মাগরিবের আযান দিল কিছুক্ষণ হয়েছে। নামাযটা শেষ করে মোবাইল হাতে সোস্যাল মিডিয়া চালাতে ব্যস্ত আনিশা। দরজাটা ভেতর থেকে চাপানো। ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে অল্প একটু মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে মোবাইলে ব্যস্ত মেয়ের দিকে তাকালেন মা আমেনা বেগম। চাঁপা গলায় বললেন, আয়েশা, ব্যস্ত?
মায়ের দিকে না তাকিয়েই পাল্টা প্রশ্ন করল আনিশা, কি হয়েছে?
আবদারের সুরে বলে, একটু দুধ চা বানা না। আনিশা মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল। নামাযের হিজাবটা তখনও খোলে নি মা। হয়ত আরও জিকির-তেলাওয়াত করবেন। কিছু না বলে মোবাইলটা পাশে রেখে উঠে রান্না ঘরে চলে গেল।
চুলায় পাতিল দিয়ে চা বানাতে শুরু করে আনিশা। পাশের রুম থেকে ভেসে আসে মায়ের মৃদু কন্ঠের তেলাওয়াত। তেলাওয়াত শেষ করে সবসময় মেয়ের মাথায় ফুঁ দিয়ে যান আমেনা বেগম। চায়ে চিনি দিতে যেয়ে থেমে যায় আনিশা। মায়ের তো ডায়বেটিস, চিনি খাওয়া মানা। চিনি ছাড়াই চা বানায় সে। চা বানানো শেষ করে এক কাপ চা মায়ের রুমে দিয়ে, নিজের কাপ নিয়ে রুমে এসে আবার মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পরে আনিশা।
মায়ের শরীরটা আজকাল ভাল যায় না। অল্পেই হাঁপিয়ে ওঠে। বয়সের সাথে সাথে শরীরে হাজারটা রোগ বাসা বেঁধেছে। মা বলতে গেলে এখন ঔষধের উপরই বেঁচে আছে। মায়ের শুষ্ক মুখের দিকে তাকালে আনিশার মন খারাপ লাগে।
গত দুই সপ্তাহ যাবত হাসপাতাল-ডাক্তারের কাছে একাই চক্কর কাটছে মা। ইচ্ছা হলেও আনিশার যাওয়ার জো নেই। ছোট বোনকে সামলাতে হয় তার। সময় পেলে আফনান, আনিশার বড় ভাই মাঝেমাঝে মায়ের সাথে যায়।
দরজার আওয়াজ পেয়েই ছুটে এসে দরজা খোলে আনিশা৷ মায়ের হাতে বড় বড় রিপোর্টের ফাইল সাথে বাজারসদাইয়ের ব্যাগে। ব্যাগ থেকে উঁকি দিচ্ছে সবুজ রঙয়ের গ্রীন টির প্যাকেট। হাত থেকে ব্যাগগুলো নিয়ে খাবার ঘরে রাখে আনিশা।
ডাক্তার কি বলেছে জানতে চায়। রিপোর্টগুলো পড়ে পড়ে দেখতে থাকে। না বুঝতে পারা লাইনগুলো গুগল করে বুঝার চেষ্টা করে আনিশা। আমেনা বেগম পানির মগে চুমুক দিতে দিতে মেয়েকে বলল, লিভারে সমস্যা বলল।
অপারেশন করতে হবে? উদ্বিগ্ন হয়ে মায়ের দিকে তাকায় আনিশা।
ঔষধ দিল। এক মাস খেয়ে আবার যেতে বলেছে। খাবারদাবার নিয়ম মেনে খেতে হবে। ওজন কমাতে বলেছে। দুধ বন্ধ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমেনা বেগম। আনিশা বুঝতে পারে না মাকে কি বলবে। তাই কিছুই বলে না।
আনিশার সকালে ক্লাস আছে। সকালের বাস ধরার জন্য খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয় তাকে। রুম থেকে বেড়িয়ে এসে দেখে মা খাবার ঘরে বসে কালো মতন কি পানীয় খাচ্ছে। ব্রাশ হাতে পেছনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিতে দিতে বলে, সকাল সকাল চা খাচ্ছো?
চা না চিরাতার পানি এটা। উদ্ভট মুখোভঙ্গি করতে করতে চিরাতার পানিতে চুমুক দিল আমেনা বেগম। আনিশা মায়ের মুখভঙ্গি দেখে মৃদু হাসে।
দিন দুয়েক হল মায়ের পেটে খুব ব্যাথা। যদিও ডাক্তার এক মাস পরে যেতে বলেছিল তাও অত্যাধিক ব্যাথার কারনে আজই গেছে মা। এদিকে ছোট বোনটা যেন আজকে কিছুতেই মানতে চায় না। কি এক কারনে কান্নাকাটি করে পুরো বাসা মাথায় তুলেছে। আনিশার আর ভাল লাগে না। সে ঘরের এক কোনায় যেয়ে বসে থাকে। এই কান্নাকাটির আওয়াজে তার মাথা ব্যাথা করে। মাথার ভেতরে ছিড়ে ছিড়ে ওঠে। কিন্তু কি করার! খানিকটা বসে থেকে আবার উঠে এসে বোনকে কোলে নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে আনিশা। কোনোভাবে ঘুম পারিয়ে দেয় বোনকে।
ধীর পায়ে হেঁটে রান্নাঘরে যেয়ে চুলা জ্বালায়। এককাপ কড়া লিগারের চা দরকার মাথাটা ঠান্ডা করার জন্য। চা হতে হতে মা চলে আসে। মুখটা বেজার। উদ্বিগ্ন হয়ে আনিশা বলে, কি বলল ডাক্তার?
