আসমান দশম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষা শেষ করার পর হঠাৎ করেই একদিন পুরোদস্তুর নামাজি হয়ে গেল। পুরোদস্তুর বলতে একেবারে ফজর থেকে শুরু করে এশা পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে আদায় করতে লাগলো। এভাবে হঠাৎ করে কঠোর নামাজি হয়ে উঠার বিষয়টা আসমানের বাবা, মা, এমনকি তার ছোট ভাই-বোনগুলোর যেমন নজর এড়ায়নি, তেমনি পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজনদেরও নজর এড়াতে পারেনি। এই বয়সটা ভয়াবহ, দুর্বিসহ। বিশেষ করে, দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করার আগ পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে ছেলেমেদের মধ্যে একটা ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তাই, এসএসসি পরীক্ষার আগ মুহুর্তে যখন একটা ছেলে হঠাৎ করে নামাজি হয়ে ওঠে, সেটা বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন সবার কাছে সন্দেহের উদ্রেক করে। তাছাড়া, টিভিতে প্রতিদিন খবর, বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে, এগুলো জঙ্গিবাদের পূর্ব লক্ষণ। এভাবে, হঠাৎ করে কেউ যখন নামাজি হয়ে যায়, টুপি পরা শুরু করে, দাঁড়ি রেখে দেয়, তাদের দিকে লক্ষ্য রাখার জন্য সরকার অভিভাবকদের নির্দেশ দিচ্ছে। আসমানের বাবা ও মা, দুজনেই উদ্বিগ্ন, কি হল আসমানের? ছেলেটা হঠাৎ করে এরকম হয়ে গেল কেন? যে ছেলে রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত পড়াশুনা করে ঘুমাতে যেত আর সকাল নয়টা-দশটার আগে ঘুম থেকে উঠতো না, সে ছেলে এখন ভোর সাড়ে চারটায় এলার্ম দিয়ে ঘুম থেকে উঠে মসজিদে চলে যাচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, তার পোশাক-আশাক, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার সবই দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে শার্ট-প্যান্ট ছিল তার একমাত্র পোশাক, লুঙ্গিও পড়তে চাইতো না; আর এখন গত ঈদে কিনে দেওয়া পায়জামা, পাঞ্জাবি আর টুপি পড়ছে ছয় প্রহর। পায়জামা আবার কেটে ছোট করে নিয়ে আসছে। মেয়েদের মতো টাখনুর উপরে পড়ছে। রাস্তায় যাকে তাকে সালাম দিচ্ছে, তার সালাম থেকে রিকসাওয়ালা থেকে শুরু করে ছোট বাচ্চারা, এমনকি ভাই বোনও বাদ যাচ্ছে না। আসমানের এসব কর্মকান্ড দেখে তার বাবা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন, চিন্তিত। আসমানের স্কুলের গণিত মাস্টারের সাথে সেদিন তার রাস্তায় দেখা। মাস্টার সাহেবও তার উদ্বেগের কথা জানালেন,
“আসমানের কি হলো, বলেন দেখি? কয়েকদিন ধরে তার মতিগতি, চালচলন তো আমার ভালো লাগছে না,” মাস্টার সাহেব আসমানের বাবাকে জিজ্ঞাসা করলেন। আসমানের বাবার বুঝতে বাকী থাকে না, মাস্টার সাহেব কি বলছেন।
“স্যার, আমিও তো বুঝতে পারছি না; হঠাৎ করে গত পনেরো বিশ দিন ধরে তার পোশাক-আশাক, চাল-চলন বদলে গেছে, একেবারে হুজুরদের মতো………” বলতে গিয়ে থেমে যান আসমানের বাবা।
মাস্টার সাহেব তাকিয়ে থাকেন। আসমানের বাবা কথা শেষ না করে চুপ করে থাকেন, তার কন্ঠটা হঠাৎ যেমন একটু শক্ত হয়ে আসে।
