Posts

গল্প

ছোটগল্প: সাবান চোর

June 12, 2024

M. Khanam

39
View
সাবান চোর

বয়স্ক মহিলাটা রাগে গজগজ করতে করতে চিৎকার করে, গতকাইলকেই বাথরুমে নতুন সাবানটা দিলাম, সেইটা গেল কই! 

সায়মা পুকুর পাড়ে বসে শীতের শেষে কালো হয়ে যাওয়া পুকুড়ের পানি দেখে। পুকুর পাড়ের গাছগুলো থেকে ঝরা পাতায় ভরে গেছে পুকুরের তলানিতে থাকা কালো-ময়লা পানি। পাশের সরু বেড়টা শুকিয়ে নীচু রাস্তার মত দেখতে হয়ে গেছে। জোয়ারের সময় এই বেড় বেয়েই পানি আসে পুকুরে। সায়মা তাকিয়ে আকাশ দেখে। তার কানে ভেসে আসে দূরে চিৎকার করা বয়স্ক মহিলাটার আওয়াজ। জামার ভেতর থেকে সাদা নতুন সাবানটা বের করে ছুড়ে মারে পুকুরে। দূর থেকে কারো হেঁটে আসার আওয়ার শুনে সায়মা। সাথে সাথে বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে ছুটে কোলায় নেমে যায় সে। এরপর যতদূর চোখ যায় দৌড়াতে থাকে। 

বসন্তের শুরু কেবল হল। সকাল পেরিয়ে দুপুরে গড়াচ্ছে, কুয়াশা কেটে গেছে। কোলা জুরে কয়েকটা গরু-বাছুর ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ধানবিহীন কোলায় ছুটতে থাকে সায়মা। একটা সময় তার ছোট্ট পা দুটো থেমে আসে৷ মাঝ কোলায় বসে পড়ে সে। শুয়ে পরে খোলা ধান ক্ষেতে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। রোদের কারনে উপরে তাকাতে পারে না সায়মা। চোখ বন্ধ করে রোদের মাঝে শুয়ে থাকে সে। 

আসামীর মত মুখ ভর্তি অনুতাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সায়মার মা। রাগী চোখে ফোঁসফোঁস করতে করতে বয়স্ক মহিলাটা তাকে বলে, আমার নতুন নতুন সাবান, বিস্কুটের প্যাকেট, চানাচুর, স্নো, পাউডার কিচ্ছু থাকে না তোর মাইয়ার কারনে! আমার কাইলকে খোলা নতুন সাবান কই গেছে খুইজ্জা বাইর করবি!

সায়মার মা কাঁদোকাঁদো সুরে জানায়, সায়মা আসলেই আমি জিগামু করমু ও নিসে কিনা। ও নিয়া থাকলে দিয়া দিব, আম্মা। 

মাগরিবের পর পর লুকিয়ে ঘরে ঢোকে সায়মা। খাবার ঘরে গিয়ে চুপিচুপি বিস্কুটের বোয়ামটা খুলে জামার টোকর ভর্তি করে নেয় সদ্য খোলা মেহমানদের জন্য আনা বিস্কুট দিয়ে। এপাশ-ওপাশ দেখে দ্রুত নিজের ঘরে চলে যায়। গোগ্রাসে গিলতে থাকে বিস্কুটগুলো। দরজার ওপারে পায়ের শব্দ পেয়ে জানালা দিয়ে বাকি বিস্কুটগুলো ফেলে দেয় সায়মা। চাঁপানো দরজা মেলে অন্ধকার ঘরটাতে ঢুকে সায়মার মা। ঘরের বাতি জ্বালাতে জ্বালাতে প্রশ্ন করে সায়মার মা, কোথায় ছিলি সারাদিন? 

 সায়মা ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয়, বাড়ির ভেতরে খেলতে আছিলাম।

সারাদিনে কিছু খাইছোস? 

হাফিজাদের ঘরে ওর মায় ভাত দিসিলো, ডিম ভাজা দিয়া। 

সায়মার মা এসে তার সামনে দাড়ায়। সায়মা মুখ তুলে তার মায়ের দিকে তাকায়। সায়মার বয়স কম হলেও সুন্দর-অসুন্দরের তফাৎ সে বুঝে। তার মা কথাকথিত সুন্দর না। কিন্তু আজ যেন তাকে একটু বেশিই অসুন্দর লাগছে। সায়মা ঢোক গিলে। কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে বলে, মা, মিথ্যা বলছি। হাফিজার মা ভাত দেয় নাই। কিচ্ছু খাই নাই সারাদিনে। অনেক ক্ষিদা লাগছে।

মায়ের গাল বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু সায়মার হাতের উপর পড়ে। সায়মা তাকিয়ে দেখে তার হাত বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে তার জামার উপর পরল। তার লাল-কালো জামাটায় চোখের পানি নিমিশেই মিলিয়ে গেল। এক হেঁচকা টানে সায়মার চুলের ঝুটি খুলে গেল। সে ছিটকে পরে ঘরের আরেক কোনায়। সে কোন থেকে তাকে টেনেহিচড়ে বাহিরের ঘরে নিয়ে আসে তার মা। অগণিত চড়-থাপ্পড়-লাত্থির শিকার হয় তার ছোট্ট শরীরটা। সায়মার মা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, বল, সাবান কি করছিস! নতুন সাবান কই রাখছিস তুই! 

কাঁদতে কাঁদতে সায়মা বলে, আমি সাবান নেই নাই, মা। বিশ্বাস কর, আমি নেই নাই!  

