ঘরের জানালায় ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি আছড়ে পড়ছিলো। চেয়ারে বসে অফিসের কোনো এক কাজে মগ্ন তারেক। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠল। তারেক খাটের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টিকে দেখতে পেলো না। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ডাকতে শুরু করল, শিউলি, শিউলি!
রান্নাঘর থেকে সামান্য মুখ বের করে শিউলি চেঁচিয়ে বলল, বল?
বৃষ্টি কোথায়?
বারান্দায় হবে হয়ত।
তারেক চেয়ার থেকে উঠে বারান্দায় এলো। বারান্দার গ্রিল ধরে আনমনে চোখে বৃষ্টি দেখছে তারেক আর শিউলির একমাত্র মেয়ে বৃষ্টি। তারেক তাকিয়ে দেখল কি যেন গভীর চিন্তা ঘিরে ধরেছে চার বছরের ছোট্ট বাচ্চা মেয়েকে।
বৃষ্টি যেদিন হল সেদিন রোদের মাঝে বৃষ্টি পরছিল। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘সান সাওয়ার’। তাই শখ করে মেয়ের নামও রেখেছিলো ‘বৃষ্টি’। কিন্তু কে জানত যে বৃষ্টির মত তার শখের এই মেয়ের জীবনও বেশ ক্ষণস্থায়ী।
চতুর্থ জন্মদিনে বৃষ্টিকে নিয়ে চিড়িয়াখানা ঘুরতে গিয়েছিলো তারা। সারাদিন হইহট্টগোল, রোদের মাঝে দৌড়াদৌড়ি— বৃষ্টির আনন্দ যেন ফুরাতেই চায় না। বানরকে খাওয়ানোর জন্য শখ করে বাদাম কিনল। সেই বাদাম খাওয়াতে খাওয়াতেই হঠাৎ মাথা ঘুরে পরে গেল বৃষ্টি। প্রথমে রোদকেই দোষী ভাবে তারেক কিন্তু সময়ের সাথে বুঝতে পারে তাদের মেয়ের শরীরে বাসা বেঁধেছে এক মরণব্যাধি, ক্যান্সার। মধ্যবিত্ত পরিবারের মাস ফুরানোর আগে ঘরের চাল ফুরানো অবস্থায় এ রোগের চিকিৎসার চিন্তাও যেন বিলাসিতা। প্রথম প্রথম ধার-দেনা করে কিছু ডাক্তার-ঔষধ জুটলেও তাও এখন বন্ধের পথে। মাদ্রাস নেবার জন্য গোটা কয়েকবার বলেছেন ডাক্তার। কিন্তু তাকে কে বোঝাবে যে তার ভিজিট জোটাতেই শিউলির শেষ নাক ফুলটাও গেছে। ধার চাওয়ার মত আর কেউ অবশিষ্ট নেই তাদের জীবনে। আজকাল মানুষও ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝিয়ে যায় যে মেয়ে বাঁচবে না, শুধু শুধু টাকাগুলো জলে ঢালা। কেউ কেউ আবার মুখ ফুঁটে বলেও ফেলে, ছেলে হলেও বুঝতাম, মেয়ের জন্য এতকিছু! ও তো এমনিতেও পরের ধন।
তাদের কোন পাপের শাস্তি এই নিস্পাপ বাচ্চাটা পাচ্ছে তা ভেবে ভেবে সারাদিন চোখের পানি ফেলে শিউলি। বৃষ্টির অসুস্থতার পর থেকে তারেক কখনও শিউলিকে হাসতে দেখে নি। শিউলি বোধহয় ভুলেই গেছে হাসতে কিভাবে হয়। নয় মাস পেটে ধরে, জীবনটা হাতে নিয়ে যে মেয়েকে পৃথিবীতে এনেছে, তার এই অসময়ে চলে যাওয়ার বায়না যেন শিউলীর জীবনের সব সুখ নিয়ে গেছে।
তারেক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বৃষ্টি কি ভাবছে বুঝার চেষ্টা করল। কিন্তু বুঝতে পারল না। মৃদু স্বরে ডাকল, বৃষ্টি? বৃষ্টি কোনো সাড়াশব্দ করল না। বৃষ্টিকে হালকা নাড়া দিয়ে আবার ডাকল তারেক, বৃষ্টি মা?
বৃষ্টি তারেকের দিকে তাকাল। বাবা?
