মা।
তিশা তালুকদার—মা।
ভাবনাটাই এতটাই অদ্ভুত ছিল।
এতটাই অসম্ভব।
এতটাই অপরিচিত—যে জীবনটা সে এতদিন চিনে এসেছে, তার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্কই নেই।
তার প্রায় হাসি পেয়ে গেল।
প্রায়।
কিন্তু ঠিক তখনই শুপ্তোর হাঁটু ভেঙে গেল।
সে সবকিছু ধীরগতিতে ঘটতে দেখল।
শুপ্তোর একমাত্র ভালো চোখটা কীভাবে ধীরে ধীরে উল্টে গেল।
কীভাবে তার শরীরের সমস্ত শক্তি এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেল।
কীভাবে কেটে ফেলা গাছের মতো সামনের দিকে হেলে পড়ল সে।
তার মাথা মাটিতে পড়ার আগেই—
তিশার হাত ছুটে গেল।
চিন্তা করার আগেই তার শরীর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।
এক বিশাল হাত শুপ্তোর মাথার পেছনটা আগলে ধরল। আঙুলগুলো ঘামে ভেজা ধূসর চুলের মধ্যে জড়িয়ে গেল। অন্য হাতটা তার কোমরের নিচে ছড়িয়ে পড়ে পুরো শরীরটা সামলে নিল।
তার বাহুর মধ্যে শুপ্তোকে অসম্ভব হালকা মনে হলো।
যেন ভাঙা হাড় আর জ্বরে-পোড়া শরীরের একটা পুঁটলি।
তার শক্তির কাছে ছেলেটার ওজন যেন কিছুই না।
তিশা ধীরে ধীরে তাকে ম্যাটের ওপর নামিয়ে দিল।
তার মাথাটা নিজের কনুইয়ের ভাঁজে রেখে দিল।
জিম মুহূর্তের মধ্যে বিশৃঙ্খল হয়ে উঠল।
চিৎকার।
ছুটে আসা পায়ের শব্দ।
রানা চেঁচিয়ে মেডিকিট আনতে বলছে।
সারিয়ার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠল—
“অ্যাম্বুলেন্স ডাকো! এখনই!”
কিন্তু তিশার কাছে সবকিছু যেন পানির নিচ থেকে ভেসে আসা শব্দের মতো লাগছিল।
দূর।
অস্পষ্ট।
তার পুরো পৃথিবী তখন সংকুচিত হয়ে এসেছিল কেবল তার বাহুর মধ্যে থাকা ছেলেটাকে ঘিরে।
তার বুড়ো আঙুলের নিচে স্পন্দিত হওয়া ক্ষীণ নাড়ি।
তার ভেজা, ছেঁড়া-ছেঁড়া শ্বাসের শব্দ।
তার হাতের ওপর শুপ্তোর রক্ত লেগে ছিল।
উষ্ণ।
আঠালো।
তার ভালো চোখটা বন্ধ।
কালো পাপড়িগুলো ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের ওপর স্থির।
কাছ থেকে আঘাতগুলো আরও ভয়ংকর লাগছিল।
তার মুখের বাম পাশটা ফুলে বেগুনি-লাল হয়ে গেছে।
চোখের পাতা ফুলে পুরোপুরি বন্ধ।
ঠোঁটটা ছিঁড়ে গেছে—একটা ক্ষতবিক্ষত ফুলের পাপড়ির মতো।
আর তার কাঁধ—
টি-শার্টের নিচে জয়েন্টটা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে আছে।
একটা বিকৃত উঁচু অংশ।
ছিঁড়ে যাওয়া লিগামেন্ট আর জায়গা থেকে সরে যাওয়া হাড়ের নীরব সাক্ষ্য।
কেউ তার কাঁধে হাত রাখল।
