অন্ধকার ঘরের মধ্যে মানুষটির অবয়ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল। রাফি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ যেন বিশ্বাস করতে চাইছিল না। যে মুখটা সে ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে, যে মুখের দিকে তাকিয়ে সে নিরাপত্তা খুঁজেছে, সেই মুখই এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর রাফি বুঝতে পারল—কিছু একটা অস্বাভাবিক।
মুখটা একই, চোখ দুটো একই, কণ্ঠস্বরও প্রায় একই। কিন্তু চোখের গভীরে সেই পরিচিত মায়া নেই।
রাফি ধীরে ধীরে বলল, “তুমি... আমার বাবা নও।”
লোকটা মৃদু হাসল।
“অবশেষে বুঝতে পারলি।”
মেহরিন রাফির পাশে এসে দাঁড়াল। সুমন সঙ্গে সঙ্গে তাকে পেছনে সরিয়ে দিল।
“রাফি, কাছে যাস না।”
লোকটা হেসে বলল, “সুমন, তুই এখনও আগের মতোই সতর্ক।”
সুমন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আর তুমি এখনও আগের মতোই মিথ্যাবাদী।”
লোকটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
রাফি বলল, “তুমি কে?”
কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর লোকটি বলল, “আমার নাম মাহবুব রহমান।”
রাফির বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
মেহরিন পিছিয়ে গেল।
“না...”
লোকটি মেহরিনের দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ, মেহরিন। আমি সেই মানুষ, যাকে তুমি তোমার বাবার পুরোনো কাগজে শুধু একটা নাম হিসেবে চিনেছিস।”
মেহরিন কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে আমার বাবা কে?”
মাহবুব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল, “তোর বাবা একজন ভালো মানুষ ছিল। কিন্তু সে একটা ভুল করেছিল।”
“কী ভুল?”
“সে আমাকে বিশ্বাস করেছিল।”
মেহরিনের চোখে অশ্রু জমে উঠল।
রাফি এবার এগিয়ে এল।
“আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী?”
মাহবুব তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই আমার ছেলে।”
রাফি কিছু বলতে পারল না।
মাহবুব আবার বলল, “কিন্তু তুই আমার কাছে শুধু ছেলে ছিলি না। তুই ছিলি প্রকল্প ১৭-এর শেষ উত্তরাধিকারী।”
রাফি ধীরে ধীরে বলল, “আর আমার মা?”
মাহবুবের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
“তোর মা সত্য জানত। তাই তাকে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল।”
“তুমি তাকে লুকিয়েছিলে?”
“না।”
মাহবুব মাথা নাড়ল।
“তাকে লুকিয়েছিল তোর বর্তমান বাবা।”
রাফি থমকে গেল।
“কী?”
মাহবুব বলল, “যে মানুষটাকে তুই এতদিন বাবা বলে চিনেছিস, সে তোকে বাঁচিয়েছে ঠিকই। কিন্তু সে সব সত্যি বলেনি। তোর মাকে সে কোথায় রেখেছিল, কেন রেখেছিল—এসব তুই এখনও জানিস না।”
রাফির মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করব কেন?”
মাহবুব মৃদু হেসে বলল, “করিস না।”
তারপর পকেট থেকে একটি ছোট চাবি বের করল।
“তোর বাবার স্টাডি রুমে একটা লোহার সিন্দুক আছে। এই চাবি দিয়ে সেটা খুলবি।”
সুমন হঠাৎ বলল, “তুমি ওকে সেখানে যেতে দেবে না।”
মাহবুব তার দিকে তাকিয়ে বলল, “কেন? কারণ সেখানে তোর বাবার নামও আছে?”
সুমন চুপ হয়ে গেল।
রাফি বুঝতে পারল, সুমন কিছু একটা জানে।
“সুমন, তুই কী লুকাচ্ছিস?”
সুমন উত্তর দিল না।
রাফি এবার তার দিকে এগিয়ে গেল।
“সাত বছর ধরে তুই আমার বন্ধু ছিলি। কিন্তু আজ বুঝছি, তুইও আমাকে পুরো সত্যি বলিসনি।”
সুমন চোখ নামিয়ে বলল, “আমি তোকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম।”
“সবাই একই কথা বলে!”
