শহরে চলে যাওয়া
বাড়ি থেকে দূরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা কখনোই শুধু একটা জায়গা বদলানোর সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে বদলে যায় অনেক অভ্যাস, অনেক সম্পর্কের দূরত্ব, আর সবচেয়ে বেশি বদলে যায় বাবার সঙ্গে সন্তানের প্রতিদিনের দেখা হওয়ার সুযোগ। ছোটবেলায় যে মানুষটির মুখ সকালে ঘুম ভাঙার পর প্রথম দেখা যেত, একদিন সেই মানুষটাকেই শুধু ফোনের পর্দায় দেখতে হয়। যে মানুষটি প্রতিদিন জিজ্ঞেস করতেন, “খেয়েছিস?” একদিন সেই প্রশ্নটা ফোনের ওপাশ থেকে শুনতে হয়।
শহরে যাওয়ার দিনটা আজও খুব মনে পড়ে। একটা ব্যাগ, কিছু কাপড়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর বুকের ভেতর অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমি বাড়ি ছাড়ছিলাম। মনে হচ্ছিল, এবার নিজের মতো করে জীবন শুরু করব। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন কাজ—সবকিছু যেন আমাকে ডাকছিল। বাড়ির পরিচিত দেয়ালগুলো তখন একটু ছোট মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমার সামনে বিশাল একটা পৃথিবী অপেক্ষা করছে।
বাবা সেদিন খুব বেশি কথা বলেননি।
সকাল থেকেই তিনি আমার ব্যাগ গোছাতে সাহায্য করছিলেন। বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, “সব নিয়েছিস তো?” আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, “হ্যাঁ বাবা, সব নিয়েছি।”
তিনি আবার ব্যাগটা খুলে দেখলেন।
আমি হেসে বললাম, “তুমি কি মনে করো আমি কিছুই বুঝি না?”
বাবা মৃদু হেসে বললেন, “না। শুধু বাবা তো।”
এই “শুধু বাবা তো”—কথাটার মধ্যে কত কিছু লুকিয়ে ছিল, সেটা তখন বুঝিনি।
মা বারবার কিছু না কিছু ব্যাগে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলেন। শুকনো খাবার, ওষুধ, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস। বাবা বলছিলেন, “এত কিছু দেওয়ার দরকার নেই। ওখানে সব পাওয়া যাবে।”
কিন্তু মায়ের চোখে তখন বিদায়ের ভয়।
আর বাবার চোখে ছিল লুকানো হিসাব।
আমি বুঝিনি, বাবা হয়তো হিসাব করছিলেন—আমি শহরে গিয়ে কত খরচ করব, কত টাকা লাগবে, প্রথম কয়েক মাস কীভাবে চলব, কখন বাড়িতে ফিরব, কোনো সমস্যা হলে কী করব।
আমি শুধু ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিলাম।
বাবা হয়তো ভবিষ্যতের ঝুঁকি দেখছিলেন।
বের হওয়ার সময় বাবা আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়তো বলবেন, “যেও না।” কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না।
শুধু বললেন, “নিজের খেয়াল রাখিস।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ।”
“সময়মতো খাস।”
“হ্যাঁ।”
“অতিরিক্ত খরচ করিস না।”
“হ্যাঁ।”
“কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করিস।”
আমি একটু হেসে বললাম, “বাবা, আমি কি এত ছোট?”
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “আমার কাছে তুই সবসময়ই ছোট।”
আমি আর কিছু বলিনি।
গাড়িতে উঠে যখন বাড়ির দিকে তাকালাম, বাবা তখনও দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি হাত নেড়ে বিদায় দিচ্ছিলেন। গাড়ি ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছিল। আমি জানালার পাশে বসে বাবাকে দেখতে দেখতে বুঝলাম, তিনি ছোট হয়ে যাচ্ছেন।
আসলে বাবা ছোট হচ্ছিলেন না।
দূরত্ব বাড়ছিল।
শহরে পৌঁছে প্রথম কয়েক দিন খুব ভালোই লাগল। নতুন জায়গা, নতুন কাজ, নতুন মানুষ। নিজের একটা ঘর। নিজের সময়। কেউ বলছে না কখন ঘুমাতে হবে, কখন খেতে হবে, কোথায় যেতে হবে। মনে হচ্ছিল, এটাই স্বাধীনতা।
কিন্তু স্বাধীনতার প্রথম কয়েক দিন পেরোতেই একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হলো।
সকালে ঘুম থেকে উঠে কেউ বলছে না, “উঠেছিস?”
