Posts

গল্প

স্বপ্নপূরণ

July 9, 2024

রাকিব হাসান

82
View

পর্ব-০১ 

এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত যে জমির আলী একটি পারিবারিক শৌচাগার নির্মাণ করবেই; আর সেটা হবে অবশ্যই দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট, সব ধরনের আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন এবং বিলাসবহুল। তবে, এটাও সত্য কথা যে, এই ধরনের শৌচাগার নির্মাণের আর্থিক সামর্থ জমির আলীর নেই এবং এটা তার পারিবারিক অবস্থার সাথে যায়ও না। কিন্তু, একবার মুখে যেহেতু বলেই ফেলেছে এখন আর পেছনে তাকানো যায় না। শৌচাগার নির্মাণের ঘোষণা যখন সে দেয়, তখন আশেপাশে না হলেও শ'খানেক মানুষ তো ছিলই, তারচেয়ে বড় কথা, এখন এটা না তৈরি করলে গ্রামে জমিরের কান কাটা যাবার অবস্থা! সুতরাং, নিজের পর্যাপ্ত টাকা না থাকা সত্ত্বেও সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলে। আজকে সকালেও তা বজ্রকন্ঠে পুনঃনিশ্চিত করেছে সে, "আমি টাক্কি বানামুই, দেহি কোন হালায় আমারে আটকায়।" তবে, এই “শালা”-র মধ্যে মূলত তার স্ত্রী আর বড় মেয়েই পড়ে। কারণ, এই দুজনই তার এই কাজে বাধা দিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের সকল লোক তাকে উৎসাহ দিচ্ছে, এমনকি একটু আগেও ফজলু বলে গেল এটা মান সম্মানের ব্যাপার। টাক্কি না বানালে সে মান সম্মান আর বুঝি ধরে রাখা যায় না, আর গ্রামে জমির আলীর কথা একটা দাম আছে। 

একটু পিছনে ফিরে দেখা দরকার, নয়তো, জমির আলী কেন নিম্নবিত্ত মানুষ হয়েও বিলাসবহুল শৌচাগার নির্মাণের বাধ্যবাধকতায় পড়ে গেছে তা বুঝা যাবে না। 

তিনদিন আগের ঘটনা। ঘুম থেকে উঠে, বাড়ির পশ্চিমে ঝোপঝাড়ের মাঝে নিজেদের শৌচাগারে যাচ্ছিল জমির। কাছে গিয়ে দেখে যে ইতোমধ্যেই কেউ একজন শৌচাগারের ভেতরে প্রক্ষালনকার্য সম্পাদনরত অবস্থায় আছে। এর আগের দিন রাতে খাবারে মসলা আর ঝাল বেশি হওয়ায় ডায়রিয়ার মত হয়ে গেছে জমিরের। চেপে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। শৌচাগারের কাছে গিয়ে দুই পা চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে সে। মনে মনে ভাবে, ভিতরে কোন শালা, বাইরায় না ক্যান! 

সে দুটি কাশ দেয়। কিন্তু, কাশের প্রত্যুত্তর হিসেবে বদনা থেকে পানি পড়ার শব্দ বা কিছু একটা প্রত্যাশা করছিল জমির। হচ্ছে না। পাতলা পায়খানার প্রেশার কি জিনিস তা যার একবার পায় সে-ই বুঝে। জমির ঘরের পিড়ায় গিয়ে পাছা মাটিতে লাগিয়ে বসে থাকে। শৌচাগারের একমাত্র বিকল্প এখন পাটক্ষেত। কিন্তু, সেখানে এখন কম কম হাটু পানি। 

পেটের চাপে সময় দীর্ঘতর হয়। দুই মিনিটের মধ্যে একবেলা ধৈর্যের অনুভূতি পায় জমির। 

অস্ফুট স্বরে বলে উঠে, "কোন বাইনচুদ টাক্কিত গেছে? এতক্ষণ লাগে?" কোন উত্তর পায় না। 

আর সম্ভব না। এইবার জোরে ডাক দিতে হবে। কিন্তু, ঘরের পিড়া থেকে পায়খানার কাছে সে হেটে যাবে, এতো সময় নাই। 

দাঁতে দাঁত কামড়ে বসে থাকে সে। নিকটতম প্রতিবেশীর বাড়িতে যেতে কম করে হলেও চার-পাচ মিনিট লাগবে। 

সে তার নিজের মৃত বাপকে মনে মনে অভিশাপ দেয়, "হালায় আমারে এই বনবাসে পাঠাইছে।" জমিরের বাপ কদম আলী। মারা গেছে প্রায় তিন বছর আগে। মারা যাওয়ার আগে জমি-জমা সব ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়ে গেছে সব ভাইয়ের মধ্যে। বাড়ির ভেতরে চার ভাইয়ের স্থান সংকুলান না হওয়ায় গ্রামের একেবারে শেষ মাথা পার হয়ে কাছারির পাশের এই জমিটা দেয় জমিরকে। প্রস্থে যেমনই হোক, দৈর্ঘ্যে বিশাল এই জমির মালিক হয় জমির আলী। এখানে মাটি ফেলে উচু করে বাড়ি বানায় সে। এরপরও দৈর্ঘ্য বরাবর বিশাল আবাদি জমি বাড়ির নিচে রয়ে গেছে। এই এক জমির ধানে জমিরের সারা বছরের ভাত খাওয়ার চাল হয়ে যায়। কিন্তু, সমস্যা হল অন্য জায়গায়। কাছারির পাশে বাড়ি। আশেপাশে কোন বাড়ি ঘর নাই, দিন দুপুরেই জমিরের ভয় লাগে। না, চোর ডাকাতের ভয় না, জ্বীন-ভূতের ভয়। কাছারিতে মানুষ দিনের বেলায় আসতেই ভয় পায়, আর জমির এখানে বাড়ি বানিয়ে থাকছে, ভাবতেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় জমিরের। 

