Posts

প্রবন্ধ

কর্তব্যকর্ম, প্রাইওরিটি অর্ডার ও সঠিক জীবন দর্শন

June 24, 2024

রাকিব হাসান

28
View

এক. 

কাঁধে কোন দায়িত্ব নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। মোটামুটিভাবে বলা যায়, মানুষের মধ্যে বোঝার ক্ষমতা আসার সাথে সাথে বিভিন্ন দায়িত্ব তার কাঁধে আসতে থাকে। তবে, সব দায়িত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ না। কিছু দায়িত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ যা তার জীবনের সফলতা বা ব্যর্থতার সাথে সরাসরি জড়িত। আবার যেসব দায়িত্ব অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোকেও একেবারে ফেলে দেয়া যায় না, পালন করতে হয়। একজন মানুষ তার বোঝার বয়সে উপনীত হওয়ার সাথে সাথে তার করণীয় হল তার উপর কি কি দায়িত্ব আছে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং সেসকল কর্তব্যকর্মের একটি প্রাইওরিটি অর্ডার (যে কোন দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটি অপেক্ষাকৃত কম) ঠিক করা। যেমন, আমি একজন শিক্ষক। আমার বেশ কিছু দায়িত্ব আছে। যেমনঃ আমাকে অফিসে যেতে হয়, ক্লাস নিতে হয়, পড়াশোনা করতে হয়, গবেষণায় সময় দিতে হয়, বাসার বাজার করতে হয়, পরিবারে সময় দিতে হয়, বাবা-মায়ের দেখাশুনা করতে হয়, ধর্মীয় কাজে সময় দিতে হয়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হয়, আত্মীয়দের খোঁজ খবর রাখতে হয়, এরকম আরো অনেক কিছু। তবে, এখানে সব দায়িত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়, সব কাজে সমান সময়ও দিতে হয় না। কিন্তু, সব দায়িত্বই পালন করতে হয়। আমি ভেবে চিনতে আমার দায়িত্বের একটা প্রাইওরিটি অর্ডার করলাম; যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটাকে ১ নাম্বারে রেখে, এরপরে দুই, তারপর তিন এভাবে। এতে করে যে অর্ডার বা ক্রমটি আসল তা আপনাদের বোঝার সুবিধার্তে নিচে দিলাম।।

আমার ব্যক্তিগত কর্তব্য কর্মের তালিকা (প্রাইওরিটি অর্ডার অনুযায়ী): 

১। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া 

২। নিয়মিত সময়মত কর্মস্থলে যাওয়া ও কর্মস্থলের প্রাপ্য সময় তাকে দেয়া 

৩। কর্মস্থলের কাজে কোন ফাঁকি না দেয়া 

৪। পড়াশুনা করা (যেহেতু আমি শিক্ষক) 

৫। গবেষণার জন্য সময় দেয়া (যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি) 

৬। মায়ের খোঁজ-খবর রাখা (যেহেতু আমার বাবা মারা গেছেন) 

৭। পরিবারের সদস্যদের সময় দেয়া ও খোঁজ খবর রাখা 

৮। বইপড়া ও লেখালেখির সময় দেয়া 

৯। আত্মীয়, পাড়া প্রতিবেশি, সহকর্মীদের খোঁজ খবর রাখা 

১০। আমলে সালেহিন করা 

দুই.

প্রথমত, আপনার দরকার কর্তব্য কর্মের একটি তালিকা (ঠিক যেমন আমার অনেকগুলো কর্তব্যকর্মের মধ্যে দশটি কর্মের তালিকা আমি উপরে দিয়েছি)। এই তালিকা যদি করা থাকে তাহলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন এবং মনে রাখতে পারবেন আপনার কি কি দায়িত্ব আছে পালন করা ও তা নিয়ে ভাবার জন্য এবং এর ফলে আপনি আপনার কর্তব্যকর্ম সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন থাকতে পারবেন। কোন ব্যক্তিই আসলে একটা মাত্র দায়িত্ব নিয়ে আসে না। কারণ, যে ব্যক্তি একজন শিক্ষার্থী সে আবার একটা পরিবারের সদস্য, আবার তার নিজের প্রতি নিজের কিছু দায়িত্ব থাকে, বন্ধু-বান্ধবের প্রতি যেমন আমাদের কিছু দায়িত্ব থাকে, নিজের ভাই বোনের প্রতিও দায়িত্ব থাকে, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব থাকে।

