Posts

উপন্যাস

রক্তিম খাম ও ছায়া মানুষের হাহাকার

January 7, 2026

Ms Karima

32
View

নীল খামের রহস্য (অভিশপ্ত উত্তরাধিকার)

দ্বিতীয় পর্ব: কবরের ওপার থেকে সেই কল

অন্ধকার ঘরটাতে আরিয়ানের নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি নিজের কানেই ড্রামের মতো বাজছে। খাটের নিচ থেকে আসা সেই নখ দিয়ে আঁচড়ানোর শব্দটা এখন আর কেবল শব্দ নয়, ওটা যেন আরিয়ানের স্নায়ুর ওপর কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে করা আঘাত। শব্দটা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, যেন খাটের নিচে থাকা সত্তাটি কাঠের ফ্রেম ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আরিয়ান অনুভব করল, তার রুমের ভেতরের বাতাসটা অস্বাভাবিক ভারী এবং শীতল হয়ে উঠেছে। এক ধরণের প্রাচীন ভ্যাপসা গন্ধ—ঠিক যেন শত বছরের পুরনো কোনো কবরের ভেতরে জমে থাকা গন্ধ—পুরো ঘরে জেঁকে বসেছে।

আরিয়ান থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতে তার ফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা অন করার চেষ্টা করল বারবার। কিন্তু পাওয়ার বাটনে চাপ দিলেও স্ক্রিন জ্বলছে না। মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে আসা সেই রহস্যময় কলটি যেন ফোনের ভেতর থেকে সবটুকু জীবনীশক্তি আর ব্যাটারি শুষে নিয়েছে। হঠাৎ জানালার বাইরে মেঘের গর্জনের সাথে এক মুহূর্তের জন্য তীব্র এক বিজলি চমকালো। সেই ক্ষণিক নীলচে আলোতে আরিয়ান যা দেখল, তাতে তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে বরফ হয়ে গেল।তার পড়ার টেবিলের সামনের চেয়ারে কেউ একজন আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। অবয়বটা হুবহু আরিয়ানের বাবার মতো। সেই একই রকম চওড়া কাঁধ, চিরচেনা চেক শার্ট, এমনকি নাকে সেই বিশেষ ফ্রেমের চশমাটাও আছে। কিন্তু বিভীষিকাটা হলো তার মুখে। বিজলির আলো যখন তার মুখে আছড়ে পড়ল, আরিয়ান দেখল সেখানে কোনো চোখ নেই। চোখের জায়গায় শুধু দুটো বিশাল অন্ধকার শূন্য গর্ত, যেখান থেকে অনবরত তেলের মতো ঘন কালচে তরল গড়িয়ে পড়ছে আর তার শার্টের কলার ভিজিয়ে দিচ্ছে। মুখটা হাঁ করা, যেন সে কিছু বলতে চাইছে কিন্তু তার জিভটা কেউ গোঁড়া থেকে উপড়ে ফেলেছে।

আরিয়ান মরণপণ চেষ্টা করল আর্তনাদ করে উঠতে, কিন্তু তার কণ্ঠনালী যেন কেউ অদৃশ্য হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরেছে। কোনো স্বর বের হলো না, কেবল একটা অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এল। ঠিক তখনি খাটের নিচ থেকে একটি বরফশীতল কালচে হাত সাপের মতো দ্রুতবেগে বেরিয়ে এল। হাতটার আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা। সেটা আরিয়ানের গোড়ালি খপ করে চেপে ধরল। সেই হাতের স্পর্শে আরিয়ানের মনে হলো জ্যান্ত কোনো মানুষ নয়, বরং এক টুকরো শুকনো বরফ তার চামড়া ভেদ করে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে তার বাম পা যেন অসাড় হয়ে পাথরে পরিণত হলো। সে চাইলেও এক ইঞ্চি নড়তে পারছে না।

