বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জীবনধারার সঙ্গে কৃষি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা প্রশ্নাতীত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের কৃষি ব্যবস্থার সামনে এমন কিছু চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে, যা মোকাবিলা না করলে ভবিষ্যতে খাদ্য ও পরিবেশ—উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে টেকসই কৃষি এখন আর কেবল আলোচনার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অপরিহার্য বাস্তবতা।
টেকসই কৃষি বলতে এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা বোঝায়, যা পরিবেশের ক্ষতি না করে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখে, কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে না। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদি উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বই এর মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশে মাথাপিছু কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আবাদি জমি কৃষির বাইরে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট করছে, পানির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। এসবের ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষকের আয় সেই হারে বাড়ছে না।
জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, খরা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। অনেক অঞ্চলে একই ধরনের ফসল চাষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় একফসল নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
টেকসই কৃষির পথে এগোতে হলে প্রথমেই ফসল বৈচিত্র্যের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ধানের পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফলমূলের উৎপাদন বাড়ালে একদিকে যেমন পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার হবে, অন্যদিকে কৃষকের আয়ও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় জৈব সার, সবুজ সার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তিও টেকসই কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল জাত, পানি সাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি এবং ভাসমান চাষের মতো দেশীয় উদ্ভাবন বাংলাদেশের বাস্তবতায় কার্যকর সমাধান দিতে পারে। তবে এসব প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে বিস্তারে কৃষক প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা অপরিহার্য।
সরকার ইতোমধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি রূপান্তর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে নীতিমালার পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
টেকসই কৃষি বাংলাদেশের জন্য কোনো বিলাসী ধারণা নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চা এবং কৃষককেন্দ্রিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে টেকসই কৃষির পথে এগোনো এখন সময়ের দাবি।