Posts

গল্প

অপার্থিব

June 25, 2024

রাকিব হাসান

22
View

চিলেকোঠায় দুটো কক্ষ ছাড়াও ছাদের যে বাড়তি অংশটাতে শিহাবের এতোদিন নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল তাহাতে এই চারজোড়া মুরগ-মুরগী অনধিকার প্রবেশ করিয়া যেন বেদখল কইয়া নিতে উদ্ধত হইল। তাহারা পুরো ছাদটিতে এমনভাবে বিষ্ঠা সাজাইয়া রাখিল যে একটু অসাবধানতা বশত পা ফেলিলেই তাহারা পায়ের অথবা পায়ে জুতা থাকিলে তাহার পৃষ্ঠদেশ আঁকড়াইয়া ধরিতে বিলম্ব করে না। অথবা, প্রাতের বেলায়, জ্যোষ্ঠ মুরগটা কর্কশ কন্ঠে যখন ডাকিয়া শিহাবের অতি আনন্দের ঘুম প্রত্যহ ভাঙ্গাইতে লাগিল, শিহাব তখন বিরক্ত হইয়া উঠিল। তথাপি, ভাড়াটিয়ার চাইতে বাড়িওয়ালার সিদ্ধান্ত বাড়ির যে কোন ব্যাপারে একপাক্ষিক ও একনায়কতান্ত্রিক গোছের হওয়ায়, শিহাব তাহার দ্বিতীয় বালিশটাকে দুই পায়ের মাঝখান থেকে আনিয়া কানের উপর চাঁপা দিয়া রাখা ছাড়া আর কিছুই করিতে পারিল না।

এই ছাদের দখল লইয়া শিহাব অনেক কিছু ভাবিয়াছিল- ইহার বাকি অংশে ফ্ল্যাট বাসা করিয়া কোন বিদখুটে ভাড়াটিয়াকে ভাঁড়া দিয়া দেওয়া হইতে পারে, ইহাতে কোচিং সেন্টার খোলা হইতে পারে, ইহাতে বাগান করিয়া ফেলিতে পারে, অথবা এইখানে দোলনা বানাইয়া বাড়িওয়ালার ছোট কন্যাটিকে সকালে বিকেলে দোল খাইতে পাঠাইতে পারে, ইত্যাদি। সেইহেতু, যখন বাড়িওয়ালার ছেলে হাতে করিয়া চার জোড়া মুরগী লইয়া সেইদিন বিকালে ছাদে আসিয়া উপস্থিত হইল, তাহা দেখিয়া শিহাব সর্বোচ্চ যাহা ঠাওর করিল তাহা হইল, নিশ্চয় বাড়িওয়ালার বড় কন্যাটি তাহার জামাই সহযোগে বিলাত হইতে এইখানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে, এবং তাহাদের আদর আপ্যায়নের জন্যে এই মুরগ -মুরগী সমূহ উৎস্বর্গ করার ব্যবস্থা করা হইতেছে। ইহা মনে হওয়ার যুক্তি সম্মত কারণ শিহাবের হাতে রহিয়াছে। গতবার শীতে যখন তাহারা আসিয়াছিল তখন শিহাব নিজের হাতে এই ছাদের উত্তর কোণে চারটি জলজ্যান্ত তরতাজা মুরগী যবেহ করিয়া দিয়াছিল। এবার মুরগীর সংখ্যা অধিক দেখিয়া ভাবিল- এবার বোধ হয় তাহাদের সহিত অতিথি আসিয়াছে, এবং আটটি মুরগী যবেহ করিতে হইবে ভাবিয়া কষ্ট যে ডাবল হইয়া গেল তাহাও বুঝিয়া লইলো এবং ঈদৃশ বোধগম্যতায় শিহাব যথেষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করিতে উদ্ধত হইল। কিন্তু, বাড়িওয়ালার ছেলে তাহাকে নিশ্চিত কষ্টের হাত হইতে বাঁচাইয়া দিবার প্রয়াসে তাহাকে বলিল, ‘ শিহাব ভাই, এবার যবাই করা লাগবে না, দেখে রাখতে হবে’। এহেন কথার মর্ম বুঝিতে না পারিয়া শিহাব বলিল, ‘দেখে রাখতে হবে মানে? জবাই করবা না?” পরবর্তি পাঁচ মিনিটে যে কথাবার্তা তাহাদের মধ্যে হইলো, ইহার সারমর্ম এই যে, এই মুরগীসমূহ পালন করিবার উদ্যেশ্যে কেনা হইয়াছে, এবং এই ছাদের মধ্যে মুরগীর বড় খাঁচা বানাইয়া ইহাদের থাকিবার ব্যবস্থা করা হইবে।

