মানুষের জীবনে প্রাপ্তির হিসাব অনেক, অথচ কৃতজ্ঞতার খাতা বড্ড ছোট।
আমরা প্রতিদিন কত কিছু চাই! কখনো একটু অর্থ, কখনো সুন্দর একটি জীবন, কখনো প্রিয় মানুষের ভালোবাসা। চাওয়া-পাওয়ার এই দীর্ঘ তালিকায় কখন যে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নিয়ামতগুলো অদেখা থেকে যায়, তা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না।
অথচ একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস একেকটি নিয়ামত। সকালে ঘুম ভেঙে নতুন সূর্য দেখা, জানালা দিয়ে আসা এক পশলা বাতাস, বৃষ্টির শব্দ শোনা, প্রিয় মানুষের মুখে হাসি দেখা—এসবই তো আল্লাহর অপার রহমত।
আমরা কখনো সুস্থ শরীরের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি না, যতক্ষণ না অসুস্থতা আমাদের বিছানায় আটকে দেয়। চোখের মূল্য বুঝি না, যতক্ষণ না অন্ধকারের ভয় আমাদের ঘিরে ধরে। একটি নিরাপদ আশ্রয়ের গুরুত্ব বুঝি না, যতক্ষণ না আশ্রয়হীন মানুষের কষ্ট চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
অথচ আল্লাহ আমাদের কত কিছু দিয়েছেন, যার জন্য আমরা কখনো আলাদা করে শুকরিয়া আদায় করি না।
কখনো কি ভেবেছি, যে মানুষটি আজ আমাদের পাশে বসে হাসছে, তার উপস্থিতিও একটি নিয়ামত? যে মা প্রতিদিন সন্তানের জন্য দোয়া করেন, যে বাবা নীরবে পরিবারের দায়িত্ব বহন করেন, যে মানুষটি বিপদের দিনে হাত বাড়িয়ে দেয়—তাদের প্রত্যেকেই আল্লাহর দেওয়া জীবনের একেকটি মূল্যবান উপহার।
জীবনে সবকিছু নিজের ইচ্ছেমতো হয় না। কিছু প্রার্থনার উত্তর পেতে দেরি হয়, কিছু স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়, কিছু প্রিয় মানুষ দূরে চলে যায়। তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হলো?
কিন্তু সব উত্তর যে আমাদের জানা প্রয়োজন, তা নয়। কখনো কখনো যা আমরা হারানো মনে করি, তার মধ্যেও আমাদের জন্য কোনো কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন—
'তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।' —সূরা আন-নাহল, আয়াত ১৮।
কী অপূর্ব সত্য!
আমরা প্রতিদিন নিয়ামতের ভেতর বসবাস করি, অথচ অভাবের হিসাব করতে করতেই দিন শেষ করে দিই।
তাই জীবনে যা নেই, শুধু তার জন্য মন খারাপ না করে যা আছে, তার জন্যও কৃতজ্ঞ হতে শিখি। অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতে শিখি। মানুষের প্রতি দয়া দেখাই, অসহায়ের পাশে দাঁড়াই এবং প্রতিটি ভালো মুহূর্তে আলহামদুলিল্লাহ বলতে শিখি।
কারণ নিয়ামত শুধু সম্পদ কিংবা প্রাচুর্যের নাম নয়। অন্তরের প্রশান্তি, সুস্থতা, হালাল রিজিক, নেক আমল করার সুযোগ, পরিবারের ভালোবাসা এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসার তাওফিকও অনেক বড় নিয়ামত।
দিনের শেষে আমাদের চাওয়া খুব বেশি কিছু হওয়া উচিত নয়।
হে আল্লাহ, আমাদের প্রাপ্ত নিয়ামতগুলোর শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দিন। আমাদের অন্তরকে অহংকার ও অকৃতজ্ঞতা থেকে পবিত্র রাখুন। যা আমাদের জন্য কল্যাণকর, তা আমাদের দান করুন। আর আপনার দেওয়া প্রতিটি নিয়ামতের যথাযথ মূল্য বোঝার মতো সুন্দর একটি হৃদয় দান করুন।
আলহামদুলিল্লাহ—যা পেয়েছি তার জন্য, যা পাইনি তার মধ্যেও আপনার হিকমত থাকার বিশ্বাসের জন্য এবং প্রতিটি নতুন সকালের জন্য।
জীবন সুন্দর, যখন মানুষ প্রাপ্তির চেয়ে দাতাকে বেশি স্মরণ করতে শেখে।