Post

‘রৌজা’ গীতিকবিতা পর্ব (৯)

June 4, 2024

Original Author আযাহা সুলতান

496
View

৮১ 
বেসেছি ভালো যাঁরে গোপনে গোপনে 
এ ভালোবাসার কথা বলি তাঁরে কেমনে। 
কেমন করে জানাই প্রিয়রে মনের কথা 
মনেতে রইল পাওয়ার কী যে আকুলতা, 
কী যে উন্মুখ হয়ে আছে পরান মিলনে। 
বেসেছি ভালো যাঁরে গোপনে গোপনে॥

সবকিছু ভুলতে পারি—পারি না বন্ধুরে 
বন্ধুর ভালোবাসা ছাড়া অসার এ মর্ম রে। 
জীবনের সার হোক তবে এই শুধু তপ 
মরণে যে করে যেতে পারি বন্ধুর জপ, 
এ বিনে চাই নে কিছু আর চাই নে মনে। 
বেসেছি ভালো যাঁরে গোপনে গোপনে॥ 
২১ কার্তিক, ১৪২৫—মানামা, আমিরাত


৮২ 
আমার মাথা নত করো তোমার পদতলে 
যত দিন আছি এ ভূতলে। 
আমি দুঃখকষ্টেও মাথা রাখি যেন পর্বতের মতো উঁচু—
থাকি বিপদ-আপদেও অটলে। 
যত দিন আছি এ ভূতলে॥

কোনো প্রলোভনের লোভন প্রাসাদে 
এই মাথা নত করো না কোনো শর্তে, 
অভাব-উপোসে দিতে পারি জীবন বিসর্জন—
নিতে পারি না ধিক্কার ঝুলিঝুলে। 
যত দিন আছি এ ভূতলে॥

আমি করিনি—করি না—করাও না কারে তোয়াজ 
না করাও আল্লাহ কারও তোষামোদী। 
এই জীবন ছোট হতে হতে মিলে যাক-না শেষাবধি—
তবু যেন হীনাত্মার পরিচয় না দি’। 
না করাও আল্লাহ কারও তোষামোদী॥

নপুংসকের জিন্দেগির বাদশাহিচেয়ে 
পুংসকের ভিক্ষার ঝুলির তুলনা নেইয়ে, 
সৃষ্টির কোনো কিছুই ছোট হওয়া দোষের না—
দোষ—হলে আত্মা ছোটর মালিকি। 
না করাও আল্লাহ কারও তোষামোদী॥ 
২৫ কার্তিক, ১৪২৫—মানামা, আমিরাত


৮৩ 
বিধি, 
শোনাও না আর ঘাসের কান্না 
বলতে চেয়েও অনেক কিছু পারি না। 
করতে চাই না আর শান্তির কলরব 
সত্যকথা বলার মাঝে দুঃখ হে রব॥

বিধি, 
দেখাও না আর বিধানের বিধান 
ফেরেশতা যত-না তারচে বেশি শয়তান। 
আজকের জিন্দেগি কালকে গল্পগুজব—
সত্যকথা বলার মাঝে দুঃখ হে রব॥

বিধি, 
ভাগ্যিস মানুষে দাওনি অদৃশ্যশক্তি 
তুমি স্রষ্টা আছ বলে কভু মানতো না যুক্তি। 
এটুকু পেয়ে এতটুকুন মানুষের গর্ব কত 
আরেকটু পেলে তুমি জানো মানুষ কী হতো॥

বিধি, 
কোথা আছে দেখাও নরাধমের ধাম 
আমাকে জানতে হবে হীনাত্মার পরিণাম। 
তা হলে স্তব্ধ করে দাও আমার ভৈরব—
সত্যকথা বলার মাঝে দুঃখ হে রব॥ 
২৭ কার্তিক, ১৪২৫—মানামা, আমিরাত


৮৪ 
শোকরান 
দিলে তুমি অপরূপ পথের সন্ধান, 
গীতিয়ান 
গাওয়ালে বেসুরের কণ্ঠে সুরের গান। 
ভুলা যায় না—যাবে না অমৃত এ দান—
শোকরান॥

কোনো দিন 
ভাবিনি আমি এমন মঞ্চ পাব একদিন, 
সীমাহীন 
এই দয়া—আমাকে ঋণী করছে দিনদিন। 
নিজেরে ভুলতে পারি—পারি না এ মান—
শোকরান॥

আমার 
ভুবনে আছে—থাকুক বেদনার পাহাড়, 
তোমার 
জিকিরে প্রকাশ না হোক মনের আঁধার। 
আমারে লুকাতে পারি—পারি না এ ঘ্রাণ—
শোকরান॥ 
২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫—মানামা, আমিরাত


৮৫ 
মরণ তো আছে একদিন 
মরতে হবে আমারি, 
তা যেন মরণের মতো হয় 
এতটুকু কামনা করি।

জিন্দেগি যাইবা দিলে শোকরিয়ে 
লাঞ্ছনার মৃত্যু দিয়ো না প্রিয়ে, 
এই মন হাসিখুশির মধ্যে দিয়ে 
করে নিয়ো তোমারি। 
মরণ তো আছে একদিন 
মরতে হবে আমারি॥

এলাম-গেলাম এরকম যেন 
না হয় এ জিন্দেগি, 
এ জিন্দেগির কোনো মানে নেই 
তুমিই তো বলেছ সুধী।

জীবন কী জ্ঞাত করো আমায় 
যদি হয় ভালো কিছু করে যাওয়ায়, 
তবে যেন হয় জীবনটা তাই 
করো জীবন পুরোপুরি। 
মরণ তো আছে একদিন 
মরতে হবে আমারি॥ 
১১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫—মানামা, আমিরাত


৮৬ 
স্মরণ করবে কি পৃথিবী আমারে? 
আমি চলে গেলে কাল পৃথিবী থেকে? 
করলাম কি কাজ এমন একটিবারে? 
মনে রাখার মতো পৃথিবী আমাকে?

