Posts

গল্প

ছোটগল্প: নীড়

June 13, 2024

M. Khanam

21
View

মাথার উপরে অন্তহীন নীল আকাশ। যতদূর চোখ যায় শুধু নীলের সমাহার। বিজ্ঞান বলে, দৃষ্টির শেষ সীমায় আমরা নীল রং দেখি বলেই আকাশের রং আমাদের কাছে নীল মনে হয়। মাঝেমাঝেই মনে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি আকাশের রং নীল? যদি পাখি হতাম তবে উড়ে গিয়ে দেখে আসতাম আকাশের সত্যিকার রং নীল কিনা। নাকি শুভ্র মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য। 

এ জন্মে বোধহয় আমার পাখি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না। কিন্তু ওদের স্বপ্ন ঠিকই পূরণ হবে। ওরা মানে আমাদের গল্পের প্রধান চরিত্র, পুপু আর পিপি, একজোড়া সদ্য বিবাহিত চড়ুই দম্পতি। 

সম্প্রতি হওয়া এক ঝড়ে পুপু আর পিপি হারিয়েছে তাদের সম্পূর্ণ পরিবারকে। কিন্তু আশা হারায় নি তারা। নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ডানায় নিয়ে উড়ে চলেছে দিগন্তের পথে। 

ঝড়ে তারা ছুটে এসেছে বহু দূর এক জঙ্গলে। কাঠঠোকরা সাহেবের খালি বাসাতেই বিনা অনুমতিতে ঝড়ের রাত-দিন পাড় করেছে তারা। এখন কাঠঠোকরা সাহেব তার বিশাল চঞ্চু দিয়ে পুপুর খুলি ফুঁটো করে দেওয়ার আগেই চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল নবদম্পতি। থাকার জন্য এই জঙ্গলটাও মন্দ নয় ভেবে এখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিল তারা। এখন দরকার একটি ভাল বাসা। কিন্তু বিপদ ঘটল ওখানেই। 

যে গাছেই বাসা বাঁধতে যায় সেখানেই কেউ না কেউ আগেই বাসা বেঁধে ফেলেছে। আর গোটা কয়েক যা খালি আছে তাতে সাপের উপদ্রব অত্যাধিক। এই অসময়ের ঝড়ের পর শহুরে মেহমানদের জায়গা দিতেও কেউ রাজি নয়। 

প্রথমেই পুপু আর পিপি গেল কাকের বাসায়। দেখতে কঠোর হলেও, পাখি সমাজের অন্যতম উপকারী পাখি হিসেবেই পরিচিতি তার। পুপু বড় আশা নিয়ে তাদের সমস্যার কথা জানাল কাককে। জানাল তারা সদ্য পরিবার হারানো এক নব দম্পতি। দরকার শুধু ছোট্ট একটা বাসার। এক রুম সাথে টয়লেট আর রান্নাঘর হলেই চলবে তাদের। 

কাক সব মনোযোগ দিয়ে শুনে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, তোমরা তো জানো, বাপু। পাঁজি কোকিলটা আমার বাসায় এসে বিনা পয়সায় ডেলিভারি করে চলে যায়। ওর বাচ্চাকাচ্চাদের নিজের বাচ্চার মত আদরে যত্নে বেবিসিটিং করে বড় করি আমি। একটু থেমে বেদনা জরজরিত কণ্ঠে বলল, আর সেই বাচ্চা বড় হয়ে আমাকেই 'কাউকা' বলে গালি দিয়ে চলে যায়। সদ্য হওয়া কোকিলের বাচ্চাগুলোর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল কাকের। তবুও ওদের তো আমি ফেলে দিতে পারি না। তোমরা এখানে থাকবে, তোমাদেরও ছানা-পোনা হবে। আমার বয়স হয়েছে। এত কি আর এখন পারি! একটু ভেবে বলল ভরসা দেওয়ার সুরে বলল, তোমরা বরং বাবুইয়ের বাসায় যাও। ওরা তোমাদের অবশ্যই জায়গা দিবে।

ভরসার বুলি কানে নিয়ে বাবুইয়ের বাসার উদ্দেশ্যে উড়ে চলল পিপি আর পুপু। বাবুই তো তাদের দেখেই রেগে আগুন।  রাগান্বিত স্বরে চিৎকার করে বলল, এক তো তোমরা রজনীকান্ত সেনের 'স্বাধীনতার সুখ' কবিতায় আমাদের ঘরকে 'কুড়েঘর' বলে অপমান করেছো! এখন আবার এখানেই জায়গা চাইতে এসেছো! এখনই বের হয়ে যাও বলছি!