আর দ্বিতীয়ত, এগুলোর মাঝে কোন কর্তব্যকর্মটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটি একটু কম, তা বোঝার জন্য প্রাইওরিটি অর্ডার (ক্রম) করা প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা বাবা-মা, ভাই বোনের প্রতি দায়িত্ব পালন না করে, কম দরকারি কাজে অনেক বেশি সময় দিচ্ছি। এতে নিজেদের অজান্তেই আমরা দায়িত্ববোধহীন হয়ে যাচ্ছি। আপনি যদি শিক্ষার্থী হন, সম্ভবত প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় ক্লাসের পড়াশুনা করা আপনার ১ নাম্বার দায়িত্ব, কিন্তু, আপনি হয়তো অন্য কাজে সময় দিচ্ছেন। আবার শিক্ষার্থী (বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে) হলেই যে পড়াশোনা ১ নাম্বার দায়িত্ব হবে এমন কোন কথা নেই। মধ্যবিত্ত্ব পরিবারের অনেক ছেলেমেয়ে আছে যাদের টিউশন দিয়ে সংসার চালাতে হয়, বাসার সকল কাজ করতে হয়, বাবা অথবা মা অসুস্থ হলে, বাসার সব কাজ করতে হয়। একমাত্র আপনি বলতে পারবেন, আপনার জন্য কোন কাজটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরপরে কোনটা, তারপরে কোনটা। যেমন, আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম, অন্য অনেকের মত আমার ১ নং দায়িত্ব পড়াশোনা ছিল না, আমার প্রধান কাজ ছিল টিউশন দেয়া যাতে করে আমি আমার পরিবারের সবার পড়াশোনা ও খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি ( যেহেতু আমার বাবা জীবিত ছিলেন না)। আপনার সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আপনার কর্তব্যকর্মের একটা তালিকা ও তাদের একটা প্রাইওরিটি অর্ডার বা ক্রম এখনই তৈরি করে ফেলা উচিত যদি আপনি তা এখনো না করে থাকেন। নিজের দায়িত্বের একটা তালিকা দেখলে অন্তত নিজেকে কোন দায়িত্বহীন মানুষ মনে হবে না। নিশ্চিত জেনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে বিনা কারণে পৃথিবীতে পাঠাননি। আপনার উচিৎ, নিজের দায়িত্বগুলো একবার হলেও নিজের চোখে দেখা। 

তিন. 

আপনি নিজের দায়িত্বের বা কর্তব্যকর্মের তালিকা তৈরি করেছেন, এর অর্থ হল, আপনি একজন দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ। আপনি অবিবেচক নন। আপনি দায়িত্ব পালন করতে চান বলেই, আপনি আপনার দায়িত্বের তালিকা করেছেন। এখন দ্বিতীয় কাজ হল, খুব ভেবে চিনতে দেখেন, তালিকার ১ নম্বরে থাকা কাজটাই আপনার জীবনের প্রধান দায়িত্ব কিনা। এভাবে, প্রাইওরিটি অর্ডার চেক করেন। আমি যেদিন প্রাইওরিটি অর্ডার করেছি, তারপর অনেক ভেবেছি। ভেবে তা রিশাফল করেছি। অনেক দায়িত্ব ১০ নং এরপরে পরে চলে গেছে। অনেক দায়িত্ব আগে-পরে হয়েছে। সবশেষে, এসে যে অর্ডার বা ক্রম পেয়েছি তা আমি উপরে দিয়েছি। 