ইহাতে শিহাব তাৎক্ষণিকভাবে নিরাবেগ থাকিলেও সাঁঝের পরে যখন নিজ কক্ষে একাকি বসিয়া বিভিন্ন বিষয়ে নিস্ফলা চিন্তা করতেছিল, সেই সময়ে কোন এক সুযোগে মুরগী প্রতিপালনের এই বিষয়টিও তাহার মাথায় আসিল, এবং প্রথমেই বিষ্ঠার যে স্বকীয় একটি উৎকট গন্ধ রহিয়াছে তাহা যেন অতি অল্প অল্প করিয়া তাহার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করিতে আরম্ভ করিল। ইহাতে তাহার কপালের মাঝখান বরাবার একটু ভাজ পড়িল এবং সময়ের সহিত বিস্তৃতরূপ ধারন করিল এবং তাহা দেখিয়া যে কোন সাইকিয়াট্রিক বলিতে পারিতেন, সে বিরক্ত এবং যুগপৎ চিন্তিত হইয়া পড়িয়াছে। ইহার পর হইতে, এই সূক্ষ চিন্তা তাহার মগজের একটি বড় অংশ এবং পর্যায়করমে আরো পরের তাহাতে থাকা অনুভূতি নিয়ন্ত্রক সূক্ষ স্নায়ূতন্ত্রের প্রায় অদৃশ্য তন্তুসমূহ দখল করিবার অব্যর্থ চেষ্টা করিয়া শিহাবকে উত্যক্ত করিতে লাগিলো। রাত্রি যতই গভীর হইতে লাগিলো, মুরগীর বিষ্ঠা ও তাহার সুগন্ধ জাতীয় চিন্তা ভাবনা তাহাকে ততই কাহিল করিয়া ফেলিল। এই মূহুর্তে কী করণীয় তাহা সে ভাবিল। সে ভাবিল, না, এক্ষুনি তিন তলায় নামিয়া বাড়িওয়ালাকে ডাকিয়া প্রতিবাদ করিবে, ইহা অন্যায়, যাহাতে ভাড়াটিয়া উত্যক্ত হয় তাহা করা যাইবে না, ভাড়াটিয়া হইলেও এইখানে সে ভাঁড়া দিয়া থাকিতেছে এবং সময়মত প্রতি মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে ভাঁড়া পরিশোধ করিতেছে। পরক্ষনেই ভাবিল, যদি বাড়িওয়ালা তাহার মুখের উপর বলিয়া দেয়, ‘শিহাব সাহেব, আপনার সমস্যা হলে আপনি বাসা ছেড়ে দিতে পারেন’। তখনও নির্লজ্জের মত এইখানেই তাহাকে থাকিতে হইবে এই কথা সে ভালো করিয়াই জানে এবং ভবিষ্যতে এই বিষয়ে আর কোন সমস্যা বাড়িওয়ালাকে বলা যাইবে না। তাই, শিহাব দ্য পাওয়ার অব পজিটিভ থিংকিং” বইয়ের কথা স্মরণ করিল, এবং আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া নিজেকে বুঝাইল, ইহা অতি ছোট সমস্যা, মুরগ মুরগের মত থাকিবে, শিহাব তাহার নিজের মত থাকিবে। সে আরো বলিল, ‘আমরা দুই প্রজাতির প্রাণী। ইহার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই’। অথবা, তাহার মাধ্যমিকে পড়া সেই ভাব-সম্প্রসারণ বাক্য মনে পড়িল, জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। সুতরাং, মুরগ-মুরগীকে অবহেলা করা বা তাদের উপর বিরক্ত হওয়ার কোন মানে হয় না। সে আয়নার আরো কাছে যাইয়া আরো ইতিবাচক ভাবে নিজেকেই যেন বলিল, এক সাথে থাকিলেও বা কি সমস্যা? বিকেল বেলাটা তাহার অলস কাটিয়া যায়- এইক্ষণ হইতে যে কোন একটা কাজ নিয়া সময় কাটাইবে। মুরগীদের খাবার দিবে, ‘আয় আয়’ বলিয়া কাছে ডাকিবে, তাহারা ছুটিয়া আসিবে, ছোট ছোট দানা শিহাবের হাত হইতে মুরগীদের সামনে ছিটিয়া পড়িলে তাহা যে ঈশ্বরের সন্তুষ্টিরই কারণ হইবে। এই সমস্ত আধ্যাত্মিক এবং ইতিবাচক চিন্তা শেষ করিয়া যখন বিছানায় গিয়া শুইলো, তখন সেই বিষ্ঠার কথা আবারো তাহার মাথায় প্রবেশ করিয়া সকল ইতিবাচক চিন্তাকে কালো কাফন পরাইয়া কবর দিয়া দিল, সে অনতিউচ্চবাক্যে চিৎকার করিয়া উঠিল, ‘শালা, শালা অমানুষের বাচ্চা, বাড়ির ছাদের উপর তোকে কিসের জন্য মুরগী পালন করা লাগবে?, তোর কি টাকার অভাব পড়ছে? তোর, শালা, দশ বিভাগে দশটা বাড়ি, ঢাকায় এতোগুলা ফ্ল্যাট, তোকে কিসের জন্য ছাদের উপর মুরগী পালন করতে হবে?’ ইহা ভাবিতে ভাবিতে সে বিছানা ছাড়িয়ে উঠিয়া পড়িল, তারপর, চিলেকোঠার দরজা খুলিয়া ছাদে চলিয়া গেল। কিন্তু, গমন পথে তাহার জুতার পৃষ্ঠদেশে যে মুরগীর বিষ্ঠা লাগিয়া গিয়াছে তাহা বুঝিতে পারিয়া তাহার মেজাজ পুরোপুরি নষ্ট হইয়া গেল। কিন্তু, এইবার, পূর্বেকার মত আওয়াজ তুলিয়া বাড়িওয়ালাকে গালি দিতে পারিল না, কারণ তাহাতে যে কেউ এই গালি শুনিয়া বাড়িওয়ালার কানে দয়া করিয়া পৌছাইয়া দিলে বাড়িওয়ালা এক্ষনি এই ছাদে উঠিয়া আসিতে পারে এবং তাহাকে শাসাইয়া যাইতে পারে, এমনকি বাড়ি ছাড়িয়া দিতে নির্দেশ দিতে পারে। এই সকল ভাবিয়া, সেইদিন শিহাব, তাহার বাটা জুতার পৃষ্ঠে লাগিয়া থাকা বিষ্ঠা দেয়ালে মুছিয়া ফেলিল এবং বিরক্ত হইয়া কক্ষে ফিরিল।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সেদিন -সারারাত্র শিহাব এই উৎকট সমস্যার কথা ভাবিয়া দুচোখের পাতা এক করিতে পারে নাই, এবং ফজরে যখন আজান হইলো তখন সব মানিয়া লইতে হইবে এই রকম সিদ্ধান্তে আসিতে আসিতে কখন যেন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। সেদিন ঘুম ভাঙিতে তাহার দেরী হইয়াছিল এবং দেরী করিয়া অফিসে যাইয়া বসের ঝাড়ি খাইয়াছিল। এই ঘটনার ফলাফল স্বরুপ, বিকেল বেলা বাসায় ফিরিয়া যখন দেখিলো বাড়িওয়ালা স্বয়ং দাঁড়াইয়া থাকিয়া একজন চুক্তি ভিত্তিক মজুরেকে দিয়া মুরগের জন্য বেশ বড় আকৃতির একটি খাঁচার মত একটি ঘর বানাইতেছে, তখন সে আরো বেশি হতাশ হইয়া গেল। বাড়িওয়ালা তাহাকে দেখিয়া হাসিল এবং নিকটে আসিয়া বলিল, শিহাব সাহেব, আপনার দায়িত্ব কিন্তু বেড়ে গেল, এই মোরগ-মুরগীগুলা একটু দেখে রাখতে হবে।অনতিবিলম্বে তাহাকে ইহাও স্মরণ করাইয়া দিল যে, মুরগীর বিষ্ঠা ছাদের দেয়ালে মোছা যাইবে না, ইহাতে দেয়াল নোংরা হইয়া যায়, এই ব্যাপারে সতর্ক থাকিতে হইবে। শিহাব ভেতরে ভেতরে জ্বলিতে লাগিল, মুখে অস্ফুট হাসি হাসিয়া বলিল, তাহা তো বটেই! তাহাতো বটেই! এই বলিয়া ‘আমি অত্যন্ত ক্লান্ত’ এই ধরণের একটি রিয়াকশন দিয়া সেইখান হইতে প্রস্থান করিয়া অতি সত্ত্বর নিজের কক্ষে চলিয়া আসিল।