“আরিফ সাহেব, একটু খোঁজ খবর নেন; পরিবেশটাতো ভালো না, আর বয়সটাও রিস্কি। কাদের সাথে চলাফেরা করে দেখেন, পরে কি না কি হয়ে যায়।” মাস্টার সাহেব বিরতি দিয়ে আবার বলা শুরু করেন,
“আসমান অসম্ভব মেধাবী ছেলে, সে আমাদের স্কুলের স্মরণাতীত কালের সেরা শিক্ষার্থী। তাকে নিয়ে আমাদেরও অনেক স্বপ্ন, এই সময় যদি সে খারাপ কারো পাল্লায় পড়ে অন্য লাইনে চলে যায়, সেটা হতাশা জনক।” মাস্টার সাহেব আসমানের বাবাকে যেমন সতর্ক করে, তার মনে উদ্বেগকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সন্ধ্যার পর, আসমানের মায়ের সাথে কথা বলেন আসমানের বাবা।
“আসমানরে নিয়ে তো চিন্তায় আছি, ও কাদের সাথে মিশে, কি করে খেয়াল রাখো কিছু?” আসমানের মা অত্যাল্প শিক্ষিত মহিলা, বাড়ির বাইরে যাননা খুব একটা, কিন্তু বাড়ির ভেতরে কি হচ্ছে, বিশেষ করে তার ছেলেমেয়েরা কি করছে সেটা তার নজর এড়ানোর নয়।
“বাড়িতে তো কাউকে আসতে দেখি না, ও ওর রুমে সারাদিন পড়াশোনা করে, নামাজ পড়ে, মাসুদের সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ি চলে আসে।” মাসুদের নাম শুনে কার্য এবং কারণ যুক্তিসঙ্গত মনে হয় আসমানের বাবার। মাসুদের পরিবার একেবারে রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবার। তারা মানুষকে দাওয়াত দেয়, ব্রেইন ওয়াশ করে, নামাজি করে, এসব আসমানের বাবা জানে। তাদের পাল্লায় পরেই কি আসমান আজ ঐ পথে পা বাড়াচ্ছে? মনের সকল ভাবনা আসমানের বাবা প্রকাশ করে না।
“পড়াশোনা করে ঠিক মত?” আসমানের মাকে জিজ্ঞাসা করে।
“সন্ধ্যার পরেতো বাসায়ই থাকে, এশার নামাজ পড়ে এসে কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়ে।”
তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া তো ভালো, কিন্তু দুইতিন মাস পর পরীক্ষা, আগে সে রাত দুইটা তিনটা পর্যন্ত পড়তো, এখন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে, আল্লায় জানে ছেলে কি রেজাল্ট করে, আসমানের বাবা মনে মনে ভাবে।
“ওর দিকে একটু ভাল করে নজর রাখো, সময়তো ভালো না।” আসমানের মাকে সতর্ক করে আসমানের বাবা।
আসমানের বাবা একজন সরকারী তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। আয় উপার্জন তেমন ভালো না। এই ছোট-খাটো চাকরি করেই এই মফস্বলে চার ছেলে মেয়ে নিয়ে বসবাস করেন। বাড়িটা নিজের বলে রক্ষা। নয়তো, বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হলে মুশকিল হয়ে যেতো। তিনি জন্মগতভাবে মুসলিম, কিন্তু তার ইসলামিক জ্ঞান বয়সের কারণে যতটুকু অর্জিত হয়েছে সেটাই। আলাদা পড়াশুনা করে তার কিছু শেখার সুযোগ হয়নি। তিনি নিয়মিত জুমার নামাজ পড়েন। ইবাদাতের বিষয়ে, বিশেষ করে নামাজের ব্যাপারে তিনি তেমন কঠোর না, নিজেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারেন না, ছেলেমেয়েদেরও জোর করেন না। তার ধারণা, ছেলে মেয়ে যখন বুঝতে শিখবে তখন এমনিতেই পড়বে, এখন পড়াশুনার বয়স।
