আমি প্রজাপতি হয়েছিলাম বলে কেউ খুশি হয়নি।
সবাই শুধু বলেছিল—
“দেখো, কত সুন্দর।”
কেউ জিজ্ঞেস করেনি,
এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে আমাকে কতটা ভঙ্গুর থাকতে হয়।
ডানা পাওয়ার পর থেকেই আমার ভয় শুরু হয়েছিল।
কারণ আমি জানতাম—
ডানা মানেই লক্ষ্য।
ডানা মানেই ছেঁড়ার জায়গা।
আমি উড়েছি খুব সাবধানে।
কারও আঙুলে না বসে,
কারও ইচ্ছেতে না মিশে।
নিজের মতো থাকতে চেয়েছিলাম—
এই অপরাধটাই ছিল আমার।
পরিবর্তনগুলো হঠাৎ আসেনি।
সবই এসেছিল নিয়ম করে।
একটু করে অবহেলা,
একটু করে চাহিদা,
একটু করে বলা—
“ডানা এত নড়াচড়া করো না।”
প্রথম ডানাটা ছিঁড়েছিল নিঃশব্দে।
আমি ব্যথা পেয়েছিলাম,
কিন্তু কাউকে দেখাইনি।
কারণ প্রজাপতিরা চিৎকার করে না।
দ্বিতীয় ডানাটা ভাঙতে সময় লেগেছিল।
ধীরে, খুব ধীরে।
আমি তখনো বেঁচে ছিলাম।
হাঁটছিলাম।
নড়ছিলাম।
কিন্তু উড়ার কথা ভাবলেই
ভেতরে কিছু একটা রক্তাক্ত হয়ে যেত।
একদিন আমি আর উড়ার চেষ্টা করিনি।
কারণ ব্যথার চেয়ে ভয় বড় হয়ে উঠেছিল।
আমি পাতার নিচে বসে রইলাম।
দিন গেল, রাত গেল।
কেউ খেয়াল করল না।
কারণ আমি তখনো ছিলাম।
শুধু প্রজাপতি ছিলাম না।
শেষটা কোনো নাটকীয় মৃত্যু নয়।
কোনো হঠাৎ নিঃশেষও না।
আমি মরে যাইনি একদিনে।
আমি প্রতিদিন একটু একটু করে
নিজের কাছ থেকে সরে গেছি।
রং ঝরেছে,
ইচ্ছা শুকিয়েছে,
স্বাধীনতার স্মৃতি বোঝা হয়ে গেছে।
একসময় আমার শরীরটা থেকেছে।
মানুষ দেখেছে—
“আছে তো।”
কিন্তু ভেতরে আমি তখন
একটা খালি খোলস।
ডানা নেই,
স্বপ্ন নেই,
উড়ার ভাষা ভুলে যাওয়া এক দেহ।
প্রজাপতির অস্তিত্ব ডানায়।
ডানা না থাকলে
সে আর কিছু না।
আমি তাই হারিয়ে গেছি।
চুপচাপ।
কারও চোখে না পড়ে।
এই পৃথিবীতে
কিছু মৃত্যু হয়—
যেখানে লাশ পড়ে না,
কেবল একজন মানুষ
নিজের ভেতর থেকে মুছে যায়।