তিশা চমকে উঠল।
ঠোঁটের কোণে গর্জন জমে উঠল।
কিন্তু সে নায়রা।
মুখ ফ্যাকাশে। চোখ বিস্ফারিত।
“তিশা, ওকে ছাড়তে হবে। প্যারামেডিকরা আসছে।”
তিশা ছাড়ল না।
বরং তার আঙুলগুলো আরও শক্ত হয়ে শুপ্তোকে আঁকড়ে ধরল।
অধিকারবোধ।
রক্ষণশীল, আদিম এক প্রবৃত্তি বুকের গভীর থেকে মাথা তুলল।
আমার।
তার ভেতরে কিছু একটা গর্জে উঠল।
আমি এটা করেছি।
ও আমার।
“তিশা।”
এবার সারিয়ার কণ্ঠস্বর আরও কাছে।
আরও দৃঢ়।
“তুমি শকে আছো। ওদের ওকে সাহায্য করতে দাও।”
সাহায্য।
তার জন্য।
তার কারণেই।
কারণ সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।
কারণ শুপ্তোর সেই অবিচল, বোকাসোকা বিশ্বাসের সামান্য ইঙ্গিতই তাকে উন্মত্ত করে তুলেছিল।
সে তাকে এক সপ্তাহ সময় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—
যদি সে বেঁচে থাকে।
কিন্তু তাকে ইটের পর ইট খুলে ধ্বংস করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি তো দেয়নি।
শুপ্তোর চোখের পাতা কেঁপে উঠল।
তার ফাটা ঠোঁট থেকে একটা নিচু, যন্ত্রণাভরা গোঙানি বেরিয়ে এল।
তার একমাত্র ভালো চোখটা সামান্য খুলল।
যন্ত্রণায় ঝাপসা।
আর তারপর—
সেই চোখ এসে থামল তিশার চোখে।
এতকিছুর পরও।
এতটা ভেঙে পড়ার পরও।
সে তাকাল তার দিকেই।
তাকে খুঁজল।
তার চোখে চোখ রাখল।
“শ্...”
নিজের কণ্ঠস্বর শুনে তিশা নিজেই অবাক হলো।
কতটা কর্কশ।
কতটা অপরিচিত।
“নড়বে না।”
আদেশের মতো শোনাল কথাটা।
আবার অনুরোধের মতোও।
শুপ্তোর ঠোঁট নড়ল।
কোনো শব্দ বের হলো না।
তিশা আরও ঝুঁকে এল।
তার কান প্রায় শুপ্তোর ঠোঁট ছুঁয়ে গেল।
“...জিতলাম?”
একটা মাত্র শব্দ।
সেটাও বলতে তার সমস্ত শক্তি যেন খরচ হয়ে গেল।
তিশার গলা থেকে একটা অদ্ভুত হাসি বেরিয়ে আসতে চাইল।
হিস্টিরিয়ার মতো।
কিন্তু আটকে গেল।
তিক্ত।
ভাঙা।
জিতলাম।
এই অবস্থাতেও সে ভাবছে সে জিতেছে।
রক্তের মধ্যে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে—
আর ভাবছে জিতেছে।
কনডম আর বাচ্চার কথা জিজ্ঞেস করা সেই বোকা ছেলেটা।
“হ্যাঁ,” তিশা বলল।
মিথ্যেটা এত সহজে বেরিয়ে এল যে সে নিজেই অবাক হলো।
“তুমি জিতেছ, বোকা ছেলে। এখন চুপ করো।”
শুপ্তোর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত হাসির ক্ষীণ ছায়া ফুটে উঠল।
যে হাসি তিশার বুকের ভেতর অদ্ভুত কিছু একটা করে দিত।
তারপর চোখ আবার বন্ধ হয়ে গেল।
শরীরের সমস্ত টান এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেল।