বাবুইয়ের ক্রোধ থেকে কোনোভাবে পালিয়ে পেঁচার ঘরে এলো পিপি আর পুপু। তাদের দুঃখের কথা খুলে বলল তাকে। পেঁচা সব শুনে তাদের আশ্বাস দিল। বেশ তো, তোমরা আমার বাসায় থাকো! আমার বাসা অনেক বড়! আর আমিও একা পাখি, ঘরে বসে থাকি সারাদিন। হাসিমাখা মুখে বলল, তোমরা পূর্বের ঘরটায় থাকতে পারবে।

পেঁচার কথা শুনে তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল পিপি আর পুপু। নেচে-ঘুরে নিজেদের নতুন বাসা দেখতে লাগল তারা। 

পেঁচা জিজ্ঞেস করল, কি? ঘর পছন্দ হয়েছে? 

পিপি হেসে বলল, খুব পছন্দ হয়েছে। 

বেশ বেশ। কিন্তু বাপু, তোমাদের এখানে থাকতে দিয়ে আমার লাভ কি বলো তো? পিপি-পুপু অবাক হয়ে পেঁচার দিকে তাকাল। পেঁচা  কণ্ঠস্বর টেনে টেনে বলল, তোমরা তো জানো আমি দিনে দেখতে পাই না। তাই তোমরা যদি প্রতিদিন আমায় ৫টা পোঁকা, ৩টা কেঁচো আর সামান্য অন্য কোনো খাবার এনে দাও তবেই তোমরা এখানে থাকতে পারবে।

পুপুর চোখেমুখে হতাশার ছাপ। সব যদি তোমাকেই দেই তবে আমি আর পিপি কি খাব! 

পেঁচা রেগে গেল। চেঁচিয়ে বলল, তবে অন্যত্র যাও। এখানে তোমাদের জায়গা হবে না! 

অবশেষে নিরাস হয়ে সেখান থেকে চলে যেতে হল পিপি আর পুপুকে। সন্ধ্যা হতে আর খুব বেশি বাকি নাই। এখনও থাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে হতাশায় এক গাছের ডালে নিরুপায় হয়ে বসে থাকে তারা।

হঠাৎ এক দোয়েল এসে পিপির পাশে বসল। পিপিকে হতাশ দেখে তার মায়া হল। কি কারনে তারা এমন হতাশ হয়ে বসে আছে জানতে চাইল দোয়েল। পিপিও তাদের দুঃখের কথা দোয়েলকে জানাল। দোয়েল বলল, আরে এই ব্যাপার! তোমরা আমার বাসায় চলো! কোনো ভাড়া দিতে হবে না। তোমরা দুইজন থাকবে, কতটুকই আর জায়গা লাগবে! দোয়েল হাসি মুখে বলল, আমরা একসাথে আমার ঘরে দিব্যি সুখে থাকতে পারব! 

এ কথা শুনে তো পিপি মহাখুশি। পুপুর দিকে তাকাতেই আর হাসিটা বিলীন হয়ে গেল। পুপুর চেহারায় হাজারটা চিন্তা বাসা বেঁধেছে।

দোয়েলের কি সুন্দর লেজ, তার কণ্ঠ তাহসানের চেয়েও সুন্দর, কি অপূর্ব চঞ্চু তার আর কি অপরূপ শ্রী। সারাদিন কাজের জন্য বাহিরে থাকে পুপু। এরকম সুদর্শন দোয়েলের সাথে পিপিকে একা রেখে কিভাবে নিশ্চিতে কাজে যাবে সে ভাবতেই পুপুর বুকটা ধুক করে উঠল। পিপিও বোধহয় বুঝতে পারল পুপুর মনের অবস্থা। তাই দোয়েলকে ধন্যবাদ জানিয়ে মানা করে দিল পিপি। দোয়েল খানিকটা মনোকষ্ট পেয়ে উড়ে গেল আর ডালে বসে রইল আশ্রয়হীন দুই পথিক পাখি। 