বাপকে গালি দিতে গিয়ে সে অতীতে হারিয়ে যায়। এতে সে পেটের চাপের কথা ভুলেই যায়। পেট আবার মোচড় দিয়ে যখন পাতলা পায়খানা পেট থেকে বেরুলো বলে, তখন সে বর্তমানে ফিরে আসে। টাক্কিঘরের দিকে তাকিয়ে দেখে, সর্বনাশ। তার ছেলে বের হয়ে গেছে, এবং ইত্যবসরে জমিরের স্ত্রী সেখানে ঢুকেও গেছে। কি মুশকিল। এবার জমিরকে আর কে সামলায়। 

ঈষৎ জোরেই বলে ফেললো, "এই খানকি*গি, টাক্কিত যাওয়ার আর টাইম পাইলি না।" জমিরের স্ত্রী সুকর্ণাপত্রী। সে হয়তো জমিরের ক্রোধান্বিত গালি শুনতে পায়, তবে ভেতরে থেকে কিছুই বলে না। নিজের স্ত্রীকে এই অকথ্যভাষায় গালি দিতে মুখে একেবারেই বাধে না জমিরের। 

জমির এবার বাড়ির দক্ষিণ দিক দিয়ে নেমে সজোরে দৌড় দেয়। যদি কোন ভাবে নিকটস্থ প্রতিবেশীর বাড়ি কোনভাবে পৌছানো যায়! এই আশায়। আর যদি না যায়? হয়তো ঝোপঝাড়েই বসে পড়তে হবে। আল্লাহর অশেষ করুণায় সে নারায়ণের বাড়ি গিয়ে পৌছায়। সকাল বেলা বলে কথা। সব বাড়ির শৌচাগারের একই অবস্থা। জমির নারায়ণের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে নারায়ণকে ডাক দেয়। সময় নষ্ট করার মত সময় জমিরের হাতে নেই। নারায়ণ বের হতেই জমির বলে, "তোমাগো টাক্কিত কেউ ডুকছে নাকি? একটু জরুরী।" 

নারায়ণ জবাব না দিয়ে জানতে চায়, "তোমাগোডা কি ভাইঙ্গা গেছে নাকি?"

"না, ভাঙ্গে নাই, বাজারে যাইতাছিলাম, হঠাৎ কইরা পেট মোচড় দিল, তাই আসলাম", জমির বিশ্বাসযোগ্য করে মিথ্যা বলে যায়। 

নারায়ণ দরজায় দাঁড়িয়ে অন্দরমহলের দিকে তাকায়। 

এতক্ষণ ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে সবই শুনছিল নারায়ণের স্ত্রী। সে ইশারায় নিষেধ করে। নিষেধ করার মত যুক্তিসঙ্গত কারণও আছে শিবানীর কাছে। মাত্র কিছুদিন আগে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এই শৌচাগার বা বাথরুম বানিয়েছে নারায়ণ। ভেতরে টাইলস আছে, হাই-কমোড, লো-কমোড, শাওয়ার, আলোকসজ্জা, আরো কত কি? এভাবে গ্রামের মানুষ এসে এখানে প্রক্ষালনকার্য সম্পন্ন করে যাবে এটা মানা যায় না। গ্রামের মানুষের স্বভাব খারাপ। একদিন আসতে দিলে আরেকদিন আসবে, একজনকে আসতে দিলে আরেকজনকে নিয়ে আসবে। শেষ পর্যন্ত এতো সাধের প্রক্ষালনকক্ষ গণশৌচাগারে না পরিণত হয়? 

নারায়ণ সরাসরি না করলো না। ঘরের ভেতর থেকে চোখ উঠানের দিকে ফিরিয়ে হাসিমুখে বলল, 'আসছো তো বুঝলাম, কিন্তু গৌরী তো এখন ভেতরে আছে, একটু ধৈর্য ধইরা অপেক্ষা করা লাগে যে।" 

অপেক্ষা করার সময় থাকলে তো বাড়িতেই করতো জমির। এখানে দৌড়ে ছুটে আসতো না।

"আচ্ছা, আমি বইতাছি”, অন্য সময় হলে সে চলে যেত, কিন্তু হাটার মত অবস্থা বা এখান থেকে ক্ষেতে যাবার মত সময় জমিরের হাতে আর নাই। এই বুঝি কাপড় নষ্ট হল।  

জমিরকে বসতে দেখে শিবানীর গা ঘিনঘিন করতে লাগলো। এমনিতেই মুসলমান, আবার ফকিরনী টাইপের, কিভাবে তাড়াই? ভাবতে থাকে শিবানী। শৌচাগার মানবশূন্যই ছিল। কিন্তু, জমিরকে বাইরে অপেক্ষমান রেখে তাকে বিতাড়নের উপায় খোজা হচ্ছিল। এমন সময় অনাকাঙ্খিতভাবে নারায়ণের একমাত্র কন্যা গৌরী বাড়ির বাইরে থেকে দৌড়ে জমিরের সামনে দিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল। জমির অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। 

