০১
ভোর পাঁচটা ত্রিশ।
ঘুম তখনো চোখে জমে আছে। আশা জানে—এটা বিশ্রামের ঘুম নয়, এটা জমাটবদ্ধ ক্লান্তি। শরীরটা আর জেগে থাকতে চায় না, আবার ঘুমিয়ে থাকতেও পারে না। মাঝখানে আটকে থাকা একটা মানুষ—ঠিক যেমন তার জীবন।
খুব ধীরে বিছানা ছাড়ে। যেন শব্দ হলেই কেউ জেগে যাবে।
জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো ঢুকছে। আলো আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই। নীলচে, ঠান্ডা, ক্লান্ত এক রঙ। আশার মনে হয়—এই আলোটা ঠিক তার নিজের মতো।
দূরের ঘরটার দিকে তাকাতেই বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
জীবন।
ওই ঘরেই শুয়ে আছে সে। মোবাইলের আলোয় মুখটা অদ্ভুতভাবে কড়া হয়ে আছে। চোখ স্থির—কোনো ঘুম নেই, শুধু অপেক্ষা। ঠিক যেমনটা গত কয়েকটি ভোরে ছিল।
আশা পা ফেলে এগোয়। প্রতিটা ধাপে যেন বুকের ভেতর কিছু ভাঙে। দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
এই চুপটাই এখন তার সবচেয়ে পরিচিত ভাষা।
তারপর প্রশ্নটা করে—খুব সাধারণ, খুব স্বাভাবিক, যেন কিছুই হয়নি—
— তুমি এখনো মোবাইলে আছো? সারারাত ঘুমাওনি?
জীবন চমকে ওঠে। মোবাইল নামায়। চোখে একসাথে অপরাধবোধ আর সীমাহীন ক্লান্তি।
— না… মানে… ঘুমিয়েছিলাম। দু-এক ঘণ্টা। কী করব বলো? চোখে ঘুম আসে না। তাকিয়ে থাকি… যদি দু-এক ডলার উঠে এই আশায়।
একটু থামে সে।
তারপর হঠাৎ করে কথাগুলো ঝরে পড়ে—যেন অনেকদিন চেপে রাখা ভার।
— এত ধার… এত ঋণ… বাড়ির খরচ… মা অসুস্থ, আপা অসুস্থ… বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়… ডাক্তারের দোকানে আট হাজার টাকা বাকি…
কথাগুলো ঘরের মধ্যে ঝুলে থাকে। বাতাস ভারী হয়ে আসে।
আশা কিছু বলে না।
সে জানে—এই কথাগুলো।
সে জানে—এই অভিযোগগুলো আসলে ভাগ্যের বিরুদ্ধে, কিন্তু এসে পড়ে তার কাঁধে।
পাঁচ বছর হলো জীবন–আশার সংসার।
পাঁচ বছরে তারা শিখেছে—সংসার মানে শুধু একসাথে থাকা না। সংসার মানে প্রতিদিন নিজেকে বোঝানো যে, এভাবেই থাকতে হবে।
জীবনের জীবনটা শুরু থেকেই এমন।
সংগ্রাম যেন তার জন্মগত উত্তরাধিকার।
একসময় তাদের পরিবার ছিল একান্নবর্তী। দুই মা, এগারো ভাইবোন। বড় সংসার। জমি ছিল, সম্পদ ছিল, স্বপ্ন ছিল। কিন্তু জীবনের বাবার সরলতা, কিছু ভুল সিদ্ধান্ত আর অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগে খুব অল্প সময়েই সবকিছু চলে যায় চাচাত ভাইদের দখলে।
তখন জীবন আর তার পাঁচ ভাইবোন নাবালক।
সেই সময় থেকেই শুরু হয় অভাব—
কিন্তু সেটা শুধু অভাব না।
অভাব মানে নিরাপত্তাহীনতা।
অভাব মানে প্রতিদিনের ঝগড়া।
অভাব মানে অপমান গিলে বড় হওয়া।
