হাঁটাটা যেন শেষই হচ্ছিল না।
প্রতিটি পদক্ষেপ তার নিজের বুকের ফাঁপা গহ্বরে বাজতে থাকা ঢোলের মতো। দর্শকদের গুঞ্জন কখনো ফুলে উঠছিল, আবার হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল—তার পিঠে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো।
সে নিজের দুই কাঁধের মাঝখানে শুপ্তর দৃষ্টি অনুভব করতে পারছিল—যেন সেটা কোনো স্পর্শ। এমন এক উত্তাপ, যা পোড়ায় না, বরং উষ্ণতা ছড়ায়। লেন্সের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীভূত সূর্যের আলোর মতো।
অভ্যস্ত, ধীরস্থির এক শিকারির সৌন্দর্যে সে রিংয়ের সিঁড়ি বেয়ে উঠল। দড়ির ফাঁক দিয়ে ঢুকে মাঝখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
মাথার ওপরের আলো এতটাই তীব্র ছিল যে ক্যানভাসটা একটা মঞ্চের মতো লাগছিল।
তার পৃথিবী সংকুচিত হয়ে গেল রিংয়ের ওই চৌকো জায়গাটুকুতে।
রেজিন আর পুরোনো চামড়ার গন্ধ। জিভের ডগায় প্রত্যাশার ক্ষীণ, তামাটে স্বাদ।
সে কাঁধ ঝাঁকাল। চামড়ার নিচে পেশিগুলো তারের মতো সরে গেল।
আর তাকে দেখতে লাগল।
শুপ্ত তার প্রত্যাশার চেয়ে আলাদাভাবে এগিয়ে এল।
কোনো দম্ভ নেই। অস্থিরভাবে লাফালাফিও নেই।
সে নীরব, প্রায় গম্ভীর মনোযোগ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠল। তার প্রতিটি নড়াচড়া মেপে নেওয়া। দর্শকদের দিকে তাকাল না। উল্লাস, ঠাট্টা কিংবা অবিশ্বাসের হাসি—কোনোকিছুরই জবাব দিল না।
তার চোখ শুধু তার ওপর।
দড়ির নিচ দিয়ে মাথা নামিয়ে ঢোকার পর নিজের পুরো—অসাধারণ কিছু নয় এমন—উচ্চতায় সোজা হয়ে দাঁড়াল।
তারপর শুধু... তাকিয়ে রইল।
পায়ের পাতা থেকে মাথার চূড়া পর্যন্ত ধীরে, একবারে পুরো শরীরটা দেখে নিল।
দৃষ্টিটা চিকিৎসকের মতো নির্লিপ্ত ছিল না। কামনাময়ও নয়।
এটা ছিল স্বীকৃতি।
যেন সে কোনো পবিত্র শাস্ত্রের অক্ষরগুলো মুখস্থ করে নিচ্ছে।
তার সিনিয়র ট্রেনার রানা দুজনের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার গলা নিচু, কিন্তু টানটান।
“এক মিনিট। কোনো নকআউট নয়। ওকে শুধু রিংয়ের ভেতরে থাকতে হবে। ক্লিঞ্চ করা যাবে। কোনো প্রশ্ন?”