খেতে বসলে কেউ জিজ্ঞেস করছে না, “আজ কী খাবে?”
রাতে দেরি হলে কেউ দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে না।
সবকিছু নিজের মতো।
তবু কোথাও যেন কিছু নেই।
একদিন রাতে ফোন বেজে উঠল।
বাবা।
আমি ফোন ধরলাম।
“কী করিস?”
“কিছু না।”
“খেয়েছিস?”
“হ্যাঁ।”
“কী খেয়েছিস?”
“বাইরে খেয়েছি।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর বাবা বললেন, “শরীর ঠিক আছে তো?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ।”
আবার নীরবতা।
বাবা বললেন, “ঠিক আছে, ঘুমা।”
আমি বললাম, “তুমিও ঘুমাও।”
ফোন কেটে গেল।
কথা বলতে পাঁচ মিনিটও লাগল না।
কিন্তু ফোনটা কেটে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ আমি চুপ করে বসেছিলাম।
কারণ বুঝতে পারছিলাম—বাবা আসলে জানতে চেয়েছিলেন, “তুই ভালো আছিস তো?”
কিন্তু তিনি সরাসরি সেই প্রশ্নটা করতে পারেননি।
বাবারা অনেক সময় ভালোবাসার কথাগুলো সরাসরি বলতে পারেন না।
তাঁরা জিজ্ঞেস করেন—“খেয়েছিস?”
আসলে বলতে চান—“নিজের যত্ন নিচ্ছিস তো?”
তাঁরা বলেন—“টাকা লাগবে?”
আসলে বলতে চান—“তোর কোনো অভাব আছে কি?”
তাঁরা বলেন—“সময়মতো ঘুমাস।”
আসলে বলতে চান—“তুই যেন অসুস্থ না হোস।”
শহরে থাকার কয়েক মাস পর আমি ধীরে ধীরে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কাজ বাড়ল। নতুন বন্ধু হলো। নতুন দায়িত্ব এলো। ফোনে কথা বলার সময় কমে গেল।
বাবা ফোন করতেন।
আমি কখনো মিটিংয়ে থাকতাম।
কখনো বলতাম, “বাবা, পরে ফোন করছি।”
কখনো ফোন সাইলেন্ট করে রাখতাম।
কখনো দেখেও ভাবতাম, “একটু পরে ফোন দেব।”
সেই “একটু পরে” অনেক সময় রাত হয়ে যেত।
কখনো পরদিন।
কখনো আরও পরে।
বাবা অবশ্য রাগ করতেন না।
পরদিন আবার ফোন করে বলতেন, “কাল ব্যস্ত ছিলি?”
আমি বলতাম, “হ্যাঁ বাবা, অনেক কাজ ছিল।”
তিনি বলতেন, “ঠিক আছে। কাজ কর।”
আমি জানতাম না, ফোন না ধরার পর বাবা কতক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসেছিলেন।
আমি জানতাম না, তিনি হয়তো ভেবেছিলেন—“ছেলের কাজ আছে।”
আমি জানতাম না, বাবা হয়তো আমার ব্যস্ততাকে নিজের একাকিত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে দেখেছিলেন।
শহর আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছিল। নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল। দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছিল। টাকা উপার্জন করতে শিখিয়েছিল। মানুষের ভিড়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে শিখিয়েছিল।
কিন্তু শহর আমাকে আরেকটা জিনিসও শিখিয়েছিল—
দূরত্ব।
বাড়ি থেকে যত দূরে গেছি, বাবাকে তত নতুন করে চিনতে শুরু করেছি।
একদিন মাসের শেষে টাকা কম পড়ে গেল। হাতে প্রায় কিছুই ছিল না। তখন বাবাকে ফোন করতে খুব সংকোচ হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ফোন করলাম।
“বাবা…”
“হ্যাঁ?”
“কিছু টাকা লাগবে।”
বাবা এক মুহূর্তও দেরি না করে বললেন, “কত?”