একসময় পরিবার ভেঙে যায়। মা ছাড়া থাকতে হয় ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে বহু বছর। কোনো আদর নেই। কোনো কাঁধ নেই। কোনো “আমি আছি” বলার মানুষ নেই।
জীবনরা বড় হয় এক ধরনের শূন্যতার ভেতর।
এই শূন্যতার মধ্যেই জীবনের বড় ভাই দাঁড়িয়ে যায় দেয়ালের মতো। খেয়ে না খেয়ে, টিউশনি করে নিজে পড়ে, ভাইবোনদের পড়ায়। জীবনকে এইচএসসি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
তারপর জীবনের স্বপ্ন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
চান্স হয়।
কিন্তু শরীর তখন আর শরীর নেই।
বছরের পর বছর অপুষ্টি, মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে শরীরে বাসা বাঁধে Rheumatic Fever। হাঁটা বন্ধ। লেখা বন্ধ। পরীক্ষা বন্ধ।
সারাদিন শুয়ে থেকে ব্যথায় কাতরানো—এই হয় তার নতুন জীবন।
ডাক্তার বদলায়, চিকিৎসা বদলায়—কিছুই কাজে আসে না। শেষ পর্যন্ত এক হোমিও ডাক্তারের ওষুধে ব্যথা একটু কমে। কিন্তু ওষুধ ছাড়া জীবন চলে না। একদিন না খেলেই হাত-পায়ের গিঁট ফুলে যায়, যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে ওঠে।
এই অসুস্থতা তার স্বপ্নগুলোকে একে একে মেরে ফেলে।
তার ওপর উচ্চ রক্তচাপ।
মেজাজ খিটখিটে।
অল্পতেই বিস্ফোরণ।
জীবন এমন একজন মানুষ হয়ে ওঠে—
ভেতরে ভাঙা,
বাইরে শক্ত,
আর দুটোর মাঝখানে আটকে থাকা এক রুক্ষ মানুষ।
০২
বিয়ের আগের রাতগুলো সাধারণত স্বপ্নে ভরা থাকে।
মেয়েরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ কল্পনা করে—নতুন ঘর, নতুন মানুষ, নতুন নাম।
কিন্তু আশার সেই রাতটা ছিল ভারী।
নিঃশব্দ।
অস্বস্তিতে ভরা।
ঘরের আলো জ্বলছিল। আলোটা খুব উজ্জ্বল না, আবার অন্ধকারও না। ঠিক মাঝামাঝি—যেমন তার মন।
মা বিছানার একপাশে বসে আছে। হাতে একটা পুরোনো কাগজ—পাত্রপক্ষের দেওয়া বায়োডাটা। কাগজটা কতবার যে পড়েছে, আশার মনে নেই। প্রতিবার পড়েই যেন নতুন করে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা।
— ছেলেটা খারাপ না, মা।
মায়ের কণ্ঠে আশ্বাস।
কিন্তু আশ্বাসের ভেতর ক্লান্তি লুকানো। অনেক যুদ্ধের ক্লান্তি।
আশা জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে নিজের ভবিষ্যৎটা যেন গুলিয়ে যায়। অচেনা, অস্পষ্ট, ভয়ের মতো।
— মা, আমি কি না বলতে পারি?
প্রশ্নটা খুব আস্তে বের হয়।
এত আস্তে যে শব্দটা যেন নিজেই ভেঙে পড়তে চায়।
মা তাকায়, তবে খুব অবাক হয়না।
এই প্রশ্নের জন্য সে প্রস্তুত ছিল।
— আর কত দিন বসে থাকবি? চাকরি হয়েছে, ঠিক আছে। কিন্তু সংসার? ভবিষ্যৎ? একা একা কতদিন চলবি?