শুপ্ত মাথা নাড়ল। তার চোখ এক মুহূর্তের জন্যও তার কাছ থেকে সরল না।
তিশা সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নাড়ল।
নিয়মগুলো একটা প্রহসন।
এক মিনিট যেন একটা পুরো জীবনকাল।
একটাও ঘুষি না মেরে, শুধু চাপ দিয়েই সে তাকে হার মানাতে পারত।
“গ্লাভস ছোঁয়াও,” রানা বলল, তারপর সরে গেল।
শুপ্ত এগিয়ে এসে মুষ্টি তুলল।
তিশাও একইভাবে করল। তার নিজের ১৬-আউন্সের গ্লাভসগুলো শুপ্তরটার পাশে যেন আরও বিশাল দেখাচ্ছিল।
দুটো গ্লাভস ছুঁল।
চামড়া প্রায় আলতো করে একে অপরকে স্পর্শ করল।
কিন্তু সেই সামান্য দূরত্বেই যেন বিদ্যুৎ জমে উঠল।
সে তার বাহুতে সূক্ষ্ম কাঁপুনি দেখতে পেল। গলায় দ্রুত স্পন্দন। সাবান, পরিষ্কার ঘাম আর তার নিচে অ্যাড্রেনালিনের তীক্ষ্ণ, প্রাণীর মতো গন্ধ।
সে পিছিয়ে গেল না।
বরং সামান্য সামনে ঝুঁকল। তার কণ্ঠস্বর কর্কশ ফিসফিস—শুধু তার শোনার জন্য।
“ধন্যবাদ।”
ঘণ্টা বেজে উঠল।
ঘণ্টার প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই তিশা নড়ল।
কোনো আগাম সংকেত নেই। সে কখনো দিত না।
তার ডান হাতের ক্রস ছিল পিস্টনের মতো। কালো চামড়ার গ্লাভসের এক ঝলক—পনেরো বছরের শৃঙ্খলা আর সারাজীবন ধরে যেকোনো ঘরের সবচেয়ে কঠিন মানুষ হওয়ার একগুঁয়ে সংকল্পে ধারালো।
এমন এক ঘুষি, যা জাতীয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়নদেরও ফেলে দিয়েছে।
এই প্রহসন প্রথম সেকেন্ডেই শেষ করে দেওয়ার মতো ঘুষি।
শুপ্ত সরে যাওয়ার চেষ্টা করল না।
সে ঘুষিটার দিকে এগিয়ে গেল।
দুই বাহু ওপরে তুলে কবজির কাছে ক্রস করে ফেলল, থুতনি নিচু।
প্রযুক্তিগতভাবে ব্লকটা ছিল নিখুঁত।
কিন্তু সম্পূর্ণ অর্থহীন।
আঘাতের শব্দটা ছিল বজ্রপাতের মতো।
এমন এক বিকট শব্দ, যা দর্শকদের মুহূর্তেই নীরব করে দিল।
শুপ্তর পা ক্যানভাস ছেড়ে উঠে গেল।
তার শরীর যেন ঝড়ে ছিটকে যাওয়া এক পুতুল।
সে দড়িতে গিয়ে আছড়ে পড়ল। ইলাস্টিক দড়ি তাকে আবার সামনে ছুড়ে দিল।
তারপর আবার সে বাতাসে।
উল্টেপাল্টে গিয়ে চিৎ হয়ে ক্যানভাসে পড়ল এমন এক ভোঁতা শব্দে যে রিংয়ের পাশে বসে থাকা সারিয়া স্পষ্টভাবে হাঁফ ছেড়ে উঠল।
এক সেকেন্ড।
তিশা আর এগোল না।
হাত এক ইঞ্চি নিচে নামিয়ে সে শুধু তাকে দেখল।
অপেক্ষা করল কোনো নড়াচড়া, গোঙানি, কিংবা অনিবার্য আত্মসমর্পণের জন্য।
দর্শকরাও নিঃশ্বাস আটকে রাখল।
তারপর শুপ্ত মালিক এমন কিছু করল, যাতে তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তার পা ওপরে উঠল।
কোর শক্ত হলো।
আর এক ঝটকায় সে এমন পরিষ্কার, এমন অবিশ্বাস্য মসৃণ গতিতে উঠে দাঁড়াল যে মনে হলো কোনো বিশেষ প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে।