পরের দিনে অফিস হইতে আসিয়া ফ্রেশ হইয়া ছাদের দিকে গিয়া দেখিল ছোট ছোট মুরগ মুরগী সমহূকে সেই খাঁচাঘরের মধ্যে বন্দী করিয়া রাখা হইয়াছে। ইহা দেখিয়া শিহাবের মনে এবং মুখে এক ধরণের স্বস্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটিল। সে ছাদের পূর্ব প্রান্তে রাখা টুলটিতে বসিয়া ভাবিল, ইহাদের এইভাবে আটকাইয়া রাখিলে আর কোন সমস্যা নাই। ছাড়িয়া দিলে সমস্যা, ইহারা ছাদ ময়লা করিবে, বিষ্ঠা ছড়াইবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। ভাবিতে ভাবিতে, শিহাব এই ছোট ছোট মুরগ মুরগীদের কান্ড কারাখানা পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিলো। দেখিলো, ইহারা এই অতি অল্প বয়সেই অতিশয় দুরন্ত হইয়া গিয়াছে। ইহারা খাঁচাঘরের ভেতরে থাকিয়াই একটি আরেকটিকে ঠোকর দিয়া দিতেছে, দৌড়াইতেছে, ঝগড়া করিয়া মারিতে উদ্যত হইতেছে, আবার একটু বড় আকৃতির মুরগটি কোন মুরগীর উপরে উঠিয়া তাহাকে বশ করিবার চেষ্টা করিতেছে। বিকাল গড়াইয়া সন্ধ্যা হইবার আগেই বাড়িওয়ালার অকর্মা ছেলেটি ছাদে চলিয়া আসিল। কথায় কথায় বলিল, ইহাদের দশ পনের দিন খাঁচায় রাখিতে হইবে, নয়তো উড়িয়া চলিয়া যাইতে পারে। এই খানে থাকিয়া যখন বাকি দুনিয়ার সব ভুলিয়া যাইবে, এবং অভ্যস্ত হইয়া পড়িবে তখন খাঁচাঘর হইতে মুক্ত করিয়া দেয়া হইবে। ইহা শুনিয়া শিহাব নতুন কিছু শিখিল এবং ভাবিল যাহাই হোক, আর দশটা দিনতো শান্তিতে থাকা যাইবে। সুতরাং আপাতত চিন্তা করিবার কোন আবশ্যকতা নাই।

