Synopsis
পৃথিবীতে কিছু ভালোবাসা আছে, যার গভীরতা আমরা বুঝতে পারি অনেক দেরিতে। বাবার ভালোবাসা তেমনই এক নীরব ভালোবাসা। বাবা খুব বেশি কথা বলেন না। তিনি হয়তো প্রতিদিন সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেন না “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” কিন্তু তাঁর প্রতিটি পরিশ্রম, প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি চিন্তা এবং প্রতিটি নীরব অপেক্ষার মধ্যে লুকিয়ে থাকে সেই ভালোবাসার অসংখ্য গল্প। শৈশবে আমরা বাবাকে দেখেছি একজন কঠোর মানুষ হিসেবে। তাঁর শাসন আমাদের কাছে কখনো বিরক্তির, কখনো ভয়ের কারণ হয়েছে। তিনি কেন এত নিয়ম মানতে বলেন, কেন সময়মতো পড়তে বলেন, কেন ভুল করলে বকেন—এসবের উত্তর তখন বুঝিনি।
সময় গড়িয়েছে। আমরা বড় হয়েছি। জীবন আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। একদিন হয়তো নিজের দায়িত্বের ভার কাঁধে নিয়ে বুঝেছি—বাবা কেন এত চিন্তা করতেন। একদিন নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছি—বাবা কেন নিজের প্রয়োজন ভুলে আমাদের প্রয়োজনকে আগে রাখতেন। একদিন ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরে বুঝেছি—পরিবারের জন্য সারাজীবন পরিশ্রম করা মানুষটির ক্লান্তি আমরা কত কম বুঝেছি।
বাবা কখনো নিজের স্বপ্নের কথা বলেননি। সন্তানের স্বপ্নকেই নিজের স্বপ্ন বানিয়েছেন। নিজের নতুন জামা না কিনে সন্তানের জন্য জামা কিনেছেন।
নিজের শখকে দূরে সরিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ দিয়েছেন।
নিজের কষ্ট লুকিয়ে সন্তানের মুখে হাসি দেখেছেন। আর সন্তানের ভবিষ্যৎ একটু সুন্দর হবে—এই আশায় নিজের বর্তমানকে বিসর্জন দিয়েছেন।
বাবার ভালোবাসা অনেকটা ছায়ার মতো। রোদে থাকলে ছায়ার মূল্য বোঝা যায় না। কিন্তু একদিন যখন সেই ছায়া আর পাশে থাকে না, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রোদটুকুও যেন অসহ্য মনে হয়। এই বই শুধু একজন বাবার গল্প নয়। এটি সেই সব বাবার গল্প, যারা নীরবে ভালোবেসেছেন।
এটি সেই সন্তানদের গল্প, যারা বাবার ভালোবাসা বুঝতে বুঝতে হয়তো অনেক দেরি করে ফেলেছে। এটি সেই পরিবারের গল্প, যেখানে বাবার ঘাম দিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি হয়েছে। হয়তো এই বইয়ের কোনো একটি গল্প আপনার নিজের বাবার কথা মনে করিয়ে দেবে।
হয়তো কোনো একটি বাক্য আপনাকে থমকে দেবে। হয়তো মনে হবে “আমার বাবাও তো এমনই ছিলেন।”
আর যদি বইটির কোনো একটি পৃষ্ঠা পড়ার পর আপনি বাবাকে ফোন করে বলেন “বাবা, তুমি কেমন আছো?” অথবা তাঁর পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকেন, তাহলেই এই বইয়ের লেখা সার্থক হবে।
কারণ বাবার ভালোবাসা বোঝার জন্য সবসময় বড় কোনো ঘটনা প্রয়োজন হয় না।
কখনো কখনো শুধু বাবার পাশে বসে তাঁর হাতের দিকে তাকালেই বোঝা যায় সেই হাতে কত বছরের পরিশ্রম জমে আছে,
কত স্বপ্নের দাগ আছে, কত না-বলা ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।
বাবারা চলে গেলে ঘরটা একই থাকে,
দরজাটা একই থাকে,
চেয়াটা একই থাকে,
কিন্তু ঘরের ভেতর থেকে একটি অদৃশ্য নিরাপত্তা হারিয়ে যায়।
তাই বাবা কাছে থাকলে তাঁকে ভালোবাসুন।
তাঁর সঙ্গে কথা বলুন।
তাঁর কষ্টের কথা শুনুন।
তাঁর হাতটি ধরে বলুন—
“বাবা, তোমার জন্যই আজ আমি আমি হতে পেরেছি।” হয়তো বাবা মুখে কিছু বলবেন না। হয়তো শুধু মৃদু হাসবেন। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে আপনি দেখতে পাবেন একজন বাবার সারাজীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সন্তানের মুখে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া। এই বই সেই নীরব ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা। সেই সব বাবার প্রতি ভালোবাসা, যাঁরা নিজের জীবনকে পেছনে রেখে সন্তানের ভবিষ্যৎকে সামনে এগিয়ে দিয়েছেন।
উৎসর্গ
যে মানুষটি নিজের স্বপ্নগুলোকে নিঃশব্দে গুটিয়ে রেখে
সন্তানের স্বপ্নকে বড় করে তুলেছেন—
সেই পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি
এই বই উৎসর্গ করা হলো।
যাঁদের কণ্ঠে ভালোবাসার কথা কম,
কিন্তু যাঁদের নীরবতায় লুকিয়ে থাকে
হাজার বছরের মমতা।
যাঁরা সন্তানের মুখে হাসি দেখার জন্য
নিজের চোখের জল লুকিয়েছেন।
যাঁরা নিজের জন্য কিছু চাননি,
শুধু চেয়েছেন-
“আমার সন্তান যেন ভালো থাকে।”
আর সেইসব সন্তানদের জন্যও,
যারা বাবাকে ভালোবাসে,
কিন্তু অনেক সময় মুখে বলতে পারে না
“বাবা, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি।”