গোধূলির লাল আলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে পুপু পিপিকে কথা দিল, দোয়েলের সেই বাসা যতই সুন্দর হোক না কেন, তার চেয়েও সুন্দর বাসাটা পুপু তৈরি করবে তার প্রিয় পিপির জন্য। আর সেই বাসায় সুখে-দুঃখে একসাথে থাকবে তারা। সম্রাট শাহজাহান যেমন তার সঙ্গিনী মমতাজের জন্য তাজমহল বানিয়েছিল, তেমনি পিপির জন্য পুপুও তৈরি করবে খড়ের পিপিমহল। 

অন্ধকার নামার আগেই একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন। আশ্রয়ের খোঁজে উড়ে চলল চড়ুই দম্পতি। জঙ্গলের এক কোনে একটা বাড়ি দেখতে পেল তারা। বাড়ির সামনের আম গাছে বসল পিপি ও পুপু। 

বাড়ির বারান্দায় এক মা তার বাচ্চা মেয়েকে একটু খাওয়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। খেলনা, মুখভঙ্গি, উদ্ভট আওয়াজ, কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। জোর করে মুখে ঢুকিয়ে দিলেও তা ফেলে দিচ্ছে বাচ্চাটা। একসময় মা রেগে গিয়ে বাচ্চাটার পিঠে আস্তে করে মার লাগাল। দেখেই বুঝা গেল ব্যাথা পাই নি তবে শিশুরা যে সৃষ্টির অন্যতম রহস্যময় প্রাণী এতে কারো সন্দেহ হওয়ার কথা নয়। অবাক চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার রাগান্বিত মুখটা দেখে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না শুরু করল বাচ্চাটা। তার এ কান্না আর থামায় কে! 

পিপির বাচ্চাটার জন্য মায়া হতে লাগল। সে গাছ নেমে উড়ে এসে বাচ্চাটার সামনে উড়তে লাগল। ডানে, বামে, উপরে, নীচে; ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগল পিপি। পুপুও পিপিকে সঙ্গ দিতে উড়ে এলো। দুইজনে কি সুন্দর উড়ে উড়ে নাচ দেখাতে লাগল। 

ওদের দেখে বাচ্চাটার কান্না থেমে গেল৷ বাচ্চাটা হাতে তালি দিয়ে দিয়ে জোড়ে জোড়ে হাসতে লাগল। মা আস্তে করে বাচ্চাটার মুখে খাবার ঢুকিয়ে দিল। বাচ্চাটার আর কোনো সমস্যা না করে পিপি আর পুপুকে দেখতে দেখতে খাবার খেতে লাগল। এভাবেই পিপি আর পুপু কিছুক্ষণ উড়ে আবার গাছের ডালে যেয়ে বসল। 

বাচ্চাটা হাত বাড়িয়ে মুখ দিয়ে আওয়াজ করতে করতে ওদের ডাকে। মা খাবার শেষ করে বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল। খানিকটা পর একটা জুতার বাক্স নিয়ে এসে বারান্দায় লাগিয়ে দেয় মা। 

পিপি আর পুপুর বুঝতে আর দেরী রইল না যে, এটা তাদেরই জন্য। জঙ্গলের প্রান্তে এত সুন্দর বাসা আর ভাড়াটাও একদম কম। শুধু তিনবেলা সার্কাস দেখালেই চলবে৷ এক মুহুর্তও দেরী না করব পিপি আর পুপু ঢুকে পরল তাদের নতুন বাসায়। খড়, পাতা দিয়ে কিভাবে এই বাক্সটাকে তাদের স্বপ্নের বাসায় পরিনত করবে সেই পরিকল্পনা করতে লাগল দুজনে। 

উত্তরের দিকটাতে বাচ্চাদের ঘর আর দক্ষিণে তাদের। এসব পরিকল্পনা করতে করতেই রাত কাটিয়ে দিল তারা। 

ভোর হতেই দুইজনে বেড়িয়ে পরল খাদ্য আর ঘর সাজানোর সামগ্রীর সন্ধানে। বাড়ি ফিরে দেখে আজও এক কাহিনী। বাচ্চাকে খাওয়ানোর মায়ের অসফল চেষ্টা। পিপি আর পুপু তাদের সার্কেস শুরু করতেই গবগব করে খেতে লাগল বাচ্চাটা।

