উৎসবের আয়োজন ছিল না। তবু সবাই যেন নতুন করে বাঁচার আনন্দ অনুভব করল। কয়েক বছর কেটে গেল। করিম এখন আগের মতো অসহায় নয়। সে কিছু টাকা জমিয়ে গ্রামের এক কৃষকের কাছ থেকে অল্প জমি বর্গা নেওয়ার পাশাপাশি নিজের ছোট্ট সবজির জমি করেছে। রহিমা শাকসবজি বিক্রি করে। ময়না স্কুলে ভালো ফল করে। রফিকও পড়াশোনায় মন দিয়েছে। করিম এখন গ্রামের অন্য গরিব মানুষদের সাহায্য করে। কেউ মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিতে চাইলে সে বলে,

“টাকা ধার নেওয়ার আগে হিসাব বুঝে নিও। কাগজ পড়ে না বুঝলে কাউকে দিয়ে পড়িয়ে নিও। টাকা দিলে রসিদ নিও। আর নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখো।”

একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধ কৃষক তার কাছে এসে বলল,

“করিম, আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। হরিপদ মহাজনের কাছে যাব ভাবছি।”

করিম বৃদ্ধের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

“চলুন, আগে আমরা গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলি। হয়তো সুদ ছাড়া সাহায্যের ব্যবস্থা করা যাবে।”

সেই থেকে গ্রামে কয়েকজন মিলে একটি ছোট তহবিল গড়ে তুলল। গ্রামের মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা জমা দিত। কেউ অসুস্থ হলে, কারও ফসল নষ্ট হলে, কারও ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ লাগলে সেই তহবিল থেকে সাহায্য করা হতো।

করিম জানত, সব সমস্যার সমাধান এভাবে হবে না। তবু সে বিশ্বাস করত, মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ালে অভাবের অন্ধকার কিছুটা হলেও কমে। এক বিকেলে করিম তার উঠোনে বসে ছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবছে। ধানের মাঠের ওপর সোনালি আলো পড়েছে। দূরে ময়না বই হাতে পড়ছে, রফিক গাছের নিচে খেলছে। রহিমা রান্নাঘরে ভাত বসিয়েছে।করিম নিজের পুরোনো হিসাবের খাতাটি বের করল। প্রথম পাতায় লেখা ছিল,

“পাঁচ হাজার টাকা ধার।”

পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে সে দেখল, কত কষ্টের দিন, কত পরিশ্রমের হিসাব, কত টাকা দেওয়ার রেকর্ড। শেষ পাতায় লেখা,

“ঋণ শোধ সম্পূর্ণ।”

করিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখে যেন সেই দিনের বাজার, মহাজনের দোকান, বটগাছের নিচের সালিশ,সব ভেসে উঠল। সে বুঝল, পাওনাদার শুধু সেই মানুষ নয়, যে টাকা ধার দেয়। পাওনাদার কখনো হয়ে ওঠে সময়, কখনো দারিদ্র্য, কখনো সমাজের অন্যায় ব্যবস্থা। আর ঋণগ্রস্ত মানুষ শুধু টাকা নয়, নিজের সম্মান, নিজের স্বপ্ন, নিজের শান্তিও যেন ধার করে বেঁচে থাকে। তবে করিম আরও একটি কথা বুঝেছিল,ঋণ মানুষকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু সচেতনতা, পরিশ্রম, সাহস এবং মানুষের সহযোগিতা তাকে আবার দাঁড় করাতে পারে।

সন্ধ্যার আজান ভেসে এল। করিম খাতাটি বন্ধ করে ঘরের ভেতর রাখল। তারপর উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার জীবনে অভাব এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। কিন্তু আজ তার মনে আর আগের মতো ভয় নেই। কারণ সে জানে, পাওনাদারের কাছে টাকা শোধ করা যায়, কিন্তু মানুষের কাছে পাওনা থাকে সহমর্মিতা, ন্যায় আর ভালোবাসা।আর সেই পাওনা, কোনো খাতায় লেখা থাকে না, কোনো সুদে বাড়ে না, কোনো সালিশে মেটে না।সেই পাওনা মানুষকে মানুষ করে তোলে।

Picked up where you left off

Comments

Mishy Hasib was this story’s first reader

+25 XP

    Please login to post comment. Login

  • Mishy Hasib 11 hours ago First reader

    সুন্দর গল্প, সব কিছু দুনিয়ার খাতায় লেখা থাকে না। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার খাতায় ঠিক তার হিসাব থাকে।

    • Kabir Al Mamun 42 minutes ago

      Thank you so much for your nice comment!