মন গলে না তার মায়ের। শরীরে যতক্ষণ শক্তি থাকে মারতে থাকে সায়মাকে। ক্লান্ত হয়ে এক সময় ওকে ও ঘরেই ফেলে রেখে রান্নাঘরে চলে যায় সায়মার মা। রান্নাঘরে যেয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছে। তারপর মাটির চুলায় চড়িয়ে রাখা ভাতের পাতিলটা নামিয়ে গর দেয়। অন্য চুলায় থাকা তরকারির ঢাকনাটা সরিয়ে কুন্তি দিয়ে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে দেয়। রান্না প্রায় হয়ে এসেছে। 

বসার ঘরের বিরাট মেঝেতে সায়মার ছোট্ট শরীরটা পড়ে থাকে৷ সে তাকিয়ে দশ ফিট উঁচু ছাদটা দেখে। তার চোখ বেয়ে অশ্রু মেঝেতে পরে। কিন্তু তার চেহারায় কোনো প্রকার অবসাদ নেই। এ যেন তার নিত্যদিনকার জীবন। 

শীতকাল শেষ হলেও রয়ে গেছে তার রেশ। বসন্তের সকালেও কুয়াশায় দেখা যাচ্ছে না তেমন কিছুই। শীতে গা শিরশিরিয়ে ওঠে সায়মার। পুকুর পাড়ে বসে দাঁত মাঝতে থাকে সে। আজ নাকি বাড়িতে অতিথি আসবে। 

সায়মা বসে আছে বাড়ির সিড়িতে। সামনে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট তার বয়সী বাচ্চাকাচ্চা। তাদের সকলের পরনে নতুন জামা, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুলে রংবেরঙের ক্লিপ, ঝুটি বাঁধা। সায়মা চেয়ে চেয়ে তাদের দেখে। তার লাল-কালো ফ্রকটা দুই জায়গা থেকে ফুঁটো হয়ে গেছে। রংটাও এখন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। হলুদ ফ্রক পরা মেয়েটার ক্লিপগুলো থেকে চোখ সরাতে পারে না সে। 

সায়মা অনুরোধ করে, তোর ক্লিপগুলো কি সুন্দর! আমারে একটু পরতে দিবি? 

মেয়েটা তার মাথায় হাত দিয়ে সায়মার কাছ থেকে দূরে সড়তে সড়তে জবাব দেয়, ইশ! মোটেও না! এগুলো আমার বাবা কিনে দিয়েছে। তোমার ক্লিপ লাগলে তোমার বাবাকে বল কিনে দিতে! 

সায়মা দৌড়ে ঘরে যায়। চুপিচুপি টেবিলের উপর থেকে মায়ের ফোনটা নিয়ে তার বাবাকে ফোন করে। ওপাশ থেকে ফোন ধরতেই সায়মা বলতে শুরু করে, হ্যালো, আব্বা। আমার ক্লিপ লাগবো! আমার জন্য ক্লিপ কিননা পাঠাও তাড়াতাড়ি! সুন্দর ক্লিপ! 

 ফোনের ওপাশ থেকে আওয়াজ আসে, তোর মারে বল তার শরীর বেঁচে কিননা দিতে! ওইর লইগাই তো পইরা আছে ওই বাড়ি! কই স্বামীর কথা শুইনা বাড়ি চইলা আইব তা না! মাগীগিরি কইরা বেড়াইতাচ্ছে! 

দূর থেকে সায়মাকে ফোনে হাতে দেখে সায়মার মা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, সায়মা! মোবাইল দিয়া কি করছ তুই! ফোন ফেলে দিয়ে দৌড়ে পালায় সায়মা। 

দূরে বসে সুন্দর জামাকাপড় পরা ছেলেমেয়েগুলোকে খেলতে দেখে সে। তাদের একজন এসে দাড়ায় তার সামনে। সায়মা মুখ তুলে তাকে দেখে। একদম টিভিতে দেখানো বাচ্চা ছেলেদের মত সুন্দর সে। সায়মার হাত ধরে তাকে টানতে তানতে বলে, তুই একা বসে আছিস কেন? খেলতে আয় আমদের সাথে। 

বাচ্চা ছেলেটার নাম নাইম। বয়স্ক মহিলাটার নাতি৷ ওরা সদরে থাকে। মাঝেমাঝে যখন ঘুরতে আসে তখন সায়মার সাথে খেলাধুলা করে। একমাত্র নাইমই ওর খেলনা দিয়ে সায়মাকে খেলতে দেয়। কিছুক্ষণ নাইমের নতুন রিমোট গাড়িটা দিয়ে খেলে নাইম আর সায়মা। এরপর সায়মা নাইমকে ধুলাবালি দিয়ে তার বানানো নতুন খেলা শেখায়। ধুলায় খেলতে খেলতে নাইমের নতুন জামা ময়লা হয়ে যায়। 

হলুদ ফ্রক পরা মেয়েটা দূর থেকে দেখতে পেয়ে যেয়ে নাইমের মাকে ডেকে নিয়ে আসে। নাইমের মা এ বাড়ির বড় বউ। ছেলের ওমন ধুলামাখা চেহারাটা দেখে চিৎকার করতে করতে কান টেনে ভেতরে নিয়ে যায় সে। সায়মা ওখানে ধুলার মাঝে একাই বসে থাকে। 

কিছুক্ষণ পর বাড়ির পেছনের দিক দিয়ে দেয়ালের ভাজ বেয়ে জানালায় মুখ ঢুকিয়ে নাইমকে খুঁজতে থাকে সায়মা। খাটের এক কোনায় তার মায়ের বড় টাচ মোবাইলটাতে কার্টুন দেখছে নাইম। সায়মা মৃদু স্বরে ডাকে, এই নাইম, নাইম। 

নাইম ডাক শুনে ছুটে জানালার কাছে আসে। ওখানে উঠলি কিভাবে! পড়ে যাবি তো।

তোর মা তোরে মারছে? 