কিন্তু, শিহাব ইহা ভাবিলেও, তাহার মন শান্ত হইলো না। তাহার মন সেই বিষ্ঠা ও তদসম্বন্ধীয় গন্ধের মধ্যে নিবদ্ধ হইয়া রইল এবং মনে মনে জ্বলিতে লাগিলো। এবং এই বাসা ছাড়িয়া অন্যত্র চলিয়া যাইতে হইবে ইহাও ভাবিল। কিন্তু, ভাবিলেও প্রতিবেশ ও পরিস্থিতি কোন কিছুই তাহাকে সমর্থন দিলো না। প্রথমত, সে ছোটখাটো একটা চাকরি করিতেছে ইহা সত্য, কিন্তু সে যে ব্যাচেলর রহিয়া গিয়াছে। সুতরাং তাহার পক্ষেই চাহিবামাত্রই একটি বাসা পাওয়া এতো সহজ নয়- ইহা সে গত তিন বছর এই মফস্বলে থাকিয়া বেশ ভালো করিয়া বুঝিয়াছে। দ্বিতীয়ত, এরকম নিরিবীলি চিলেকোঠা রামাদিয়া শহরে আর পাওয়া যাইবে না। এই পুরো ছাদটা জুড়িয়া দীর্ঘ তিন বৎসর যাবত সে একাই বসবাস করিতেছে। আর সে ব্যাচেলর বলিয়া নিচের চারটি তলা হইতে কেউ সচরাচর ছাদে চলিয়া আসে না। শিহাব একাকি থাকা পছন্দ করে। তাই, ইহা তার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা। তৃতীয়ত, চিলেকোঠা হওয়ায় ইহার ভাঁড়া এই বিল্ডিং এরই অন্য সকল ফ্ল্যাটের অর্ধেক। সুতরাং, এই ভাড়ায় অন্যত্র এই রকম বাসা পাওয়া যাইবে না ইহা চন্দ্র সূর্যের মতই ধ্রুব। আর সবচেয়ে বড় কথা হইলো, যে খোলা মেলা নির্ঝঞ্ঝাট জায়গাটা এইখানে রহিয়াছে। তাহা বেশ স্বাস্থপ্রদ ও শান্তিদায়ক বলিয়াই সে বিশ্বাস করিয়াছে। সুতরাং, এই বাসা ছাড়িয়া দিবো বলিলেই ছাড়িয়া দিবে – বিষয়টা এতো সরলরৈখিক না। অনেকগুলো চিন্তা ভাবনা অতিবেগুনী রশ্মির মত আসিয়া একটি বিষমবাহু ত্রিভুজের মত করিয়া ফেলিল যেন আর ইহার সমাধান তাহার ক্ষেত্রফল বের করার মতই কঠিন তাহা সে ইতোমধ্যেই বুঝিয়া ফেলিয়াছে। তাই, চুপ করিয়া সব মানিয়া লইয়া মুরগী প্রজাতির সাথে মিলিয়া মিশিয়া বাস করিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছে।

যেদিন এই সিদ্ধান্ত লইয়াছে, সেদিন রাত্রিতেও তাহার মন উসখুস করিয়াছে, তাহা যতটা না এই মোরগ-মুরগীর জন্য তাহার চাইতে অধিক এই বাড়িওয়ালার জন্য এবং তাহার ‘কমন সেন্স’ এর অনুপস্থিতির কথা ভাবিয়া। হইতে পারে, এইসব মোরগ-মুরগী অবলা, ইহারা কোন ক্ষতি করিতে পারে না, তাই বলিয়া ইহাদের আরেকজনের বাসার সামনে আনিয়া পোষিতে হইবে – ইহা কেমন কথা? আমার বাসার সামনে এই সব চলিবে না। আমি মাগনা এইখানে থাকি না। তবে, শিহাবের নিরবতা যতটা গর্জাইয়া উঠে সরবতা ততটাই নীরব হইয়া যায়। তাই, ইহা চিৎকার চেঁচামেচি করিয়া ভাবিলেও বাড়িওয়ালার সামনে বলিবার সাহস পায় নাই এবং মনের ক্রোধ মনে রাখিয়া তাহাকে গালিগালাজ করাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করিল।