তারেক হাসিমুখে বলে, কি ভাবছিলে এভাবে তাকিয়ে? বৃষ্টি কিছু বলতে যাবে তার আগেই বৃষ্টি ভেজা জামাকাপড় নজরে পরল তারেকের। তাড়া দিয়ে বলল, একি, পুরো ভিজে গেছো যে! চল, ভেতরে চল! তারেক তাড়াতাড়ি বৃষ্টিকে ভেতরে নিয়ে গেলো। বৃষ্টির জামাকাপড় বদলে দিতে দিতে তারেক লক্ষ করল বৃষ্টি এখনও কিছু ভাবছে। আদরমাখা কণ্ঠে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, এত গভীরভাবে কি ভাবছো বল তো?
বৃষ্টি বেশ কৌতুহলী ভাব নিয়ে বাবার দিকে তাকাল। শেষ কিছু মাসের চিকিৎসার ধকল তার ছোট্ট মুখটাতে বিদ্যমান। কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, বাবা, বৃষ্টি কেন পড়ে?
তারেক কিছুক্ষণ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবল, এইটুকু মেয়েকে বৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই মেয়েকে কোলে নিয়ে ভাবতে থাকে কি বলা যায়। ভেবে বলে, ওই আকাশের মেঘের উপর এক রাজকুমারী আছে। সেই রাজকুমারী যখন কান্না করে, তখন তার অশ্রু বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়ে। তারেক রূপকথার গল্পের মত করে মেয়েকে বৃষ্টি পড়ার রহস্য বুঝাল।
বৃষ্টির উত্তর পছন্দ হল কিনা বুঝা গেল না। কিছুক্ষণ চুপ করে আবার গভীর চিন্তায় মগ্ন হয় সে। কৌতুহল নিয়ে তারেকের দিকে তাকিয়ে বলে, রাজকুমারী কেন এত কান্না করে, বাবা?
তারেক হাসে। বলে, রাজকুমারীর মনে অনেক কষ্ট তাই।
রাজকুমারীর মনে এত কিসের কষ্ট, বাবা?
রাজকুমারীর প্রিয় পুতুলটা হারিয়ে গেছে। তাই তার মনে এত কষ্ট।
রাজকুমারীর পুতুলটা কোথায় হারিয়ে গেছে, বাবা?
কোথায় আবার! এই যে আমার কোলে! হেসে মেয়ের পেটে কাতুকুতু দিল তারেক। বাবার উত্তরে শুনে সে কি হাসি বৃষ্টির। এ হাসি যেন থামতেই চায় না। তারেকের মনে হতে লাগল, এই হাসির চেয়ে সুন্দর এই পৃথিবীতে কিছুই নেই।
রান্নাঘর থেকে বৃষ্টির হাসির আওয়াজ শুনে এগিয়ে এলো শিউলি। দূর থেকে দাড়িয়ে থেকে মেয়ের হাসি মুখটা দেখে সে৷ না চাইতেও অশ্রুতে চোখ ভরে ওঠে তার৷ রংবেরঙের সুতো দিয়ে একাধিক বার সেলাই করা শাড়ির আচলটা দিয়ে চোখ মুছে শিউলি। তারেক একবার তাকিয়ে শিউলিকে দেখে। জীবনের সব সুখ হাতছাড়া হওয়া এক ব্যক্তি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না তার মাঝে। তারেক ভাবে, সে কিছুই করতে পারে নি এই পরিবারের জন্য। ভাবতে ভাবতে তার চোখও পরিপূর্ণ হয় অশ্রুজলে।
বৃষ্টি তাকিয়ে তার বাবাকে কাঁদতে দেখে। বাবা, তুমি কাঁদছো? কি হয়েছে, বাবা? বৃষ্টির চোখেমুখে আতংক।
ও কিছু না, মা। তুমি এত সুন্দর করে হাসলে যে আমার চোখে পানি চলে এলো। তারেক চোখ মুছতে মুছতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল।
বৃষ্টির চোখেমুখে অভিমান বাসা বাঁধে। আমি হাসলে বুঝি তোমার কান্না পায়? তাহলে আমি আর কখনও হাসব না।
তারেক এক গাল হাসল মেয়ের অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য। না, না। তুমি কখনও হাসা বন্ধ করো না, মা।
বৃষ্টি বুঝতে পারল না কেন তার হাসি তার বাবাকে কাঁদায়। কেনই বা সেই কথা বলতে বলতে তার বাবা গাল ভরে হাসে। কিছু একটা বুঝার জন্য মায়ের দিকে তাকায় সে। তাকিয়ে দেখে তার মাও আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে। রাগান্বিত স্বরে বলে ওঠে, মা, তুমি কাঁদছো কেন? তোমারও বুঝি আমার হাসি দেখলে কান্না পায়! শিউলি বুঝতে পারল না কি বলবে। তাই উত্তর হিসেবে নিরবতাকেই বেছে নিল। বৃষ্টি এবার তার বাবার কোল থেকে নেমে গেল। অভিমানী সুরে বলল, তোমরা যদি এভাবে কান্না কর তাহলে কিন্তু আমি এখান থেকে অনেক দূরে চলে যাব!