মারে নি তবে বকেছে। এ ঘর থেকে বের হতে মানা করেছে। 

বিস্কুট খাবি? 

নাহ। 

চানাচুর? চিপস দেওয়া চানাচুর আনছে তোর ফুপি। 

খাওয়া যায়। দাড়া আমি নিয়ে আসি। 

তোরে বাইর হইতে মানা করছে। আমি লইয়া আই, দাড়া! লাফ দিয়ে জানালা থেকে নীচে নামে সায়মা। 

চুপিচুপি রান্নাঘরের দরজার পাশে এসে উঁকি দেয় ভেতরে দেখার জন্য। রান্নাঘরে তখন নাইমের মা আর ফুপি দাড়ানো। তাদের দেখে সাথে সাথে মাথা সড়িয়ে নেয় সায়মা। চলে যেতে নেয় তখনই তাদের ভেতর হওয়া কথোপকথন কানে আসে সায়মার। 

নাইমের মা গ্যাসের চুলায় কড়াইয়ের মাংসটা নাড়তে নাড়তে বলে, সায়মার মায় তাহলে এই বাড়িই থাকব এখন?

নাইমের ফুপি তরকারি কাটতে কাটতে বলে, আর যাইব কই? যাওয়ার জায়গা আছে! না বাপের বাড়ি আছে, না ভাইব্রাদাররা কেউ ওরে নিব! মাইয়া মাইনসের বেশি দেমাগ থাকা ভাল না, বুঝচ্ছো বড় বউ। 

ওর স্বামী কি এখন ওই বউয়ের সাথেই আছে? 

ওর জামাই তো একটা হারামজাদা। এমন ব্যাটার ঘর করব ওই বেটি! ওয় তো ভাগছে। এখন তো সায়মার মারে ডাকে, যাইতে কয়। কিন্তু এই ছেরি যাইব না। এত দেমাগ থাকলে চলে! মাইয়াটা ছোট, কয়দিন এমনে খালার বাড়ি পইরা থাকব! আমার মায় কি সারাজীবন পালব ওরে! স্বামী ডাকছে- সুরসুর কইরা যাইব গা, তা না। 

মাইয়াটাও তো শুনছি জাতের না। 

একদম চোরের ঘরের চোর। ওর যন্ত্রণায় ঘরে একটা সাবান, বিস্কুট, স্নো কিচ্ছু টিকে না। সব খাইয়া ফেলায়। 

এইসব চোরটোর ঘরে জায়গা দিসে কেন আম্মা! কড়াইয়ের ঢাকনাটা দিতে দিতে বলে, একলা একলা ঘরে থাকে এই জন্য ওনার ছেলে কিছু বলতে চায় না যে ওরা থাকলে আম্মারে সঙ্গ দেওয়ার কেউ আছে। বুঝেনই তো আপা, ছেলেটার ভবিষ্যৎ নিয়াও ভাবতে হয়। এই অজোপাড়া গাঁয়ের স্কুলে কি আর পড়াশোনা হয়! ছেলেটার জন্যই তো সদরে বাসাটা নিলাম। দরজার পাশে দাড়িয়ে সব শুনতে থাকে সায়মা। 

বাড়ির ছোট বউ সেই হলুদ ফ্রক পরা মেয়েটার মা এসে সায়মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সায়মাও তাকে দেখে হকচকিয়ে যায়। ছোট বউ বলে, কিরে, তুই এখানে দাড়ায়ে আছিস কেন?  

সায়মা রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আবদার করে, আমারে কয়টা চানাচুর দিবা?  

নাইমের মা আর ফুপু সায়মার দিকে বিরক্তির চোখে তাকায়। নাইমের ফুপি এগিয়ে এসে চোখ রাঙ্গিয়ে ধমক দেয়, কিসের চানাচুর? ঘরে কোনো চানাচুর নাই। 

সায়মা বলে, তুমিই না সকালে নিয়ে আসলা। ওই বড় বয়মের ভেতরে রাখলা চানাচুরের বড় একটা প্যাকেট। সায়মা আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বয়মটা দেখায়। নাইমের ফুপি রাগী চোখে তাকিয়ে থাকে সায়মার দিকে। পাশে দাড়িয়ে বাড়ির দুই বউও দেখে বাচ্চা মেয়েটার লাল দুই চোখ দিয়ে তাকিয়ে থাকা। 

নাইমের মা পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে এগিয়ে এসে সায়মার সামনে দাঁড়ায়। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলে, ওগুলো মেহমানদের জন্য আনছে, সোনা। মেহমানরা যখন বিকেলে আসবে তখন তোকেও খেতে দেব, ঠিক আছে? তুই এখন খেলতে যা। সায়মা ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। 

নাইম জানালার সামনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে সায়মার জন্য। কিন্তু সায়মা আর আসে না। 

হলুদ ফ্রক পরা মেয়েটা চিৎকার করে কান্না করতে থাকে, অ্যাঁ অ্যাঁ আমার ক্লিপ কোথায়?