কথাগুলো যুক্তির।
কিন্তু যুক্তি কি কখনো মনকে মানাতে পারে?
আশা চুপ করে থাকে।
তার চুপটাই যেন সম্মতির প্রথম ধাপ।
— ছেলেটার পরিবারে সমস্যা আছে, আমি জানি।
মা হঠাৎই বলে ওঠে।
— কিন্তু সব পরিবারেই তো কিছু না কিছু থাকে। তুই তো কাউকে একদম নিখুঁত পাবি না।
এই কথাটাই যেন শেষ পেরেক।
আশা জানে—সে নিখুঁত কাউকে খুঁজছে না।
সে শুধু এমন কাউকে চায়,
যার ভেতরটা ভাঙা নয়।
যার রাগ তাকে ভয় দেখাবে না।
যার নীরবতা তাকে অপরাধী বানাবে না।
কিন্তু এই চাওয়াটার কোনো মূল্য নেই।
রাতে সে ঘুমোতে পারে না।
বালিশের পাশে চোখ খোলা পড়ে থাকে। ঘরের ছাদটা অদ্ভুতভাবে কাছে চলে আসে।
মাথার ভেতর প্রশ্নের মিছিল—
এই বিয়ে কি আমাকে নিরাপত্তা দেবে?
নাকি আরেকটা যুদ্ধ?
আমি কি শক্ত?
আমি কি পারব?আমি কি করব?
ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে আসে।
স্বপ্নে সে দেখে—একটা দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সে দৌড়াচ্ছে।
হাত দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে।
কিন্তু দরজাটা খুলছে না।
ঘুম ভাঙে বুক ধড়ফড় করে।
দুদিন পরেই বিয়ে হয়।
সাদামাটা।
কোনো বড় আয়োজন না।
কোনো ঢাকঢোল না।
আশা হাসে। ছবি তোলে। সবাই বলে—
— খুব ভালো লাগছে।
কেউ জানে না—
এই হাসিটা আসলে রাজি হয়ে যাওয়ার মুখোশ।
বিয়ের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ ঠিকই ছিল।
নতুনত্ব ছিল।
ভদ্রতা ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে জীবনের ভেতরের রুক্ষতা বের হতে শুরু করে।
সন্দেহ।
অকারণ রাগ।
অসহিষ্ণুতা।
আশা বুঝতে পারে—
সে কোনো সম্পর্কের মধ্যে আসেনি।
সে ঢুকে পড়েছে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ভেতর।
আর সেই লড়াইয়ের নাম—
সংসার।
০৩
ভোরের আলো আসেনি, শুধু ঘরের কোণগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া অন্ধকারে ভেসে উঠে ।
আশা বসে টেবিলের পাশে, কফির কাপ হাতে। হাতটা কাঁপছে না, কিন্তু চোখের ভেতর ভয় আছে।
— আজকের দিনটা কেমন যাবে?
ভেতরে প্রশ্নগুলো ছুটছে, উত্তর নেই।
জীবন ঘুম থেকে উঠেছে, চোখে ক্লান্তি, মুখে অপরাধবোধ নেই—শুধু রাগ। দুজনে প্রতিদিন এভাবেই গোমড়া মুখে অফিসের জন্য বের হয়। আশার অফিস থেকে বের হতে একটু দেরি হলেই শুনতে হয়— কেন দেরি করলে?
— অফিসে কী করলে সারাদিন?