জমিরের আর বুঝতে বাকি রইলো না, ঘটনা কি? একে তো পাতলা পায়খানার অভ্যন্তরীণ প্রেশার, তার উপর নারায়ণের এই ব্যবহার, জমির নিজেকে সামলাতে পারলো না। এরই মধ্যে নারায়ণ যখন এসে বলল, “গৌরী বের হয়ে গেছে, কিন্তু তার মা হঠাৎ করে আবার ভেতরে চলে গেছে।”   

জমির ভেতরের চাপে নিজের মুখ সামলাতে পারলো না, “মিয়া, সোনা দিয়া টাক্কি বান্ধাইছো, মানুষরে যাইতে দিও না, ভিতরে তোমার দেবতাগরে হাগাও।" 

জমিরের চিৎকারে নারায়ণ একেবারে ভ্যাবাচেকা গেল। কি হইল বুঝার আগেই, জমির বাড়ি থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেল। 

বাজারে যেতে দারুর বাড়ির রাস্তার পশ্চিম পাশে একটা শৌচাগার আছে। গণশৌচাগার টাইপের। জমির দৌড়ে সেদিকেই গেল। আর সেখানে পৌছাতে পৌছাতে যে তার কাপড় চোপড় নষ্ট হয় নাই সে কথার কোন গ্যারান্টি নাই।  সেই বিভীষিকাময় কাহিনী মনে হলে এখনো জমির ঝিম মেরে বসে থাকে। সে ঘটনার বিস্তারিত আর নাই পাড়লাম। তবে, বিকেলে যখন নারায়ণ মোস্তফা মেম্বারের কাছে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে বিচার চেয়ে জমিরের বাড়ি আসে, জমির শ’খানেক মানুষের সামনে ঘোষণা দেয়, নারায়ণের শৌচাগারের চেয়েও দামী শৌচাগার যদি সে না বানায় তাহলে সে মাটিতে নাক ঘষা দিয়ে গ্রাম থেকে বের হয়ে যাবে। এই হল কাহিনী। 

ক্ষণিকের উত্তেজনায় যে ঘোষণা জমির দিয়ে ফেলে তা রাগ করে তালাক দেয়ার মতই ঘটনা। মুখ থেকে যে কথা একবার বের হয়ে গেছে তা আর পেটে ঢুকানোর কোন উপায়ই নেই। সেটি তখন আর আপনার সম্পত্তি থাকে না, আর আপনার নিয়ন্ত্রণেও থাকে না; তা জনগণের সম্পত্তি হয়ে যায়, তারা যথেচ্ছা সেটা ব্যবহার করে। এক ফোঁটা কালি যেমন এক গ্লাস পানিতে জ্যামিতিক হারে ছড়িয়ে পানিকে দূষিত করে তোলে, গরীবের রাজবাড়ি নির্মাণের খবরও সেভাবেই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একমাত্র জমিরের বড় মেয়ে আর তার স্ত্রী আপত্তি করলেও জমিরের পক্ষে এখন সারা গ্রামের মানুষ। অনেক সম্পদশালী মুসলমান এসে দাঁড়িয়েছে তার পক্ষে। এখানে ধর্মের জয় পরাজয়ের একটা ব্যাপার আছে বলে তাদের অভিমত। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম হয়ে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের কাছে কোনভাবেই পরাজিত হওয়া যায় না। বাতেন শেখ জমিরের কাধে হাত দিয়ে বললেন, "জমির, এইটা এখন আমাদের মান সম্মানের ব্যাপার, তুমি কামে হাত দেও, আমরা আছি সবাই তোমার লগে।" 

অজিদ, মজিদ, শামসু, সবাই একমত। কামে হাত দিলেই কাম শেষ হইবো। জমিরেরও সিদ্ধান্ত নেয়া শেষ; টাক্কি ঘর বানাতেই হবে। 

খোজ-খবর নিয়ে জানা গেল নারায়ণের শৌচাগার নির্মাণে প্রায় তিন লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে। সে তো বছর খানিক আগের কথা। যে হারে নির্মাণ সামগ্রীর ব্যয় বেড়েছে তাতে টাকা দ্বিগুণ না হলেও কাছাকাছি হবে। জমিরের কপালে চিন্তার বলিরেখা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে।হালিমা পাশে এসে দাঁড়ায়, "টাক্কি বানান লাগবো না, আর যদি বানাইতেই অয় তাইলে স্ল্যাপ আর টিন দিয়া বানান।"

জমির চুপ থাকে। না, সে যতদূর এগিয়েছে সেখান থেকে আর পিছনে আসা যায় না। এই শৌচাগার না বানানো মানে নাকে খত দেয়া। মুখের কথার জন্য সে আফসোস করে। 

কিন্তু, জমিরের পাশে এখন পুরো গ্রামের মানুষ। একবার মেম্বার সাহেব আর বড় বাড়ি গিয়া রোশন সাহেবের সাথে বিষয়টা বুঝা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। বিকেলে মেম্বার সাহেবের সাথে দেখা হলে মেম্বার সাহেব বলেন, টাকা পয়সা ব্যাপার না। আগে তুমি কাজ শুরু কর, পরে আমরা তো আছি। 

রোশন সাহেবের সাথে বাজারে দেখা হয় সন্ধ্যায়। সে জানায়, একটা টাক্কিঘর আর কয় টেহার কাম, তুমি শুরু কর, দেখবা, দেখতে দেখতে শেষ হইয়া গেছে।"