আমি বললাম।
তিনি বললেন, “ঠিক আছে।”
আমি বললাম, “আগামী মাসে দিয়ে দেব।”
বাবা হেসে বললেন, “আমার টাকা ফেরত দিতে হবে না।”
আমি বললাম, “না বাবা, দেব।”
তিনি বললেন, “তুই ভালো থাক, সেটাই যথেষ্ট।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
কারণ শহরে এসে আমি বুঝতে পেরেছিলাম—টাকার মূল্য কত।
আর বাবা সারাজীবন বুঝেছিলেন—সন্তানের প্রয়োজনের সময় টাকার হিসাব করা যায় না।
বছর কেটে গেল।
একদিন ছুটিতে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ির গেট দিয়ে ঢোকার সময় মনে হলো, সবকিছু একই আছে। কিন্তু আবার কিছুই আগের মতো নেই।
বাবা আগের চেয়ে একটু ধীরে হাঁটছেন।
চুল আরও সাদা হয়েছে।
চোখে চশমা।
হাতে আগের সেই ঘড়ি।
আমি বললাম, “বাবা, কেমন আছ?”
তিনি বললেন, “ভালো।”
তারপর আমার ব্যাগটা নিতে এগিয়ে এলেন।
আমি বললাম, “থাক, আমি নিতে পারব।”
বাবা বললেন, “জানি। তবু দে।”
আমি ব্যাগটা তাঁর হাতে দিলাম না।
সেদিন প্রথমবার মনে হলো—যে মানুষটি আমার ছোটবেলার ব্যাগ বহন করেছেন, আজ তাঁর হাতে ব্যাগ তুলে দেওয়া উচিত নয়; বরং তাঁর পাশে দাঁড়ানো উচিত।
আমি তাঁর পাশে হাঁটতে শুরু করলাম।
বাবা বললেন, “শহরে অনেক কষ্ট হয়?”
আমি বললাম, “হয়।”
“সব ঠিকঠাক চলছে?”
“চলছে।”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ভালো।”
আমি হেসে বললাম, “তুমি আর কিছু বলবে না?”
বাবা বললেন, “কী বলব?”
আমি বললাম, “অনেক দিন পর বাড়ি এসেছি।”
তিনি বললেন, “তাই তো দেখছি।”
আমি বললাম, “তুমি কি আমাকে মিস করো?”
বাবা একটু থেমে বললেন, “এগুলো আবার জিজ্ঞেস করতে হয়?”
আমি হেসে ফেললাম।
বাবাও হাসলেন।
কিন্তু সেই হাসির ভেতর একটা দীর্ঘ অপেক্ষার ছায়া ছিল।
সেদিন রাতে আমি অনেকক্ষণ বাবার পাশে বসেছিলাম। তিনি পুরোনো গল্প করছিলেন। আমি শুনছিলাম। অনেক গল্প আগে শুনেছি, তবু সেদিন মনে হচ্ছিল প্রথমবার শুনছি।
হয়তো বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমরা গল্পের শব্দ নয়, গল্পের ভেতরের মানুষটাকে শুনতে শিখি।
শহরে যাওয়ার আগে আমি ভেবেছিলাম, বাড়ি ছেড়ে গেলে আমি স্বাধীন হব।
বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর বুঝলাম—স্বাধীনতা মানে নিজের মানুষদের থেকে দূরে চলে যাওয়া নয়। স্বাধীনতা মানে নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়া, কিন্তু নিজের শিকড়কে ভুলে না যাওয়া।
আমি শহরে নিজের জন্য একটা জীবন তৈরি করেছিলাম।
আর বাবা দূরের সেই বাড়িতে বসে আমার জন্য অপেক্ষার একটা জীবন তৈরি করেছিলেন।
আমাদের জীবন দুদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
আমি সামনে।
বাবা হয়তো একটু একটু করে অতীতের দিকে।
কিন্তু আমাদের মাঝখানে একটা অদৃশ্য সুতো ছিল—ফোনের ওপাশের একটি কণ্ঠস্বর, “খেয়েছিস?”
সেই প্রশ্নটা কখনো বদলায়নি।
শহর বদলেছে।
সময় বদলেছে।
আমার বয়স বদলেছে।
বাবার চুল সাদা হয়েছে।
কিন্তু বাবার প্রশ্নটা একই রয়ে গেছে।
“খেয়েছিস?”
আজ বুঝি, এই একটি প্রশ্নের ভেতরেই বাবার পুরো ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল।
কারণ পৃথিবী যত বড়ই হোক, মানুষ যত দূরেই যাক, বাবা শেষ পর্যন্ত শুধু এটুকুই জানতে চান—
“আমার সন্তানটা ভালো আছে তো?”