সে তিশার বাহুর মধ্যে আরও ভারী হয়ে পড়ল।
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ জিমের কোলাহল ছিন্ন করে এগিয়ে এল।
ক্রমশ আরও জোরে।
আরও তীক্ষ্ণ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ইউনিফর্ম পরা প্যারামেডিকরা ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
তাদের সঙ্গে স্ট্রেচার।
তারা দ্রুত এবং পেশাদার ভঙ্গিতে শুপ্তোর অবস্থা পরীক্ষা করতে শুরু করল।
ঘাড় স্থির করা হলো।
ভাইটাল পরীক্ষা করা হলো।
“একাধিক পাঁজর ভাঙার সম্ভাবনা।”
“বাম কাঁধ ডিসলোকেটেড।”
“মুখে গুরুতর আঘাত।”
“সম্ভবত কনকাশন।”
একজন দ্রুত বলে যাচ্ছিল।
“ওকে সরাতে হবে।”
তারা শুপ্তোকে তিশার কাছ থেকে নিতে এগিয়ে এল।
হাত বাড়ল।
স্ট্রেচারের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
তিশার চোখের সামনে হঠাৎ লাল কুয়াশা নেমে এল।
তার বাহু আরও শক্ত হয়ে গেল।
শুপ্তোকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল সে।
নিজের শরীর দিয়েই তাকে ঢেকে ফেলল।
তার গলা থেকে একটা নিচু গর্জন বেরিয়ে এল।
গভীর।
পশুর মতো।
প্যারামেডিকরা থেমে গেল।
তিশার ভঙ্গিতে এমন এক কাঁচা হিংস্রতা ছিল, যা তাদেরও এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল।
“মিস, আমাদের—”
“আমি করব।”
তিশার গলা কর্কশ।
গর্জনের মতো।
কোনো আপত্তির সুযোগ নেই।
সে নিজের অবস্থান বদলাল।
এক হাত শুপ্তোর হাঁটুর নিচে গেল।
অন্য হাত তার পিঠ আর মাথাকে সাবধানে ধরে রাখল।
আঘাতের জায়গাগুলো এড়িয়ে—
একটা মসৃণ, শক্তিশালী ভঙ্গিতে সে উঠে দাঁড়াল।
শুপ্তোকে এমনভাবে তুলে নিল যেন তার ওজন একটা শিশুর বেশি নয়।
তার মাথা তিশার কাঁধে ঢলে পড়ল।
গরম, অগভীর শ্বাস এসে লাগল তার ঘাড়ে।
রিংয়ের সিঁড়ি দিয়ে তিশা তাকে নিচে নিয়ে এল।
ভিড় তার সামনে থেকে সরে গেল।
যেন লোহিত সাগর দু’ভাগ হয়ে গেছে।
কেউ তাকিয়ে আছে।
কেউ ফিসফিস করছে।
কেউ মোবাইল বের করেছে।
তিশা কাউকেই পাত্তা দিল না।
সে সোজা বেরিয়ে গেল প্যারাডাইস জিম থেকে।
উজ্জ্বল দুপুরের রোদে।
অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে অপেক্ষা করা স্ট্রেচারের কাছে পৌঁছে শুপ্তোকে অত্যন্ত সাবধানে শুইয়ে দিল।
একজন তরুণী প্যারামেডিক—চোখে অদ্ভুত মায়া—অ্যাম্বুলেন্সে উঠে শুপ্তোর পাশে বসল।
মনিটর লাগাতে লাগাতে সে তিশার দিকে তাকাল।
“আপনি কি ওর পরিবারের কেউ?”
