শুক্রবার আসতে রাফির কাছে যেন অনেক সময় লেগে গেল।
চিঠিটা পাওয়ার পর থেকে তার ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছিল। কাজের টেবিলে বসে সে বারবার একই কথাটা ভাবছিল—
সে কি সত্যিই আসবে?
সাত বছর আগে যে মানুষটি বলেছিল, “আমি ফিরে আসব”—আজ আবার সেই মানুষই তাকে ডেকেছে।
কিন্তু কেন?
কোথায় ছিল এতদিন?
কেন কোনো যোগাযোগ করেনি?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
এত বছর পর হঠাৎ ফিরে আসার কারণ কী?
শুক্রবার বিকেল চারটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে রাফি পুরোনো রেলস্টেশনে পৌঁছাল।
স্টেশনটা আগের মতোই আছে।
ভাঙা প্ল্যাটফর্ম।
পুরোনো লোহার বেঞ্চ।
এক পাশে ছোট্ট চায়ের দোকান।
আর মাথার ওপর ঝুলে থাকা পুরোনো ঘড়িটা—যেটা বহু বছর ধরেই পাঁচ মিনিট পিছিয়ে।
রাফি প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াল।
ঘড়িতে পাঁচটা বাজতে আর পাঁচ মিনিট বাকি।
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন সে নিজেই শুনতে পাচ্ছিল।
হঠাৎ দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
রাফি রেললাইনের দিকে তাকাল।
একটি ট্রেন ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকল।
কয়েকজন যাত্রী নামল।
কেউ তাড়াহুড়ো করে চলে গেল।
কেউ রিকশার দিকে এগিয়ে গেল।
রাফি প্রতিটি মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
কিন্তু সে নেই।
ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল।
রাফির বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল।
সে নিজের মনে বলল,
“আমি আবারও ভুল করলাম।”
ঠিক তখন—
পেছন থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।
“তুমি এখনও আগের মতোই অপেক্ষা করো।”
রাফি জমে গেল।
এই কণ্ঠ সে চেনে।
অনেক বছর আগে অসংখ্য রাত ফোনে এই কণ্ঠ শুনেছে।
তারপর ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকাল।
একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা পোশাক।
খোলা চুল।
চোখে ক্লান্তির ছাপ।
কিন্তু সেই চোখ—
রাফি পৃথিবীর হাজার মানুষের ভিড়েও চিনে ফেলতে পারত।
মেহরিন।
রাফির ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
“তুমি…”
মেহরিন কিছু বলল না।
শুধু তাকিয়ে রইল।
সাত বছরের দূরত্ব যেন তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
রাফি ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি সত্যিই ফিরে এসেছ?”
মেহরিন মৃদু হাসল।
“আমি তো বলেছিলাম, ফিরে আসব।”
রাফির চোখে পানি চলে এল।
“তাহলে এতদিন কোথায় ছিলে?”
মেহরিন মুখ ফিরিয়ে নিল।
“সব কথা এখানে বলা যাবে না।”
“কেন?”
“কারণ কেউ আমাদের দেখছে।”
রাফি চারদিকে তাকাল।
স্টেশন প্রায় ফাঁকা।
দূরে চায়ের দোকানে একজন বৃদ্ধ বসে আছে।
আর প্ল্যাটফর্মের অন্য পাশে কালো পোশাক পরা একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
রাফি লোকটির দিকে তাকাতেই সে মুখ ফিরিয়ে নিল।
“ও কে?”
মেহরিন খুব আস্তে বলল,
“আমি জানি না।”
“তাহলে তুমি ভয় পাচ্ছ কেন?”
মেহরিন এবার রাফির দিকে তাকাল।
“কারণ সাত বছর আগে আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি।”
রাফির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“মানে?”
মেহরিন তার ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিটা রাফির হাতে দিয়ে বলল,
“এটা দেখো।”
রাফি ছবিটির দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
ছবিতে রাফি আর মেহরিন।
তাদের দুজনের সঙ্গে আরও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
একজন বৃদ্ধ।
রাফি তাকে চিনতে পারল না।
কিন্তু ছবির পেছনে লেখা ছিল—
“ঢাকা, ১৭ আগস্ট ২০১৯।”
রাফির বুক কেঁপে উঠল।
“এই ছবি কবে তোলা?”
“সাত বছর আগে।”
“কিন্তু…”
মেহরিন বলল,
“তুমি সেদিন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে।”
“কী বলছ?”
“তোমার মনে আছে, সেদিন রাতে আমার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল?”
রাফি মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“তুমি আসোনি।”
“আমি এসেছিলাম!”
মেহরিন চুপ করে রইল।
রাফি বলল,
“আমি স্টেশনে এসেছিলাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলাম। তারপর…”
“তারপর কী?”
রাফি চোখ বন্ধ করল।
তারপর হঠাৎ মাথার ভেতর একটা ঝলক দেখা দিল।
একটি গাড়ি।
হেডলাইট।
একজন মানুষ।
আর তারপর—
অন্ধকার।
রাফি চোখ খুলল।
“আমি কিছু মনে করতে পারছি না।”
মেহরিন বলল,
“কারণ সেদিন তোমার সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটেছিল।”
রাফি স্তব্ধ।
“কিন্তু আমাকে তো কেউ বলেনি!”
“তোমার পরিবার তোমাকে বলেনি।”
“কেন?”
মেহরিনের চোখে পানি চলে এল।
“কারণ তারা ভেবেছিল, তুমি যদি সব জানতে পারো, তাহলে তুমি আমাকে খুঁজবে।”
“আর তুমি?”
মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি তোমাকে খুঁজেছিলাম।”
“তাহলে যোগাযোগ করোনি কেন?”
মেহরিন এবার ব্যাগ থেকে আরেকটি চিঠি বের করল।
“কারণ আমি তোমাকে এগুলো পাঠিয়েছিলাম।”
রাফি অবাক হয়ে বলল,
“কিন্তু আমি তো কোনো চিঠি পাইনি।”
মেহরিন বলল,
“আমি সাত বছরে তোমাকে মোট তেরোটি চিঠি লিখেছিলাম।”
রাফির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“তাহলে?”
মেহরিন ধীরে ধীরে বলল—
“কেউ একজন সেই চিঠিগুলো তোমার কাছে পৌঁছাতে দেয়নি।”
রাফি কিছু বলতে পারল না।
দূরে আবার ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
কালো পোশাকের লোকটি ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে।
মেহরিন রাফির হাত শক্ত করে ধরে বলল—
“চলো। এখনই।”
রাফি জিজ্ঞেস করল,
“কোথায়?”
মেহরিন উত্তর দিল—
“যেখানে আমাদের গল্পটা শেষ হয়েছিল।”
তারপর দুজন অন্ধকার প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি ফোন বের করে কারও সঙ্গে কথা বলল।
তার কণ্ঠ খুব নিচু—
“ওরা দেখা করেছে।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর ফোনের ওপাশ থেকে উত্তর এল।
লোকটি বলল—
“হ্যাঁ। এবার ওদের থামাতে হবে।”