জমিরের হাতে কোন টাকা নেই। কিন্তু, কাজটা তো শুরু করা লাগবে। 

জমির পরের হাটবার একটা দুধেল গরু আর দুইটা ছাগল বিক্রি করে শৌচাগার নির্মাণের কাজে হাত দেয়। হালিমা  আর কুলসুম বাধা হয়ে দাঁড়ালেও তা এক ধাক্কায় উড়িয়ে দেয় জমির। 

পর্ব-২ 

এই পরিবারে জমির আলী সর্বেস্বর্বা। জমিরের কথাই এখানে আইন। দুধেল গাভীর উপযোগিতা বলে শেষ করা যায় না। পরিবারে একটা দুধেল গাভী থাকা মানে একটা আর্থিক নিরাপত্তা। প্রতিদিন এই গাভীর দুধ বিক্রির টাকায় বাকি সব খরচ চলে যায় আর বাড়িতে নিত্য প্রয়োজনীয় দুধের চাহিদা তো পূরণ হচ্ছেই। অথচ, সেই দুধেল গাভী জমির বিক্রি করে দিল। 

জমিরের বউ চিৎকার করে নিজের সামর্থ্যের পুরোটা রাগ ঢেলে দিল, "তুই বাডি নিয়া রাস্তায় নামবি, ফহিরের ঘরে ফহিরের পুত!" না, মহিলা মানুষ; এই খারাপ এই ভালা। জমির তার কথায় তোয়াক্কা করল না। কুলসুম জমিরের ভুল ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করল, "বাজান কামডা ঠিক হইল না। গরুডা ঈদের আগের বেচলে কত টেহা বেচতে পারতেন।" যদিও কুলসুমের কথার উত্তর দেয়ার কোন দরকার সে এই মুহুর্তে অনুভব করলো না, তবু উত্তর দিল, “দরকারের সময় এইগুলি বেইচ্যা টেহা না আনলে এইসব পাইল্যা লাভ কি?”   

কুলসুমের মন চাইছিল বলতে, "বাজান, তুমি টাক্কি বানাইবা, এইডা কি এমন দরকারের মধ্যে পড়ে? এইডা পাগলামি, মানুষ আড়ালে হাসাহাসি করতাছে।" 

কুলসুম চুপ থাকে, এইসব বলার কোন মানেই হয় না। জমিরের পক্ষে কথা বলা মানুষগুলোকেই জমির আপন মনে করছে, আর যারা তাকে মানা করে তারাই শত্রু। তাদের দিকে জমির ফিরেও তাকায় না, মুখ কালা করে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। 

মহাসমারোহে শৌচাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট শৌচাগার নির্মাণের জন্য প্রথমে ডিজাইন আর পরে ডিজাইনার খুজে বের করা হল। নারায়ণের বাথরুমের ডিজাইন যে ডিজাইনার করেছিল তার সাথেও কথা বলা হল এবং সেই ডিজাইনের কপি আনা হল। তাতে বেশ কিছু টাকাও খরচ হল। ডিজাইন আর ইট বালি কিনতেই জমিরের গরু ছাগল বেচা টাকা ফুরালো। 

সিমেন্ট কেনা বাকি, লোহা কেনা বাকি, রাজমিস্ত্রীর সাথে কথা ফাইনাল, কাঁচামাল কেনা শেষ হলেই কাজ শুরু হবে। 

বাড়ির পাশে থাকা কড়ই গাছ, বড়ই গাছ, আম গাছ, জাম গাছ এসব স্বল্প মূল্যে বিক্রি শুরু করে জমির। কুলসুম বাধা দেয়, "বাজান, এই বার এইসব বাদ দেন, শেষকালে রাস্তায় নামতে হইবো।" জমিরও বুঝতে পারে, এইভাবে শৌচাগার বানানো ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু, তার কথার দাম এতো বেশি ছিল যে তার আর রুখে দেয়ার সাধ্য তার নাই। পুরো গ্রামবাসী আজ জমিরের শৌচাগার দেখার অপেক্ষায়। প্রতিদিন মানুষ এসে তার কাজের অগ্রগতি দেখছে আর অনেকে হতাশা প্রকাশ করছে। তার চেয়ে বড় কথা, নারায়ণ বিজয়ের হাসি হাসবে বলে অপেক্ষায় আছে। শেষ হাসি যদি নারায়ণ হাসে সে হাসি জমিরের সইবে না। 

না, নারায়ণের সাথে হারা যাবে না, গ্রামের মানুষের চোখে হাসির পাত্র হওয়া তো যাবেই না, ভাবে জমির। 

বিক্রয়যোগ্য সব কিছু বিক্রি শেষ হলে, এবার টাকা ধার করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। মোস্তফা মেম্বারের কাছে যায় সে। মোস্তফা মেম্বারের মন খারাপ, তার ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে কদিন আগে, তার চিকিৎসার কোন ত্রুটি করে নাই মোস্তফা। হাত একেবারে খালি। তবুও সাহস দেয়, "জমির, তুমি কাজ চালাইতে থাকো, ডেকোরেশনের সময় আমি টেহা দিমুনে।"

বড় বাড়ি যায় একদিন জমির, আরেকদিন যায় রোশন সাবের কাছে। সবারই এখন বিপদ। ধারের টাকার গন্ধ আর পায় না জমির। রাজমিস্ত্রী প্রতিদিন সকালে তার বাড়ি আসে। "এই মিয়া, এইভাবে বইসা থাকমু? তুমি বাথরুম না বানাইলে না কইরা দেও, আমি তো পুলাপাইন লইয়া আজাইরা বইসা আছি", রানা মিস্ত্রি রাগারাগি করে সেদিনের মত চলে যায়। 