তবে, এ কথাও সত্য, তিনি নিজেকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। নামাজটা এখন তার শুরু করা দরকার বলে মানেন। কিন্তু, দীর্ঘ অনভ্যাসের কারণে নামাজটা ধরতে পারছেন না। তবে, তিনি নিয়ত করেছেন, বয়স চল্লিশ হলেই তিনি নিয়মিত নামাজ পড়া শুরু করবেন। নবীজিও বয়স চল্লিশের পরেই নামাজ ধরেছেন বলে তিনি কোন এক ওয়াজে শুনেছেন। তিনিও সেই আশায় আছেন। সেটা তো তার নিজের ক্ষেত্রে, কিন্তু, আসমানের বয়স মাত্র ষোল বছর। এই অল্প বয়সে তার এতো কঠোর নামাজি হওয়ার দরকার কি? তাও আবার পড়াশোনা নষ্ট করে।
আসমানের বাবা জানেন, ষোল নয়, সাত বছর থেকেই নামাজ পড়া উচিৎ, দশ বছরে কোন ছেলে মেয়ে যদি নামাজ না পড়ে, তাদের শাসন করা উচিৎ, প্রহারও করা যায়। সবই ঠিক আছে, তবে, আজকাল সমাজ-সভ্যতা অন্যরকম। এখানে পড়াশোনা না করলে, ভাল ফলাফল না করলে, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এখানে নামাজের চেয়ে পড়াশোনা বেশির দরকার। এসব ভাবতে ভাবতেই, আসমানের বাবার মাথায় কি যেন একটা বিষয় আসে। সে তার বড় মেয়েকে ডাকে,
“জাবেদা, আসমানের রুমে ওর স্কুলের বই ছাড়া অন্য কোন বই আছে কিনা, একটু দেইখো তো, পাইলে কালকে আমাকে নামগুলি লেইখ্যা দিবা।”
আসমানের বাবা ও মায়ের উদ্বেগ ও সতর্কতা দেখে, আসমানের এই পরিবর্তনকে তার ছোট ভাইবোনও ভয়ঙ্কর কিছু হিসেবেই নিচ্ছে। তারাও আসমানের কাছ থেকে একটু দূরে দূরে থাকছে। আসমান যখন জাবেদাকে সালাম দেয়, সে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
পরের দিন, সন্ধ্যায়, আসমানের বাবা বাসায় আসার সাথে সাথেই জাবেদা দৌড়ে তার বাবার কাছে যায় আর একটা চিরকুট হস্তান্তর করে।
“আব্বু, ভাইয়ার রুমে এই বইগুলো পাইছি,” জাবেদা জানায়।
আসমানের বাবা হাইপার মেট্রোপিয়ার রোগী। পকেট থেকে চশমা বের করে চোখে পড়ে, চিরকুটটা দেখে। সেখানে তিনটা বইয়ের নাম লেখা। আর রাহীকুল মাখতুম, শামায়েলে তিরমিজি আর আল আযকার। লেখা বাংলায় হলেও শব্দগুলো মনে হয় আরবী, তাই এসব বইয়ের বিষয়বস্তু কি তা তিনি ধারণা করতে পারেন না। চিরকুটটি পকেট থেকে ডাইরী বের করে সেখানে রেখে দেন। আগামীকাল অফিসে গিয়ে বড় স্যারকে দেখাতে হবে। তিনি বুজুর্গ মানুষ, নামাজি, ইসলাম বিষয়ে তার ভাল জ্ঞান, তিনি বলতে পারবেন এগুলো কিসের বই।
********
“আরিফ সাহেব, আপনি এতো চিন্তা করছেন কেন? এগুলো তো ভাল বই, এগুলো সব মুসলিমের ঘরেই থাকা উচিৎ। আপনি পড়েন নাই, আপনার ছেলে পড়ছে, ওর পড়া শেষ হলে আপনিও নিয়ে পড়বেন।” পরের দিন অফিসে বড় স্যারের কথায় আসমানের বাবা কলিজায় পানি ফিরে পান। আসমান কোন জঙ্গি বইটই পড়ছে না।
“কিন্তু, স্যার, এখন ওর পড়াশোনা করার কথা; দুই তিন মাস পর ওর এসএসসি পরীক্ষা, এখন এসব বই পড়লে পড়াশুনার ক্ষতি হবে না?” আসমানের বাবা চিন্তিত বদনে বড় স্যারকে জিজ্ঞাসা করে।