একটা নিখুঁত কিপ-আপ।
তার ধূসর চুলও প্রায় নড়ল না।
তার চোখ সঙ্গে সঙ্গে তিশার চোখ খুঁজে নিল।
সেই একই অটল ভক্তি এখনও জ্বলছে সেখানে।
সে পায়ের পাতার ওপর একবার হালকা বাউন্স করল। কাঁধ ঘুরিয়ে নিল।
তারপর আবার গার্ড তুলল।
জিম ফেটে পড়ল।
এটা উল্লাস ছিল না—আরও আদিম কিছু।
সম্মিলিত হাঁফ ধীরে ধীরে অবিশ্বাসের গর্জনে পরিণত হলো।
তিশার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।
এটা হিংস্র হাসি নয়। অবজ্ঞারও নয়।
বহু বছর ধরে এই রিংয়ের ভেতরে যে অনুভূতিটা সে অনুভব করেনি—সেটা।
কৌতূহল।
সে আবার এগিয়ে এল। এবার পায়ে আরও হালকা ভঙ্গি। চক্কর দিতে লাগল।
শুপ্তও তাকে অনুসরণ করল। তার ফুটওয়ার্ক অপ্রত্যাশিতভাবে ধারালো। হাত উঁচু।
সে বাঁ দিকে ফেইন্ট করল। তারপর জ্যাব।
শুপ্ত মাথা সরিয়ে সেটা এড়িয়ে গেল। অল্পের জন্য। ঘুষির বাতাস তার চুল উড়িয়ে দিল।
সে শরীর লক্ষ্য করে হুক মারল।
শুপ্ত কনুই দিয়ে সেটা আটকাল। আঘাতের ধাক্কায় তার শরীর কেঁপে উঠল।
কিন্তু সে পড়ল না।
আঘাতটা সহ্য করল।
গোঁ গোঁ করল।
তবু দাঁড়িয়ে রইল।
বিশ সেকেন্ড।
দর্শকরা এখন স্লোগান দিতে শুরু করেছে। নিচু, ছন্দময় এক স্পন্দন।
তিশা কিছুই শুনছিল না।
তার পৃথিবী আবার সংকুচিত হয়ে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মধ্যে।
অসম্ভব, বিরক্তিকর, তাকে পূজা করা সেই মানুষটা—যে পড়তে অস্বীকার করছে।
সে তাকে আর ঠাট্টা করছিল না।
খেলাচ্ছলে শিকারি চলে গেছে।
তার জায়গায় এসেছে আরও ঠান্ডা, আরও নিখুঁত কিছু।
পেশাদার।
চ্যাম্পিয়ন।
সে সামনের পা মাটিতে গেঁথে অ্যাক্স কিক ছুড়ল।
গোড়ালি ওপরে উঠে আবার নিচে নামল—গিলোটিনের ফলার মতো, শুপ্তর মাথার চূড়া লক্ষ্য করে।
শুপ্ত নড়ল।
পিছিয়ে নয়—ভেতরের দিকে।
সে মাথা নিচু করে ঘুরে গেল। দূরত্ব তৈরি করার জন্য ব্যাক হ্যান্ডস্প্রিং করার চেষ্টা করল।
কিন্তু পায়ের অবস্থান ঠিক ছিল না।
ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল।
ঘূর্ণনের মাঝপথেই সে ছিটকে গিয়ে বিশ্রীভাবে মাটিতে পড়ল।
দর্শকদের মুখ থেকে হতাশার শব্দ বেরিয়ে এল।
সে দুর্বল।
সে শেষ।
কিন্তু সে পড়ে রইল না।
তার দুই হাত ক্যানভাসে ঠেকল।
শরীর কুঁকড়ে শক্ত হলো।
আর সে আবার কিপ-আপ করল।
দ্বিতীয়বার।
এবার যেন আরও মরিয়া।
আরও জেদি।
সে উঠে দাঁড়াল।
টলছিল।
শ্বাস আসছিল তীক্ষ্ণ, ছেঁড়া শব্দে।
আর ঠিক তখনই তিশার আপারকাট লাগল।
সে ইচ্ছা করে আঘাতটা করতে চায়নি।
এটা ছিল প্রতিক্রিয়া।
তার অসম্ভব সহনশীলতার প্রতি এক প্রবল প্রতিক্রিয়া।
তার কোমর ঘুরল।
মুষ্টি ওপরে উঠল।
আর গ্লাভসটা সোজা তার চোয়ালের নিচে গিয়ে লাগল।
তার মাথা পেছনে ছিটকে গেল।