পরের দিন সকাল বেলায় ছেলে মুরগের কর্কশ কন্ঠে “কুক্কুরুত’ এই জাতীয় একটি অর্থহীন শব্দের বারংবার উল্লসিত ডাকে ঘুম ভাঙ্গিল। চোখ খুলিয়াই ভাবিল, যাহা হোক, ঢাকার মত কাকের ডাক শুনিয়া তো উঠিতে হয় নাই। সাধারণত, এতো সকালে কখনো সে ঘুম হইতে জাগিয়া ওঠে না, তবে, আজিকা উঠিয়া যখন বাহিরে গেল, বাহিরের সৌন্দর্য দেখিয়া সে অতিব মুগ্ধ না হইয়া পারিল না। পাঁচতলা বিল্ডিং এর ছাদে দাঁড়াইয়া পুরো শহরের সৌন্দর্য দেখিয়া সে ভাবিল, সকালে ঘুম থেকে উঠিবার প্রয়োজন আছে বটে। এবং ইহার ভাবিবার পরে, তাহার মোরগ-মুরগী সমূহের কথা মনে হইল, দেখা গেল, ইহারা খাঁচাঘরের ভেতর হইতে বাহির হওয়ার জন্য জালের বেড়ার নিকটে আসিয়া অস্থির হইয়া বাহিরে তাকাইতেছে। কিন্তু, ইহাদের বাড়িওয়ালার অনুমতি ব্যতীত বাহিরে বের হইতে দেয়া চলিবে না। এবং আরো ভয় হইতেছে ইহারা এক তলা -পাঁচ তলা বুঝে না সেটাই স্বাভাবিক, দেখা গেল এখানে ছাদের রেলিং এর উপর উঠিয়া বাহিরে যাইবার জন্য লাফ দিয়া দিল। শিহাব যতটুকু জানে, মোরগ-বা মুরগী উড়িতে পারে না, হয়তো অল্প পারে, কিন্তু, এই পাঁচ তলা থেকে লাফ দিয়া দিলে, দক্ষিণ পাশে হয়তো পুকুরে পড়িয়া নাকানি চুবানি খাইবে অথবা পূর্বে লাফ দিলে রাস্তার কোন চলন্ত গাড়ির উপরে বা নিচেও পড়িয়া যাইবে। সুতরাং, তাহারা যেভাবে আছে সেভাবে থাকিলেই তাহাদের জন্য মঙ্গল। তবে, ইহাদেরকে কিছু খাবার ছিটাইয়া দেয়া যাইতে পারে। কিন্তু, আশেপাশে কোন খাবার না দেখিয়া ভাবিল নিজের বাসা হইতে অল্প চাল আনিয়া ইহাদেরকে দেয়া যাইতে পারে। এবং তৎক্ষণাৎ, যে চিন্তা সে কাজ নীতিতে বাসার ভেতর হইতে এক মুঠো চাল আনিয়া খাচাঘরের জালের ছিদ্র দিয়া ভেতরে ছিটাইতে লাগিল। ইত্যবসরে, বাড়িওয়ালাও তাহার ছেলে নামাজ শেষ করিয়া ছাদে উঠিয়া দেখিল, শিহাব তাহার স্বহস্থে মোরগ মুরগীগুলোকে যত্ন করিয়া খাবার দিতেছে। ইহা দেখিয়া সে বিশেষ প্রীত হইল এবং খুশি হইয়া বলিল, বাহ! শিহাব সাহবে, আজিকে বেশ সকালে ঘুম হইতে উঠিয়াছেন’। শিহাব হ্যা সূচক জবাব দিল আর মুরগীগুলো খাবার ছাদে রাখিয়া গেলে সে নিজে মাঝে মধ্যে তাহাদের খাবার দিতে পারিবে বলিয়া মত ব্যক্ত করিল। বাড়িওয়ালা সন্তুষ্ট হইয়া বলিল, সে তো চমৎকার কথা এবং সে তাহার অকর্মা ছেলেটিকে নির্দেশ দিল যেন খাবারের পাত্রটি ছাদের উপরে রাখিয়া দেয়।

শিহাবের দুসম্পর্কের এক খালা মারা যাওয়ায় তাহাকে তিন চার দিনের জন্য নিজের গ্রামের বাড়িতে চলিয়া যাইতে হইল। যখন ফিরিয়া আসিল, দেখিল, ছোট ছোট কয়েকটি বাচ্চা মুরগীকে খাঁচাঘর হইতে বাহির করা হইয়াছে। তাহারা দৌড়াইতেছে, লাফাইতেছে, রেলিং এর উপরে উঠিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিতেছে। রেলিং এর উচ্চতা চার ফুটের মত হইবে, ফলে এই অতি অল্প বয়সে এতো উচুতে ওঠা তাহাদের পক্ষে সম্ভব না -ইহা বুঝিবার প্রানী ইহারা না। তাই, সময় সুযোগ পাইলেই ইহারা রেলিং এর উপরে উঠিবার জন্য লাফাইতে লাগিল।

খাঁচাঘরের ভেতরে রাখা মুরগীগুলো একটু বড়। ইহাদের এই মূহুর্তে বের করা যাইবে না বলিয়া বাড়িওয়ালার অকর্মা ছেলে মত প্রদান করিল। তাহাদের আগে পোষ মানাইতে হইবে, এরপর বাহিরে ছাড়িতে হইবে। শিহাব ভাবিলো, ইহা উত্তম। এখন ছাড়িয়া দিলে চলিয়া যাইতে পারে।

ইহার পর আরো সপ্তাহ খানেক কাটিয়া গেল। এই সময়ের মধ্যবর্তী সময়টাতে শিহাব এই অবলা প্রাণীগুলোর চাল চলন লক্ষ্য করিল, তাহাদের মধ্যে প্রথমে যে ঠোকরা ঠুকড়ি ছিল তাহা কমিয়া গিয়াছে বলিয়া তাহার মনে হইল। বড় মুরগী গুলোকে বাহির করা হইল। প্রথমে তাহাদের খাঁচাঘর হইতে বাহির করা হইলেও চিকন সুতা দিয়া এক পা বাধিয়া রাখা হইতো, এখন সে বাধন খুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহারা আর উড়িয়া যাইবার চেষ্টা করিতেছে না, বরং এই ছাদকেই নিজের স্থায়ী ঠিকানা ভাবিয়া নিশ্চিতে বসত করিয়া যাইতেছে।