কয়েকদিন বাদেই আবার আবার আকাশ কালো হয়ে এলো। দিন ভর বাতাস দম মেরে থেকে সন্ধ্যা থেকে প্রবল গতিতে ছোটা শুরু করল। বাতাসে জুতার বাক্সটা দুলতে লাগল। দুলতে দুলতে এক সময় নীচে পড়ে গেল পিপি আর পুপুর এত সাধ করে সাজানো ঘর। পিপি আর পুপু উড়ে বেড়িয়ে আসল বাক্স থেকে৷ দমকা হাওয়ায় তাদের ছোট্ট ডানাগুলো বেগ পেল না। কোনো পথ না দেখে জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল তারা।

বাচ্চাটা বিছানায় ঘুমাচ্ছিল আর তার মা খাওয়ার জন্য মগে পানি ঢালছিল। পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ শুনে পেছনে তাকাতেই তার চোখ কপালে উঠল। দৌড়ে পাখিদের দিকে ছুটে এলো সে। তার ছুটে আসা দেখে ভয় পেয়ে উপরে উড়ে গিয়ে ছুটাছুটি করতে লাগল পিপি আর পুপু। ছুটতে গিয়ে মায়ের হাত ফসকে কাচের মগটা পড়ে ভেঙ্গে গেল। পানি আর কাচ ছড়িয়ে পরল মেঝেতে। মা ছুটে দেওয়ালের দিলে এগিয়ে গেল। ততক্ষণে পুপু বুঝতে পারল মা তাদের তাড়াতে নয় বরং ঘরের বৈদ্যুতিক পাখাটা বন্ধ করতে ছুটে আসছিলো। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। পাখার সাথে ধাক্কা লেগে ছিকটে পড়ে পিপি। 

কাচের টুকরোগুলোর পাশে পিপির নিথর শরীরটা পরে থাকে। সাদা মেঝেতে লাল রক্ত পানির সাথে মিশে যায়। পুপু কোনো আওয়াজ করে না। শুধু তাকিয়ে দেখে যে কাচের মগটার মত তার আর পিপির সব স্বপ্নও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। 

মগ ভাঙ্গার আওয়াজে বাচ্চাটার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে ভয় পেয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। বাচ্চাটার মা সাবধানে কাঁচ পেরিয়ে এসে তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে শান্ত করে। 

পুপুর তো হাত নেই। নাহলে কখনই ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরত পিপিকে। তাই শুধু চঞ্চু দিয়ে পিপির নিথর শরীরটাকে ঠুকরাতে থাকে। 

সকালে মা পিপির মৃত শরীরটা বাড়ির সামনের আম গাছের নীচে গর্ত করে পুতে দিল। বারান্দার এক কোনে জুতার বাক্সটাকে সে পরে থাকতে দেখল। ঝড়ের পানিতে বাক্সটা ভিজে গেছে। ভেতরের খড়-ডালও বেড়িয়ে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মা একবার ডালে বসা পুপুর দিকে তাকাল, এরপর বাক্সটা বারান্দার বাহিরে রেখে ঘরের ভেতর চলে গেল। 

ডালে বসে পুপু নিঃশব্দে সব দেখছিলো। পিপির দাফন আর তাদের স্বপ্নের ঘরের ইতি ঘটা দেখে পুপু আকাশের পানে উড়ে চলল। 

সঙ্গিহীন, জোড়াবিহীন পুপুর জীবনের যেন আর কোনো উদ্দেশ্যেই রইল না। 

সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না। তাদের জন্যও থামে নি। প্রতিদিনই ওই আকাশের রং কালো থেকে নীল হয়েছে, এরপর নীল থেকে লাল হয়ে আবার কালো হয়েছে। প্রতিদিনই সেই বারান্দায় বসে বাচ্চাটাকে খাওয়ানোর অসফল চেষ্টা করেছে তার মা। শুধু পিপি আর পুপু আসে নি তাদের ছোট্ট ডানায় ভর করে বাচ্চাটাকে স্বপ্নের দেশে নিয়ে যেতে। 

একদিন বারান্দা পরিষ্কার করতে যেয়ে মায়ের চোখ পড়ে ঘরের বাহিরে পরে থাকা সেই জুতা বাক্সটার দিকে। বাক্সটা তাকে মনে করায় সেই একজোড়া চড়ুইয়ের কথা। বাক্সটা ফেলে দেওয়ার জন্য হাতে নিতেই ওর ভেতর থেকে গড়িয়ে পরে একটা চড়ুই পাখির নিথর দেহ। চমকে গিয়ে মা নীচে তাকায়। আর তার বুঝতে বাকি থাকে না যে এটা সেই চড়ুই যার জোড়া তাদের ঘরে মারা যায়। মা বাক্সটার ভেতরে তাকিয়ে দেখে এর ভেতর খড় দিয়ে একটি অসম্ভব সুন্দর বাসা বানানো। 