মুখ থেকে এক ঝলক লালা বাতাসে ছিটকে পড়ল।
দ্বিতীয়বার তার পা মাটি ছেড়ে উঠল।
আর সে ক্যানভাসে গিয়ে এক স্তূপের মতো পড়ে রইল।
পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড।
সে নড়ল না।
দর্শকরা আবার নীরব।
রেফারি রানা অর্ধেক পা এগিয়ে এল।
লড়াই থামানোর জন্য প্রস্তুত।
তিশা তার ওপর দাঁড়িয়ে রইল।
তার বুক ওঠানামা করছে।
কিন্তু ক্লান্তিতে নয়।
অন্য কিছুর কারণে।
একটা উত্তপ্ত, ঘূর্ণায়মান হতাশা—যার কোনো নাম সে দিতে পারছিল না।
সে তাকে সবকিছু দিয়ে আঘাত করেছে।
ভেঙে দিয়েছে।
পড়ে থাকো, সে মনে মনে বলল।
দয়া করে, নিজের ভালোর জন্য পড়ে থাকো।
শুপ্তর আঙুল নড়ল।
তারপর বাহু।
সে কাত হয়ে গেল। কাশল।
তারপর নিজেকে ওপরে তুলতে শুরু করল।
তার নড়াচড়া ধীর।
ভাঙাচোরা।
কিন্তু ইচ্ছাকৃত।
তার বাঁ হাত অস্বাভাবিক কোণে ঝুলে আছে।
অকার্যকর।
তার পা কাঁপছে সদ্যোজাত হরিণশাবকের মতো।
তবু সে উঠল।
সে উঠল।
তিশার দৃষ্টি লাল হয়ে গেল।
রাগে নয়।
আরও বিপজ্জনক এক অনুভূতিতে।
ভয়ে।
এই মানুষটা—এই অসম্ভব, হাস্যকর, সুন্দর মানুষটা—সত্যিই যদি বেঁচে যায়?
সে ভয় পেল।
ভয় পেল, এত অসতর্কভাবে যে দরজাটা সে খুলে দিয়েছে, সত্যিই যদি কেউ সেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে?
ভয় পেল, বেদির কাছে সত্যিই যদি কেউ পৌঁছে যায়?
সে দর্শকদের শুনতে পেল না।
রানার চিৎকারও না।
সে শুধু শুপ্তকে দেখছিল।
রক্ত আর ঘামে ভেজা, পায়ের ওপর দুলতে থাকা শুপ্ত।
তার চোখ—সেই জ্বলন্ত, ভক্তিতে পূর্ণ চোখ—এখনও তার ওপর স্থির।
সে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
তার মুষ্টিগুলো হাতুড়িতে পরিণত হলো।
সে তাকে দড়ির দিকে ঠেলে নিয়ে গেল।
কোণায়।
তার আঘাতগুলো দ্রুততার মধ্যে মিশে গেল—কোনো কৌশল ছিল না।
শুধু ক্রোধ।
তার শরীরে আঘাত।
বাহুতে।
গার্ডে।
আঘাত করতে করতে তার নিজের গ্লাভসের ভেতরকার আঙুলগুলো পর্যন্ত ব্যথা করতে লাগল।
আঘাত করতে করতে পৃথিবীটাই যেন হারিয়ে গেল।
সে বাঁশির শব্দ শুনল না।
রানা যে চিৎকার করে বলছে, “থামো! থামো!”—সেটাও না।
তার কাঁধে রানার হাত পড়েছে, তাকে টেনে সরিয়ে নিচ্ছে—সেটাও অনুভব করল না।
সে থামল কেবল তখনই, যখন বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ লাল কুয়াশা ভেদ করে সবকিছুকে ছিন্ন করে দিল।
সে চোখ পিটপিট করল।
জিমটা আবার স্পষ্ট হলো।
দর্শকরা সবাই দাঁড়িয়ে।
রানা তার আর শুপ্তর মাঝখানে।
তার মুখ ফ্যাকাশে।
চোখ বিস্ফারিত।
আর শুপ্ত এখনও দাঁড়িয়ে।
তাকে প্রায় চেনাই যাচ্ছিল না।
তার ঠোঁট ফেটে গেছে।
চিবুক বেয়ে রক্ত পড়ছে।
বাঁ চোখ ফুলে প্রায় বন্ধ।
বাঁ হাত শরীরের পাশে নিস্তেজভাবে ঝুলে আছে।