ছোট বউ রাগী সুরে তার স্বামীকে বলতে থাকে, এইসব ওই বেয়াদব মাইয়াটার কাজ! ঘরে চোরছাচোর আইনা ভইরা ফেলছে তোমার মা। 

বয়স্ক মহিলাটার ছেলে বলে, আরে বাচ্চা মানুষ, নিসে হয়ত, দিয়া দিবে! তুমি এমন করতেছো কেন! মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলিয়ে মেয়েকে সান্ত্বনা দেয়। কান্না কইরো না, মামনি। তোমাকে আরও সুন্দর সুন্দর ক্লিপ কিনে দিব আব্বু! ঠিক আছে? 

থাপ্পড়ের আওয়াজে ঘরটা কেঁপে ওঠে। সায়মার মনে হয় ও চোখে অন্ধকার দেখছে। সায়মার মা জেরা করার সুরে বলে, জান্নাতের ক্লিপ কি করছিস, বল! কোথায় রাখছিস! 

আমি ওর ক্লিপ নেই নাই, মা। বিশ্বাস কর, আমি নেই নাই। সায়মা কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে। 

সামনের ঘরে নতুন অতিথিরা বসা। তাদের সাথে বসা বাড়ির ছেলেরাও৷ দরজার পাশে দাড়িয়ে আছে বাড়ির মেয়ে-বউরা। ঘর জুরে সৌজন্যতার মৃদু হাসির আওয়াজ। 

নাইমের বাবা হাসি মুখে বলে, আমার বোন বলে বলতেছি না, আমাদের রত্নার মত মেয়ে এই যুগে পাওয়া কঠিন! ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় ভাল, নিজ থেকেই ঘরের কাজ করতে পারে। ওর হাতের রান্না আমার মায়ের রান্নার পর আমার সবচেয়ে পছন্দ। বউয়ের দিকে তাকিয়ে খানিকটা হেসে বলে, এইটা বললে যদিও আপনাদের ভাবী আবার রাগ করে। 

নাইমের মা হাসতে হাসতে বলে, একদম ফালতু কথা বলবা না। তবে আমাদের রত্নার হাতে কিন্তু আসলেই জাদু আছে। ওরে কিছু শিখানোই লাগে নাই। দেখে দেখেই সব শিখে ফেলছে।  

মৃদু সৌজন্যতার হাসির মাঝে চাঁপা পড়ে যায় সায়মার কান্নার আওয়াজ। 

মুড়ি-বিস্কুট প্লেটে সাজাতে থাকে সায়মার মা। হঠাৎ কি মনে পড়ে ছুটে যায় রান্নাঘরে। দুধটা উতলে চুলার চারপাশে ছরিয়ে গেছে। চুলা বেয়ে নীচে পড়ে গেছে কিছুটা দুধ। তাড়াতাড়ি চুলার আঁচ কমায় সায়মার মা। চা পাতির বোয়ম থেকে কিছুটা চা পাতি দুধের ভেতরে দিয়ে নেড়ে দেয়। এরপর পাশ থেকে একটা ন্যাকড়া এনে চুলার আসপাশটা পরিষ্কার করতে থাকে। রান্নাঘরে ঢোকে নাইমের ফুপি। বলে, কি রে চা হয় নাই এখনও? তাড়াতাড়ি কর!  

সায়মার মা চায়ের পাতিলে আবার চামচ দিয়ে নাড়া দিতে দিতে বলে, জী, আপা।  

ট্রে তে করে চা এনে বসার ঘরের টেবিলে রেখে আসে সায়মার মা। বাড়ির পুরুষরা সবাই চা খেয়ে বেড়িয়ে যায়। নাইমের মা এসে বসার ঘরটা পরিষ্কার করতে থাকে। প্লেটে কিছুটা বিস্কুট-চানাচুর রয়ে গেছে। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে ডাকে, জান্নাত, এই দিকে আয় তো! 

জী, কাকি? 

দেখ তো সায়মা কোথায় গেল? ওয় দুপুরে একটু চানাচুর খাইতে চাইছিলো। এদিকে ওদিক তাকাতে তাকাতে বলে নাইমের মা। 

রাগে ফোসঁফোঁস করতে করতে জান্নাত বলে, ওই চোররে কিছু দেওয়া লাগবে না। ও আমার ক্লিপ চুরি করছে। 

পাশ থেকে নাইম বলে, ক্লিপ? কোন ক্লিপ? যেগুলা বাথরুমে রেখে আসছিস ওইগুলা? 

বাথরুমে? অবাক হয়ে নাইমের দিকে তাকায় জান্নাত। 

নাইম এগিয়ে আসতে আসতে বলে, নিজে গোসল করার সময় রেখে এসে এখন সায়মার দোষ দিচ্ছে! মায়ের হাত থেকে চানাচুরের প্লেটটা নেয় নাইম। আমাকে দেও, মা। আমি দিয়ে আসি ওকে। সায়মা বোধহয় ভেতরের ঘরে আছে। নাইম দুই হাতের মুঠোয় চানাচুরটুকু নিয়ে ভেতরে আসে। 

সায়মা ঘরের এক কোনায় বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে৷ মারের আঘাতে ঠোঁট ফেঁটে রক্ত জমে আছে সেখানে৷ নাইম এসে ওর পাশে দাড়ায়। তাড়া দিয়ে বলে, হাত পাত তাড়াতাড়ি, হাত পাত! 