এবার আসি আসল কথায়, আপনার জীবনে প্রাইওরিটি অর্ডারের ১ নাম্বার যে কাজ, এটা আপনার জন্য একেবারে অনিবার্য। একেবারে ফরজ। এটা আপনাকে করতেই হবে। অন্য যে কোন কাজ মাঝে চলে আসলেও এটা ছাড় দেয়া যাবে না। এই দায়িত্বের জন্য আপনাকে প্রতিদিন নিশ্চিত একটা সময় বরাদ্দ করতে হবে। এই সময় অন্য কোন কিছু করলে চলবে না। আপনি, যে কোন কিছু ছাড় দিয়ে দিবেন, কিন্তু আপনার এক নম্বর যে দায়িত্ব তাতে একচুল পরিমাণ ছাড় দিবেন না। যেমন, আপনি শিক্ষার্থী, আপনার টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা নেই, টিউশন দিতে হয় না, বাজার করতে হয় না, রান্না করতে হয় না, সব বাবা মা করেন। আপনার যদি প্রাইওরিটি লিস্টের এক নাম্বারে থাকে ভালভাবে প্রতিদিন ৪/৬/৮ ঘন্টা পড়াশোনা করা, এটা আপনাকে করতেই হবে। আর, আপনার প্রাইওরিটি লিস্টের এক নম্বরে আছে, বাবা, অথবা মাকে সাহায্য করা, তাহলে এই দায়িত্বে কোন ছাড় দেয়া যাবে না। 

চার. 

আপনার তালিকায় থাকা কর্মগুলো বা তাদের ক্রম ঠিক আছে কিনা তা বোঝা বেশ দুরুহ। সেটা বোঝার জন্য জীবন দর্শন (Philosophy of Life?) সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকা লাগবে। এ ক্ষেত্রে আপনাকে বিবেক সাহায্য করবে, কিন্তু, সেটা ভ্রান্তও হতে পারে। যেমন, আপনি একাদশ শ্রেণিতে পড়েন, আপনার মনে হলে, প্রেম করা বা রাজনীতি করাই আপনার প্রধান দায়িত্ব এবং সেটাকে লিস্টের এক নম্বরে দিয়ে আপনি জানপ্রাণ দিয়ে প্রেম করা শুরু করলেন, বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি শুরু করলেন, এটা কি ঠিক লিস্ট ছিল? প্রাইওরিটি লিস্ট ঠিক করার ক্ষেত্রে অথবা ঠিক করার পর, আপনাকে কারো সাহায্য নিতে হবে। কার সাহায্য নিবেন?

(০১) আপনি যদি আমেরিকান কারো সাহায্য নেন, তাহলে সে বলবে, প্রেম করা ভাল, এটা ১নং এ রাখতে পারো; আপনি যদি কোন ধর্মপ্রাণ মুসলিম, ভাইয়ের সাহায্য নেন, সে বলবে, প্রেম করা হারাম, এটা বাদ দাও।

(০২) আপনি যদি ছাত্রলীগের কারো সাহায্য নেন, সে বলবে, ছাত্রদল খারাপ; আপনি যদি ছাত্রদলের সাহায্য নেন, সে বলবে, ছাত্রলীগ খারাপ। 

(০৩) আপনি যদি আস্তিকের সাহায্য নেন, সে বলবে, বিশ্বাসই সব, যুক্তি দিয়ে সব চলে না। আপনি যদি নাস্তিকের সাহায্য নেন, সে বলেব, বিজ্ঞান বা যুক্তিই সব, অন্ধ বিশ্বাসের কোন মূল্য নেই। 

অর্থাৎ, প্রাইওরিটি লিস্ট করার ক্ষেত্রে আপনি কোন ব্যক্তিকে যদি পরামর্শদাতা হিসেবে বাছাই করেন সেক্ষেত্রে সমূহ সম্ভাবনা থাকবে সে ব্যক্তি তাঁর নিজের বিশ্বাস আপনার কাঁধে চাপিয়ে দিবে। তবে, আপনি যদি এমন একজন ব্যক্তিকে বের করতে পারেন যার কোন দেশ নেই, ধর্ম নেই, রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই, যে কোন প্রতিবেশের মধ্যেই নেই, যে “চূড়ান্ত ও পরম” নিরপেক্ষ একজন ব্যক্তি, সে হয়তো আপনাকে এই তালিকা তৈরির ব্যাপারে পরামর্শ দিতে পারে এবং আপনি তা গ্রহণ করতে পারেন। বাস্তবে, এই ধরণের “আদর্শ মানব” আপনি কোথাও পাবেন না। সুতরাং আপনি যার পরামর্শ নিয়েই প্রাইওরিটি লিস্ট করুন না কেন, একদল তাতে সম্মতি জানালে, নিশ্চিতভাবেই আরেক দিন এটাকে ভুল বলবে। 

পাঁচ. 