কাঁধ স্পষ্টতই স্থানচ্যুত।
জয়েন্টের স্বাভাবিক অবস্থান নেই।
তার বুক উঠছে-নামছে দ্রুত, অগভীর, মরিয়া শ্বাসে।
ধূসর চুল কপালে ঘাম আর রক্তে লেপ্টে আছে।
কিন্তু সে দাঁড়িয়ে।
তার বুক থেকে অগভীর, ছেঁড়া শ্বাস বের হচ্ছে।
তার ডান হাত—শরীরের এখনও কার্যকর একমাত্র অংশ—কাঁপতে কাঁপতে মুষ্টিবদ্ধ।
রক্ত, ঘাম আর যন্ত্রণার কুয়াশার মধ্য দিয়ে তার একমাত্র ভালো চোখটা তিশাকে খুঁজে নিল।
আর সেখানে তিশা এমন কিছু দেখল, যা তার বুক সংকুচিত করে দিল।
জয় নয়।
প্রতিশোধও নয়।
কৃতজ্ঞতা।
যেন তিশা তাকে কোনো উপহার দিয়েছে, তাকে মারধর করেনি।
রানার কণ্ঠ কুয়াশা ভেদ করে এল।
কর্কশ।
অবিশ্বাসে ভরা।
“সময় শেষ। এক মিনিট... এক মিনিট শেষ।”
শব্দগুলো স্থির জলের ওপর ছোড়া পাথরের মতো পড়ল।
চারদিকে ঢেউ ছড়িয়ে গেল।
কোথাও চাপা গুঞ্জন।
কোথাও তীক্ষ্ণ নিঃশ্বাস।
কিন্তু তিশা কিছুই শুনল না।
তার পৃথিবী সংকুচিত হয়ে গেল তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙা ছেলেটার মধ্যে।
সেই বোকা মানুষটা যে পড়ে যেতে অস্বীকার করেছে।
সেই উপাসক, যে নিজের রক্ত দিয়ে তার বেদিকে ভিজিয়ে দিয়েছে।
তাহলে সে জিতলই বা কী?
ভাবনাটা হাঙরের পাখনার মতো জলের ওপর ভেসে উঠল।
ঠান্ডা।
ধারালো।
সে সেটাকেই আঁকড়ে ধরল।
বর্মের মতো নিজের চারপাশে জড়িয়ে নিল।
লড়াইয়ে জয় এক জিনিস।
কিন্তু সে নিজের ইচ্ছেমতো সবকিছু পাবে না।
যেভাবে সে চেয়েছে, সেভাবে নয়।
সেই সন্তান, সেই পূজা, সেই কোমল, দুর্বল জিনিসগুলো নয়—যেগুলোর কথা সে এমন বিধ্বংসী আন্তরিকতায় বলেছিল।
কেউ তিশা তালুকদারকে সেই দুর্বল জিনিসগুলো চাইতে বাধ্য করতে পারে না।
কেউ না।
সে এগিয়ে গেল।
দুজনের মাঝের দূরত্ব বন্ধ করে দিল।
তার ছায়া শুপ্তর ওপর পড়ে গেল।
পুরো ছোট্ট শরীরটাকে যেন ঢেকে ফেলল।
এত কাছে এসে সে তার রক্তের তামাটে গন্ধ পেল।
ঘামের নোনতা গন্ধ।
আর সবকিছুর নিচে—
সেই একই পরিষ্কার গন্ধ, যেটা সে লকার রুমে মনে রেখেছিল।
সাবান।
আর কিছু উষ্ণ।
কিছু একেবারে শুপ্তর নিজের মতো।
সে নিচু হলো।
তার ঠোঁট শুপ্তর কানের কাছাকাছি।
কণ্ঠস্বর নিচু, মসৃণ—শুধু তার জন্য এক ধারালো ফলার মতো।
“তুমি করুণ।”
সে অনুভব করল শুপ্ত কেঁপে উঠল।
খুব সামান্য।
প্রায় বোঝাই যায় না এমন একটা কম্পন তার ভাঙা শরীরের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে গেল।
ভালো।
“এই ভাঙা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ।”
“ভাঙা পাঁজর।”
“স্থানচ্যুত কাঁধ।”
সে সামান্য পিছিয়ে এসে তার একমাত্র ভালো চোখের দিকে তাকাল।
তার মুখ ঠান্ডা অবজ্ঞার মুখোশে ঢাকা।
“তুমি ভাবছ, এতে কিছু প্রমাণ হয়েছে?”
