ফিরে দেখা সোনালী দিন
মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বোধহয় তার শৈশব। যখন কোনো দায়-দায়িত্ব ছিল না, ছিল না আগামীর দুশ্চিন্তা। আমার শৈশব কেটেছে সবুজে ঘেরা এক ছোট্ট গ্রামে। সেখানে ইট-কাঠের দেয়াল নয়, বরং প্রকৃতির বিশালতার মাঝে বড় হয়েছি আমি। আজ যখন নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতায় দমবন্ধ হয়ে আসে, তখন সেই হারানো দিনগুলোর কথা মনে পড়লে মনটা এক নিমেষে শান্ত হয়ে যায়।
সেই মেঠো পথ আর বৃষ্টির দুপুর
আমার মনে পড়ে বর্ষাকালের সেই দিনগুলোর কথা। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ যেন কোনো অপার্থিব সুর তুলত। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল বড় একটা পুকুর আর তার পাড়ে সারিবদ্ধ কদম গাছ। বৃষ্টির তোড়ে যখন চারপাশ ঝাপসা হয়ে যেত, আমরা বন্ধুরা মিলে নেমে পড়তাম কাদা-মাটিতে ফুটবল খেলতে। কাদায় মাখামাখি হয়ে যখন বাড়ি ফিরতাম, মায়ের বকুনি ছিল অবধারিত। কিন্তু সেই বকুনির মধ্যেও এক অদ্ভুত মমতা মিশে থাকত। মা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে বলতেন, "আবার যদি বৃষ্টিতে ভিজেছিস, তবে আজ আর ভাত দেব না।" যদিও জানতাম, দিনশেষে গরম ভাতের সাথে ইলিশ মাছের ভাজা আমার জন্যই অপেক্ষা করছে।
আম কুড়ানোর ধুম
বৈশাখ মাসের কালবৈশাখী ঝড় ছিল আমাদের কাছে উৎসবের মতো। আকাশের কোণে মেঘ জমলেই আমরা দল বেঁধে দৌড় দিতাম বাগানের দিকে। বাতাসের ঝাপটায় টুপটুপ করে আম পড়ার শব্দ এখনো কানে বাজে। কার আগে কে বেশি আম কুড়াতে পারে, তা নিয়ে চলত তুমুল প্রতিযোগিতা। কুড়ানো আমের টক-মিষ্টি স্বাদ আর নুন-লঙ্কা দিয়ে মেখে খাওয়ার সেই তৃপ্তি আজ দামী রেস্তোরাঁর খাবারেও খুঁজে পাই না। মাঝেমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে ভিজে একাকার হয়ে যেতাম, কিন্তু সেই রোমাঞ্চের কাছে ঠান্ডা লাগার ভয় ছিল তুচ্ছ।
বিকেলের খেলার মাঠ
বিকেল মানেই ছিল আমাদের রাজত্ব। স্কুল থেকে ফিরেই ব্যাগটা এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে দৌড় দিতাম খেলার মাঠে। কোনোদিন গোল্লাছুট, কোনোদিন দাঁড়িয়াবান্ধা, আবার কোনোদিন ডাংগুলি। সূর্য যখন দিগন্তের ওপারে লাল আভা ছড়িয়ে ডুবে যেত, তখন পাড়ার কাকিমাদের হাঁকডাক শুরু হতো। আমাদের ফেরার সময় হতো। সন্ধ্যাবেলায় হারিকেনের মৃদু আলোয় পড়তে বসা আর সেই আলোয় দেওয়ালের ওপর হাতের ছায়া দিয়ে নানা রকম পশু-পাখির অবয়ব তৈরি করা ছিল এক দারুণ বিনোদন। তখন তো আর স্মার্টফোন বা ভিডিও গেম ছিল না, তাই আমাদের কল্পনার জগৎটাই ছিল অনেক বেশি রঙিন।
শীতের সকাল ও নলেন গুড়
শীতের সকালের স্মৃতিগুলো একটু অন্যরকম। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে চাদর মুড়ি দিয়ে উঠোনে রোদে বসে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহানো। গাছি যখন খেজুর গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামাত, সেই টাটকা রস খাওয়ার স্বাদই আলাদা। আর দিদার হাতের তৈরি পিঠে-পুলির কথা তো না বললেই নয়। নলেন গুড়ের গন্ধে সারা বাড়ি ম ম করত। পাটিসাপটা আর ভাপা পিঠের সেই স্বাদ যেন এখনো জিভে লেগে আছে। দিদা গল্প বলতেন রূপকথার—রাজপুত্র, রাক্ষস আর পক্ষীরাজ ঘোড়ার গল্প। শুনতে শুনতে কখন যে দিদার কোলেই ঘুমিয়ে পড়তাম, টেরও পেতাম না।
হারানো দিন
সময় কত দ্রুত বয়ে যায়! এখন আমি শহরের এক বহুতল ভবনের বাসিন্দা। সামনে বিশাল মাঠ নেই, নেই সেই কদম গাছ কিংবা ধুলো মাখা মেঠো পথ। এখন বৃষ্টি মানেই ট্রাফিক জ্যাম আর কাদা মানেই বিরক্তি। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে যখন শৈশবের কথা ভাবি, তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে হয়—সেই দিনগুলো যদি আবার ফিরে আসত! আধুনিকতা আমাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে সেই সহজ-সরল অনাবিল আনন্দ।
শৈশব মানে কেবল একটা সময় নয়, শৈশব মানে একরাশ আবেগ, এক টুকরো শুদ্ধতা। সেই সোনালী দিনগুলো আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় সারাজীবন অম্লান হয়ে থাকবে। যখনই খুব ক্লান্ত লাগে, আমি চোখ বন্ধ করে সেই গ্রামের মেঠো পথে ফিরে যাই, যেখানে আমি ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।
গল্পটি ভালো লাগলে কমেন্ট করুন , ফলো দিন
আর পরবর্তী গল্পের জন্য অপেক্ষা করুন।
লেখক: আমি রবিউল ইসলাম
আমার ইমেল: mdr997414@gmail.com