শহরের কোলাহল, যানজট আর প্রতিদিনের একঘেয়েমি জীবনে রাহুল যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল। অফিস থেকে ফিরেই মোবাইল স্ক্রল করা আর ঘুম—এই ছিল তার রুটিন। একদিন হঠাৎ পুরোনো ডায়েরির পাতা উল্টাতে গিয়ে সে পড়ল ছোটবেলার লেখা একটি লাইন—“একদিন আমি অনেক দূরে যাব।” সেই লাইনটিই যেন তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভ্রমণের আগুনটাকে জ্বালিয়ে দিল।
পরদিনই সে সিদ্ধান্ত নিল পাহাড়ে যাবে। কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে—কিছুই ঠিক ছিল না। শুধু জানা ছিল, শহর ছেড়ে একটু নিঃশ্বাস নিতে চায়। ব্যাগে কয়েকটা জামাকাপড়, একটি ক্যামেরা আর মায়ের দেওয়া শুকনো খাবার নিয়ে রাহুল রওনা দিল উত্তরবঙ্গের দিকে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে দেখল ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। কংক্রিটের দালান ছেড়ে সবুজ মাঠ, নদী আর পাহাড় চোখে পড়তে শুরু করল। মনে হচ্ছিল প্রকৃতি নিজেই তাকে স্বাগত জানাচ্ছে। দার্জিলিং পৌঁছে ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শে তার সমস্ত ক্লান্তি যেন মিলিয়ে গেল।
একটি ছোট হোমস্টেতে উঠল সে। সেখানে পরিচয় হলো বৃদ্ধ গাইড তেনজিংয়ের সঙ্গে। তেনজিংয়ের চোখে ছিল জীবনের গভীর গল্প। পরদিন ভোরে তেনজিং তাকে নিয়ে বের হলো পাহাড়ি পথে হাঁটতে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাহুল অনুভব করল—জীবন শুধু অফিস আর দায়িত্বের নাম নয়, জীবন মানে অনুভব করা, দেখা, শেখা।
পথে তারা এক পাহাড়ি গ্রামে পৌঁছাল। সেখানকার মানুষগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু তাদের হাসিতে ছিল অদ্ভুত এক শান্তি। এক বৃদ্ধা রাহুলকে গরম চা খাওয়ালেন। ভাষা পুরো বোঝা না গেলেও অনুভূতির কোনো বাধা ছিল না। সেই মুহূর্তে রাহুল বুঝল, ভ্রমণ শুধু জায়গা বদলানো নয়, মন বদলানোরও নাম।
সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার সময় পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সে দেখল লালচে আলোয় আকাশ রঙিন হয়ে উঠছে। ক্যামেরা হাতে তুলেও সে ছবি তুলল না। মনে হলো, এই দৃশ্য ক্যামেরায় নয়, হৃদয়ে ধরে রাখাই ভালো।
কয়েকদিন পর যখন সে শহরে ফেরার জন্য রওনা দিল, তার ভেতরের মানুষটা আর আগের মতো রইল না। সে বুঝে গেছে—ভ্রমণ মানে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের কাছে ফিরে আসা। শহরে ফিরেও রাহুল জানত, অচেনা পথের সেই ডাক সে আর কোনোদিন ভুলতে পারবে না।
32
View