তিশা এক মুহূর্তও দেরি করল না।
“হ্যাঁ।”
সে অ্যাম্বুলেন্সে উঠে গেল।
নিয়ম।
প্রোটোকল।
কিছুই তার মাথায় ছিল না।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
তাদের ঘিরে ফেলল জীবাণুমুক্ত, কাঁপতে থাকা একটা ছোট্ট জগৎ।
ঝলমলে মনিটর।
বিপ... বিপ... করা যন্ত্র।
অক্সিজেনের গন্ধ।
অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলল।
সাইরেন চিৎকার করছে।
ঢাকার বিশৃঙ্খল ট্রাফিকের মধ্য দিয়ে গাড়ি একটার পর একটা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।
সেই সংকীর্ণ জায়গার ভেতরেই বাস্তবতা ধীরে ধীরে তিশার ওপর চেপে বসল।
সে দেখল প্যারামেডিক কাঁচি দিয়ে শুপ্তোর টি-শার্ট কেটে ফেলছে।
উন্মুক্ত হলো তার ট্যাটুতে ঢাকা বুক ও পেট।
বাংলা ক্যালিগ্রাফি আর জ্যামিতিক নকশার জটিল এক বিস্তৃত শিল্পকর্ম তার পাঁজর জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
অথবা—
যা এখনো অক্ষত ছিল।
তার শরীরে ইতিমধ্যে গাঢ়, ভয়ংকর কালচে-লাল আঘাত ফুটে উঠেছে।
তার সহিংসতার মানচিত্র।
প্যারামেডিক তার পাঁজরের পাশে হাত দিয়ে পরীক্ষা করল।
অচেতন অবস্থাতেও শুপ্তো যন্ত্রণায় গোঙাল।
তার শরীর সামান্য বাঁকা হয়ে উঠল।
“বাম পাশে একাধিক ফ্র্যাকচার নিশ্চিত।”
সে দ্রুত ঘাড়ে সার্ভিক্যাল কলার লাগিয়ে দিল।
“পালস খুব দুর্বল।”
এক মুহূর্ত থেমে—
“ব্লাড প্রেসার কমছে।”
তিশার বুকের ভেতরটা বরফ হয়ে গেল।
কমছে।
তার শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
তার জন্য।
তিশা হাত বাড়াল।
আহত নয় এমন হাতটার ওপর তার হাত কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
শুপ্তোর চামড়া ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে।
তার আঙুলের ডগা ধীরে ধীরে কবজির ভেতরের দিকে ছুঁয়ে গেল।
দ্রুত কাঁপতে থাকা নাড়ি।
হঠাৎ—
শুপ্তোর হাত কেঁপে উঠল।
তার লম্বা, অদ্ভুতভাবে কোমল আঙুলগুলো ধীরে ধীরে তিশার তর্জনীকে জড়িয়ে ধরল।
সে ধরে রইল।
তিশাকে।
অ্যাম্বুলেন্সের বাকি পথটা তিশার কাছে কেবল শব্দ আর গতির একটা অস্পষ্ট মিশ্রণ হয়ে রইল।
হঠাৎ গাড়ি থামল।
দরজা খুলে গেল।
স্ট্রেচার ছুটে গেল ভেতরে।
শুপ্তোকে নিয়ে যাওয়া হলো জরুরি বিভাগের দরজা পেরিয়ে।
উজ্জ্বল আলোয় ভরা হাসপাতালের ভেতরের অন্ধকারে সে হারিয়ে গেল।
তিশাও পেছন পেছন এগোল।
একটা নীরব, বিশাল ছায়ার মতো।
যতক্ষণ না একজন নার্স হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল।
“আপনি আর সামনে যেতে পারবেন না। এখানে অপেক্ষা করুন।”
তিশাকে একটা অপেক্ষাকক্ষের প্লাস্টিকের চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হলো।
নির্জীব একটা ঘর।
প্লাস্টিকের চেয়ার।
দেয়ালে হাত ধোয়ার নিয়ম নিয়ে বিবর্ণ পোস্টার।
সময়ের কোনো অর্থই যেন আর ছিল না।
তিশা স্থির হয়ে বসে রইল।
তার গ্লাভস তখনো হাতে।
তার বাহুতে শুপ্তোর রক্ত শুকিয়ে গাঢ় বাদামি দাগ হয়ে আছে।
স্পোর্টস টপেও একই দাগ।
তার শরীরে ঘামের গন্ধ।
চামড়ার গন্ধ।
লোহার মতো রক্তের গন্ধ।
এক ঘণ্টা পর সারিয়া আর নায়রা তাকে খুঁজে পেল।
তারা একটা পানির বোতল এনে দিল।
তিশা ছুঁয়েও দেখল না।
এর কিছুক্ষণ পর শাজি আর মিরাজও এল।
তাদের মুখে উদ্বেগ স্পষ্ট।
তারা সবাই নিচু গলায় একসঙ্গে কথা বলতে লাগল।
তিশা শুনল না।
তাদের কথাগুলো তার মাথার ভেতরের বিশাল নীরবতার চারপাশে ঘুরতে থাকা ক্ষুদ্র মাছির মতো লাগছিল।
“কনডম ব্যবহার করলে আমরা বাচ্চা কীভাবে নেব?”