“আরিফ সাহেব, শুনেন, দুনিয়াটাই তো সব না, আখিরাতই সব। আখিরাতই আসল। দুনিয়ার সব জ্ঞান দিয়ে যদি আপনি বেহেশতে যেতে না পারেন, আপনার এই জ্ঞানের ভ্যালু শূন্য। দুনিয়ার জ্ঞান দরকার আছে, কিন্তু সেটা আখেরাতের জ্ঞান বাদ দিয়ে নয়, বরং আখেরাতের জ্ঞানকে আগে রাখতে হবে। আপনার ছেলে সম্পর্কে আমি জানি, ও ভয়ানক মেধাবী, আর সে মেধাবী বলেই সঠিক পথ এতো দ্রুত আবিষ্কার করতে পেরেছে, যেটা আপনি এখনো পারেননি। আমার ধারণা, আপনার ছেলে বুঝেশুনেই এই পথে নেমেছে।"
আসমানের বাবা চুপ থাকেন। বড় স্যার জ্ঞানী মানুষ। তার কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে, বাপ দাদা থেকে পাওয়া যে ইসলাম, সেটা আবেগের ইসলাম। সেখানে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে বলেই মনে হয় আসমানের বাবার। কিন্ত, তার ছেলের এই আকস্মিক পরিবর্তনে অন্য কারো হাত আছে কিনা, কোন দুরভিসন্ধি আছে কিনা, সেটাও তো ভাবার বিষয়। শফিকুর রহমান, আসমানের বাবার মনের শঙ্কা বুঝতে পেরে তাকে পরামর্শ দেন,
“আরিফ সাহেব, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আপনি এক কাজ করেন, আপনি আসমানের সাথে একটু আলাদা কথা বলেন, সে কি কি বলে আমাকে জানাইয়েন, তাহলেই আমি সব বুঝতে পারবো।”
*****
সন্ধ্যার সময় আসমানের কক্ষে প্রবেশ করতেই আসমান তার বাবা ও মাকে আলাদা করে সালাম দেয়। আসমানের বাবা মা দুজনেই স্তম্ভিত হন। ফ্যামিলির ভেতরে এভাবে সালামের প্রচলন নেই আরিফুল ইসলামের পরিবারে। শুধু মাত্র বাইরে থেকে কোন বয়স্ক মুরুব্বি আসলে সালাম দিতে হয় এটাই তিনি ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছেন। তাই, সালামের উত্তর তিনি ক্ষীণ কন্ঠে দিয়ে, আসমানের টেবিলের লাগোয়া খাটে দুজনেই বসে।
“আসমান, তোমার সাথে কিছু বিষয়ে কথা বলা দরকার?” আসমানের বাবাই কথা শুরু করেন।
“জ্বি, আব্বা, বলেন।”
“গত বেশ কিছুদিন ধরে তোমার চাল-চলন, কতা-বার্তা, পোশাক-আশাক, এগুলো নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি, তুমি হঠাৎ করে এরকম হয়ে গেছে কেন?”
আসমান আগে থেকেই জানতো আজকে অথবা কালকে তাকে এই বিষয়ে উত্তর দিতেই হবে। আজকে তার বাবা, মা এসেছে, কালকে পাড়া-প্রতিবেশি, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, সবাই জিজ্ঞাসা করতে পারে। তবে, আসমান শঙ্কিত নয়। আসমান যা বেছে নিয়েছে তা বুঝে শুনেই বেছে নিয়েছে।
“আব্বা, চিন্তার কি আছে এখানে? আমি একজন মুসলিম, আমার বয়স ষোল বছর, আমার উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ, আমি কিভাবে নামাজ না পড়ে থাকতে পারি?”
এই যুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তি দেয়ার মত শক্তি একজন মুসলমানের থাকার কথা নয়, আসমানের বাবাও প্রতি-যুক্তি দাঁড় করাতে পারলেন না। তিনি স্বল্প সময় চুপ থাকলেন।
“না, ঠিক আছে, নামাজ পড়া ভালো, এটা নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই, কিন্তু, সামনে তোমার পরীক্ষা, তোমার পড়াশুনায় কোন ক্ষতি হয় কিনা? এখন তো আগের চেয়ে বেশি পড়াশোনা করা উচিৎ। রুটিন অনুযায়ী পড়াশোনা করা দরকার, নাকি? জিপিএ-৫ না পেলে কলেজে ভর্তি হতে কত সমস্যা, তুমি তো বুঝ।” আসমানের বাবা তাকে নিজের জ্ঞানে বোঝাতে চেষ্টা করলেন।