রাফির কণ্ঠে হতাশা।
“আমাকে সবাই রক্ষা করতে চেয়েছে। অথচ কেউ আমাকে সত্যিটা বলেনি।”
মেহরিন ধীরে ধীরে রাফির কাছে এসে দাঁড়াল।
“আমি বলেছিলাম, সত্যিটা হয়তো আমাদের ভেঙে দেবে।”
রাফি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “কিন্তু মিথ্যা আমাদের অনেক আগেই ভেঙে দিয়েছে।”
ঠিক তখনই বাইরে আবার গাড়ির শব্দ হলো।
মাহবুব জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওরা এসে গেছে।”
রাফি জিজ্ঞেস করল, “কারা?”
মাহবুব বলল, “যারা প্রকল্প ১৭ শেষ করতে চায়।”
“তারা কী চায়?”
“তুই।”
ঘরের সবাই চুপ।
মাহবুব ধীরে ধীরে বলল, “তোর কাছে যে নথি আছে, সেটা তাদের দরকার। কিন্তু তারা জানে না—নথির আসল চাবি কোথায়।”
রাফি চাবিটার দিকে তাকাল।
“এটা?”
“না।”
মাহবুব মাথা নাড়ল।
“চাবি তোর কাছে আছে।”
রাফি অবাক হয়ে বলল, “কোথায়?”
মাহবুব তার বুকের দিকে ইশারা করল।
“তোর জন্মের সময় যে লকেটটা তোর গলায় দেওয়া হয়েছিল, সেটা কোথায়?”
রাফি সঙ্গে সঙ্গে নিজের গলার দিকে হাত দিল।
শৈশব থেকে তার কাছে থাকা ছোট্ট রুপালি লকেট।
যেটাকে সে কখনো খোলার চেষ্টা করেনি।
মেহরিন তাকিয়ে বলল, “রাফি...”
মাহবুব বলল, “ওটাই প্রকল্প ১৭-এর আসল চাবি।”
রাফি লকেটটা খুলে হাতে নিল।
লকেটের পেছনে খুব ছোট করে খোদাই করা ছিল—
১৭-০৮-২০০১
তার জন্মতারিখ।
কিন্তু এবার সে লকেটটা ঘুরিয়ে দেখল।
ভেতরের অংশে একটা সূক্ষ্ম রেখা।
মেহরিন বলল, “এটা খোলা যায়।”
রাফি নখ দিয়ে চাপ দিতেই লকেটটা খুলে গেল।
ভেতরে একটি ক্ষুদ্র কাগজ ভাঁজ করা ছিল।
রাফি কাগজটা বের করল।
কাগজে মাত্র একটি বাক্য—
“যাকে তুমি বাবা বলে জানো, সে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি লুকিয়ে রেখেছে।”
রাফি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে তার বাবার নাম।
রাফি কলটি ধরল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর সেই পরিচিত কণ্ঠ—
“রাফি, তুই যদি সত্যিই সব জানতে চাস, তাহলে এখনই বাড়ি ফিরে আয়।”
রাফি বলল, “কেন?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
“কারণ তোর মাকে আমি কোথায় রেখেছি, সেটা আজ তোকে বলতে হবে।”
কল কেটে গেল।
রাফির চোখে তখন আর ভয় ছিল না।
ছিল শুধু একটাই সিদ্ধান্ত।
সে মেহরিনের হাত ধরল।
“চলো।”
মেহরিন জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”
রাফি দরজার দিকে তাকিয়ে বলল—
“বাড়ি।”
সুমন বলল, “তুই জানিস না সেখানে কী অপেক্ষা করছে।”
রাফি থেমে তার দিকে তাকাল।
“হয়তো জানি না।”
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“কিন্তু সাত বছর ধরে আমি একজন মানুষের অপেক্ষায় ছিলাম।”
মেহরিন তার হাত শক্ত করে ধরল।
রাফি বলল—
“আজ আমি তার কাছে যাচ্ছি।”
আর পুরোনো হাসপাতালের বাইরে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে।
কিন্তু রাফি জানত—
তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার রাত এখনও শেষ হয়নি।