বাংলা সাহিত্য

‘রৌজা’ গীতিকবিতা পর্ব (১০)

June 5, 2024

আযাহা সুলতান

Original Author আযাহা সুলতান

529
View

৯১ 
আমি জানি না আরাধনা 
না জানি কোনো প্রার্থনা, 
তুমি তো জানো অন্তরের খবর। 
আমি বলতে চাই এক 
বলে ফেলি আরেক, 
আমার বয়ানে নেই যেরযবর॥

এ জীবনের অর্জন কী 
শূন্য ছাড়া পাই নে খুঁজি, 
আঁকাজোকা দেখছি অকার্যকর॥

তোমার বাণী শুদ্ধ চলনে 
নয় শুদ্ধ পাঠ করণে, 
আমি তো শুদ্ধ পড়েও করি ভুল! 
এ আমার এ বন্দেগি 
পায় কেমনে জিন্দেগি? 
তুমি যদি দাও না ছাড় একচুল?।

আমার কী হবে—হবে কী 
ভাবছি সেদিনের গতি কী, 
আমার মধ্যে নেই আমার অন্তর॥ 
২৩ আষাঢ়, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত


৯২ 
আমার প্রভু দয়াময় 
করলে আমায় সৃষ্টি নিশ্চয়, 
নিশ্চয় তিনি করুণাময়।

ছিলাম আমি বিক্ষিপ্তে 
নিয়ে এলে প্রভু অস্তিত্বে, 
পেলাম আমি বিরাট পরিচয়॥

যদি হই তাতে কৃতঘ্নমনা 
আমারে আমি স্বীকার করি না, 
আমারে আমি করি বঞ্চনা।

না বুঝে—বুঝে কে বেশি 
নিজেরে নিজে বানায় দোষী, 
আমাতে ভালো কম বোঝার হৃদয়॥ 
১৩ শ্রাবণ, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত


৯৩ 
মেহেরবান, 
তোমার মেহেরবানির শোকরিয়া 
আদায় করতে পারি না—পারি না জনম-জনমে। 
সুমহান, 
তোমার মহানতার গুণবর্ণনা করিয়া 
শেষ করা যায় না—যায় না কোনো কালির কলমে॥

আমার জবানে কী প্রশংসা করি আমি 
শত-হাজার-কোটি প্রশংসার ঊর্ধ্বে তুমি; 
গুণবান, 
তোমার গুণগান যেতে পারি গাহিয়া 
অতটু জ্ঞানের পরিধি বাড়াও—বাড়াও এ মনে॥

জীবনে, 
তুমি ছাড়া সবকিছু অর্থহীন ও ধোঁকা 
অনর্থের ধোঁকায় ধোঁকায় রেখো না আমাকে। 
কেমনে, 
কোন সেই সাধনে পাই তোমারি দেখা 
আমারে চালাও—চালাও সেই গন্তব্যেরই পথে॥

যেপথে রেখেছ তুমি তোমার সন্ধান 
আমার কমিয়ে দাও সেপথের ব্যবধান; 
রহমান, 
তোমার রহমতে নেও আমায় ঢাকিয়া 
আমি পথ খুঁজে পাই—পাই যেন অসীম মহাশূন্যে॥ 
১৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত


৯৪ 
তোমার মহব্বতে এসেছি পৃথিবীতে 
আবার চলে যাব তোমার আদেশে, 
মাঝখানে কিছু সময় এলোমেলোতে 
কেটেছে জানি আমার—বুঝি শেষে॥

সবকিছু চলে—চলছে তোমার ইশারায় 
গ্রহ-তারা-নক্ষত্র সবকিছু নিয়মশৃঙ্খলায়, 
আমায় অনিয়মে ঘুরায় কে বিপরীতে? 
মাঝখানে কিছু সময় এলোমেলোতে॥

আমি চলতে পারি কী দক্ষতার বলে 
তুমি যদি দাও না চলনের ক্ষমতা, 
চালনের মালিক তুমিই চালাচ্ছ বলে 
চলছি আমি মনে করি সঠিক রাস্তা॥

তুমি দিয়ে যাচ্ছ যখন পথের দিশা 
আমাকে পথ ভুলায় কোন সর্বনাশা, 
কে সে পথভ্রষ্ট চালিত করে বিপথে? 
তোমার মহব্বতে এসেছি পৃথিবীতে॥ 
২৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত 

৯৫ 
সৃজক! 
আমায় ক্ষুদ্র করেছ দুঃখ নেই 
করো না কভু ক্ষুদ্রমনা। 
পৃথক! 
তোমার থেকে করেছ ভালো 
অন্তর থেকে করো না॥

সৃষ্টির যত নীচত্ব দেখালে তুমি 
অল্প প্রাণের জন্যে কাঁদি আমি, 
আফসোস! 
বড় জগতে জন্ম নিয়েই 
ছোট দুনিয়ার ভাবনা॥

দেখেছি! 
আসমান-জমিনের পার্থক্য কী 
তারচেয়ে অধিক অন্তর। 
পেয়েছি! 
যতটু যা সমাধানের মিল 
ভাবের ঘোরের ভেতর॥

হৃদয়ে যদি হওয়া যায় বড় 
সকল তক্ত তার কাছে ক্ষুদ্র, 
মানুষ! 
নিবেদিত প্রাণ হতে পারলে 
নেই প্রাণের তুলনা॥ 
৬ পৌষ, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত


৯৬ 
নিরন্তর আমার এ অন্তর 
কাঁদছে শুধু কাঁদছে! 
কীজন্যে অন্তরের এ কান্না 
আমিও কিছু বুঝি নে।