“আব্বা, আপনি চিন্তা করবেন না, জিপিএ-৫ পাবো কিনা, তা আল্লাহই ভালো জানেন, আমি আমার আপ্রাণ চেষ্টা করবো। আমি রুটিন মাফিক পড়ছি। ঐ যে দেখেন আমার রুটিন, আমার পড়াশোনায় কোন ক্ষতি হচ্ছে না।”
আসমানের বাবা, আসমানে টেবিলের বিপরীতে রাখা দেয়ালের রুটিনে চোখ রাখে। এই রুটিন গত মাসে ছিল না। রুটিনে কিছু পরিবর্তন লক্ষনীয়। আগের রুটিন ছিল সময় কেন্দ্রিক, এখনকারটা নামাজকেন্দ্রিক। আগের রুটিনটা আসমানের বাবার স্পষ্ট মনে আছে, সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটা, বাংলা; আটটা থেকে নয়টা, ইংরেজি; নয়টা থেকে দশটা, পদার্থ বিজ্ঞান; দশটা থেকে সাড়ে দশটা খাবার; সাড়ে দশটা ত্থেকে সাড়ে এগারোটা রসায়ন; সাড়ে এগারো থেকে সাড়ে বারো, জীববিজ্ঞান ইত্যাদি, কিন্তু, এই রুটিনটা আলাদা, এখানে লেখা, মাগরবি থেকে এশা, বাংলা; এশা থেকে খাবার আগ পর্যন্ত ইংরেজি; খাবারের পর এক ঘন্টা পদার্থ; ফজরের পর থেকে এক ঘন্টা রসায়ন; দ্বিতীয় ঘন্টা জীব বিজ্ঞান ইত্যাদি। রুটিনের এই ভাষাগত পরিবর্তন আরিফ সাহেবের চিন্তাকে আরো গভীরে নিয়ে যায়। কিন্তু, তিনি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে, শুধু নামাজের বিষয়ে থাকতে চান,
“বাবা আসমান, নামাজ পড়ার বয়স তো আর তোমার চলে যায় নাই, তোমার সামনে তো সারাজীবন পড়েই আছে।” বাবার বোকামিতে আসমান অবাক না হয়ে পারে না। কিন্তু, বাবার সাথে বেয়াদবি হতে পারে এমন কোন কিছু বলা ঠিক হবে না। আসমান শুধু এতটুকুই বলে,
“আব্বা, মানুষ কী জানে সে কতদিন বাঁচবে? আমি আজকে বেঁচে আছি, কালকে বেঁচে থাকবো, এমন কোন নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবে? আমরা কেন সে আশায় থাকবো?”
আসমানের কথা আসমানের বাবাকে আরো চিন্তায় ফেলে দেয়। তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। তিনি নিয়ত করেছেন, বয়স চল্লিশ হলে তিনি নামাজ শুরু করবেন, তার মনে ভয় সৃষ্টি হয়, তিনি কি চল্লিশ পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন, এই নিশ্চয়তা তাকে কে দিয়েছে? আসমানের বাবা মনে মনে নরম হয়ে পড়েন।
“আসমান, নামাজ নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই, এর বাইরেও তোমার পোশাক-আশাক নিয়ে বাইরের মানুষ অনেক কথা বলে, অনেকে খারাপ কিছু সন্দেহ করে, আমাদের শত্রুর অভাব নাই, বাবা, আমরা তো চিন্তায় থাকি। কখন জানি, পুলিশ টুলিশের ঝামেলা হয়।"
আসমান তার বাবা-মা'র চিন্তার কারণ বুঝতে পারে।
“আব্বা, আপনি কোন চিন্তা করবেন না, আমি খারাপ কিছু করছি না, খারাপ কারো সাথে মিশি না, ইনশাহ আল্লাহ, এরকম কিছু হবে না।”
আসমানের মা এতক্ষণ শুনছিলেন ছেলের কথা। তিনি আসমানকে পরামর্শ দেন, “তুই নামাজ পড়িস, ঠিক আছে। পায়জামা-পাঞ্জাবী, টুপি এগুলো আপাতত না পড়লে হয় না? শার্ট-প্যান্ট পড়ে নামাজ পড়। তাইলেও তো কিছুটা রক্ষা।” মা-বাবা'র উদ্বেগ বুঝতে দেরী হয় না আসমানের। কিন্তু, আসমানের সংগ্রামটাও মা-বাবা হিসেবে তাদের বুঝা উচিৎ।