তাহলে করণীয় কি?

প্রথম করণীয় হল আপনাকে এমন কিছু প্রশ্ন নিজেকে করতে হবে যা আপনার ও আপনার পূর্ব পুরুষদের বিরুদ্ধে যায়। 

আর দ্বিতীয় করণীয় হল, সে সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা। 

বিষয় দুটি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজনঃ 

প্রথম প্রশ্ন হল, আমি কি সঠিক জীবন দর্শনের উপর আছি? নাকি ভুল জীবন দর্শনের মধ্যে আছি? আমার পূর্ব পুরুষরা আমাকে যে ধর্ম, যে বিশ্বাস, যে আচার-প্রথা, যে সংস্কৃতি, যে কর্ম পদ্ধতি দিয়ে গেছে, তা কি সঠিক না কি আমাকে অন্য ধর্মসমূহ, অন্য বিশ্বাসসমূহ, অন্য আচার-প্রথাসমূহ, অন্য সংস্কৃতিসমূহ ও অন্য কর্ম পদ্ধতি সমূহ যাচাই করে দেখতে হবে? আপনার বিবেক আপনাকে যা বলবে তা হল যুক্তির কথা। আপনাকে বলবে, তুমি সব যাচাই বাছাই কর, তারপর সিদ্ধান্ত নাও কোনটা সঠিক। এখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে, আপনার বর্তমান জীবন দর্শন। সে বলবে, না আমিই সঠিক। আর কিছু যাচাই বাছাই করার দরকার নেই। কিন্তু, আপনি যখন এর বিরুদ্ধে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন, আমি যাচাই করবো, তারপর গ্রহণ করবো, তাহলে আপনি সঠিক জীবন দর্শন অবশ্যই খুঁজে পাবেন। 

আর দ্বিতীয় যে করণীয়, অর্থাৎ আপনার যাচাই বাছাইয়ের জন্য উত্তর খুঁজে বের করা, সে কাজে আপনাকে সাহায্য করবে বই। এ বিষয়ে আমি “বই পড়া কেন দরকার?” প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছি, তাই পুনরাবৃত্তি করলাম না। 

ছয়. 

জগতের এক মহাবিস্ময়, পৃথিবীবাসীর জন্য একমাত্র নিরপেক্ষ ও নির্ভুল বই- আল কোরআন। পৃথিবীর একমাত্র বই যেখানে বারবার বলা হয়েছে, ‘হে মানবজাতি,”। অর্থাৎ এই বই শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, পুরো মানবজাতির জন্য। কোরআন যে ঐশ্বরিক গ্রন্থ এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করে লেখা দীর্ঘকায় করার নিস্প্রয়োজন। কুরআন হল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নির্দেশনা, মানবজাতি কিভাবে চললে মৃত্যুর আগে ও পরে সফলতা লাভ করবে সে নির্দেশনা কুরআনে দেয়া আছে। কুরআন শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, সকল মানুষের হেদায়াতের জন্য। কুরআন ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি ঐশ্বরিক গ্রন্থ মানুষের কাছে রয়েছে। এর মধ্যে তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল প্রসিদ্ধ। তবে, সেগুলো বিকৃত হয়েছে। তারচেয়ে বড় কথা, কুরআন হল সর্বশেষ ঐশ্বরিক গ্রন্থ যা আগের সব ঐশ্বরিক গ্রন্থকে সত্যায়ন করে এবং কুরআন এমনভাবে মানুষের অন্তরে হেফাজতের ব্যবস্থা করা হয়েছে যার ফলে কুরআন বিকৃত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। কুরআন ঐশ্বিরিক গ্রন্থ-এটা বোঝার জন্য একজন মানুষ বিবেক এবং মুক্ত ও নিরপেক্ষ মনই যথেষ্ট। যদি আল্লাহ নিজে মানুষের স্মরণের মধ্যে কুরআন হেফাজতের ব্যবস্থা না করতেন তাহলে এতো বড় একটি গ্রন্থ মানুষ কখনোই মুখস্থ করে নিতে পারতো না। পৃথিবীতে একমাত্র কুরআন ছাড়া আর কোন ধর্মগ্রন্থ নেই যা মানুষ মুখস্থ রাখতে পেরেছে। তাই, বিশ্বাস করার জন্য আসলে মনকে খুলে দেয়াই যথেষ্ট। আর কিছু দরকার নেই। আমি সঠিক জীবন দর্শন পাওয়ার জন্য অসংখ্য বই পড়েছি। প্রত্যেকটি বই থেকে রেফারেন্স নিয়ে আরেকটি বইয়ে গিয়েছি। সেখান থেকে আরেকটি। এভাবে আমার বয়স যখন ৩৬ বছর, আমি কুরআনে পৌছেছি এবং এই গ্রন্থে এসে একটি নিরপক্ষে জীবন দর্শন পেয়েছি যা কোন নির্দিষ্ট জাতির জন্য নয়, নির্দিষ্ট ধর্মের জন্য নয়, নির্দিষ্ট সংস্কৃতির জন্য নয়, বরং পুরো মানবজাতির জন্য এবং আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী সকল মানুষের জন্য।