— ফোনে কার সাথে কথা বলছ? প্রশ্ন গুলো ছোট, কিন্তু স্বর এমন কর্কশ যে আশার বুকে ব্যাথা লাগে।
সে চুপ থাকে, বোঝে—কোনো প্রতুত্তর কাজ করবে না। ব্যথা কমবে না।
অফিসের ফাইলের হিসাব, ঋণ, সন্তানদের খরচ—সব কিছু যেন ঘরের চারপাশে ভাসছে, শুধু তাকে চেপে ধরতে।
আশার ভেতর এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব।
একদিকে সন্তানদের জন্য বাঁচার দায়বোধ, অন্যদিকে নিজের অস্তিত্বকে হারানোর ভয়।
ছোট্ট আরাফ ঘুম থেকে উঠে, চোখ বড় বড় করে আশার দিকে তাকায়—মা, বাবা আবার রাগ করছে।
জুন কেঁদে ওঠে, হাতে ছোট্ট শক্তি, যেন বোঝাতে চায়—আমাদের জন্য কি ঠিক আছে সব?
আশা কেবল তাদের কোলে টেনে ধরে, চুম্বন দেয়, শান্ত করে। ভেতরটা অশ্রুতে ভিজে যায়, মুখে কৃত্রিম হাসির অভিনয়ের চেষ্টা।
— আমি যদি শক্ত না থাকি, বাচ্চারা কি করে বাঁচবে?
— এই একা আমি কতক্ষণ সহ্য করতে পারব?
জীবন তখন ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। চোখে ক্লান্তি, মুখে রাগ।
চুপচাপ। ভিতরে চাপা ক্ষোভ, অশান্তি।
আশা জানে—চিৎকার বা প্রতিবাদ কোনো সমাধান নয়।
শুধু সহ্য করতে হবে। শুধু টিকে থাকতে হবে।
এই সংসার মানে এমন—ক্লান্তি, চাপ, একরোখা রাগ, আর তবুও চলতে থাকা।
দু’সন্তান আবার ঘুমে ঢলে পড়ে।
আশা রান্নাঘরে যায়, রাতের খাবার প্রস্তুত করে।
একসাথে খেতে বসে কিন্তু কোন আলাপ নেই,হাসি নেই,চুপচাপ খাওয়া শেষ ।
ঘরটা শান্ত, কিন্তু ভিতরে ঝড়।
শুধু এই চুপচাপ জীবন, যে কোনো আঘাতের আগে থেমে থাকা।
ভোর আসে।
আশা নিজেকে বোঝায়—এখানে শক্তি আছে।
ভাঙার ভেতরেও কিছু আলোর মতো শক্তি, যা তাকে আবার দাঁড় করাবে। সে বাঁচবে। সে টিকে থাকবে। বাচ্চারা বাঁচবে। তারা হাসবে।”
এটাই তার একমাত্র চাওয়া।
সংসার মানে শুধু সহ্য করা নয়।
সংসার মানে লড়াই, যা একমাত্র ভালোবাসার জন্য।
০৪
ঘরটা ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে ঢলে আসে।
রোদ তখনও কিছুটা আছে, কিন্তু তার আলো ঘরে পৌঁছায় না—শুধু ছায়া ছড়ায়, কাচের মধ্যে ভাঙা আলো।
সন্ধ্যা ঘনালে আশা অফিস থেকে ফিরে বাসায়, একটু পরে জীবনও বাসায় আসে অফিস সেরে। রান্নাঘরে ঢুকে আশা চোখেমুখে ক্লান্তি নিয়ে।
ভেতরে ভাঙন, ভেতরে ঝড়।
জীবন চেয়ার টেনে বসে। চোখে মুখে ক্লান্তি, চাপা রাগ।
— চা হবে না?