না, এইভাবে হয় না। জমিই বেচন লাগবো, এছাড়া কোন উপায় নাই। কিন্তু, ভাবনা যত সহজ কাজ তত সহজ নয়। জমির নিজে আজ পর্যন্ত এক বিঘা জমিও কিনতে পারে নাই। বাবার দেয়া এই জমিটার এক অংশে তার বাড়ি, বাকিটাতে ধান চাষ করে, সারা বছরের খাবার আসে এই জমি থেকে। এই জমি বিক্রি করতে পারবে না জমির। 

হালিমা আর কুলসুম বেশ বুঝতে পারে, জমির একা বসে বসে বসে কি ভাবে। কুলসুম সন্ধ্যায় জমিরকে বলে, "বাজান, ক্ষেতটা বেইচেন না, তাইলে না খাইয়া থাহন লাগবো।" জমির অবাক হয়, জমি বেচার কথা তো জমির এখনো মুখে বলেই নাই, কুলসুম বুঝলো কিভাবে। জমিরের খুব ইচ্ছে হয়, কুলসুমের মাথায় হাত রেখে বলতে, "না রে মা, এই জমি আমার বাবার দেয়া জমি, আমি ক্যামনে বেচমু?" কিন্তু, জমির বলতে পারে না। হালিমাও এসে পাশে বসে। না, আজ আর কোন রাগারাগি করে না। হালিমা একেবারে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে যায়, "আমাগো তো আর কিছুই নাই, কুলসুমের বাপ, এই জায়গাডা না থাকলে আমগোরে মানুষ ফকির কইবো। এই জায়গা কিছু কইরেন না।"

জমিরের কষ্ট লাগে। সব জিনিসপত্র কেনা শেষ। এখন শুধু মিস্ত্রির খরচটা হইলেই চলে। তবুও স্ত্রী-কন্যার কথায় ভয় বেড়ে যায় জমিরের। জমি বিক্রির চিন্তা বাদ দেয় সে। গ্রামের কিছু অবস্থা সম্পন্ন মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার নিতে থাকে জমির। ধার নেয়ার সময় সবাইকে একই কথা বলে, “জমি বেচার লোক খুজতাছি। বিক্রি হওয়ার সাথে সাথেই টেহা দিয়া দিমু।” জমি বেচার কথা শুনে কিছু মানুষ এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করে, কিন্তু, জমিরকে তা বুঝতে দেয় না। তাকে অল্প কিছু টাকা দিয়ে দেয়। কেউ কেউ জমি নিজে কেনার আশায় কিছু বেশি টাকা দেয়। 

এবার হাতে বেশ কিছু টাকা আসে জমিরের। রানা মিস্ত্রিকে ডেকে পাঠায়, "তোমার লোকজন নিয়া আইসো, কাম শুরু কইরা দেও", সন্ধ্যায় রানা মিস্ত্রির বাড়িতে গিয়ে বলে আসে জমির আর তার পরের দিন সকালেই কাজ শুরু হয়ে যায়। 

দেখতে দেখতে চোখের পলকে এক সপ্তাহের মধ্যেই শৌচাগার একটা আকৃতি ধারণ করে। সারা গ্রামের মানুষ দেখার জন্য আসে। যাদের কোন কাজ নেই সারাদিন এখানেই দাঁড়িয়ে থাকে, মাঝে মধ্যেই কেউ দু চারটা ইট এগিয়ে দেয়, কেউ লোহা বাকা করে, কেউ সোজা করা। ছোট ছেলে মেয়েরা সারাদিন কৌতূহলী চোখ নিয়ে শৌচাগারের দিকে তাকিয়ে থাকে। 

রাজমিস্ত্রীদের তিনবেলা খাবারের জন্য দেশি মুরগী জবাইয়ের একটা হিড়িক পড়ে যায় জমিরের বাড়িতে। সকাল বিকাল তার বাড়ির পাশ দিয়ে হেটে গেলে দেশি মুরগীর মাংসের স্বাদ পাওয়া যায়। ওইদিকে বাজারে হাসির জোয়ার নেমে আসে। সব কিছু বিক্রি করে টাক্কি দিতাছে, জমির, এই বলে অট্টহাসির খেল খেলে যায় চায়ের দোকানে। হঠাৎ করে জমির যদি চলেই বা আসে, সবাই চুপ করে প্রসঙ্গ পালটায়।

মাত্র দুই সপ্তাহে জমিরের শৌচাগারের গায়ে আস্তরণ পড়ে। এখনো রঙ করা বাকি, ভেতরের ডেকোরেশন বাকি। সেগুলোই ছাড়াই কি চমৎকার দেখা যায়। সবাই বাহবা না দিয়ে পারে না। আহা! জমির দেখাইয়া দিল। নারায়ণ তার বাথরুমে জমিরকে ঢুকতে দেয় নাই, আজ নারায়ণের বাথরুম জমিরের বাথরুমের তুলনায় কিছুই না। সবাই যখন জমিরের সামনেই এই কথা বলতে থাকে, জমিরের বুকটা তখন গর্বে ফুলেফেঁপে উঠে, আমিও পারি। পড়ন্ত বিকেলে নারায়ণের বাড়ির দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি হাসে জমির। 

শৌচাগার নির্মাণ প্রায় শেষ হলেও আরো দুইটা বড় কাজ বাকি, প্রথমটা হল বার্নিশ আর ডেকোরেশনের কাজ আরেকটি হল, ভেতরে পানি সরবরাহ করার জন্য নলকূপ ও বাথরুমের উপরে ট্যাংকি বসানোর কাজ। ধার করা টাকা ফুরিয়ে গেছে, বিক্রি করার মত কিছুই নেই, ধার দেয়ার মতও আর কেউ নেই, যারা আগে টাকা ধার দিয়েছে তাদের কাছে চাইতে জমিরের বিবেকে বাধে। সাহস করে যদিও বা দুয়েক জনের কাছে চায়, তারা কিছু কপাল ভাজ করে, "এই মিয়া, আগের টাকাই তো দেও নাই, আবার টেহা চাও? তুমি না জমি বেচবা কইল্যা, বেচ না ক্যান?"