শিউলি আর সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে এসে বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। না, মা। আমাকে ছেড়ে তুই কোথাও যাস না। তোকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকব! স্বজোড়ে কাঁদতে লাগল শিউলি।
বৃষ্টি বুঝতে পারল না কেন তার হাসি, তার কথা সবকিছুই তার বাবা-মায়ের কান্নার কারন হয়ে দাড়ায়। কিছুটা শান্ত হলে শিউলি দ্রুত রান্নাঘরে চলে যায়। তারেক শুধু দাড়িয়ে দেখে। শিউলিকে সান্ত্বনা দেওয়ার তার কোনো অধিকার নেই বলেই ধরে নিয়েছে সে।
রাতের খাবার বেড়ে বাবা-মেয়েকে খেতে ডাকে শিউলি। আটটার সংবাদে এবারের ঈদেও চিড়িয়াখানায় উপচে ভরা ভীড়ের খবর চলে। এদিকে সংবাদে না বললে হয়ত তারেক জানতও না আরেকটা ঈদ এসে চলে গিয়েছে তাদের জীবনে। চাঁদ রাতে সকলে যখন ফুর্তিতে ব্যস্ত ছিল, বৃষ্টিকে নিয়ে হাসপাতালের চক্কর কাটছিলো তারা। সময় যে ফুরিয়ে আসছে, বালির গতি যে ক্ষীণ হয়ে এসেছে তা বুঝতে তারেক বা শিউলি কারোই দেরী নেই। তবুও মমতার খাতিরে মিথ্যা আশা বাঁধে তারা, যে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। বৃষ্টি সুস্থ হয়ে উঠবে।
বৃষ্টি উৎসাহী কণ্ঠে বলে, বাবা, বাবা! আমাকে আরেকদিন চিড়িয়াখানা নিয়ে যাবে? সেদিন তো সিংহটাই দেখা হল না। উঠে একটু থেমে আবার বলে, জানো বাবা, সিংহকে ইংরেজিতে ‘লায়’ বলে। আমি লায়ন দেখব, বাবা। বৃষ্টি হাসতে হাসতে কথা বলতে থাকে।
তারেক অবাক হয়ে মেয়ের কথা শোনে। এই তো সেদিন তোয়ালে পেঁচিয়ে ঘরের বাহিরে দ্রুত পায়চারী করা তারেকের কোলে বৃষ্টিকে দেয় ওর নানী। এত ছোট বাচ্চা এর আগে দেখে নি তারেক। তার ভয় হয় যদি হাত ফসকে পরে যায় তার মেয়ে! শক্ত করে আকড়ে ধরে তোয়ালেটা। মেয়ের কানে আজান পড়তে পড়তে বুঝতে পারে তার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। চোখের পানি মুছতে পারে না সে। হাত নড়ালেই যদি বৃষ্টি তোয়ালে থেকে পরে যায় সেই ভয় হয় তার। হঠাতই নিজেকে আবিষ্কার করে ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তার তার স্ক্রিনে কিছু একটা দেখিয়ে তারেককে বলে কিভাবে তার শখের এই মেয়ে পৃথিবীতে আর কিছু মাসের মেহমান।
ভাতের ভেতর হাত ঘোরাতে ঘোরাতে মুখে হাসি নিয়ে বৃষ্টির কথা শোনে তারেক। ভাত আর তার গলা দিয়ে নামে না।
টিভিতে স্কুলের ইউনিফর্ম পরা কিছু বাচ্চাদের দেখা যায়। বৃষ্টি তাকিয়ে দেখে কিভাবে তার বয়সী বাচ্চারা আনন্দ করে স্কুলে যাচ্ছে। বলে, বাবা, আমি কবে স্কুলে যাব?
