অনভিপ্রেত শেষ প্রহর
ভোরের সূর্য রোদের সোনালি আলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
মায়ের কোলে বসে ছোট্ট আশা তার হাত মেলে আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল।
“মা, আমি বড় হয়ে অনেক বড় কিছু হতে চাই।”
মা হেসে বললেন, “তুমি ছোট্ট, কিন্তু তুমি বড় স্বপ্ন দেখছো। আর ঠিক সেই স্বপ্নের জন্য তুমি লড়বে, তাই না?”
শৈশবেই সে শিখেছিল—জীবনে যা ভালো লাগে, তা নিজের করে নিতে হবে। প্রয়োজন হলে মিথ্যা বলতে হয়, অভিনয় করতে হয়, শাস্তি সহ্য করতে হয়।
তার হাসি ছিল সরল, কিন্তু চোখে ছিল অদ্ভুত দৃঢ়তা।
স্কুলের মাঠে সবাই তার সঙ্গে খেলতে চাইত। শিক্ষকরা বলতেন,
“এই মেয়েটি অন্যদের মতো নয়, তার মেধা ও মনোবল উভয়ই আলাদা।”
রান্নাঘরের পাশের বারান্দায় বসে সে কখনও নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে ভাবত,
“আমি কি সত্যিই যথেষ্ট শক্ত?”
বাইরের হাসি, ভেতরের প্রশ্ন—এই দ্বন্দ্বই ছিল তার শৈশবের সঙ্গী।
হৃদয়—ফুপাতো ভাই। বুদ্ধিমান, দায়িত্বশীল, মানুষকে সহযোগিতা করতে খুব আগ্রহ তার। পড়াশোনায় মেধাবী কিন্তু অস্থির।
আশা তাকে প্রথম মনে ধরতে শুরু করে যখন হৃদয় আশাকে কলেজে ভর্তি করানো ও হোস্টেলে উঠাতে যথেষ্ট দায়িত্বশীলতা দেখিয়েছিল।
হৃদয় বলল,
“তুমি এখানে অল্প সময়েই হয়ত অনেক বন্ধু পাবে। তবে সাবধান, কেউ কেউ হয়ত ভুল বোঝার চেষ্টা করতে পারে।”
আশা চুপচাপ তাকিয়ে রইল। ভেতরে একটি অদ্ভুত তৃপ্তি—“এই মানুষটা অন্যরকম দায়িত্বশীল মানুষ"
হৃদয় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালোবাসত।
আশা লক্ষ্য করেছিল—সে একা থাকলেও নিজের মূল্য বুঝতে জানে।
ধীরে ধীরে দুজন একে অপরের প্রয়োজন হয়ে ওঠে।
হৃদয়ের দৃষ্টিতে, আশা শুধু একজন আত্মীয় নয়; সে তার নিঃশব্দ সহায়ক।
বাবা বলেছিলেন,
“আশা, তুমি তাকে অতিরিক্ত বিশ্বাস করো না। সে স্থির নয়।”
কিন্তু আশার ভেতরে হৃদয়ের ছবি আঁকা হয়ে গেছে। সে তাকে ছেড়ে থাকতে পারবেনা। নিজেকে ভালো রাখতে তার হৃদয়কে প্রয়োজন। এভাবে চলতে চলতে তারা দুজনেই নিজেদের কে পরস্পরের প্রয়োজন ভাবতে শুরু করে।কিন্তু এ পথটা ছিল খুবই দুঃসহ। কারণ হৃদয় ছিল এইসএসসি পাশ একজন ছেলে,যদিও বেশ ভালো ছাত্র ছিল।স্টার মার্কস পেয়ে পাশ করলেও হৃদয়ের পড়াশেনার চেয়ে আগ্রহ বেশি ছিল মানুষের উপকার করা,ভালো কোন উদ্যোগে নেতৃত্ব দেয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া,কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে দৌড়ানো,এলাকার বিচার সালিশ করা।আসলে হৃদয়ের বাবা শিক্ষক মানুষ ছিলেন আর বাবার বড় ছেলে এই হৃদয়। কিন্তু হৃদয় খুব বন্ধুবৎসল হওয়ায় তার অনেক বন্ধু হয়। তারা নিজেরাও তেমন শিক্ষানুরাগী না হওয়ায় সঙ্গদোষে হৃদয়ও তেমনি হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত তার পড়াশোনা থেমেই যায়। বাবার তৈরি ব্যবসার ক্ষেত্রেও হৃদয় বেশ উদা সীন ও অস্থির। কোন কাজেই ভালো ভাবে মনস্থির করতে পারেনা। এজন্য তার বাবার অনেক খাতে বেশ কিছু টাকাপয়সা খোয়া যায়। বাবা তাকে বিভিন্ন কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেও কোন কিছুতেই থিতু হতে পারেনি হৃদয়। যাহোক আশা হৃদয়কে ভালোবাসলেও হৃদয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা,নির্দিষ্ট কর্মহীনতার কারণে অনার্স পড়ুয়া মেয়েকে কোন ভাবেই তার হাতে তুলে দিতে নারাজ আশার বাবা।যদিও হৃদয় তারই আদরের বোনের সন্তান। কিন্তু ঐ যে আশা যখন কোন কিছু চায় সে জীবনের সমস্ত কিছুর বিনিময়ে সেটা পেতে চায়। হৃদয়কে পেতে তার বাবার হাতে অনেক অত্যাচার-মারধোর সহ্য করতে হয়েছে।খুব বীভৎস ভাবে তার বাবার হাতের মার খায়। তবুও সে হার মানে না।শেষ পর্যন্ত আরেক ফুপাতো ভাই ভাবির সহযোগিতায় বাবার হাত থেকে কোন রকমে বেচেঁ হৃদয়ের কাছে পৌছায় সে।শুরু হয় আরেক জীবন।