সবাই সহজ পথটা বাতলে দেয়। পরামর্শের জন্য একবার রোশন সাবের কাছে যায় জমির। “আরে মিয়া, তুমি তো দেখাই দিলা”, শুনতে শুনতে আবারো গর্বে বুকটা ফুলে উঠে, "তোমার কাজ তো দেখলাম শেষ, লাইগ্যা থাকো, বাকিটা শেষ হইয়া যাইব।"    

“হাতে একবারে টেহা পয়সা নাই, রোশন, তুমি যদি কিছু টেহা দিতা?" জমির ক্ষীণ কন্ঠে অনুরোধ করে।

এইবার রোশন কাজের বুদ্ধি দেয়, “শোন জমির, তোমার অবস্থা আমি জানি, সারা গ্রামের মানুষ তোমার কাছে টেহা পায়, তোমার বাথরুমের কাজও শেষ হয় নাই, এই বিপদ থেকে বাইর হওয়ার একটাই উপায়", বলে চুপ করে থাকে রোশন, জমিরকে সেই উপায়টা উপলব্ধি করার সুযোগ দেয় রোশন। 

“শোন, জমির ভাই, তুমি চাইলেও তোমার জমি বিক্রি করতে পারবা না, যাদের কাছ থেকে টেহা নিছো, সবাই তোমার এই জমির দিকে তাকাইয়ে আছে, বেচতে গেলে মারামারি বাইধা যাইব।" 

জমির অবাক হয় তবে ভবিষ্যৎবাণীর সম্ভাব্যতা অনুমান করতে পারে জমির। মনে মনে ভাবে, এখন করনীয় কি? 

জমিরের ভাবনা পড়তে দেরী হয় না রোশনের। করণীয় বলে দেয় কানে কানে।

পরের তিন সপ্তাহে জমিরের বাড়িতে যা হল তা এক কথায় মহাকাব্যিক ঘটনা। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে শৌচাগার রঙ করা আর ভেতরের ডেকোরেশনের কাজ শেষ হয়। ইন্টারনাল ডেকোরেশনের জন্য এমন সব জিনিস আনা হল যা এই গ্রামের মানুষ আগে দেখে নাই কখনো, নামও জানে না কেউ, জমির নিজেও এসবের নাম জানে না। শৌচাগারের ভেতরের আলোকসজ্জা দেখতে সন্ধ্যার পর শত মানুষের আনাগোনা জমিরের বাড়িতে। শৌচাগারের পেছনে মটর বসিয়ে পানি উঠানোর ব্যবস্থাও চমৎকার। শৌচাগারের উপরে পানির ট্যাংকি তিন চার গ্রাম দূর থেকে দৃশ্যমান। 

এই শৌচাগার পুরো এলাকায় জমিরের আলাদা স্ট্যাটাস ও আইডেন্টিটি সৃষ্টি করেছে। জমির এখন চায়ের দোকানে গেলে দুজন উঠে গিয়ে তাকে বসতে দেয়। জমির এখন সবার জন্য চায়ের অর্ডার দেয়। শৌচাগার এখন উদ্বোধন হয়নি, মানে এখনও কেউ এখানে প্রক্ষালনকার্য সম্পাদন করেনি। অজিদ আর মজিদের পরামর্শে মসজিদের হুজুরের সাথে কথা বলে জমির। একটা শুভ দিন দেখে মসজিদে সিন্নী দিয়ে আর বাড়িতে দোয়া মাহফিল পড়িয়ে শৌচাগার উদ্বোধনের ব্যাপারে মত দেন মসজিদের ইমাম সাহেব। সে অনুযায়ী শুক্রবার মসজিদে জুমার নামাজের পর সিন্নী দেয়া হয়, শনিবার দুপুরে সারা গ্রামের মানুষকে দুপুরে আপ্যায়ন করে রবিবার সকাল থেকে শৌচাগার উদ্বোধন করা হয়। কয়েকজনের বিশেষ ইচ্ছায় শৌচাগারের নামকরণ করা হয়, "স্বপ্নের শৌচাগার"। উদ্বোধনের দিন আশেপাশের এলাকা থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসে, এমনকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও জমিরের অনেক শখ ছিল সে নিজেই পায়খানা নির্গমনের মধ্য দিয়ে শৌচাগার উদ্বোধন করবে, কিন্তু, আগের দিন তিনবেলা গরুর মাংস খাওয়ায় তার কোষ্ঠ কঠিন হয়ে গেছে। ফলে সে উদ্বোধন করতে পারেনি। অবশ্য দুয়েক দিনের মধ্যেই তার পায়খানা স্বাভাবিক হয়ে আসে, সে আরামে প্রক্ষালন কক্ষ ব্যবহার করতে থাকে। 