বিষ্ঠা সম্পৃক্ত যে সমস্যা তাহা সৃষ্টি হইবার আগে ইহার কোন সমাধান আছে ইহা শিহাব ভাবে নাই। কিন্তু, এখন যখন দেখিল, এই অবলা প্রাণি সমূহ সারাদিন বিষ্ঠা বিসর্জন করলেও বিকাল হইতে হইতে তাহা শুকাইয়া যায়, এবং অতি সহজেই ঝাড়ু দিয়া তাহা ছাদের এক কোনে থাকা ফুটো দিয়া নিচে ফেলিয়া দেওয়া যায়, তখন দেখিল ছাদ পরিষ্কার রাখাটা কোন কঠিন কাজ না এবং বাড়িওয়ালার নির্দেশে তাহার একমাত্র অকর্মা ছেলেটি এই কাজটা প্রতিদিন নিষ্ঠার সাথে পালন করিতেছে। ইহা দেখিয়া শিহাব বেশ নিশ্চিন্ত থাকিল এবং সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটির কথা তাহার মনে উদয় হইয়াছিল ইহা আসলে তেমন কোন সমস্যাই না। এবং সমস্যা হইবার আগে সমাধান যতটা কঠিন মনে হয়, সমস্যা হওয়ার পরে আসলে সমাধানের পথটা আপনা আপনি বের হয়ে আসে এবং ততটা কঠিন মনে হয় না।

ইহার পর হইতে, কমবেশি প্রতিদিন, শিহাব সকাল বেলা ঘুম হইতে উঠিতে লাগিলো এবং কখনো ব্রাশ হাতে লইয়া আবার কখনো না লইয়া বের হইয়া মুরগীগুলো দেখিতো। তাহাদের খাঁচাঘর হইতে নিজ দায়িত্বে বের করিয়া দিত, খাবার ছিটাইয়া দিতো। সকালের একটা বড় অংশ সে ইহাদের নিয়া কাটাইতে লাগিল। ইহাদের মধ্যে এখন বেশ মিল মহব্বত পয়দা হইয়াছে বলিয়া তার মনে হইলো। মোরগের দেহটি আগের চেয়ে অনেক বলিষ্ঠ হইয়াছে এবং মাঝে মধ্যে ইহা সুযোগ করিয়া মুরগীর উপর চড়িয়া যাইতে চাহিতেছে, ইহা দেখিয়া শিহাবের মনেও একটি সঙ্গিনীর চিন্তা কয়েকবার উদয় হইয়াছে। সে একা থাকে বলিয়া কোন নারী দেহের উপর চড়িয়া উঠা তাহার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু তাহার মনেও যে এই ভাবনা উদয় হয় না- তাহা বলিলে মিথ্যা বলিতে হইবে। এই মুরগ-মরগীর খেলা দেখিয়া তাহারো মনে এই ধরণের খেলা খেলিবার সাধ হইল। আর ভাবিলো, যদি একখানা সঙ্গিনী থাকিত, তাহা হইলে তাহারাও অবসরে এইভাবে খেলিয়া বেড়াইতে পারিত। কিন্তু, পরক্ষণেই ভাবিল, আমি ইহা কি ভাবিতেছি। কিসের সাথে কি তুলনা দিতেছি। মোরগ তো মোরগই। আমরা দুই প্রজাতির প্রাণি, ইহার সাথে আমাদের মিল খুঁজিলে চলিবে কেন?

কিন্তু, যতই মিল না খুজুক, যখন মুরগী ডিম পারিল, এবং ইহার ভবিষ্যৎ যে তাহা ফুটিয়া বাচ্চা হইতে পারে- তাহা ভাবিয়া শিহাব বিমর্ষ হইয়া গেল। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিজের অজান্তে তাহার মধ্যে বের হইয়া আসিল, ‘আহারে! যদি বিয়ে করিয়া ফেলিতাম এতোদিনে বাচ্চা হইয়া যাইতো’। কিন্তু, মানব সমাজে বিয়ে , মুরগীর মত না, ইহা বুঝিতে হইবে, এইখানে বিয়ে করতে হলে, চাল লাগে, চুলা লাগে, আর আজকাল আরো অনেক কিছু লাগে, মুরগীর মত সব তো আর ফ্রি পাওয়া যায় না। এইসব ভাবিয়া যখন হায় হুতাশ করতেছিল এবং নিজেকেই নিজে স্বান্তনা দিয়া যাইতেছিল, একদিন অফিস হইতে আসিয়া দেখিলা ডিম সমূহ এইখানে নাই, কি হইলো কি হইলো ভাবিয়া বিকাল হইয়া গেলো। যখন বাড়িওয়ালার ছেলে সাঁঝের আগে এইখানে আসিল, তখন শুনিতে পাইলো, হঠাত করিয়া তাহার বন্ধু আসিলে তাহাদিগকে মুরগীর ডিম ভাজি করিয়া খাইয়াতে হইয়াছে। ইহা শুনিয়া শিহাব স্তব্ধ হইয়া গেল, এই ডিম হইতে বাচ্চা হইবে, ইহাই তো নিয়ম, এই ভাবে জানোয়ারের মত কয়েকটা প্রাণ কিভাবে মানুষ হইয়া খাইয়া ফেলিল তাহা ভাবিয়া সে কষ্ট পাইতে লাগিল। অকর্মা ছেলেটি বলিল, আপনি তো দোকান হইতে আনিয়া হাঁসের ডিম, মুরগীর ডিম খাইয়া ফেলেন, তখন? এই প্রশ্ন করিবার পর শিহাবের ভাবোদয় হইলো, তাইতো! ইহা সত্য কথা। কিন্তু, আগেই এইভাবে শিহাব কখনো ভাবে না। তাহার পর হইতে, হাঁসের ডিম, মুরগীর ডিম খাওয়া তাহার কাছে মানুষের বাচ্চা নষ্ট করিয়া ফেলার মত জঘন্য মনে হইল, এবং এই সদৃশ্য অনেক সংবাদ খবরের কাগজে যাহা পড়িয়াছে সব তাহার মনে হইতে লাগিল। মনে ভাবিল, মানুষের গর্ভের বাচ্চাকে নষ্ট করিয়া ফেলা পাপ হইলে, ইহাদের বাচ্চা ডিমের ভেতর নষ্ট করিলে পাপ হইবে না কেন? সে হয়তো উত্তর পাইলো, আমরা দুই প্রজাতির, ইহার সাথে আমাদের মিল খুঁজিলে চলিবে কেন?