"কে... কে তোমরা? কী চাও আমার কাছে? আমার বাবাকে নিয়ে কেন এই বীভৎস নাটক করছো?" অনেক কষ্টে ফুসফুসের সবটুকু জোর দিয়ে ফিসফিস করে প্রশ্ন করল আরিয়ান। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই ঘরের সিলিং ফ্যানের পাশের বাতিটা তীব্র আলোয় জ্বলে উঠল। কিন্তু সেই তীব্র আলোতে আরিয়ান দেখল ঘর একদম ফাঁকা। খাটের নিচের সেই পিশাচের হাত বা টেবিলের সামনের সেই বীভৎস অবয়ব—সবই এক পলকে মিলিয়ে গেছে। আরিয়ান হাপাচ্ছে, কপাল বেয়ে ঘামের বড় বড় ফোঁটা ঝরছে। সে নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে টলতে টলতে টেবিলের ড্রয়ারের দিকে তাকাল। তার বুকটা ধক করে উঠল। লকেটটা সেখানে নেই! তার বাবার সেই রহস্যময় শেষ স্মৃতিটা কেউ একজন শূন্য থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে।

টেবিলের ওপর রাখা সেই রহস্যময় নীল খামটার দিকে চোখ যেতেই সে দ্বিতীয়বার বড় ধরণের ধাক্কা খেল। খামটা এখন আর নীল নেই; ওটা এখন মানুষের টাটকা রক্তের মতো টকটকে লাল হয়ে গেছে। ছবির সেই জরাজীর্ণ জমিদার বাড়িটার দরজায় আগে কেউ ছিল না, কিন্তু এখন সেখানে একটা কালো কুচকুচে ছায়ার মতো আকৃতি দেখা যাচ্ছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই আরিয়ান দেখল, সেই ছায়া মানুষটার হাতে ঠিক তার বাবার লকেটটা ধরা। ছবিটা যেন একটা ডিজিটাল স্ক্রিনের মতো প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। ছবির সেই ছায়াটা যেন ধীরে ধীরে ছবির ফ্রেমের ভেতর থেকে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে হাসছে।

ঠিক সেই সময় আরিয়ানের ল্যাপটপটা, যেটা আগে থেকেই শাটডাউন করা ছিল, সেটা নিজে থেকেই সশব্দে অন হয়ে গেল। স্ক্রিনে কোনো উইন্ডোজ লোগো এল না, বরং একটা পুরনো ধোঁয়াটে ভিডিও চলতে শুরু করল। ভিডিওতে তার বাবা, মৃত্যুর মাত্র চারদিন আগে এটি রেকর্ড করেছিলেন। বাবার চোখেমুখে গভীর আতঙ্ক, তিনি বারবার আতঙ্কিত হয়ে পেছনের দরজার দিকে তাকাচ্ছেন, যেন কেউ সেখানে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। ভিডিওতে তিনি খুব নিচু এবং ধরা গলায় বলছেন:

"আরিয়ান, আমার সময় শেষ। যদি তুমি এই ভিডিওটা দেখো, তবে জানবে—আমাদের রক্তে এক প্রাচীন অভিশাপ বইছে। চাটগাঁর সেই পুরনো জমিদার বাড়ি, যেটার ছবি তুমি পাবে, সেখানে ভুলেও কোনোদিন পা দিও না। লকেটটা কোনোভাবেই ওই বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। ওরা তোমাকে প্রলুব্ধ করবে, নানা মায়াজালে তোমার শৈশবকে ফিরিয়ে এনে তোমাকে দুর্বল করতে চাইবে, কিন্তু তুমি স্থির থেকো। ওই লকেটটাই ওদের অন্ধকার আত্মাকে এই জগতের বাইরে বন্দি করে রেখেছে, ওটা হাতছাড়া হওয়া মানেই চাটগাঁর সেই অভিশপ্ত গ্রাম এবং তোমার ধ্বংস নিশ্চিত..."