কথাটা যেন তারেকের বুকে তীরের মত বিধল। সত্যিই কি বৃষ্টি কখনও স্কুলে যেতে পারবে সেই চিন্তাটা তার মাথায় এদিকে ওদিক দুইবার পাঁক খেল। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বৃষ্টির দিকে তাকাল সে। হেসে বলল, এই তো, তুমি আরেকটু বড় হলেই স্কুলে যাবে। বাবার কথা শুনে বৃষ্টির আনন্দও বেড়ে গেল। আর কিছুদিন এরপরই সেও এমন সাদা-নীল ইউনিফর্ম পড়ে স্কুলে যাবে। স্কুলে যেয়ে কি কি করবে ভাবতেই চোখ দুইটা ঝলমল করে ওঠে বৃষ্টির।
শিউলি তাকিয়ে তার মেয়ের হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা দেখে। এই সুন্দর হাসিটার ঠিক উপরে এই ক্লান্ত দুটো চোখ কি বেমানান লাগছে ভাবতেই চোখে পানি আসে তার। বৃষ্টি দেখার আগেই রান্নাঘরে চলে যায় শিউলি। ছড়িয়ে থাকা সাদা ভাতগুলোকে এক করে থালাটা হাতে করে তারেকও রান্না ঘরে যায়। এক কোনায় শিউলিকে আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে দেখে। দেখেও না দেখার ভান করে হাত ধুয়ে বেড়িয়ে যায় তারেক।
গভীর রাতে শিউলির চিৎকারে ঘুম ভাঙে তারেকের। তখনও বাহিরে বৃষ্টি পরছে। বজ্রপাতের আলোতে শিউলির খোলা চুল আর কান্না ভেজা মুখটা তারেকের মনে এক ভয়ের জন্ম দিল। বৃষ্টির আদো কথার আওয়াজে তার ছটফট করা হৃদপিন্ডটা খানিকটা শান্ত হল। ছুটে গিয়ে ঘরের বাতি জ্বালানোর চেষ্টা করল তারেক। কিন্তু বাতি জ্বলল না। জানালা খুলে মোড়ের ল্যাম্পপোস্টটা বন্ধ দেখে বুঝতে পারল বিদ্যুৎ নেই। অন্ধকারে হেঁটে এসে শিউলির মাথায় হাত রাখল তারেক। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য না বরং অন্ধকারে শিউলি কোথায় আছে তা বুঝার জন্য।
শিউলী মৃদু কণ্ঠে বলে, বৃষ্টি কেমন যেন করছে।
বাহিরে বড্ড বৃষ্টি পরছে। এত রাতে কিছু পাওয়াও যাবে না।
তুমি একটু বৃষ্টির পাশে বস। অন্ধকারে তারেকের হাতটা ধরে ধীরে খাট থেকে নামে শিউলি। ফিরে একবার মেয়ের দিকে তাকায়। জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে বৃষ্টি। আমি একটু দুধ গরম করে আনি ওর জন্য।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টির আওয়াজের মাঝে বৃষ্টির নিঃশ্বাসের আওয়াজটা হাঁকিয়ে জানান দেয় যে সে এখনও লড়ে যাচ্ছে। এ এমন এক যুদ্ধ যার সম্পর্কে বৃষ্টি জানে না। মৃত্যু কি সে বুঝে না। শুধু জানে সেদিন মায়ের কথার অবাধ্য হয়ে চিড়িয়াখানায় এত দৌড়াদৌড়ি করেছে বলেই তার আজ এই হাল হয়েছে।
শিউলি একখানা মোমবাতি জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে রান্নাঘরে যায়। তারেক খাটের পাশে বসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বাবার হাতের স্পর্শ পেতেই বৃষ্টি যেন কি বলে ওঠে। তারেক বুঝতে পারে না বৃষ্টি কি বলছে। মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, বৃষ্টি মা, শরীর খারাপ লাগছে? বিদ্যুৎ না থাকাটা তার কাছে সৌভাগ্য মনে হয়। নাহয় বাবার গাল বেয়ে এমন অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেখে বৃষ্টির কতটা অভিমান হত ভাবতে থাকে সে।
বৃষ্টি জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নেয়। বলে, বাবা, রাজকুমারী যখন ওর পুতুলটা খুঁজে পাবে ও খুব খুশি হবে, তাই না? একটু থেমে জোড়ে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, আর ওর কান্নাও থেমে যাবে, তাই না?