যত যা পেয়েছি ধন্য জীবন 
যত যা পাইনি দুখী না মন, 
কী রেখে যাচ্ছি এটাই কথন 
কী দিলাম পৃথিবীকে। 
নিরন্তর আমার এ অন্তর 
কাঁদছে শুধু কাঁদছে॥

যা করলাম—করেছি যা জীবনে 
সবই মনে হয় ভুল! 
আপন আপন করে মরেছি শুধু 
আপনচে নেই অতুল।

জীবনের শেষপ্রান্তে এসে বুঝছি 
পিঠের আঘাতচে বুকের ব্যথা কী! 
আপনার বলে থাকে কিছু যদি 
আপন কর্মের মাঝে। 
নিরন্তর আমার এ অন্তর 
কাঁদছে শুধু কাঁদছে॥ 
২৬ পৌষ, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত


৯৭ 
শ্রেষ্ঠ কর্মে 
স্রষ্টার ধর্মে 
দেখলাম যা নিদর্শন, 
চৌকস সক্ষমে 
সৃষ্টি কর্মক্ষমে 
করা হয়েছে সৃজন।

মনেপ্রাণে যা চিনাল 
মন ভালো তো সব ভালো, 
বৃক্ষরাজি ফুলে 
প্রাণের মূলে 
পেয়েছি সন্ধান অতুলন। 
শ্রেষ্ঠ কর্মে 
স্রষ্টার ধর্মে 
দেখলাম যা নিদর্শন॥

দুখীর দরদে 
দুখীই জুটে 
এটাই দুখীর নিয়তি, 
সুখীর আনন্দে 
সুখীই ছুটে 
দুয়েতে বড়ই সংগতি।

জ্ঞাতিতে জ্ঞাতির টান 
জ্ঞাতি ছাড়া সব সমান, 
বৃষ্টির জলে 
নদী সজলে 
দেখি নে বিরূপ কখন। 
চৌকস সক্ষমে 
সৃষ্টি কর্মক্ষমে 
করা হয়েছে সৃজন॥ 
৩০ পৌষ, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত


৯৮ 
ধনী, 
তোমার দুনিয়াতে এসেছিলাম 
চাইনি লেনের হাত। 
দানী, 
দেনে অধিকারিত্ব চেয়েছিলাম 
প্রাণের জগন্নাথ॥

তুমি দিলে না বলে সামর্থ্য 
দিতে পারিনি আমি কিছুই তো, 
ভাগ্যের ভাণ্ড এতটা নিকৃষ্ট 
মনে বড় ঘাত। 
ধনী, 
তোমার দুনিয়াতে এসেছিলাম 
চাইনি লেনের হাত॥

ওই, 
দুখীরা আমার সামনে কেঁদে যায় 
বড়ই আমার দুখ। 
কই, 
সুখীরা হেসে যাচ্ছে হাসুক সদায় 
এ প্রার্থনায় সুখ॥

অকৃতজ্ঞকারীর নেই সদ্গতি 
হিংসাকারীরও তদ্রূপ নেই উন্নতি, 
জীবনের স্মরণে রেখে যাচ্ছি কী 
মিলাতে বসি খাদ। 
ধনী, 
তোমার দুনিয়াতে এসেছিলাম 
চাইনি লেনের হাত॥

১০ মাঘ, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত


৯৯ 
বাবার কোলে নিরাপদ নয় 
না মায়ের কোলে আপদহীন—
আজকের শিশু! 
এরচে জগতে আর কী হয় 
সুরক্ষিত স্থান সন্তানসন্ততির—
বলো হে প্রভু?

দয়াহীন কেন আজ? 
এমন স্নেহবন্ধনের মাঝ? 
আদরের চুম্বনে বিষের কাজ! 
কেন ফলপ্রসূ? 
বলো হে প্রভু?।

কতটা নির্মম হলে যে মানুষ 
হতে পারে সন্তানের হন্তারক—
কতটা পশুত্বপর? 
নির্দয় কত হলে হয় অমানুষ 
দেখার বাকি ছিল বোধহয়—
মাতাপিতার অন্তর!

দেখালে মা’র আঁচলাশ্রমে! 
সন্তানের বিপদ কী জন্মে! 
বাবার ছায়াতলে ক কী মর্মে? 
আপদমুক্ত কমু? 
বলো হে প্রভু?। 
১৪ মাঘ, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত


১০০ 
তোমরা বলছ, 
তোমরা উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছ পৃথিবী? 
আমরা বলছি, 
আমরা সবে বিলুপ্তির পথে আছি ঘুরিফিরি! 
তোমাদের কথা আর আমাদের দেখা 
দুয়ের পার্থক্য যেন আলোকবর্ষ ব্যবধা! 
চিন্তা কী, 
নিজের ধ্বংস নিজেরাই করছি মিলেমিশি!।

কোথা শুনেছি, 
পাশের ঘর পুড়লে নিজের ঘর পুড়বে! 
কথা সত্যি, 
দাঁড়িয়ে তামাশা দেখনেওয়ালারও রক্ষা নে! 
ভাবছি—আমাদের গতি যাই হোক-না 
তোমাদের জন্যে রইল মঙ্গলকামনা; 
প্রার্থনা করি, 
আমরা না থাকি—থাকুক তোমাদের বসতি॥ 
১৭ মাঘ, ১৪২৬—মানামা, আমিরাত 

Comments

    Please login to post comment. Login