“ভাবছ, এক মিনিট টিকে থাকলেই তুমি কিছু পাওয়ার যোগ্য হয়ে গেছ?”
সে কোনো উত্তর দিল না।
সে পারল না।
তিশা বুঝতে পারল, ব্যথা সামলাতে তার চোয়াল এত শক্ত হয়ে আছে যে কথা বলাটাই এখন তার জন্য অসম্ভব।
কিন্তু তার চোখ এখনও তিশার চোখ থেকে সরেনি।
সেই একই পূজা।
সেই একই আশা।
দৃশ্যটা তাকে চিৎকার করতে ইচ্ছে করাল।
“আমার বাসায় এসো।”
প্রতিটি শব্দ সে মেপে বলল।
লোহার ওপর হাতুড়ির আঘাতের মতো।
“তিন দিন পর।”
“যখন অন্তত ঠিকমতো দাঁড়াতে পারবে।”
সে থামল।
শব্দগুলোকে বাতাসে ঝুলতে দিল।
শর্তটার ওজন তাকে অনুভব করতে দিল।
যখন ঠিকমতো দাঁড়াতে পারবে।
যেন সে আর কখনো দাঁড়াতেই পারবে।
যেন তিশা তাকে এইমাত্র চূর্ণ করে দেয়নি।
“আর শুপ্ত...”
তার ঠোঁটে নিজের নাম শুনে শুপ্তর চোখে কিছু একটা ঝিলিক দিল।
আশার মরিয়া একটা স্ফুলিঙ্গ।
যেন সে ভাবছে, তিশা এবার এমন কিছু বলতে যাচ্ছে যা তার পৃথিবী বদলে দেবে।
তিশা সেই আশাটাই নিভিয়ে দিল।
“...কনডম নিয়ে এসো।”
কথাগুলো যেন একটা চড়ের মতো আঘাত করল।
তিশা দেখল কথাগুলো তার মুখে আঘাত করছে।
তার বিধ্বস্ত মুখে প্রথমে বিভ্রান্তি ফুটে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে উপলব্ধি।
তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
ফাটা ঠোঁট সামান্য খুলল।
কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
যেন সে এমন একটা সমীকরণ সমাধান করার চেষ্টা করছে যার কোনো মানে হয় না।
এটাই ছিল তিশার পদ্ধতি।
নিজের আধিপত্য ধরে রাখার পদ্ধতি।
তার জয় মেনে নিয়েও তার ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করার পদ্ধতি।
তাকে নিজের বিছানায় ঢুকতে দেওয়া, কিন্তু তার শরীরের সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষার দরজাটা বন্ধ রাখা।
সে যা দিচ্ছে—তার পূজা, তার ভক্তি, এমনকি তার সম্পূর্ণ সত্তাটাও—তা গ্রহণ করবে।
কিন্তু বিনিময়ে কিছুই দেবে না।
শুধু সুরক্ষিত যৌনতার ঠান্ডা, হিসাবি লেনদেন।
সে তাকে ব্যবহার করবে।
যেভাবে অন্যদের করেছে।
আর সব শেষ হলে তাকে চলে যেতে বলবে।
অন্যভাবে ভেঙে দেবে।
শেষ পর্যন্ত তার সেই পূজাটাও নিভে যাবে।
এই বাস্তবতার নির্মমতা বুঝে।
শুপ্ত তার পায়ের ওপর দুলতে লাগল।
এক মুহূর্তের জন্য তিশার মনে হলো, সে পড়ে যাবে।
প্রায় প্রার্থনা করল যেন তাই হয়।
কারণ সে পড়ে গেলে সব শেষ হবে।
প্যারামেডিকরা তাকে নিয়ে যাবে।
আর তিশাও মুক্তি পাবে তার সেই দৃষ্টির কারাগার থেকে।
কিন্তু সে পড়ল না।