“ মা, আপনারা আমাকে ছোটবেলা থেকে নামাজের অভ্যাস করাননি। এমনকি, জাবেদা, হামিদা, শাফায়েত, কাউকেই নামাজের জন্য তাগাদা দেননা। বড় হয়ে যাওয়ার পর এই অভ্যাস করা কঠিন কাজ। আমাকেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। অভ্যাস গঠন করা অনেক কঠিন কাজ। পায়জামা-পাঞ্জাবী, টুপি পড়লে আমার মন নামাজের জন্য সচেতন থাকে, আমি আগ্রহ পাই। আর এইগুলো আরামদায়ক। বাহ্যিক ইসলামিক পরিবেশ, পোশাক-আশাক, চাল-চলন দেখলে ছোটরাও এগুলোতে ধীরে ধীরে অভ্যস্থ হবে। আর কোন কারণ নেই।”
আসমানের মা আর কি বলবেন বুঝতে পারেন না। এই কথাগুলো কি আসমানের নাকি কেউ তাকে মুখস্থ করিয়ে দিয়েছে তিনি বুঝতে পারেন না। যত প্রশ্ন তাদের মনে আছে যেন সব প্রশ্নের উত্তর সামনে নিয়ে বসে আছে আসমান। তাই, প্রশ্নে না গিয়ে আসমানের বাবার মত তার মাও তাকে পরামর্শ দেয়,
“ আসমান, স্কুলে গেলে এইগুলো পড়ে যাইওনা, স্কুলে ড্রেস পরে যেও।”
“মা, এখন তো স্কুল ড্রেস নাই, প্রি-টেস্টের পরে স্কুল ড্রেস বাধ্যতামূলক না। রফিক, কালাম, সবাই জিন্স, টি-শার্ট পড়ে স্কুলে যায়। ঐসব ড্রেস আমার কাছে আন-ইজি লাগে।”
আসমানের কথার পর আর কি বলার থাকে? আসমানের মায়ের মাতৃমন খুশি হতে চায়, আসমান নামাজি হতে চাইছে, ভাল মুসলিম হতে চাইছে। কিন্তু, উদ্বেগ তার মন থেকে যায় না। এই সমাজ সহজে ভালোকে, সত্যকে মেনে নিতে চায় না। কোন এক কালো শক্তি ভালো শক্তিগুলো ভয় নামক বন্দুক দিয়ে তাড়িয়ে বেড়ায়। যেদিন থেকে তার ছেলে নামাজি হয়েছে, সেদিন থেকে তার পেছনে কিছু মানুষ লেগেছে। জাহেরা খাতুন বুঝতে পারেন, শুধু মানুষ নয়, এই সমাজ, এই দেশ আসমানের মত যুবকদের পিছনে লেগেছে, তাদেরকে ভয় দেখিয়ে ইসলাম থেকে দূরে রাখার সব বন্দোবস্ত করে রেখেছে। আসমানকে এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করেই সারা জীবন টিকে থাকতে হবে। তবুও আসমানের জন্য মনে মনে তিনি প্রাণ ভরে দোয়া করেন।
আসমানের বাবা আসমানের কথা শুনছিলেন। তিনি জানেন, আসমানকে আর বুঝিয়ে নিবৃত করা যাবে না। আসমান অত্যন্ত মেধাবী, আর মেধাবী বলেই হয়তো সে সত্যান্বেষী এবং সে সত্যকে খুঁজে পেয়েছে। তিনি শুধু নিজের উদ্বেগের কথা আসমানকে অবগত করেন।
“আসমান, এই নামাজ পড়া, পায়জামা-টুপি পড়া, এসব আমাদের পাশেপাশের মানুষ ভালোভাবে দেখে না, আর টিভিতে সব সময় বলে এগুলো জঙ্গিবাদের লক্ষণ, আমরা তো ভয়ে থাকি, কখন না আবার বাড়িতে পুলিশ আসে।” আসমান তার বাবাকে নিশ্চিন্ত করে,
“আব্বা, আম্মা, আপনারা কোন চিন্তা করবেন না। আল্লাহ যদি কাউকে বিপদে ফেলতে চান তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না, আর আল্লাহ যদি কাউকে রক্ষা করেন, তাকে কেউ কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আপনার আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। ইনশাহ আল্লাহ, আমার কোন বিপদ হবে না।”
আসমানের কথা তার বাবা মুগ্ধ হয়ে শুনে। একমাস আগেও ছেলের মুখের কথা এতো বুদ্ধিদীপ্ত ছিল না। এই ছেলেটি হঠাৎ করে কিসের পরশ পেয়ে এরকম বদলে গেল তা জানতে ইচ্ছে হয় আসমানের বাবার।
“আসমান, এসব কথা তুমি কার কাছ থেকে শিখেছো?”