আমার নিজের প্রাইওরিটি লিস্ট ঠিক করার ক্ষেত্রে, আমার বিবেকে সায় দিয়েছে, আমার যুক্তি, আমার বিশ্বাস সায় দিয়েছে, এই গ্রন্থের পরামর্শ গ্রহণ করতে। আমি শতভাগ বিশ্বাস নিয়ে কুরআনের জীবন দর্শনকে নিজের জীবন দর্শন হিসেবে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছি।  

সাত. 

আপনি মুসলিম তাই এরকম বলছেন, আপনি হিন্দু বা খ্রিস্টান হলে অন্য কথা বলতেন। 

প্রথমত, আমার শরীরের কোথাও এমন কোন চিহ্ন নেই যা আমার মুসলিম হওয়াকে সত্যায়ন করে, আমি যৌক্তিকভাবেই দেখেছি এই মহাবিশ্বের একজন পরিকল্পনাকারী থাকাটা যৌক্তিক, না থাকাটাই অযৈক্তিক। আমিও তারই সৃষ্টি এবং আমি তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি এবং তাঁর ইচ্ছার কাছে আমার ইচ্ছাকে সঁপে দিয়েছি। এ ধরনের ব্যক্তিকে যেহেতু মুসলিম বলা হয় তাই আমি মুসলিম। আপনি যুক্তি দিয়েই হিন্দু বা খিস্টান বা অন্য ধর্মে জন্মগ্রহণ করেও একজন মুসলিম হতে পারেন। সেখানে কোন বাঁধা নেই। 

দ্বিতীয়ত, আল কুরআনের মত এতোবড় মোজেজা বা বিস্ময় আমার সামনে থাকা সত্ত্বেও আমি কোন যুক্তিতে বলতে পারি এটা মানুষের লেখা, ঐশ্বরিক গ্রন্থ নয়। মানুষের লেখা আর একটা গ্রন্থ কি আনা যায় যা শতভাগ নির্ভুল ও যা লেখার দেড় হাজার বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও কোন রকম বিকৃত হয়নি। আপনি যদি একজন সৃষ্টি কর্তায় বিশ্বাস করেন, আপনি যদি তাঁর বিশাল সৃষ্টির মধ্যে নিজেকে ক্ষীণ এক সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেন, আর মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর প্রেরিত শেষ নবী ও রাসূল হিসেবে মেনে নেন, তাহলে আপনি আমার চেয়েও ভাল একজন মুসলিম হয়ে যেতে পারেন। 

শেষ কথা 

নিজের বিবেক, বুদ্ধি, যুক্তি, জ্ঞান সব প্রয়োগ করে সঠিক জীবন দর্শন ঠিক করুন, সে জীবন দর্শন অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করার জন্য একটি কর্মপদ্ধতির তালিকা করুন, সে তালিকাকে প্রাইওরিটি অনুযায়ী সাজিয়ে নিন। সে অনুযায়ী সময় বন্টন করুন। আপনি ইহকাল ও পরকালে সফলদের কাতারে থাকবেন, ইনশাহ আল্লাহ।

Comments

    Please login to post comment. Login