তারেক মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে, হ্যাঁ, মা। ও কান্না বন্ধ করে হাসবে।
তাহলে তো বৃষ্টিও থেমে যাবে, তাই না?
হ্যাঁ, বৃষ্টি থেমে গিয়ে খুব সুন্দর ঝলমলে রোদ উঠবে। তারেক অন্য হাত দিয়ে তার চোখ মুছতে যেয়ে থেমে যায়। পাছে বৃষ্টি যদি বুঝে যায় তার বাবা কান্না করছে! বৃষ্টি কিছু একটা বলল কিন্তু তার কথাগুলো বুঝা গেল না। তারেক খানিকটা অপেক্ষা করল। বৃষ্টির নিঃশ্বাসের শব্দটা ক্ষীণ মনে হল তার। তারেক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বৃষ্টিকে নাড়তে নাড়তে স্বজোরে বলল, কি বলছো, বৃষ্টি মা? আমি কিছু বুঝতে পারছি না! বৃষ্টি, কথা বলো, মা!
তারেকের কণ্ঠ শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে শিউলি। বৃষ্টি কোনো কথা বলে না। মোমবাতির আলোতে মেয়ের চেহারাটার দিকে তাকায় সে। শ্বাস নেওয়ার শক্তিটুকু নেই ছোট্ট শরীরটার। শিউলি ধীরে বৃষ্টির পাশে বসে ওর মুখে চামচ দিয়ে একটু দুধ দেয়। মুখ বেয়ে দুধটুকু বালিসের উপর গড়িয়ে পরে। শিউলি হু হু করে কেঁদে ওঠে। এক মনে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করে শিউলি। তারেক তাকিয়ে শুধু দেখে আর নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে।
হঠাৎ কেঁদে ওঠে বৃষ্টি। বাবা-মা, তোমরা কোথায়! আমি তোমাদের দেখতে পাচ্ছি না কেন?
তারেক চমকে উঠে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে৷ এই তো আমরা তোমার পাশেই আছি, মা। তারেক ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে।
জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে দেখে ভোরের আলো ফুঁটতে শুরু করেছে। মেঘ সরে গিয়ে সকালের রোদ জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। বৃষ্টিও বন্ধ হয়ে গেছে। এতক্ষণে রাস্তায় এক-দুইটা রিক্সা তো বের হওয়ার কথা ভাবতে থাকে তারেক।
রোদ এসে বৃষ্টির মুখের উপর পরল। আলোতে তাকাতে না পেরে অশ্রুসজল চোখ দুটো বন্ধ করে সে। বৃষ্টির কথার আওয়াজে চিন্তা থেকে বেড়িয়ে আসে তারেক। একটু নীচু হয়ে শোনার চেষ্টা করে বৃষ্টি কি বলছে। ক্ষীণকণ্ঠে আদো আদো করে বৃষ্টি বলে, বাবা— রাজকুমারী কি ওর—কথাটা আর শেষ করতে পারে না বৃষ্টি।
ভোরের পাখির ডাকের মাঝে আর বৃষ্টির ক্ষীণ নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায় না। দূর থেকে রিক্সার "ক্রিং ক্রিং" আওয়াজ শোনা যায়।
তারেক তখনও কান পেতে মেয়ের অস্পষ্ট কথা শোনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সে কি বুঝল কে জানে। তবে বৃষ্টির সাথে সাথে তার পুরো পৃথিবীটাও নিশ্চুপ হয়ে গেল। সেখানে না কোনো পাখির আওয়াজ শোনা গেল, না রিক্সার ক্রিং ক্রিং। পাশে বসে থাকা শিউলির কান্নার আওয়াজটাও মনে হল বড্ড দূরে কোথাও থেকে আসছে।
তারেক মুখ উঠিয়ে ভোরের জ্বলমলে রোদ দেখল। রাজকুমারী যে অবশেষে তার প্রিয় পুতুলটা খুঁজে পেয়েছে তা বুঝতে তারেকের আর দেরী রইল না।