প্রশ্নটা তার মাথায় ঘুরতেই থাকল।
একটা উন্মাদনার মতো।
একটা মন্ত্রের মতো।
প্রশ্নটা অশ্লীল ছিল না।
প্রলোভনও ছিল না।
এটা ছিল...
কৌতূহলী।
ব্যবহারিক।
যেন সে জিজ্ঞেস করছিল—
কীভাবে একটা আসবাবপত্র জোড়া লাগাতে হয়।
যেন তার সঙ্গে একটা জীবন সৃষ্টি করা কোনো অসম্ভব স্বপ্ন নয়।
যেন সেটা ঘটবেই।
স্বাভাবিকভাবেই।
আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র বাধা—
একটা পাতলা ল্যাটেক্সের টুকরো।
অবশেষে একজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।
পঞ্চাশের কোঠার একজন মানুষ।
ক্লান্ত মুখ।
চোখে চশমা।
তিনি অপেক্ষমাণ লোকজনের দিকে তাকালেন।
তারপর তার চোখ থামল তিশার ওপর।
যোদ্ধার মতো দাঁড়িয়ে থাকা নারী।
রক্তে ভেজা পোশাক।
“শুপ্তো মালিকের পরিবার?”
“হ্যাঁ।”
তিশা উঠে দাঁড়াল।
তার গলা যেন ঘষে ঘষে কর্কশ হয়ে গেছে।
ডাক্তারের দৃষ্টি পেশাদার।
নিরাবেগ।
“ও এখন স্থিতিশীল।”
একটু থেমে তিনি বললেন,
“বাম পাশে তিনটা পাঁজর ভেঙেছে। একটায় ডিসপ্লেসমেন্ট হয়েছে, তবে ফুসফুসে ছিদ্র করেনি।”
তিশা নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।
“মারাত্মক ব্রুইজিং আছে। ডিসলোকেটেড কাঁধ ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। কনকাশন হয়েছে। মুখের নরম টিস্যুতে গুরুতর আঘাত রয়েছে।”
ডাক্তার থামলেন।
“আর যথেষ্ট পরিমাণ রক্তও হারিয়েছে।”
এক মুহূর্ত নীরবতা।
“ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য ওকে ভারী সেডেশনে রাখা হয়েছে। অন্তত কয়েকদিন পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।”
তিশার বুক থেকে এমন এক স্বস্তির ঢেউ বেরিয়ে এল, যা প্রায় বমি বমি লাগার মতো তীব্র।
স্থিতিশীল।
সে মরছে না।
তার হাতে মারা যায়নি।
“আমি কি ওকে দেখতে পারি?”
প্রশ্নটা নিজের অজান্তেই বেরিয়ে গেল।
ডাক্তার কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর তিশার রক্তমাখা পোশাকের দিকে তাকালেন।
“আপনিই কি...?”
