Posts

প্রবন্ধ

রবি ঠাকুরের 'গোরা' পাঠ শেষে

July 4, 2024

রাকিব হাসান

25
View

এক. 

গ্যেটে একটা কথা বলেছিলেন, "The decline of literature indicates the decline of a nation." গোরা পাঠ করতে করতে বারবার শুধু এটাই ভাবছিলাম যে, জাতি হিসেবে আমাদের যে অধপতনের যে কারণ তা গ্যোটের ঐ বাক্যেই বলা আছে। শুধু ভাষার সাহিত্যমান নয়, রবীন্দ্রযুগের (যেখানে শরৎচন্দ্রও আছেন) উপন্যাসের সাথে সমসাময়িক উপন্যাসের অসংখ্য পার্থক্যের মধ্যে একটা হল-আজকালকার উপন্যাসে শুধু গল্পটাই পাওয়া যায়, আর গল্পে টুইস্ট পেলে তো পাঠক অন্য কিছু পাওয়ার কথা ভুলেই যায়, কিন্তু, ঔপন্যাসিকের জীবনানুভূতি বা জীবনদর্শনের কোন ছোঁয়া পাওয়া যায় না। ভাষার কারুকার্য, সাহিত্যমান, রূপক, অলঙ্করণ যেমন একটা উপন্যাসকে "উপন্যাস" করে তোলে, তেমনি, একটা উপন্যাস নিজের ছাল খুয়িয়ে একটা "বড় গল্প" ছাড়া আর কিছুই হয় না যদি সেখানে ঔপন্যাসিকের জীবনদর্শনের ছোয়া না থাকে। "ছোটগল্প" র কথা না হয় বাদই দিলাম, গোরা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আজকালকার উপন্যাসগুলো একটা 'বড় গল্প' ছাড়া কিছুই নয়।

দুই. 

'গোরা' উপন্যাসে জীবনদর্শন নিয়ে কথা বলার আগে এর নির্মাণশৈলী নিয়ে দুয়েকটা কথা বলি। 'গোরা'কে রাজনৈতিক উপন্যাসের কাতারেই ফেলা হয়, যদিও সে বড় কঠিন কাজ। Intra-textual Discourse আলোচনা করলে ইহাকে কখনোই রাজনৈতিক উপন্যাস বলা যাবে না, একমাত্র Extra-textual Discourse আলোচনা করলেই একে কোনভাবে রাজনৈতিক উপন্যাস বলা যেতে পারে। কারণ, "গোরা" উপন্যাসের ভেতরে রাজনৈতিক ঘটনা বা উপলক্ষ্য নেই বললেই চলে, তবে, শীতকালে ঘন কুয়াশার পেছনে যেমন বিশ্বভ্রহ্মান্ডকেও নেই মনে হয়, সেভাবেই গোরা উপন্যাসে রাজনীতি একেবারেই হারিয়ে শূন্য হয়ে গেছে। "গোরা", আমার মতে, "পুরোদস্তুর একটি সামাজিক উপন্যাস, তবে এই উপন্যাসের সমাজ এমনই এক সমাজ যাকে চতুর্দিক থেকে ধর্মের বেড়া দিয়ে ফসলি জমির মত রক্ষা করা হয়েছে। তৎকালীন সনাতন বা হিন্দুয়ানী সমাজের সাথে ব্রাহ্মণ সমাজের চিরায়ত বৈরিতার মধ্য দিয়ে গল্প এগিয়ে গিয়েছে সত্য, তবে, দুই সমাজের দুই প্রতিনিধি ললিতা-বিনয় প্রণয়-পরিণয় যে সে বৈরিতার বিরুদ্ধে অদম্য এক বিদ্রোহ তাও যে সত্য। পরেশবাবু বা আনন্দময়ী চরিত্রগুলো এক ব্যক্তি হয়েও এতটাই শক্তিশালী যে, ক্ষুধার্ত নেকড়ে যেমন সিংহের চারিদিকে ঘুরে, তাদের ব্যক্তিশক্তির চারিদিকে ক্ষুধার্ত সমাজ সেভাইবেই ঘূর্ণায়মান অথচ ঝাপিয়ে পড়তে অক্ষম। পরেশবাবু সত্যের সন্ধান পেয়ে পরিশেষে 'সমস্ত সমাজের আশ্রয় হইতে বাহির করিয়া লইয়া' ঈশ্বর ধর্মের পদপ্রান্তে নিজেকে সমর্পণ করিতে এতুটুকু দ্বিধা করেন নাই।

তিন. 

কেন্দ্রিয় চরিত্র গোরাকে নিয়ে কয়েকটা কথা না বললেই নয়। গোরা চরিত্রের নাম আর গোরার চারিত্রিক বৈশিষ্ট মিলেমিশে একেবারে একাকার হয়ে গেছে এই উপন্যাসে। গোরা এমনই অসীম আত্মবিশ্বাসী এক মানুষ যাকে তাঁর জীবন আদর্শ বা জীবন বোধ থেকে এক চুল পরিমাণ নড়ানোর সাধ্য কোন মানুষের তো নেই-ই, কোন যুক্তি-দর্শন দিয়েও তাকে নড়ানো যায় না। " ভারতধর্ম" বলে যে অসীম শক্তি তার হৃদয়কে অসীম বিস্তৃত করে রেখেছে সেই অসীমার ভেতরে সবই যেন বিশ্বভ্রহ্মান্ডে মানুষের মত অতি ক্ষুদ্র, অতি নগন্য। যে বিনয়কে গোরা হৃদয়ের গভীর থেকে বন্ধুত্বের অধিকার দিয়েছিল, সেই বিনয় যখন হিন্দুয়ানী সমাজ ছেড়ে ব্রাহ্মণ সমাজের ললিতাকে বিবাহ করে তখন গোরা তাকে ত্যাগ করতে একেবারেই বিচলিত হয় না। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই যে, হিন্দু ধর্মের এই একনিষ্ঠ সৈনিক অবশেষে জানতে পারে সে হিন্দু ধর্মের কেউ না, তার বাবা মা খ্রিষ্টান। এই পরিচয় গোরাকে নতুন জীবনের সন্ধান দেয়, সে সকল ধর্মের উর্ধ্বে মানবধর্মের স্থান দিয়ে নিজে আনন্দময়ীর পদতলে স্থান নেয়। এই পরিণতি যেন গ্রীক ট্র্যাজিক হিরোদের অনায়াসে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে। 

Comments

    Please login to post comment. Login