পর্ব-তিন 

মাস তিনেক পরের কথা। জমির তার নিজের জমিতে ইরি ধানের বীজ ফেলতে যায় সকাল বেলা। পাশের গ্রামের বিশার ছেলেরা এসে বাঁধা দেয়। তারা দাবী করে এই জমি তারা রোশনের কাছ থেকে কিনেছে। জমির আকাশ থেকে পড়ে। ইতোমধ্যে, জমিরের স্ত্রী ও কন্যা এই খবর জেনে যায়। খবর জানার পর থেকেই হালিমা একেবারে চুপ হয়ে যায়। চুলোয় ভাতের হাড়ি চড়ানো ছিল, কুলসুম সেটা নামিয়ে আনে। জমির ছুটে রোশনের বাড়িতে। 

রোশন তখন বাড়ির আঙিনায় বসে সূর্যের দিকে মুখ করে বিপরীতে আয়না রেখে ক্ষৌরকার্য সম্পাদনরত অবস্থায় ব্যস্ত। পাশে তার স্ত্রী পানির বাটি নিয়ে নরসুন্দরের সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। জমিরকে দেখেই জায়নাব পানির বাটি রোশনের সামনে রেখে প্রস্থান করে। 

জমিরের মুখাবয়ব রাগের ছাপ বেশ স্পষ্ট। "রোশন ভাই, তুমি কি আমার জমি বিশার কাছে বেইচ্যা দিছো নাকি?"

যদিও এই জমি কোন ভাবেই আর জমিরের না, কারণ, জমির শৌচাগার নির্মাণের সময় গোপনে এই জমি রোশনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে আর সেই টাকা দিয়েই মহা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সে শৌচাগারের কাজ শেষ করে ও বাড়িতে দোয়া মাহফিল ও সারা গ্রামের মানুষকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছিল। তবে, রোশন জমিরের কথার প্রতিবাদ করে না, শুধু জমিরকে জানায়, "হ, হঠাৎ করে টেকা দরকার হইল, যোগার করতে পারতেছিলাম না, তাই নিরুপায় হয়ে ক্ষেতটা ছাইড়া দিলাম।"

জমিরের অপ্রকাশ্য ক্রোধ ভেতরে আরো বাড়ন্ত অবস্থায় থাকলেও তা প্রকাশের কোন সুযোগ এখানে নেই। কারণ, জমি রোশনের, সে যা খুশি করতে পারে, কিন্তু, জমির যখন এই ক্ষেত রোশনের কাছে বিক্রি করে তখন দলিল দস্তাবেজের বাইরেও কিছু মৌখিক কথা ছিল। আগামী তিন বছর রোশন এই জমি দখল করবে না, বা কাউকে জমি ক্রয়ের কথা বলবেও না। জমির বিকল্প ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত এই জমিতেই চাষবাস করবে। রোশন কোন বাধা দিবে না। 

"রোশন ভাই, এই রকম তো কথা ছিল না!" জমির ক্ষীয়মান কন্ঠেই রোশনকে মনে করিয়ে দেয়। 

"মুখের কথা তো কোন কথা না, দলিলে যা লেখা আছে সেটাই হল আসল কথা", শুদ্ধ বাংলায় জমিরকে আইন শিক্ষা দেয় রোশন।  

অন্য সময় হলে হয়তো জমির রোশনের সাথে চিৎকার চেচামেচি করতো। কিন্তু, জমিরও অধিক শোকে পাথর হয়ে আছে। তার স্ত্রী যা ভাবছে সেই একই ভাবনা তার ভেতরেও।  

এবার সে আরো নমনীয় হয়, "রোশন ভাই, আমি তো বিপদে পইড়া যামু। তুমি জানো, এই ক্ষেত ছাড়া আমার কিছু নাই।"

রোশনের ইচ্ছা হয় সত্য কথাটা জমিরের মুখের উপর বলে দিতে, "এই মিয়া, তুমি কি বলদ, তুমি ফসলি জমি বেইচ্যা টাক্কি বানাও?" রোশন নিজেকে সামলিয়ে নেয়। জমিরের কাটা গায়ে সে আর নুনের ছিটা দেয় না। কিন্তু, নিজের যতটুকু অধিকার আছে সেই তাই করেছে, আর তাই সে জানিয়ে এখানেই কথা শেষ করতে চায়, "এই মিয়া, আমার জমি আমি বিক্রি করছি, তোমার কি আছে না আছে, তা নিয়া আমার ভাবনার টাইম নাই।" 

ইতোমধ্যে, রোশনের ক্ষৌরকার্য শেষ হয় এবং জমির রোশনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। রোশনের চেহারায় সূর্যের আলোকরশ্মি পড়ছে, চেহারা চকচকে হয়ে গেছে, সেই চকচকে চেহারায়ও একটা প্রতারণাবোধ তাহার মুখাবয়বে এমনি চাপ দিয়ে বসে আছে যে রোশন মুখ তুলে জমিরের চোখে তাকাতে পারে না। সে অপারগতাকে ঢাকার জন্য রোশন ছুরি, কাচি, পানির বাটি নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সব কিছু একত্রিত করে ঘরের দিকে চলে যায়। উঠানের মাটি যেন জমিরের পায়ের নীচ থেকে ভাটার পানির মত নেমে যাচ্ছিল। ঝিম ধরা পায়ের মত অর্ধ অবশ পায়ে জমির রোশনের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে।

