চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ব্রেন ডেথ’ বা মস্তিষ্কের মৃত্যু মানে এক চূড়ান্ত ও নির্মম যবনিকাপাত—যেখান থেকে আর কোনোদিন, কোনো পথেই আলোতে ফেরা যায় না। কৃত্রিম যন্ত্রের নির্মম ছন্দে হয়তো বুকটা ওঠানামা করে, ধমনীতে রক্ত ছুটে চলে, কিন্তু শরীরের মূল চালিকাশক্তি যেখানে চিরতরে স্তব্ধ, সেখানে জীবন শব্দটাই এক যান্ত্রিক অভিনয়, এক করুণ প্রহসন।
এই একই রূপক যখন আমরা আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি আর সমষ্টিগত চেতনার ওপর দর্পণ হিসেবে ধরি, তখন তার অবয়বটি হয়ে ওঠে আরও বেশি শিউরে ওঠার মতো। এটি এক নীরব, অদৃশ্য মহামারী। একটি সমাজের বাইরে চোখধাঁধানো চাকচিক্য থাকতে পারে, আকাশছোঁয়া অট্টালিকা আর যান্ত্রিক কোলাহলে চারপাশ মুখরিত হতে পারে; কিন্তু তার ভেতরের আত্মিক চিন্তা, মানবিক নৈতিকতা আর প্রাণবন্ত সৃজনশীলতা যদি অসাড় হয়ে পড়ে, তবে সেই সমাজ আসলে লাইফ সাপোর্টে থাকা এক জীবিত লাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ভয়াবহ পতন রাতারাতি আসে না; এটি নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে সমাজকে গ্রাস করে, যার প্রথম ক্ষতটি তৈরি হয় মানুষের চিন্তার স্থবিরতায়।
চিন্তার এই অচলাবস্থা সমাজকে এক অন্ধকার চোরাবালিতে আটকে ফেলে। যখন একটি জনপদের মানুষ নতুন কোনো ধারণাকে বুকে টেনে নিতে ভয় পায়, প্রগতি আর বিজ্ঞানের আলো থেকে অন্ধের মতো চোখ ফিরিয়ে নেয়, আর কেবল অতীতচারিতা বা প্রাচীন গোঁড়ামির মরচে পড়া শিকলকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়—তখন বুঝতে হবে সেই সমাজের সমষ্টিগত মনস্তত্ত্বের মৃত্যু ঘটেছে। জ্ঞান যেখানে প্রশ্নহীন দাসত্বে রূপ নেয় এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে যেখানে অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, সেখানে সমাজ তার নিজস্ব সত্ত্বা হারিয়ে ফেলে। এই বন্ধ্যাত্ব মানুষকে হুজুগে আর অন্যের ইশারায় চলা এক রোবটে পরিণত করে, যে নিজের ভালো-মন্দ বিচার করার আদিমতম ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
চিন্তার এই মৃত্যু সরাসরি আঘাত করে সমাজের নৈতিকতার হৃৎপিণ্ডে। ন্যায়-অন্যায় বোধের এই যে ধীর বিলুপ্তি, যেখানে মানুষ নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য অপরের বুক চিরে রক্ত নিতেও দ্বিধা করে না, যেখানে চোখের সামনে অন্যায় দেখেও সমাজ পাথরের মতো নির্বিকার চেয়ে থাকে—তা আসলে এক চরম আত্মিক পক্ষাঘাত। যে সমাজ আর কোনো আর্তনাদে গর্জে ওঠে না, যে সমাজ অন্যের যন্ত্রণায় সমব্যথী হতে ভুলে গিয়ে কেবল নিজের সুরক্ষার বৃত্তে মুখ লুকিয়ে বাঁচে, তাকে কোনোভাবেই জীবিত বলা চলে না। নৈতিকতাহীন এই সমাজ বাইরে থেকে দেখতে যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক না কেন, ভেতর থেকে তা আসলে এক পচা-গলা গলিত শব।
আর এই সামগ্রিক বন্ধ্যাত্বের সবচেয়ে বড় বলিদান ঘটে মানুষের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার ওপর। সৃজনশীলতা হলো মানব সভ্যতার সেই প্রাণরস, যা আমাদের প্রতিনিয়ত ডানা মেলতে শেখায়, নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। কিন্তু যে সমাজে নতুন কিছু সৃষ্টি করার চেয়ে পুরোনো স্রোতে গা ভাসানো সহজ, যেখানে ভিন্নমত বা অভিনব কোনো সৃষ্টিকে অবহেলা, উপহাস আর তীব্র ঘৃণায় পিষে ফেলা হয়, সেখানে সৃজনশীলতার অপমৃত্যু ঘটে। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান বা দর্শনের আঙিনায় যখন নতুন কোনো জোয়ার আসে না, মানুষ যখন কেবল ধার করা অনুকরণে তৃপ্ত থাকে, তখন সমাজ পরিণত হয় এক তপ্ত, নিষ্ফলা মরুভূমিতে।
মস্তিষ্কের এই সামাজিক ও মানসিক মৃত্যু আমাদের এক ভয়ানক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এটি আমাদের চিৎকার করে মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা, নিশ্বাস নেওয়া বা বাহ্যিক উন্নয়নই একটি জীবন্ত সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। একটি সমাজ তখনই বেঁচে থাকে, যখন তার চিন্তার নদীতে জোয়ারের স্রোত থাকে, যখন তার নৈতিকতার ভিত থাকে পাহাড়ের মতো মজবুত, আর যখন তার সৃজনশীলতার আকাশে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয়। এই প্রাণের স্পন্দনগুলো হারিয়ে গেলে যে অন্ধকার নেমে আসে, তা আসলে এক জীবিত লাশের পদচারণা মাত্র—যা নিজের অজান্তেই সমাজকে এক মহাধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে নিয়ে যায়।
346
View