“ আব্বা, টেন এ ফার্স্ট হওয়ার পর আপনি আমায় এক হাজার টাকা দিলেন না? আমি সেটা দিয়ে আমি কুরআনের একটা বাংলা অনুবাদ কিনেছি, একটা হাদিসের বই, আর কতগুলো ইসলামি বই কিনেছি। আমি প্রতিদিন এক ঘন্টা করে ইসলামিক বই পড়ি।” আসমানের বাবা তার দিকে তাকিয়ে থাকে। আসমান হাত দিয়ে টেবিলের এক পাশে রাখা পাঁচ ছয়টা বই দেখায়। আসমান একটা মাঝারী সাইজের বই হাতে নেয়।
“আব্বা, এটা কুরআনের বাংলা অনুবাদ। ছোটবেলায় যখন আরবীতে পড়তাম কিছুই বুঝতাম না, এখানে বাংলা আছে। পড়লে সব বুঝতে পারি। এটাই মানুষের জীবনের সকল সমস্যার একমাত্র নির্ভুল সমাধান।”
আসমানের বাবা শোনে, তার চোখ ছলছল করে। তিনি অশ্রু সংবরণ করেন। তিনি একজন মুসলিম অথচ কুরআনে আল্লাহ কি বলেছেন, তিনি জানেন না। কোন দিন বাংলা কুরআন পড়েন নাই। হুজুরদের কাছে যা শুনেছেন তাই জেনেছেন, তাই বিশ্বাস করেছেন। আজ আসমানের কথা শুনে মনে হল, না, নিজের পড়ে দেখা উচিৎ, তিনি সারা জীবন যা জেনেছেন তা সঠিক, নাকি এখানে অন্যকিছু লেখা আছে। তিনি কুরআন হাতে নিয়ে দেখতে চান, কিন্তু, তার ভয় করে, তিনি ওযু করেন নাই, এই অবস্থায় হাতে নিলে যদি গুনাহ হয়।
আসমান তার বাবাকে বলে, “আব্বা, এটা আপনি নেন, যখন সময় পান পড়বেন।"
“পরে নিবো, আমার এখন ওযু নাই।”
“এটা হাতে নিতে অযু লাগবে না, আব্বা। এটা বাংলা অনুবাদ, আপনি নিতে পারেন, যখন মন চায় পড়বেন।”
ক্ষীণ কম্পিত হাতে আসমানের বাবা কুরআন খানা হাতে নেন। তার পুরো গায়ে একটা শিহরণ সৃষ্টি হয়। মনে হয়, বিশাল একটা কিছুর ভার তিনি কাঁধে নিলেন।
“আব্বা, আপনার মনে যত প্রশ্ন আছে, এটা পড়তে থাকেন, ইনশাহ আল্লাহ, সব প্রশ্নের উত্তর আপনি ধীরে ধীরে এখানে পেয়ে যাবেন। আপনি পড়তে শুরু করেন।"
যেন একটা নতুন জীবনের সন্ধান পেলেন, এমন একটা আত্মসন্তুষ্টি আসমানের বাবা দেহ ও মনকে ছুয়ে যায়। আসমানের মা বাংলাও ঠিকমত পড়তে পারে না। আসমান তার বাবাকে অনুরোধ করে, "আব্বা, আপনি পড়বেন, আম্মাকেও পড়ে শোনাবেন।"
আসমানের বাবা ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। আসমানও দাঁড়ায়, “আব্বা, সামনে আমার জন্মদিন, একটা গিফট চাইবো, দিবেন?”
আসমানের বাবা আসমানের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখ দিয়ে কোন শব্দ আসে না। নীরব ইশারায় সম্মতি দেন।
“আব্বা, আপনার বয়স তো কম হলো না। আপনি যদি নামাজ পড়া শুরু করেন, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার হবে। আমি সারাজীবন আপনার এই উপহারের কথা মনে রাখবো।”
আসমান উপহার হিসেবে যা চাইলো তা কঠিন কিছু না, আবার আসমানের বাবার পক্ষে তা দেয়া সহজও নয়। তিনি যে অভ্যাসের দাস হয়ে আছেন। তিনি আগের মতই নীরব থাকেন। আসমানের পিঠে তিনি হাত রাখেন। চোখের ভাষায় আসমান সম্মতিসূচক ইঙ্গিত পায়। আসমান খুশি হয়। আসমানের বাবা, মা আসমানের কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। সামিনে তার বাবা, পিছনে তার মা। পাশের কক্ষটা আসমানের কাছে বেশি আলোকিত মনে হয়। তার মনে হয়, এভাবেই যদি বাবার পেছনে মা, দুজনেই বেহেশতে যেতে পারতেন, কত বড় সাফল্য হত সেটা। বাবা-মা কি জানেন?