আশা চুপ থেকেই চা বানিয়ে দেয়। উত্তর দেয়ার শক্তি বা আগ্রহ কোনটিই নেই।
ছোট্ট আরাফ তার পাশে দাঁড়ায়।
সে বোঝে বাবা আবার রাগ করছে।
জীবন চা খেয়েই বাইরে চলে যায়।
কোনও শব্দ নেই। শুধু ঘরে নীরবতা, যে নীরবতায় চাপা আঘাত আছে।
আশা জানে—কোনও সাহায্য আসবে না।
কেউ বুঝবে না, কেউ শুনবে না।
শুধু তার নিজের শক্তি দিয়েই তাকে সহ্য করতে হবে, ধৈর্য ধরে টিকে থাকতে হবে।
রাত গভীর হয়।
আশা শুয়ে মুখ লুকিয়ে সন্তানদের ঘুমের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ছোট ছোট মুখগুলো, ছোট ছোট হাতগুলো—তার একমাত্র শান্তি।
ভেতরে অশ্রু, কিন্তু বাইরে চুপচাপ।
ভাঙা সংসারের মাঝে এই শান্তি এক অদ্ভুত আলো, যা তাকে আবার দাঁড় করায়।
তাই একটু সময় পেলেই সে দু’সন্তানকে কোলে নেয়।
ছোট ছোট হাত ধরে, চুল বুলিয়ে, তাদের চোখে মুখে হাসি ফিরানোর চেষ্টা করে।
সে জানে—এই হাসি তার একমাত্র শক্তি, তার একমাত্র অস্ত্র।
সংসার মানে শুধু চাপ নয়।
সংসার মানে টিকে থাকা।
সংসার মানে প্রতিদিন নিজেকে আবার দাঁড় করানো।
রাত চলে যায়।
ভোর আসে।
আশা জানে—আজও তাকে লড়াই করতে হবে।
কিন্তু প্রতিটি রাতের নীরব শান্তি, সন্তানদের নিঃশ্বাস, তাদের অল্পস্বল্ হাসি—সবই তার ভাঙা মনের শক্তি।
এটাই তার অস্তিত্ব।
এটাই তার বেঁচে থাকার কারণ।
জীবন পাশের রুমে মোবাইলে কাজ করছে।
চোখে মুখে দুশ্চিন্তা ধীরে ধীরে ক্ষোভ জমায়।
কিছু বলে না, কিন্তু তার উপস্থিতি নিঃশব্দ চাপ তৈরি করে।
আশা জানে—যদি সে চুপ থাকে, তবু সংসারের ভার কাঁধে পড়ে।
প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি নিঃশ্বাস—সবই লড়াই।
০৫
রাত ধীরে ধীরে কাটে।
আশা ভোরবেলা রান্নাঘরে আসে নিঃশব্দে যেন সন্তানদের ঘুম ভেঙে না যায়, রান্না হলে তাদের ডেকে তুলে খাওয়ানো,স্কুলের জন্য তৈরি করা,স্কুলের ব্যাগ সাজিয়ে স্কুলে পাঠানো,তাদের টিফিন দেয়া,নিজের অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া,অফিস যাওয়া,সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরা, খাবার তৈরি করা,বাচ্চাদের পড়ানো,তাদের খাওয়ানো,ঔষুধ খাওয়ানো এই ছোট ছোট কাজের মধ্যে জীবনের ছোঁয়া থাকে,গতি থাকে প্রচন্ড, লড়াইয়ের মতো।
তারপর নামে রাত।এই রাতগুলোই আসল পরীক্ষা।
মা হওয়া শুধু সন্তানকে জন্ম দেওয়া নয়।
মা হওয়া মানে প্রতিদিন নিজেকে ছেদ করেও টিকে থাকা।
মা হওয়া মানে ভগ্নহৃদয়েও হাসি খুঁজে পাওয়া।
মা হওয়া মানে—প্রতিটি কষ্টের মাঝে লড়াই করা
০৬
বিকেলের রোদ ধীরে ধীরে জানালার কাচের ফাঁক দিয়ে ঢুকছে।
ঘরটা ভরা—আত্মীয়, প্রতিবেশী, কেউ শুধু এসেছে ‘বড় মানুষ’ হওয়ার অধিকার নিয়ে।
মাঝখানে চেয়ারে বসে জীবন। তার
এক পাশে দাঁড়িয়ে আশা—চুপচাপ, চোখ নিচু।
চুপ থাকার এই ক্ষমতাই এখন তার একমাত্র অস্ত্র।
একজন মুরুব্বি কাকা গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করে—সংসার টিকে থাকতে হলে অনেক কিছুতে ছাড় দিতে হয়, মা।আরেকজন বলল-তুমিতো মেয়ে; মেয়ে মানুষের একটু বেশিই ধৈর্য থাকা দরকার। কেউ প্রশ্ন করে—
— তুমি কি ওকে খোঁটা দাও? কথা শোনাও?