অতঃপর, একদিন সকালে ইহাদের খাবার দিতে যাইয়া দেখিল, আর দুইটি সুন্দর ডিম খাঁচাঘরের ভেতরে পড়িয়া রহিয়াছে। শিহাব দেরি না করিয়া সেগুলোকে নিজের বাসার ভেতরে নিয়া আসিল এবং যত্ন সহকারে রাখিয়া দিল। সেইদিন বিকেলে অফিস হইয়ে ফিরিয়া আসিবার পূর্বে একবার বড় বাজারের দিকে চলিয়া গেল এবং মাঝারি আকৃতির একটি মাটির হাড়ি খবরের কাগজে মোড়াইয়া সাথে লইয়া আসিল। তাহার পর, ইহাতে খড় দিয়া ডিম দুটো তাহার রান্না ঘরে তাকে উপরে রাখিয়া দিল আর মুরগিটিকে আনিয়া সেখানে বসাইয়া দিল। তাহার পর যখন সন্ধ্যা নামিল মুরগীটিকে বাহিরে বের করিয়া দিল। কিন্তু, যখন বাড়িওয়ালার অকর্মা ছেলে মোরগ মুরগী ভেতরে রাখিয়া চলিয়া গেল, শিহাব তখন মুরগিটিকে আবার ধরিয়া আনিয়া ডিমের উপর তাপ দেওয়ার জন্য রাখিয়া দিল। এই ভাবে বেশ কয়েকদিন চলিলো, শিহাব অসুস্থতার কারণ দেখাইয়া বেশ কয়েকদিনে ছুটি নিয়া নিলো। কারণ, সে দেখিলো দিনের বেলায় তাহার বাসা তালা লাগানো থাকায় মুরগী পর্যাপ্ত তাপ দিতে পারিতেছে না। কিন্তু, শিহাবের মনে হইল ইহাতে আরো তা দেয়ার দরকার রহিয়াছে। এবং সে স্থির প্রতিজ্ঞ যে ইহা হইতে সে বাচ্চা ফুটাইয়া ছাড়িবে।

এইভাবে, তাহার কিছুদিনের ছুটির বিনিময়ে যখন সে একদিন সকাল বেলা দেখিল ডিম দুটি ফুটিয়া হলুদ রঙের দুটি অতি সুন্দর বাচ্চা বাহির হইয়া আসিয়াছে, তখন তাহার আনন্দের যেন সীমা রইলো না। বাচ্চা দুইটি হাতে লইয়া সে বীর বেশে বাহির হইয়া আসিল, এবং যখন অকর্মা ছেলেটি আসিয়া উপস্থিত হইলো তখন শিহাব তাহাকে অতি আনন্দের সাথে ইহাদের জন্ম বৃত্তান্ত ব্যাখ্যা করতে লাগিলো। আজিকেও সে অফিসে গেল না এবং সারা দুপুর ব্যাপিয়া ইউটিউব, গুগল তালাশ করিল, কিভাবে ইহাদের সুস্থ রাখিয়া পালন করিতে হইবে। এক দিনেই সে যথেষ্ট দক্ষ হইয়াছে বলিয়া তার কাছে মনে হইলো। তাহার এক বন্ধুর কথা মনে পড়িল, যে পশু ডাক্তার হইয়াছে। বিভিন্ন সূত্র ধরে তাহার মোবাইল নাম্বার জোগার করিয়া বিকালে ছাদে বসিয়া তাহাকে ফোন দিল, তার কাছ হইতে পরামর্শ নিল। এবং পরবর্তি দিনের মধ্যে সেই পরামর্শ মাফিক সমস্ত ঔষধ পথ্যের ব্যবস্থা সম্পন্ন করিল।