আমেনা বেগম চুপচাপ সোফায় বসে। অ্যান্ডোসকপি দিয়েছে। ও আমি করাব না। অভিযোগের সুরে বলতে থাকে, মুখের ভেতর ওত বড় পাইপটা ঢুকিয়ে দেবে, শুনলেই তো ভয় করে।
চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে নিজের রুমে বসে থাকে আনিশা। হাতের মোবাইলে অ্যান্ডোসকপি নিয়ে কিসব যেন পড়ছে সে। এই গত কয়েকদিনে যে পরিমান মেডিকেল জ্ঞান তার হয়েছে তাতে বলাই যায় যে ডাক্তার হিসেবেও একখানা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আনিশার হতেই পারত। শুধু শুধু মানবিকের চক্কর খাটছে৷ শুধু ফ্রয়েড আর মার্ক্সে না, হিপোক্রেটসেও বেশ বাহাবা অর্জন করতে পারত সে। চায়ের কাপ আর আনিশা, দুটো থেকেই উষ্ণতা ধীরে ধীরে গায়েব হতে থাকে।
মা আরেকখানা ডাক্তার দেখায় পেট ব্যাথার জন্য। সেখান থেকেও অ্যান্ডোসকপি দেয়ায় শেষমেশ অ্যান্ডোসকপি করাতেই হয় তাকে। এ রিপোর্টে খোঁজ মেলে নতুন এক রোগের, আলসার। আগেই ডায়বেটিস, লিভারের কারনে অধিকাংশ খাবারই বন্ধ আমেনা বেগমের। এবার বাকিটাও গেল।
শুক্রবার দিন। পরিবারের সবাই বাসায়। সচারাচর ভালমন্দ রান্না হয় এদিনে। আজও হয়েছে। খাবার ঘরে সবাই ভাগযোগ করে আমেনা বেগমের রান্না করা মাংস, তরকারি খাচ্ছে। আমেনা বেগম অল্প কয়টা সাদা ভাত অল্প কিছু তরকারি দিয়ে চুপচাপ খেয়ে উঠে যায়। মাংস খাওয়া তার নিষেধ।
সন্ধ্যায় সবার জন্য চা-নাস্তা তৈরি করে আমেনা বেগম। গরম গরম চিনি দেওয়া দুধ চা, সাথে শীতের নতুন সবজির পকোড়া। সবাই মজা করে খেয়ে উঠে চলে যায়। সবাই চলে গেলে গ্রীন টির প্যাকেটটা খুলে কাপের গরম পানিতে ঢুবায় আমেনা বেগম। বর্নবিহীন পানিটা ধীরে ধীরে হলদেটে হতে থাকে। চেয়ে চেয়ে দেখে আমেনা বেগম।
বয়স তার খুব বেশি না। কিন্তু এখনই হাতের চামড়ায় ভাঁজ পরেছে, চোখে-মুখের চামড়াও ভাঁজ পরেছে, চুলগুলো পেঁকে সাদা হয়ে যাচ্ছে, চেহারাটা কেমন বিবর্ন লাগে আজকাল। গ্রীন টির ব্যাগটাকে কয়েকবার মগে নাড়িয়ে চাড়িয়ে নেয় আমেনা বেগম। পানি নিতে খাবার ঘরে আসে আনিশা। আমেনা বেগম হেসে মেয়ের দিকে তাকায়। বলে, এই আনিশা, গ্রীন টি খাবি একটু?
না, তুমি খাও। মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসে আনিশা। বোতলে পানি ভরে নিজের ঘরে চলে যায়।
খাবার ঘরের পাশেই ছেলের ঘর। ক্ষীণ শব্দে একটা ইংরেজি গান ভেসে আসে সে ঘর থেকে। ওর পরেই তাদের শোবার ঘর। সে ঘর থেকে ভেসে আসে টিভিতে চলতে থাকা সংবাদের আওয়াজ। আমেনা বেগম নিঃশব্দে খাবার ঘরে বসে ধোঁয়া ওঠা গ্রীন টির মগের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার শুষ্ক মুখটা কেমন বাচ্চাদের মত ছোট লাগে।
শূন্য তাকিয়ে আনমনে হয়ে যায় সে। নিজেকে খুঁজে পায় শৈশবে। মায়ের আঁচল ধরে রান্নাঘরে ঘুরঘুর করতে দেখে নিজেকে। ধোঁয়া ওঠা মাটির চুলো, কাঠের বেড়া দেওয়া রান্নাঘর যার ফাঁকা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছে। শীতের সকাল, এই সকালে টাটকা খেঁজুরের রস পাওয়া যায় গ্রামে। সেই রস দিয়েই মা তৈরি করেছে আমেনার পছন্দের রসে ভেজা পিঠা। পুরো রাত রসে ভিজে পিঠাগুলো ফুলেফেঁপে উঠেছে। চামচ দিয়ে এক পিচ উঠিয়ে হাসিমুখে মেয়ের মুখে পুরে দেয় আমেনা বেগমের মা। বলে, কেমন হয়েছে?
গরম বিস্বাদ গ্রীন টি ঠোঁটে লাগার সাথে সাথে নিজেকে বাস্তবে খুঁজে পায় আমেনা বেগম। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে সে। আনমনেই বলে ওঠে,
খুব মিষ্টি।