কি হইছে? সায়মা হাত এগিয়ে দেয়। সায়মার হাতে চানাচুরগুলো দেয় নাইম। সায়মার ছোট আঙুলের ফাঁক দিয়ে চানাচুর পড়ে যেতে থাকে ওর জামার উপর। সায়মা পুরো হাতটা উল্টে দেয়। সব চানাচুর জামার উপর পড়ে। তারপর জামাটাকে নেড়ে নেড়ে সব চানাচুরগুলো এক জায়গায় করে।

নাইম সান্ত্বনা দিয়ে বলে, তুই কান্না করিস না। জান্নাত একটা বোকা। ও নিজেই ওর ক্লিপগুলো বাথরুমে রেখে ভুলে গিয়েছিলো। সায়মা তাকিয়ে নাইমকে দেখে৷ ফর্সা গায়ের রং, টানা টানা চোখ, গোলাপি দুইটা ঠোঁট আর ছোট্ট একটা নাক। সলার ঝাড়ুর মত খোঁচা খোঁচা চুলগুলো কপালের উপর পরে থাকে। সেই চুল থেকে শ্যাম্পুর সুন্দর একটা ঘ্রাণ আসে। সায়মার বয়স কম হলেও সে সুন্দর-অসুন্দরের তফাৎ বুঝে। নাইম সুন্দর, সায়মার চোখে সে সবচেয়ে সুন্দর। সায়মা নাইমকে ইশারা করে চানাচুর নিতে৷ দুইজন মিলে চানাচুর মুঠ ভরে মুখে দেয়। সায়মার ঠোঁটের কাটা জায়গায় চানাচুরের ঝাল লাগা মাত্রই কেঁদে ওঠে সায়মা। নাইম দৌড়ে যেয়ে পানি নিয়ে আসে তার জন্য। নাইমের চোখে-মুখে ভয়, যেন কি না কি হয়েছে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে সায়মার হাসি চলে আসে৷ অশ্রুসিক্ত চোখেই হাসতে থাকে সায়মা। 

মাসের শেষ শুক্রবার নাইমের ছোট ফুপির বিয়ে ঠিক হয়। জানালার ফাঁক দিয়ে বরকে দেখেছিলো সায়মা। মাথার উপর টাক পড়ে গেছে। সে শুনেছে নতুন বর নাকি জান্নাতকে সুঁই মেরেছে। সেই সুঁইয়ের ব্যাথায় জান্নাত কেঁদে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছে। তাই নতুন বর বাড়ি এলে সে ঘরের আসেপাশে যায় না সায়মা। নাইমের ছোট ফুপি সদরের এক কলেজে পড়ে। ওদের সাথেই থাকে। বিয়েতে আরও মাস খানেক বাকি থাকায় সবাই আবার নিজ নিজ বাড়ি চলে যায়। ব্যস্ত ঘরটা আবার ফাঁকা হয়ে যায়। 

সায়মা বাড়ির সামনের রাস্তায় বসে বালুর ভেতরে তার আর নাইমের নাম লেখে। শহরে যে বাড়িতে সায়মারা থাকত, সে বাড়িটা এই বাড়ির একটা ঘরের সমান হবে। সেখানে তার বাবা-মা, দাদা-দাদির সাথে থাকত সে। একদিন এক সুন্দর মহিলাকে নিয়ে এলো তার বাবা। এরপর অনেক চিৎকার চেঁচামেচি হল, তার বাবার হাতে মার খেতে খেতে নাক-মুখ বেয়ে রক্ত পরতে থাকল তার মায়ের। কনুইয়ের ভাঁজে রক্ত জমে কালো হয়ে গেল। সেই অবস্থায়ই কোমড়ে লাত্থি মেরে ঘরের বাহিরে বের করে দিল তার মাকে। পরদিন সকালে বটি নিয়ে তেড়ে এসেছিলো সেই সুন্দর মহিলা। ভাগ্যিস তার দাদি থামিয়ে ছিল। 

সেদিন রাতের লঞ্চেই এ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় সায়মা আর তার মা। এই বড় বাড়িটা সায়মার ভালোই লাগে৷ এই বাড়িতে তার মাকে কেউ মারে না। বয়স্ক মহিলাটা সারাদিন এদিকে-ওদিকে ঘুরে বেড়ায় আর তারা দুই মা-মেয়ে এই বিশাল বাড়িতে একা একা থাকে। শহরের বাড়িতে জমানো কিছু টাকা ছিল তা সাথে নিয়ে আসে সায়মার মা। সেই টাকার জন্য দিনে দুইবার ফোন দিত সায়মার বাবা। তখন একবারও আসতে বলে নি তাদের। উল্টো আপদ বিদায় হয়েছে ভেবে খুশিই ছিল। বিপদ হল ওই সুন্দর মহিলা চলে যাওয়ার পর। 

সায়মার মাঝেমাঝে মনে পরে তার বাবাকে। শহরে থাকতে ওখানকার বাচ্চাদের সাথে খেলত সে। একসাথে পাশেই একখানা সরকারি স্কুলে পড়ত সে। এ বাড়িতে আসার পর আর স্কুলে যাওয়া হয় নি তার। সায়মা একা একা বসে বালুতে নাম লিখতে থাকে। হঠাতই এতদিনের সুন্দর জীবনটা বিষাক্ত লাগতে থাকে তার। এই নিস্তব্ধতা অস্থির করে তোলে তাকে। এদিক-ওদিক ঘুরে তাকিয়ে খালি বাড়িটা দেখে। দূর দূর পর্যন্ত কোনো মানুষ নেই। সায়মার দম বন্ধ লাগতে থাকে। সে দৌড়ে কোলায় নামে। ছুটতে থাকে কোলার মাঝ বরাবর। 