“হ্যাঁ।”
তিশা চোখ সরাল না।
“আমিই।”
ডাক্তারের মুখে অদ্ভুত একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠল।
বিচার নয়।
আবার পুরোপুরি বিচারহীনও নয়।
ক্লান্ত এক ধরনের বোঝাপড়া।
তিনি মাথা নাড়লেন।
“রুম ৩০৪। ঘুমিয়ে আছে। বিরক্ত করবেন না।”
একটু থেমে বললেন,
“দশ মিনিট।”
রুম ৩০৪ পর্যন্ত হাঁটাটা তিশার কাছে যেন জীবাণুমুক্ত কোনো পাতালপুরীর ভেতর দিয়ে হাঁটা।
করিডোরে ব্লিচের গন্ধ।
আর অদৃশ্য কোনো হতাশার গন্ধ।
ঘরটা অন্ধকার।
জানালার ব্লাইন্ড অর্ধেক নামানো।
একটা মনিটরের আলোতেই ঘরের বেশিরভাগ অংশ দৃশ্যমান।
সবুজ রেখা উঠছে।
নামছে।
বিপ... বিপ... বিপ...
হাসপাতালের বিছানায় শুপ্তোকে ছোট মনে হচ্ছিল।
সাদা চাদর আর বেইজ কম্বলের মধ্যে প্রায় হারিয়ে গেছে।
মুখের বেশিরভাগ অংশ ব্যান্ডেজে ঢাকা।
বাম চোখ আর গালের ওপর মোটা প্যাড বাঁধা।
কপালের ওপরও ব্যান্ডেজের ফিতা।
হাতের পেছন দিয়ে একটা IV লাইন ঢুকে গেছে।
স্বচ্ছ তরল ধীরে ধীরে তার শরীরে ঢুকছে।
বুকটা ধীর, ওষুধে ভারী ছন্দে ওঠানামা করছে।
হাসপাতালের গাউন সরে যাওয়ায় তার বাহুর ট্যাটুগুলো দেখা যাচ্ছে।
মনে হচ্ছে—
কোনো পতিত যোদ্ধার শরীরে আঁকা প্রাচীন বর্ম।
তিশা ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল।
প্রতিটি পদক্ষেপ যেন একটা নিষিদ্ধ সীমা অতিক্রম করা।
সে তার ওপর দাঁড়িয়ে রইল।
নিচে তাকিয়ে দেখল—
তার নিজের হাতে তৈরি ধ্বংসস্তূপ।
এটা তার সৃষ্টি।
তার সহিংসতার শিল্পকর্ম।
আর সেই ছেলেটা একে বলেছিল—
উপাসনা।
তিশার হাত ধীরে ধীরে উঠল।
সামান্য কাঁপছিল।
তারপর শুপ্তোর গালের দিকে এগিয়ে গেল।
যেখানে এখনো আঘাত লাগেনি।
কিন্তু স্পর্শ করার আগেই থেমে গেল।
সে পারল না।
“তুমি একটা আস্ত বোকা।”
তিশা ফিসফিস করে বলল।
গলা ভারী।
“একটা অসাধারণ... আত্মঘাতী বোকা।”
শুপ্তোর চোখের পাতা কেঁপে উঠল।
তার দৃশ্যমান একমাত্র চোখ—ডান চোখটা—ধীরে ধীরে খুলল।
মরফিনে ঝাপসা।
ফোকাসহীন।
কিন্তু ধীরে ধীরে চোখটা ঘুরে এসে থামল তিশার ওপর।
কিছুটা সময় লাগল চিনতে।
তারপর সেই ঝাপসা চোখে পরিচয়ের আলো ফুটে উঠল।
তার ফাটা ঠোঁট নড়ল।
কোনো শব্দ বের হলো না।
তিশা আরও কাছে ঝুঁকে গেল।
তার কান শুপ্তোর ঠোঁটের কাছে।
“...তিশা?”