চড়ুই পাখির বাসা পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর একটি কারুকাজ যা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদের স্থাপত্য দেখলে যে কারো বিশ্বাস হবে যে তারা বুয়েট থেকে স্নাত্তক পাস করেছে। না, না, এই বুয়েট বাংলাদেশ ইউনির্ভাসিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি নয় বরং বার্ড ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি। মা অবাক হয়ে বাসাটা দেখতে থাকে। এর চেয়ে বেশি সুন্দর কিছু তিনি এর আগে দেখেন নি। মেঝে থেকে চড়ুইয়ের মৃত শরীরটা হাতে তুলে নেয় মা।

পুপু তার কথা রেখেছে। দিনের পর দিন সে একাই তৈরি করেছে তাদের স্বপ্নের পিপিমহল। জীবনের শেষ সময়টাও কাটিয়েছে এই পিপিমহলে তার সঙ্গিনী পিপির স্মৃতির সাথে। 

মা পুপুর শরীরটাও ঠিক সে জায়গাতেই পুতে দেয় যেখানে পিপি আছে। আর বাক্সটাকে ঝুলিয়ে দেয় বারান্দার এক কোনায়। যাতে আবার নতুন কোনো পাখি দম্পতি যদি চায় তবে এই বাসায় তারা থাকতে পারবে। 

কিছুদিনের মাঝেই নতুন এক চড়ুই দম্পতি পিপিমহলে থাকতে শুরু করে। তাদের কিচিরমিচির শুনে বাচ্চাটা হাত তালি দিয়ে আদো আদো কথা বলে। মা প্রতিদিন সেই চড়ুইদের দেখে আর ভাবে, তাদের মনে কি প্রশ্ন জাগে না এমন সুন্দর বাসাটা কে এইখানে বানিয়ে রেখে গেছে? মা ভাবে যদি তারা মানুষের কথা বুঝত তবে মা তাদের সেই অমর চড়ুই দম্পতির প্রেমকাহিনী শোনাত। কিন্তু আফসোস, না তারা মানুষের কথা বুঝবে, না তাদের কখনও জানা হবে কতটা ভালবাসায় তৈরি এই ছোট্ট নীড়। 

পুপু আর পিপি তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তাই বলে থেমে থাকবে না কিছুই। সৃষ্টিশীল এই পৃথিবীর সবকিছুই চলতে থাকবে এর নিয়মে। মা আকাশের দিকে তাকায়। দৃষ্টির শেষ সীমানায় নীল রঙয়ের আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা ভাসতে দেখে সে। 

শখের এই নীড়ে সংসার করা হলো না পিপি আর পুপুর৷ কিন্তু ওই নীল আকাশের শুভ্র মেঘের মাঝে হয়ত ছোট্ট আরেকটা নীড় তারা তৈরি করেছে, ভাবে মা। সেখানে হয়ত তাদের জোড়া কয়েক ছানা-পোনাও হয়েছে। তারা সুখে-শান্তিতে সংসার করছে ভাবতে ভাবতে মায়ের ঠোঁটের কোনে হাসি ফোঁটে। পুপুর জন্য ভাল বোধ হতে থাকে মায়ের। সঙ্গী হারানোর বেদনা তার চেয়ে ভাল আর কে বুঝে! ঘরের ভেতর থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। মা শেষ একবার ফিরে তাকায় আম গাছের নীচের কবরটার দিকে। তাদের স্বপ্নগুলো পূরণ করা যে এখনও বাকি আছে। ভাবতে ভাবতে ঘরের ভেতরে চলে যায় মা। 

দমকা হাওয়ায় পিপিমহলটা খানিকটা দুলে ওঠে। আম গাছের ডালে বসে থাকা নব দম্পতি জিকো আর জুলি পিপিমহলকে দেখতে থাকে। একদিন জিকোও জুলির জন্য এর চেয়েও সুন্দর নীড় “জুলিমহল” বানাবে এই ওয়াদা করতে করতে আকাশের পানে উড়ে যায় তারা। 

Comments

    Please login to post comment. Login