সপ্তাহ বাদে নাইমের ছোট ফুপি ফিরে আসে। বিয়ের কেনাকাটা শুরু হয়েছে। রংবেরঙের জিনিসে বাড়ি ভরতে শুরু করে। অন্যান্য বাড়ির মহিলারা আসে বাড়ির বাজার দেখতে। এত সব মানুষের ভেতর সায়মা কখনও তার মাকে দেখে না। তার মা থাকে বাহিরের রান্নাঘরে যেখানে মাটির চুলাটা আছে। বয়স্ক মহিলাটা ধীর পায়ে রান্নাঘরে ঢোকে৷ শুকনো পাতাগুলো পাশে সড়াতে সড়াতে বলে, সায়মার মা, তুমি কি করবা ঠিক করছো? স্বামীর ঘর কি আর করবা না? সায়মার মা চুপ করে পাতিলের তরকারি নাড়তে থাকে। রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে বয়স্ক মহিলাটা বলে, বিয়াটা খাইয়া চুপচাপ স্বামীর ঘরে ফেরত যাও। আমি এমনে বয়ায়ে বয়ায়ে তোমগো খাওয়াইতে পারমু না। 

সায়মা একা একা ঘরের সামনের সিড়িটাতে বসে আছে। নাইম এসে পেছন থেকে আচমকা ভয় দেখায়। আঁতকে ওঠে সায়মা। নাইম হাসতে থাকে। হাহাহা, ভয় পেয়েছে!  

সায়মা রেগে বলে, গর্দভ একটা। 

নাইম দুটো সুন্দর লাল রংয়ের ক্লিপ এগিয়ে দিতে দিতে বলে, নে, এটা তোর জন্য। 

অবাক হয়ে ক্লিপ দুটো হাতে নেয় সায়মা। আমার জন্য? সে যেন তার দুই চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। মায়ের সাথে যখন বাজারে গিয়েছিলাম তখন মাকে বলে কিনেছি তোর জন্য। 

সায়মা দুই চোখ ভরে ক্লিপ দুটো দেখে, চুলে লাগায়। তার চেহারা থেকে হাসি যেন সড়তেই চায় না। দুইদিন বাদেই বিয়ে। নাইমরা চলে আসায় সায়মার চোখেমুখে আনন্দ ফিরে এসেছে। 

বরের বাড়ি থেকে আজ বড় দুইখানা লাগেজ পাঠিয়েছে। সেগুলো খুলে জিনিসপত্র দেখতে থাকে বাড়ির মহিলারা। জান্নাতের মা একখানা শাড়ি হাতে নিয়ে বলতে থাকে, বদল শাড়িটা এমন ফিকে রঙের দিল! আমার বিয়ের বদল শাড়িটা কিন্তু খুব সুন্দর ছিল!  

নাইমের ফুপি বলে, তোমার শাড়িগুলো তো বড় বউ পছন্দ করছিলো। যাই বল, বড় বউ, তোমার পছন্দ কিন্তু ভাল। আমার পাভেলের বিয়ার সময় তোমারেই নিয়ে যাব।

নাইমের দাদি বিরক্তির সুরে বলে, গয়নাগুলা বাইর কর তো, দেখি। 

সায়মা আর ওর মা-ও ঘরের এক কোনায় দাড়িয়ে বাড়ির বাকি মহিলাদের সাথে বিয়ের বাজার দেখে। সবাই যখন গয়না দেখতে ব্যস্ত, ছোট্ট সায়মার চোখ আটকে আছে ছোট ফেস পাউডারের বক্সটার দিকে। কি সুন্দর বক্সখানা। উপরে পাথরের কাজ করা, ভেতরে ছোট একখানা আয়না আর কি সুন্দর ফুলের মত দেখতে একখানা নরম তুলি, আঙুল দিতেই ঢেবে যায়, আর ঘ্রাণটা কি সুন্দর। খোলার সাথে সাথে পুরো ঘরে সেই ঘ্রাণ ছড়িয়ে যায়।

বাড়ির ভেতরের কানা মহিলার ছেলের বউটা শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে জিজ্ঞেস করে, সীতা হারটা কি পুরাটা স্বর্ণ? কত ভরি হবে এইখানে?

জান্নাতের মা মুখ বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে বলে, স্বর্ণ না তো কি! আমাদের হীরার টুকরা ননদটারে কি ইমিটেশন জামাইয়ের কাছে দিমু আমরা! আমাগো জামাই শহরের বড় ডাক্তার! পুরো তিন ভরি স্বর্ণ এইখানে! 

নাইমের ফুপি ধমক দেয় দেয় জান্নাতের মাকে। বলে, হইছে, থাম। এত ভরিটরি, দাম জানা লাগব না কারো। সবাই দেখতে আসছো, দেইখা চইলা যাবা। 

চোখ বড় বড় করে সীতাহারটার দিকে তাকিয়ে থাকে কানা মহিলার ছেলের বউ। একই ভাবে ফেস পাউডারের উপর লাগানো বড় মাঝের হার্ট শেপের গোলাপি পাথরটার দিকে তাকিয়ে থাকে সায়মা। 

পরদিন সকালে সায়মার ঘুম ভাঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজে। সায়মা এসে ঘরের দরজার সামনে দাড়িয়ে দেখে নাইমের বড় ফুপি বুক চাপড়িয়ে কাঁদছে, সর্বনাশ হইয়া গেল! আমাগো মাইয়াটার সর্বনাশ হইয়া গেল! সায়মা এসে দাড়াতেই সবাই ঘুরে তার দিকে তাকায়। তাদের চোখেমুখে সন্দেহ। 