একটা ফিসফিস।
স্বস্তিতে ভরা একটা নিঃশ্বাসের মতো।
“আমি এখানে।”
তিশা বলল।
কথাটা বলতে গিয়ে নিজের ভেতর থেকে কী যেন ছিঁড়ে বের করতে হলো তার।
কম্বলের ওপর শুপ্তোর হাত নড়ল।
যে হাতে IV লাগানো নেই।
কয়েক ইঞ্চি এগিয়ে এল।
আঙুলগুলো সামান্য প্রসারিত হলো।
একটা আমন্ত্রণ।
একটা অনুরোধ।
তিশা তার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।
ওজন তোলা হাতের তালুতে শক্ত চামড়া।
মুষ্টিতে পুরোনো দাগ।
লম্বা আঙুল।
এই আঙুলগুলোই অ্যাম্বুলেন্সে তার আঙুল ধরে রেখেছিল।
তিশার প্রতিটি প্রবৃত্তি তাকে বলছিল—
পেছনে সরে যাও।
চলে যাও।
এই উন্মাদনার এখানেই শেষ হোক।
কিন্তু সে গেল না।
বরং হাত বাড়িয়ে দিল।
তার বিশাল হাত শুপ্তোর হাতটাকে ঢেকে ফেলল।
তার আঙুলগুলো অনেক বড়।
অনেক শক্তিশালী।
কিন্তু এবার সেই হাতের মুঠোয় এমন কোমলতা ছিল, যা তার নিজের কাছেই অপরিচিত।
শুপ্তোর হাত উষ্ণ।
তার গ্রিপ দুর্বল।
তবু সে ধরে রইল।
তার বুড়ো আঙুল তিশার হাতের ওপর ধীরে ধীরে একটা বৃত্ত আঁকতে লাগল।
তারপর শুপ্তো হাসল।
খুব সামান্য।
ভাঙা ঠোঁটের কোণে একটা ক্ষীণ বাঁক।
কিন্তু সেই হাসির মধ্যে এমন এক শক্তি ছিল—
যা তিশার কোনো ঘুষির মধ্যেও ছিল না।
“জানতাম তুমি আসবে।”
শুপ্তো অস্পষ্ট গলায় বলল।
তার চোখ ইতিমধ্যে আবার বন্ধ হয়ে আসছে।
ওষুধ তাকে ঘুমের দিকে টেনে নিচ্ছে।
“আমার... বেদি...”
কথাটা অসম্পূর্ণ থেকে গেল।
সে ঘুমিয়ে পড়ল।
তার হাত তিশার হাতে নিস্তেজ হয়ে গেল।
কিন্তু তিশা হাত ছাড়ল না।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে।
সেই ছেলেটার হাত ধরে—
যে তার সঙ্গে একটা সন্তান চেয়েছিল।
যে তাকে বেদি বানিয়ে উপাসনা করতে চেয়েছিল।
ঘরের নীরবতার মধ্যে কেবল হার্ট মনিটরের শব্দ।
বিপ... বিপ... বিপ...
তিশা সেই শব্দ শুনতে শুনতে অনুভব করল—
শুপ্তো তার ভেতরে এমন একটা বীজ বপন করেছে, যার শিকড় ধীরে ধীরে আরও গভীরে ঢুকে যাচ্ছে।
লবণাক্ত, অনুর্বর মাটির ভেতর।
তার আত্মার গভীরে।
বাইরে ঢাকার রাত আরও ঘন হয়ে উঠল।
আর ৩০৪ নম্বর ঘরের ভেতরে—
তিশা তালুকদার।
অদম্য।
নির্বিকার।
এক দুর্গের মতো শক্ত।
ত্রিশ বছর ধরে যে দেয়ালগুলো কেউ ভাঙতে পারেনি—
সেই দেয়ালগুলোতে আজ প্রথমবারের মতো—
ফাটল ধরতে শুরু করল।
পর্ব ৩ সমাপ্ত