বাবার কথা শেষ হওয়ার আগেই ল্যাপটপের স্পিকার থেকে একটা কর্কশ অট্টহাসি ভেসে এল এবং এক প্রচণ্ড শব্দে স্ক্রিনটা ফেটে চুরমার হয়ে গেল। আগুনের ছোট ছোট ফুলকি আর কাঁচের টুকরো ছিটকে পড়ল মেঝেতে। ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়ানের সেই ডেড ফোনে একটা তীক্ষ্ণ মেসেজ টোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে কালো  ব্যাকগ্রাউন্ডে রক্তবর্ণের অক্ষরে লেখা ভেসে উঠল মাত্র তিনটি শব্দ: "আমরা তোমার দরজায়।"

বাইরের করিডোরে অনেকগুলো মানুষের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অনেক মানুষ যেন একসাথে মিছিল করে আরিয়ানের বেডরুমের দরজার দিকে আসছে। কিন্তু তাদের হাঁটার শব্দ স্বাভাবিক মানুষের মতো নয়; মনে হচ্ছে তারা ভারী কোনো বস্তুর মতো শরীরটাকে মেঝেতে ঘষটে ঘষটে এগোচ্ছে। দরজায় প্রথম ধাক্কাটা পড়ল— ধড়াস! মনে হলো কাঠের দরজাটা এখনই ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। দরজার নিচ দিয়ে একটা ঘন কালো ধোঁয়া ঘরের ভেতর ঢুকতে শুরু করেছে।

আরিয়ান প্রাণভয়ে জানালার দিকে দৌড়ে গেল। নিচে চারতলার রাস্তাটার দিকে তাকাতেই তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ ম্লান আলোয় দেখা যাচ্ছে সেই ছোট বাচ্চাটা একা দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে ছেঁড়া নোংরা জামা, এক হাতে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি, যার শিখাটা নীল রঙের। বাচ্চাটা ধীরে ধীরে মাথা তুলে ওপরের দিকে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল এবং খুব ধীরলয়ে এক হাত তুলে ইশারা করল নিচে নেমে আসার জন্য।

মোমবাতির কাঁপাকাঁপা আলোয় বাচ্চাটার মুখটা যখন পুরোপুরি স্পষ্ট হলো, আরিয়ান অনুভব করল তার মাথার ভেতর যেন হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল। ওই বাচ্চাটার মুখ আর কারও নয়, পঁচিশ বছর আগে আরিয়ান যখন ছোট ছিল, তখন তাকে দেখতে ঠিক যেমন লাগত—এটি তারই হুবহু প্রতিচ্ছবি! বাচ্চাটা অদ্ভুত এক ঠান্ডা হাসি দিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, যা আরিয়ানের কানে বাতাসের মতো ভেসে এল— "সময় হয়ে গেছে আরিয়ান, পৈতৃক বাড়িতে ফিরে চলো।"

দরজার ওপাশে ধাক্কা আর আঁচড়ানোর শব্দ আরও বাড়ছে, দরজাটার কাঠ মচমচ করে ভাঙতে শুরু করেছে। আর জানালার নিচে দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের ছায়া। আরিয়ান বুঝতে পারল, আজ রাতের এই মরণফাঁদ থেকে বের হওয়ার কোনো পার্থিব পথ তার সামনে নেই। তাকে সেই অভিশপ্ত বাড়ির ঠিকানায় যেতেই হবে।

পরের পর্বে যা থাকছে: নিজের শৈশবকে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান কি উন্মাদ হয়ে যাবে? দরজার ওপাশে থাকা সেই অমানবিক সত্তাগুলো কি আরিয়ানকে ছিঁড়ে ফেলবে? লকেটটা কি আরিয়ান উদ্ধার করতে পারবে, নাকি তার আগেই তাকে যাত্রা করতে হবে চাটগাঁর সেই অভিশপ্ত গ্রামের পথে? রোমহর্ষক সমাধান আসছে ৩য় পর্বে!

Comments

    Please login to post comment. Login