সায়মার মা ঘরের এক কোনে দাড়িয়ে ছিল। সে ছুটে এসে সায়মাকে আড়াল করে ওর সামনে দাড়ায়। আমার সায়মা বিস্কুট, চানাচুর, ছোটখাটো সাজানির জিনিস নিতে পারে কিন্তু সোনাগয়না নিব না কখনও। ও ছোট মানুষ, ও তো এইগুলা বুঝেও না! চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে সায়মার মার। সায়মা বুঝতে পারে না কি হয়েছে। বাড়ির সবার চোখে সন্দেহ থাকলেও তারা সায়মার মায়ের সাথে একমত প্রকাশ করে। বিস্কুট চানাচুর নিয়ে থাকলেও সায়মা কখনও টাকা-পয়সায় হাত দেয় নাই। বা বাড়ির অন্য কোনো জিনিসেও না। নাইমের ফুপি বুক চাপড়িয়ে কাঁদতে থাকে। তার কান্নার আওয়াজ সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। 

পুরোদিন সায়মার মা তাকে ঘর থেকে বের হতে দেয় না। নিজেও বের হয় না। ঘরের এক কোনায় বসে কাঁদতে থাকে। আজ আর সে সায়মাকে মেরে মেরে প্রশ্নও করে না। শুধু ঘরের এক কোনায় বসে অঝোরে কাঁদতে থাকে। মাকে এভাবে কাঁদতে সায়মা কখনও দেখি নি। যখন তার বাবা-দাদা-দাদি তার মাকে মারত, তখন মা কাঁদত কিন্তু এভাবে নয়। আজ যেন তার ভেতরের সবটুকু কষ্ট চোখের পানি হয়ে বের হয়ে আসছে। সায়মার তার মায়ের দিকে তাকিয়ে কষ্ট হয়। তার বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে এমন বোধহয়। সায়মা এসে তার মায়ের পা ধরে কাঁদতে থাকে। বলে, আম্মা, তুমি এইভাবে কাইদো না। বিশ্বাস কর, আমি কিছু নেই নাই। আমি কারো কিছু নেই নাই। আমি কোনো বিস্কুট, চানাচুরও খাই নাই। কোনো ফল খাই নাই। আমি কিচ্ছু নেই নাই রত্না খালার। সায়মা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। সায়মার মা সায়মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। সায়মা মায়ের ময়লা শাড়ির ভেতর মুখ গুঁজে থাকে। ঘামের গন্ধটা তার নাকে আটকে যায়। শেষ কবে তার মা তাকে এইভাবে জড়িয়ে ধরেছিল সে মনে কর‍তে পারে না। 

জান্নাতের মা বহুবার নাক ছিটকিয়ে ছিটকিয়ে সায়মাদের ঘর তল্লাশি নিতে বলে। সায়মাকে গুনে গুনে চার বার ‘চোরের ঘরের চোর’ বলেও গালি দেয় সে। প্রথম তিনবার সায়মার গায়ে না লাগলেও, চতুর্থবার নাইম শুনে ফেলায় সায়মার প্রচন্ড লজ্জা হয়। সে ছুটে সে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে। 

সায়মার মা তার সব জিনিস এনে বয়স্ক মহিলার সামনে রাখে। কাঁদতে কাঁদতে সেগুলোর তল্লাশি নিতে বলে। কেউ ব্যাগে হাত না দেওয়ায় নিজেই ব্যাগের প্রত্যেকটা জিনিস উল্টেপাল্টে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেখায়। সায়মা দূরে দাড়িয়ে সবটা দেখে। তার মায়ের ময়লা কয়টা শাড়ি আর তার পুরানো জামা-গেঞ্জি। সেখানে কোনো অন্য মানুষের জিনিস দেখতে পায় না সে। থানা-পুলিশ হলেও কোনো সমাধান হয় না। শেষমেশ ইমিটেশনের সীতাহার পরেই নাইমের ছোট ফুপির বিয়ে হয়। 

বিয়ের পরদিন নাইমের ছোট ফুপি বাড়ি আসে তার টাকলু জামাইকে নিয়ে। সুঁইয়ের ভয়ে ও ঘরের আসেপাশে যায় না সায়মা। সায়মার মা ব্যাগ গুছাচ্ছে। আজ রাতের লঞ্চে ঢাকা যাবে তারা। সায়মা ঘরের এক কোনে বসে তার মাকে দেখছে। 

হঠাৎ নাইমের ছোট ফুপি রত্না সে ঘরের সামনে এসে দাড়ায়। বলে, হাসি বুবু, আসব? তার দু হাত ভর্তি মেহেদী, পরনে দামি একখানা জর্জেটের থ্রিপিস, কানে-গলায়-হাতে সোনার গয়না। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সদ্য বিয়ে হয়েছে মেয়ের। ধীরে ঘরে প্রবেশ করে রত্না। 

সায়মার মা আদরের সহিত রত্নার গালে হাত ছুঁইয়ে বলে, তোমারে খুব সুন্দর লাগতেছে, বইন। 

হাসি বুবু, তুমি কি রাগ কইরা চলে যাচ্ছো? তুমি এত দিন যাবত আমাদের মায়ের খেয়াল রাখছো, আমার বিয়ের সব কাজে সাহায্য করছো, এখন যদি এভাবে চলে যাও আমি কিন্তু খুব কষ্ট পাব৷ সায়মার মায়ের হাত ধরে বলতে থাকে রত্না। 

না না, কি বল এগুলা! অনেকদিন তো থাকলাম। সায়মার বাবাও বার বার যাইতে বলতেছে, ওর স্কুলও বন্ধ যাইতেছে। মেয়েটার ভবিষ্যৎ নিয়েও তো ভাবতে হইব নাকি! সায়মার মা একটু থামে। মুখের হাসিটা অপরাধবোধে পরিবর্তিত হয়। মৃদুকণ্ঠে বলে, তোমার শ্বশুর বাড়ির মানুষজন কি খারাপ ব্যবহার করছে তোমার সাথে?