আশা তাকায় না।
তার চোখের সামনে ভাসে শুধু দুইটি মুখ—আরাফ আর জুন।
ছোট্ট, ভরসাহীন চোখ দুটো।
যেন বলছে—মা, আমরা আছি। কিন্তু আমাদের জন্য কি তুমি সইতে পারবে?
জীবন কথা বলে।
তার কণ্ঠে অভিযোগ, রাগ, অসহ্য ক্লান্তি—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘ ফিরিস্তি।
— ও আমাকে বোঝে না। সবসময় আমাকে ছোট করে। ওর মুখের কথা সহ্য করা যায় না।
কেউ কেউ মাথা নেড়ে সায় দেয়।
কেউ হাসি ফোঁকায়, কেউ চাপা আগ্রহ দেখায়।
কেউ আশাকে প্রশ্ন করে না—সে কী সহ্য করছে?
শেষমেশ একজন বলে—
— বউ যদি একটু চুপ থাকে, সংসারটা ঠিক হয়ে যায়।
এই এক বাক্যেই সালিশ শেষ।
রায় লেখা হয়ে গেছে আগেই।
দোষী ঠিক হয়ে গেছে।
কেউ আশার কথাও শুনলো না।
তাকে কেউ বুঝতেও চাইলোনা।
জীবন কিছু বলে না।
চোখে মুখে রাগ ক্ষোভ।
উঠে সামনে চলে যায়—অবচেতন রাগ নিয়ে।
আশা শুধু তার শিশু দুটির দিকে তাকায়, কোলে নেয়,
তাদের শরীরের উষ্ণতা, ছোট্ট নিঃশ্বাস, নিঃশ্বাসের শব্দ - ছন্দ—এটাই তার একমাত্র শক্তি।
সেদিন আরাফ জিজ্ঞেস করে—
— মা, বাবা কেন চিৎকার করলো?
আশা কিছু বলে না।
সে শুধু ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে।
এদিনেও জুন ঘুমের মধ্যে হালকা কাঁপে।
আশা তার মাথা বুলিয়ে দেয়।
এই সালিশের ফলাফল শূন্য।
কেবল নিশ্চিত হয়েছে—এই সংসারে সত্যের বা নারীর কোনো মূল্য নেই।
টিকে থাকার জন্য তাকে বাঁচতে হয়।
শুধু বোঝাপড়ার কথা শুনতে হয়।
শুধু মুখে শান্তি দেখানো হয়।
কিন্তু ভেতরের কষ্ট দেখার কেউ নেই।
আশা জানে—এখানে সে শুধু স্ত্রী নয়।
সে অভিযুক্ত।
সে সাক্ষী।
সে একা।
এখানেই তার শক্তি।
চুপ থাকা—এটাই তার একমাত্র প্রতিরক্ষা।
ভোর হয়।
ঘর আবার নিঃশব্দ।
আশা উঠে পড়ে।
রান্না করে।
বাচ্চাদের স্কুলের ব্যাগ সাজায়।
অফিসের জন্য প্রস্তুতি নেয়।
এই জীবন, এই সংসার—এখনো চলছে।
কিন্তু আশা জানে—প্রত্যেক লড়াই, প্রত্যেক চুপচাপ নিঃশ্বাস তার শক্তি তৈরি করছে।
শুধু টিকে থাকা নয়—এটাই তার যুদ্ধের রসদ।
শুধু বাঁচা নয়—এটাই তার বেঁচে থাকার সঙ্গী।