সাঁঝের বলায় ইহাদের স্বস্থানে রাখিয়া আসিল এবং রাত্রিতে যখন বিছানায় শুইল তখন তাহার বেকার জীবনের কথা বারে বারে মনে উঁকি দিতে লাগিল। দেখিল সেখানে মুনা তাহাকে চাকরির জন্য তাড়না দিতেছে, এরপর, তাহার বিয়ে ঠিক হইয়া গিয়াছে বলিয়া কান্নাকাটি করেতেছে, তারপর, তাহার বাচ্চাটিকে সযতনে দোলনার মধ্যে রাখিয়া দোল খাওয়াইতেছে, শীতকাল বলিয়া তাহার গাঁয়ে, পায়ে কাপড় জড়াইয়া দিতেছে। ইহা ভাবিতেই , তাহার মনে পড়িল, মুরগীর বাচ্চা গুলোর হয়তো শীত বোধ হইতেছে। সুতরাং, সে বিছানা হইতে উঠিয়া রান্না ঘরের বাতি জ্বালাইয়া তাহাদিগকে দেখিল, দেখিলো মুরগটি কখন যেন এই খানে আসিয়া তাহার বাচ্চাদিগকে জড়াইয়া রাখিয়াছে। দেখিয়া সে তৃপ্ত হইল। মনে ভাবিল, মুনার বাচ্চা আমার বাচ্চা হইতে পারিত, আর এই মুরগীটার মত সেও এক ঘরেই তাহার বাচ্চাকে বুকে জড়াইয়া শীতের রাত্রিতে শুইয়া থাকিতে পারিত। কিন্তু, সে কিসের সাথে কি তুলনা দিতেছে, মুরগী তো মুরগী, আমরা দুই প্রজাতির ইহাদের সাথে আমদের মিল খুঁজিলে চলিবে কেন?

গল্প এইখানেই শেষ হইতে পারিত যদি না পরের দিন সকালে আসিয়া অকর্মা ছেলেটি এই দুটো বাচ্চার মালিকানা দাবি না করিতো। পরের দিন, সকালে যখন শিহাব ছাদে থাকা মুরগী গুলোকে খুদ ছিটাইয়া দিতেছিল, তখন অকর্মা ছেলেটি আসিয়া মনে করাইয়া দিল, নবজাতক মুরগীর বাচ্চা দুটি যখন বড় হইবে তাহারা বেচিয়া দিবে এধরনের পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই তাহার বাবা মা করিয়া ফেলেছে। ইহা শুনিয়া শিহাব ক্ষেপিয়া গেল। সে বলিয়া ফেলিল, ‘ইহা তোমাদের হয় কি করিয়া, তোমরা তো জানোয়ার, মুরগীর ডিম খাইয়া ফেল, ইহা তো তোমরা খাইয়া ফেলিতে, আমি বাঁচাইয়াছি, ইহা কোন ভাবেই দিবো না”। অকর্মা বালকটি বলিল, ইহা আপনি বাবাকে বুঝাইয়েন, কিন্তু, আমাদের কেনা মুরগী, আমাদের ডিম, বাচ্চা আমাদের’। সেদিন অফিসে গিয়া আর শিহাব শান্তি পাইলো না। তাহার মনে হইলো তাহার সম্পত্তি কে যেনো জোর করিয়া, অন্যায় করিয়া লইয়া যাইতে চাইতেছে, এবং ন্যায়-অন্যায় কোন শক্তি দিয়া সে তাহা ঠেকাইয়া রাখিতে পারিতেছে না। এই মুরগীর বাচ্চা তাহার,এরপক্ষে শিহাব বেশ কিছু যুক্তি দাঁড় করিয়াতে চাইলো, কিন্তু, দেখিলো শক্তিশালী যুক্তিসমূহ তাহার বিরুদ্ধে যাইতেছে, কম শক্তিশালী যুক্তিগুলো তাহার পক্ষে কথা বলিতেছে। শিহাব ভাবিল, সে বলিবে, এই ডিম সে বাজার হইতে কিনিয়া আনিয়াছে, তারপর তাহাতে তা দিয়া বাচ্চা ফুটাইয়াছে, তাহাতে বাড়িওয়ালা কিছু বলিতে পারিবে না, কিন্তু, ইহাতে কি হইলো? মিথ্যা বলিতে হইলো। কিন্তু, সে মিথ্যা বলিবে কেন? সে কি ডিম দুটোকে ডিম খেকো জানোয়ারের হাত হইতে রক্ষা করে নাই? ইহাদের জন্য পনের দিনের ছুটি নেয় নাই? অফিসে বসের ঝাড়ি শুনে নাই, কষ্ট করে নাই? এই সবের চাইতে কি যে কিনিল সেই বেশি মালিকানার দাবিদার হইয়া গেল? ঈশ্বর কি ইহা দেখিবেন না?

তবুও, বারংবার তাহার মনে হইতে লাগিলো, কোন একটা জায়গায় শিহাবের মালিকানা দাবি করার পক্ষে অন্যায় রহিয়াছে, এই বাচ্চার পিতৃত্বের দাবি যে মোরগ করিতে পারে, তাহা নিশ্চিতই বাড়িওয়ালার। কিন্তু, মোরগ তো আর কথা বলতে পারে না, মুরগীও না। সুতরাং, তাহারা দাবি করিবে না। কিন্তু, বাড়িওয়ালা তো দাবি করতে পারে। শিহাবের মনে হইলো, পরকালে যদি ইহার মালিকানার জন্য বিচার হয় তাহা হইলে কোন না কোন কারণে ঈশ্বর মনে হয় শিহাবকেই মালিকানা দিবে। পার্থিক বিচারে তাহা তার নাও হইতে পারে।

সেদিন রাত্রিতে শিহাব ভাবিল, যে মুরগ মুরগী ইহার বাবা মা তাহারা ইহার মালিকানা দাবি করে না। দাবি করে মানুষ। কারণ মানুষ আর ইহারা এক প্রজাতির না। ইহাদের মধ্যে মিল খুঁজিলে চলিবে কেন?

Comments

    Please login to post comment. Login