তারা আমারে তেমন কিছুই বলে নাই। একটু তো কষ্ট পাইছেই, এত দামের জিনিসটা। কিন্তু কি করার! বিশ্বাস কর, বইন, ও বিস্কুট, চানাচুর নিতে পারে, তোর স্নো-সাবান নিতে পারে কিন্তু সোনাদানা নিব না! সায়মার মায়ের চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকে। 

আমি কি একবারও সে কথা বলছি! বুবু, তুমি এইগুলা ওর সামনে বইল না। রত্না সায়মার মাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়। 

রাস্তায় একখানা অটো দাড়িয়ে আছে সায়মাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। ঘরের সবাইকে বিদায় জানিয়ে সায়মা আর তার মা অটোতে চড়ে বসে। সায়মা দূরে দাড়ানো নাইমকে দেখে। অটো চলতে শুরু করলে নাইম আরও দূরে সড়ে যেতে থাকে। একটা সময় নাইমকে আর দেখা যায় না। সায়মা আর চুলে হাত দিয়ে নাইমের দেওয়া ক্লিপগুলোকে ধরে৷ সায়মার বয়স কম হলেও সে সুখ-দুঃখের তফাৎ বুঝতে পারে। তার এখন দুঃখ অনুভব হচ্ছে। 

লঞ্চ চালু হলে সায়মার মা সায়মাকে জিনিসপত্র দেখতে বলে। সে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সায়মা লঞ্চের পাশে দাড়িয়ে নদীর পাড় দেখে৷ বাতাসে তার চুল উড়তে থাকে। সায়মার ভয় হয় ক্লিপগুলো যদি পানিতে পড়ে যায়। তাই তাড়াতাড়ি ছুটে এসে কাপড়ের ব্যাগটা খুলে ক্লিপগুলো সেখানে রাখে। সকালে তারা ঢাকা পৌঁছে যায়। 

লঞ্চঘাটের পাশের দোকানে বসে চা-রুটি খায় সায়মা আর তার মা। খাওয়া শেষ হলেও সেই দোকানের বেঞ্চ থেকে ওঠে না সায়মার মা। সায়মা তার মায়ের দিকে তাকিয়ে তাকে দেখে। তার চোখেমুখে কোনো অনুভূতি নাই। 

সায়মা বলে, আম্মা, আমরা বাসায় যামু না? আব্বা কি আমাগো নিতে আইব? তার মা তার দিকে তাকায়। তার চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে সায়মার ভয় বোধ হয়। 

সায়মার মা মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, তুই ওই বাসায় যাইতে চাস? 

আমাগো তো আর কোথাও যাওয়ার নাই। মামারাও তো আমাগো নিব না। সায়মা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকায় তার মায়ের দিকে। 

আমরা আমাগো নিজেগো বাসায় যামু। 

আমাগো বাসা?

হ। খাওয়া হইছে তোর? 

হ, খাইছি। মুখে হাসি ফুঁটে সায়মার। সায়মার মা উঠে দোকানদারকে টাকা দিতে যায়। 

সায়মার সামনে দিকে এক বাচ্চা মেয়ে হেঁটে গেলে তার চুলের ক্লিপ দেখে হঠাৎ সায়মার নিজের ক্লিপের কথা মনে পরে। সে দ্রুত কাপড়ের ব্যাগটা খুলে ক্লিপ খুঁজতে থাকে। ছোট ক্লিপগুলো বড় এই ব্যাগে খুঁজে পেতে কষ্ট হয় তার। জামাকাপড় উল্টেপাল্টে খুঁজতে থাকে সে। হঠাৎ তার লাল-কালো ময়লা জামাটার ভাজে কিছু একটা চমক দিয়ে ওঠে। সায়মা বুঝতে পারে না জিনিসটা কি। তার ছোট হাতটা দিয়ে জামার ভাজ থেকে টেনে তিন ভরি স্বর্ণের সীতাহারটা টেনে বের করে সে। 

সায়মার বয়স কম হলেও সে ঠিক-ভুলের তফাৎ বুঝে। সে ফিরে পেছনে তার মায়ের দিকে তাকায়। তার মা তার মাথার পেছনে দাড়িয়ে আছে। সায়মা তার ছোট মুখটা তুলে তার মায়ের চেহারার দিকে তাকায়। তার মা সুন্দর না হলেও এতটা কুৎসিত তাকে কখনও লাগে নি। সায়মার মা এক গাল হাসে৷ কাপড়ের ব্যাগটা ভালমত আটকে সায়মার হাতটা ধরে টান দেয়। হাঁটা শুরু করে সে। সায়মা হাঁটতে হাঁটতে তার মাকে দেখে। কেমন যেন চিনতে পারে না নিজের মাকে। পেছন থেকে মায়ের চেহারা দেখতে না পারলেও সায়মার মনে হয় মা হাসছে। ফিরে তাকিয়ে মেয়ের ভয়ার্ত দৃষ্টি দেখে সে। 

হাসতে হাসতে বলে, দুটো ভাল খাইতে হইলে, পরতে হইলে যদি চোর হইতে হয়, তাইলে তাই হইস। কিন্তু তাই বইলা সাবান চোর?

Comments

    Please login to post comment. Login