বরং এগিয়ে এল।
একটা ধীর, যন্ত্রণাদায়ক পদক্ষেপ।
তারপর আরেকটা।
তার ভাঙা শরীর তাকে থামানোর জন্য চিৎকার করছে—তিশা সেটা তার মুখে দেখতে পাচ্ছিল।
ব্যথায় তার মুখ সাদা হয়ে যাচ্ছে।
শ্বাস আটকে যাচ্ছে।
তবু সে এগিয়ে এল।
তার দিকে।
সবসময় তার দিকেই।
সে থামল যখন ঠিক তিশার সামনে এসে দাঁড়াল।
এত কাছে যে তার কপালে জমে থাকা ঘামের প্রতিটি ফোঁটা গুনে ফেলা যায়।
এত কাছে যে তার কষ্টে ভরা শ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো শব্দ নেই।
তিশার দিকে তাকাতে তাকে ঘাড় অনেকটা পেছনে তুলতে হলো।
তার একমাত্র ভালো চোখটা আবার তার চোখ খুঁজে পেল।
তারপর সে কথা বলল।
তার কণ্ঠস্বর ছিল কর্কশ।
পাতলা।
ভাঙা।
প্রতিটি শব্দ যেন এমন এক যুদ্ধ, যা তাকে নিজের শরীরের যন্ত্রণার বিরুদ্ধে লড়াই করে বলতে হচ্ছে।
“তিশা...”
শুধু তার নাম।
দুই অক্ষরের মতো ছোট্ট একটা শব্দ।
কিন্তু তার ভেতরে যেন সবকিছুর ভার।
পূজা।
আশা।
সেই অসম্ভব, মরিয়া ভালোবাসা—যেটাকে তিশা এতদিন ধরে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে।
“আমরা কীভাবে বাচ্চা পাব...”
সে থামল।
তার বুক উঠল-নামল।
শরীর কেঁপে উঠল।
শুধু দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টাতেই যেন তার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে।
“...যদি আমরা কনডম ব্যবহার করি?”
প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে রইল।
সহজ।
কিন্তু বিধ্বংসী।
নির্দোষ।
শিশুসুলভ।
যেন সত্যিই সে বুঝতে পারেনি।
যেন জীববিজ্ঞান আর বাস্তবতার এই সামান্য বিষয়টা তার মাথায় এইমাত্র ঢুকেছে।
আর সেই মুহূর্তে তিশা তালুকদার অনুভব করল—
তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যাচ্ছে।
কারণ সে বুঝতে পারল।
একেবারে পরিষ্কারভাবে।
সে কোনো খেলা খেলছে না।
সে কোনো মনস্তাত্ত্বিক চাল দিচ্ছে না।
তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে না।
তাকে চ্যালেঞ্জ করছে না।
তাকে জয় করার চেষ্টা করছে না।
সে শুধু বিশ্বাস করেছে।
সে বিশ্বাস করেছিল, এক মিনিট টিকে থাকা মানেই দরজাটা খুলে গেছে।
সে বিশ্বাস করেছিল, তিশার কথাগুলো একটা প্রতিশ্রুতি—ফাঁদ নয়।
সে বিশ্বাস করেছিল—সত্যিই, একেবারে মন থেকে বিশ্বাস করেছিল—
তিশা তালুকদার, যে নারী ত্রিশ বছর ধরে নিজের দুর্বলতার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে এসেছে,
সে সত্যিই...
সত্যিই...
তার সঙ্গে একটা সন্তান জন্ম দেবে।