সকালে রান্না করা ভাত ঠান্ডা হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলল। ভাতের হাড়ির দিকে তাকিয়ে হালিমা পাথর হয়ে বসে থাকে। কুলসুমও তার নিজের মত করে বাড়িতে হেঁটে বেড়ায়, এখান থেকে সেখানে যায়, মাঝে মাঝে তার মায়ের দিকে তাকায়। বাড়ির মধ্যে এই দুইটি প্রাণিকে যেন ঈশ্বর আজকের জন্য বাকহীন করে দিয়েছেন। কেউ কারো সাথে কিছুই বলে না। না, বিষয়টা এমন নয় যে তাদের মধ্যে বলার মত কোন কথা নেই, অনেক কথা আছে। কিন্তু, জমির তাদের অগোচরে যে গর্হিত কাজ করেছে সেই কাজের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনের মনের ভেতরে এতো স্বকথন চলছে যে তারা এখনো তা থেকে বের হতে পারছে না।  

কুলসুম বার বার জমিরকে বলেছিল, “বাজান, এই জমি ছাড়া আমগো আর কিছু নাই, এই জমি আপনে বেইচেন না", কিন্তু, শেষ পর্যন্ত কি হল। জমির তাদের একেবারে না জানিয়ে জমিটা বিক্রি করে দিল। এর পরিণাম কি জমির বুঝে না, নাকি সে অন্ধ, মূক? এই একটা মাত্র জমি থেকে তাদের সারা বছরের খাবার চাল আসে, বাড়িতে জমির ছাড়া আয় রোজগারের কেউ নেই, বাজান কি এইসব বুঝে না? এই জমি ছাড়া যে খাবার খাওয়ার মত কোন ব্যবস্থা তাদের নাই, সে কি বাজান জানে না? এই রকম হাজারো প্রশ্ন কুলসুমকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয় আর তার অস্তিত্বকে ঘর থেকে মহাশূন্যে নিয়ে যায়। পাকঘরে বসা হালিমার মনেও হয়তো এই একই প্রশ্ন বারংবার ঘুরে ফিরে আসছে।  

হাড়ির ভাত তাপ বিসর্জন করে ঠান্ডা হতে থাকে। এই ভাত কারো গলা দিয়ে নামবে না। ছয়মাস পর যখন ঘরে খাবারের মত ভাত থাকবে না, তখন কি হবে? অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা ভেবে হালিমা অতীত আর ভবিষ্যতে হারিয়ে থাকে। তার কাছে বর্তমান হঠাৎ করেই যেন একেবারে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। 

রোশনের বাড়ি থেকে বের হয়ে জমিরের পা আর বাড়ির দিকে যায় না। শেষ কাছারির পেছনে ভূতুড়ে বট গাছের নিচে গিয়ে বসে সীমাহীন মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে। এখান থেকে যতদূর চোখ পড়ে, শুধু কিছুদূর পর পর নেংটী দেয়া মানুষ দেখা যায় যারা ইরি ধানের বীজ বপনে ব্যস্ত; সবাই আগামী দিনের খাবারের বন্দোবস্ত করছে। এই সকল কাজ জমিরের কাছে হঠাৎ খুবই অগুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সে অতীতের ভুল, আর ভবিষ্যতের মাশুলের কথা ভাবতে থাকে।  

এই জমি ছাড়া তার কি কোন বিকল্প আছে যেখান থেকে সে এক বছরের খাবার পাবে। দিনের দুপুরে সে অপরিমেয় আধারে হাতড়ে বেড়ায়। না, আর কোন কাজের ব্যবস্থা তার নেই। অন্যের জমিতে কাজ করার মত সুযোগ এখানে খুবই কম এবং যদিও বা সে সুযোগ কেউ করে দেয়, নিশ্চিতভাবেই জমির তার বাবার জাত থেকে নিচের জাতে নামছে। এতোদিন জমির ছিল গৃহস্থ আর তখন সে হবে দিন মজুর। অথচ, গত বছর সে নিজেই একজন দিন মজুর নিয়ে তার জমি থেকে ধান কেটেছে, ধান মাড়াই করেছেন, ধান সিদ্ধ করে চাল বানিয়ে গোলায় ভরেছে। সেই দিন-মজুর কি এমন পেয়েছিল জমিরের কাছ থেকে, দুই বেলা খাবার আর আধ মন ধান। এই দিয়ে কি জমিরের সংসার চলবে। বাকি, হালিমা আর কুলসুমকেও অন্যের বাড়িতে ফসল তোলা মৌসুমে কাজ নিতে হবে? জমির আর ভাবতে পারে না। 

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। জমির যেন এই মাত্র কোন এক আপন জনকে কবরে নামিয়ে বাড়ি আসল, সেভাবে বাড়িতে আসে। হালিমা চুপ করে বসে থাকে। জমিরের দিকে একবার তাকিয়েও আরেকবার তাকাতে ইচ্ছে করে না, কুলসুম তার বাবাকে ডাকে, “বাজান, আপনে সারাদিন খান নাই, আসেন ভাত খাইয়া নেন।” 

জমির শৌচাগারের দিকে তাকায়। আজকে সারাদিন তার শৌচাগারে যাওয়া লাগে নাই। পেটে ভাত না থাকলে টাক্কি দিয়ে কি হবে? জমির ভাবে। এত সাধের শৌচাগার হয়তো আগামী বছর দিনের পর দিন অব্যবহৃত পড়ে থাকবে। 

কুলসুম জমিরের সামনে এনে ভাতের বাসন দেয়। ভাতের দিকে হাত বাড়াতে ভয় পায় জমির। আরো একবার সে শৌচাগারের দিকে তাকায় আরও একবার ভাবে, "পেটে ভাত না থাকলে টাক্কি দিয়ে কি হবে?"  

Comments

    Please login to post comment. Login