আমিও পৃথিবীর স্বজন একজন 
করতে চেয়েছি পৃথিবীকে আপন, 
আমারও স্বপ্ন ছিল তবে কর্ম-ইয়াদে—
মনে রাখার মতো পৃথিবী আমাকে॥

সবাই তো আসে পৃথিবীতে শূন্য হাতে 
শূন্যে ফিরে—জীবনটা বুঝে কয় জনে, 
যে বুঝে জন্মের মানে পারে কিছু হতে 
সে রেখে যেতে পারে অবদান স্মরণে।

গুণীরা চায় না কবে বরণীয় হোক 
স্মরণীয় হতে পারলেই বরেণ্যলোক, 
আফসোস—পারিনি ইয়াদগার হতে—
মনে রাখার মতো পৃথিবী আমাকে॥ 
২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫—মানামা, আমিরাত


৮৭ 
আর কারে বোঝাব মনের দুঃখ আমি 
তুমি ছাড়া বোঝার কে আছে অন্তর্যামী। 
পিতা বুঝে না পুত্রের মত 
পুত্র বুঝে না পিতার দরদ, 
ভবে বুঝে স্বার্থের জপ—বুঝো শুধু তুমি—
আর কারে বোঝাব মনের দুঃখ আমি॥

ভাই-বন্ধু-স্বজন যত মনে করি আপন 
শোনালে শুনে না কেউ কষ্টের কথন। 
ধন থাকলে পূজে জনে 
জন থাকলে ডরায় ক্ষণে, 
মন থাকলে—নিঃস্বার্থ একমাত্র তুমি—
আর কারে বোঝাব মনের দুঃখ আমি॥ 
২২ বৈশাখ, ১৪২৬—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম


৮৮ 
কোথায় আছ প্রাণের বন্ধু আমার 
কেমনে পাই তোমারে? 
কোথায় গেলে মিলে দেখা তোমার 
চেতন কিবা ঘুমের ঘোরে?

দেখল যারা তোমায় মনশ্চক্ষে 
ভুলল জগৎ আর ভুলল নিজেকে! 
আমায় কবে ভুলাবে ‘সত্য’ বলে 
ধন্য মরণ মনসুরে। 
কোথায় আছ প্রাণের বন্ধু আমার 
কেমনে পাই তোমারে?।

বলে কি তারা বুঝে আসে না 
বিশ্বের সৃষ্টি এমনি? 
আমি বুঝি—তুমি না থাকলে 
সমস্তের শৃঙ্খলা কেমনি?

যত সহজে গাই জীবনের গান 
তত সহজ কিরে অজানার সন্ধান? 
নিজেরে আমি বুঝি না যেখানে 
তোমায় বুঝি কী করে? 
কোথায় আছ প্রাণের বন্ধু আমার 
কেমনে পাই তোমারে?। 
৩০ বৈশাখ, ১৪২৬—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম 

৮৯ 
স্রষ্টা! তুমি যদি সৃষ্টি করো আমায় 
না না—আমার কোনো সন্দেহ নাই। 
তবে? মনে কেন জানি ভাবায় 
অনেক কথা শুনি তাই॥

এত ভালো দেখালে জগৎ 
তবু জগতের মনে দ্বিমত, 
কোথা থেকে আসে ভেবে না-পাই—
না না—আমার কোনো সন্দেহ নাই॥

আমি তো মহাদিবসের ভয়ে আছি 
কোথায় স্থান আমার কেঁদে যাচ্ছি। 
কী হবে সেদিনের রূপরং ভাবছি 
আমার মধ্যে আমি নাই॥

যে যা ভাবে ভাবুক গে 
ভাবনার বলে মরুক গে, 
আমি বাঁচি—আমারে দাও প্রচ্ছায়—
স্রষ্টা! তুমি যদি সৃষ্টি করো আমায়॥ 
১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম


৯০ 
ফলবান বৃক্ষ দেখছি—
কেমনে ফলছে ফল। 
বর্ষিত আসমান দেখছি—
কেমনে বর্ষে জল॥

নদী কেনে বয়ে চলছে 
সাগরে মিশে ঢেউ তুলছে, 
এই বিশ্ব আর এই মহাচক্র 
দেখে যাচ্ছি অবিরল॥

পাই নে ভেবে কূলকিনারা—
ফুল বিনে ফল কেনে। 
বটের গাছে ক্ষুদ্র গোটা—
লতার ফসল মণে মণে॥

শূন্যে কেনে ভাসছে পাথর 
জলে কেনে ডুবছে না গতর, 
হাজারো আশ্চর্যে জগদ্দর্শন 
তবু মানবহৃদে ছল॥ 
২৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম 

Comments

    Please login to post comment. Login