বিকেলটা অন্য দিনের মতো ছিল না।
আকাশে রোদের তেজ কমে এসেছিল। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যটা ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল, আর তার শেষ আলো ছড়িয়ে পড়ছিল শহরের পুরোনো বাড়িগুলোর ছাদে। বাতাসে ছিল শীতের হালকা গন্ধ। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতাগুলো অকারণে কাঁপছিল।
রাফি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার হাতে একটি পুরোনো চিঠি।
চিঠিটা সে গত সাত বছর ধরে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। কাগজের রং অনেকটা হলদেটে হয়ে গেছে, ভাঁজের জায়গাগুলোও ক্ষয়ে এসেছে। তবু কয়েকটি শব্দ এখনও স্পষ্ট—
“তুমি অপেক্ষা করো। আমি ফিরে আসব।”
সাত বছর।
একটা মানুষের জীবনে সাত বছর খুব কম সময় নয়।
এই সাত বছরে রাফির জীবনে অনেক কিছু বদলে গেছে। চাকরি বদলেছে, শহর বদলেছে, পরিচিত মানুষগুলো একে একে দূরে সরে গেছে। কেউ বিয়ে করেছে, কেউ বিদেশে চলে গেছে, কেউ আবার এমনভাবে হারিয়ে গেছে যেন কোনোদিন তার অস্তিত্বই ছিল না।
শুধু একজন বদলায়নি।
সে নিজে।
অথবা বলা ভালো—তার অপেক্ষাটা বদলায়নি।
প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই রাফি সেই একই জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। কখনো চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে থাকে, কখনো চিঠিটা হাতে নেয়। তারপর নিজের অজান্তেই সেই পুরোনো কথাটা মনে পড়ে—
“আমি ফিরে আসব।”
কিন্তু সে আর আসেনি।
রাফি মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করে—
মানুষ কি সত্যিই অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়?
নাকি একসময় অপেক্ষাটাই মানুষের জীবনের অংশ হয়ে যায়?
সে জানে না।
শুধু জানে, সাত বছর পরও সে প্রতিদিন দরজার শব্দ শুনলে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।
হয়তো সে এসেছে।
হয়তো সত্যিই ফিরে এসেছে।
তারপর আবার নিজেকেই বোঝায়—
না।
এটা শুধু বাতাসের শব্দ।
সেদিনও ঠিক এমনই একটি সন্ধ্যা ছিল।
রাফি চিঠিটা হাতে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ নিচ থেকে ডাকপিয়নের কণ্ঠ শোনা গেল।
“রাফি সাহেব!”
সে নিচে তাকাল।
একজন বৃদ্ধ ডাকপিয়ন দাঁড়িয়ে আছেন।
“আপনার নামে চিঠি।”
রাফি অবাক হয়ে নিচে নেমে এল।
“আমার নামে?”
“জি।”
বৃদ্ধ লোকটি একটি ছোট খাম এগিয়ে দিলেন।
রাফি খামটি হাতে নিয়ে দেখল—কোনো প্রেরকের নাম নেই।
শুধু তার নাম লেখা।
রাফি।
আর হাতের লেখাটা—
সে যেন কোথাও দেখেছে।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন একটা শব্দ হলো।
“এই চিঠি কোথা থেকে এসেছে?”
বৃদ্ধ ডাকপিয়ন মাথা নাড়লেন।
“জানি না বাবা। আমাদের অফিসে এসে জমা দিয়েছিল কেউ একজন।”
“কে?”
“মুখ মনে নেই।”
রাফি আর কোনো কথা বলল না।
ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ফিরে এল।
দরজা বন্ধ করল।
তারপর অনেকক্ষণ খামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
খাম খুলতে তার ভয় লাগছিল।
কারণ কিছু চিঠি মানুষকে আনন্দ দেয়।
আর কিছু চিঠি মানুষের বহু বছরের শান্তি কেড়ে নেয়।
অবশেষে সে খামটি খুলল।
ভেতরে মাত্র একটি কাগজ।
তাতে লেখা—
“তুমি কি এখনও আমার অপেক্ষায় আছো?”
রাফির হাত কেঁপে উঠল।
নিচে আরও একটি লাইন—
“যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে আগামী শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় পুরোনো রেলস্টেশনে এসো।”
তারপর—
“এবার আমি সত্যিই আসব।”
রাফি চিঠিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল।
সাত বছর ধরে যে কথাটার অপেক্ষায় ছিল—
আজ সেই কথাই আবার ফিরে এসেছে।
কিন্তু তার মনে হঠাৎ একটি প্রশ্ন জেগে উঠল—
যদি সত্যিই সে ফিরে আসে, তাহলে কি রাফি তাকে আগের মতো করে গ্রহণ করতে পারবে?
নাকি সাত বছরের অপেক্ষা তাদের মাঝখানে এমন একটি দূরত্ব তৈরি করেছে, যা কোনো ফিরে আসা দিয়েও পূরণ করা সম্ভব নয়?
জানালার বাইরে তখন সূর্য ডুবে গেছে।
অন্ধকার ধীরে ধীরে শহরটাকে ঢেকে ফেলছে।
রাফি চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরে খুব আস্তে বলল—
“আমি এখনও তোমার অপেক্ষায় আছি।”
তারপর ঘরের আলো নিভে গেল।
কিন্তু জানালাটা খোলা রইল।