হৃদয়ের বাড়িতেও কেউ রাজি না থাকলেও মারধোরের পর আশার শারীরিক অবস্থার কারণে তাকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু আশা স্বাধীনচেতা মন ও খেয়ালখুশিমতো চলার জন্য আশার মাথায় আরেক আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়। হৃদয়ের বাবার দুটো বাড়ি -একটি বাজারের পাশে,ওটাতেই তারা বহুবছর ধরে ছিল। বছর আটেক আগে তারা পাশের পাড়ার বাড়িতে স্থানান্তর হয়। কিন্তু হৃদয় আগের বাসাতেই থেকে যায়। ঐ বাসার চারপাশে মার্কেট রয়েছে তার বাবার। বাবার সাথে সেগুলো দেখাশুনা করে হৃদয়। আশার মনে ইচ্ছে জাগে সে বাজারের পাশের বাসাটিতে হৃদয়ের সাথে থাকবে।তাহলে অনেকটা স্বাধীন থাকতে পারবে,শ্বশুরশাশুড়িকে দেখাশোনা করতে হবেনা,ইচ্ছে মত ঘুরতে ফিরতে পারবে,আনন্দ-ফুর্তি করতে পারবে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে আশা খুব ভয়ংকর এক কাজ করে। এখানে চলে আসার জন্য আগের বাড়িতে শাশুড়ী (তার নিজের ফুপু) কে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে,অভিনয় করে বাসা থেকে বের হয়ে ঐ বাসায় ওঠে।এতে হৃদয়ের বাবা মা খুব কষ্ট পায়। এ অবস্থায় হৃদয় আশাকে বলল,
“তুমি কি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ, আমি চাই, এখানে থাকব। নিজের মতো বাঁচব।”
যাহোক আশা তার মনমতো সংসার করা শুরু করে।হৃদয়ের মতো সেও এই এলাকায় পরিচিত হতে থাকে খুব গল্পপ্রিয় ও মিশুক হিসেবে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাজারের সব ধরনের দোকানদার তাকে এক নামে চেনে যেখানে প্রায় সারাদিন ঘুরেফিরে।আশার আরেক স্বভাব আছে তা হলো-সে সবখানে ঘুরতে পছন্দ করে,পছন্দমত মুখরোচক খাবার খেতেও খুব ভালোবাসে,যখন ইচ্ছে যার বাসায় যেতে ইচ্ছে করে চলে যায়, যা পছন্দ তা যার কাছে ইচ্ছে তার কাছে আবদার করে,না পেলে খুব মন খারাপ করে। কিন্তু হৃদয়ের তো এত সামর্থ্য নেই। তাই আশা পরিচিত সবার কাছ থেকে এসব আবদার করে।এটা অনেককে বিব্রত করলেও আশা হয়ত সেটা বোঝে ই না।তার শখ অনেক-নতুন নতুন কাপড়ের,নতুন নতুন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার,আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার ইত্যাদি।
এভাবে চলতে চলতেই তার দুটো সন্তান হয়। বড়টি মেয়ে আর ছোটটি ছেলে।
প্রতিটি শিশুর হাসি নতুন আলো নিয়ে আসে।
কিন্তু সুখ দীর্ঘস্থায়ী নয়। শারীরিক অসুস্থতা ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।
এর মাঝেই মা, বাবা, বড় ভাই কে হারিয়ে ফেলে আশা।
জীবন তাকে একাকীত্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
আশা ভেতরে ভেঙে গেলেও, বাইরে হাসি রেখেছিল। ছেলে মেয়ের হাসিখুশি যেন তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের জন্য নতুন নতুন খাবার বানাত।
ছোট ছেলের জন্মের একবছরের মাথায় হঠাৎ আশার পেট হালকা ফুলতে থাকে। সবাই ভাবে হয়ত আরেকটি বাবু হবে। কিন্তু না, কোন টেস্টেই কিছুই ধরা পড়ে না। গ্যাসের ঔষধ খেতে দেয় ডাক্তার। ওষুধে কোন কাজ হয়না। এর মাঝে হৃদয়ের বাবা মা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বছর তিনেকের মধ্যে হৃদয়ের বাবা মারা যায়। আশার শরীর দিন দিন আরো খারাপ হতে থাকে। শরীরে বাসা বাঁধে ভয়ংকর এক ব্যাধি-লিভার ক্যান্সার। কি যে কষ্ট-যন্ত্রনাময় রোগ এটি।সাথে লাখ লাখ টাকা ধার দেনা হয় চিকিৎসার জন্য। সপ্তাহে সপ্তাহে কেমো দিতে হতো। কেমো দিয়ে শরীরের ভেতরটা যেন পুড়ে ছাই হয়ে যায়।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তার বাইরের শরীর দেখে আর তার কথাবার্তা শুনে বোঝাই যায় না যে তার ভেতরে এত যন্ত্রণা। কেমোথেরাপির একেকটা দিন একেকটা বছরের মত লাগে আশার। সুঁই ঢোকার মুহূর্তের অদ্ভুত ব্যথা,জিহ্বায় ধাতব স্বাদ , বমির চাপ, মাংসপেশি ও মাথার ব্যথা, চুল পড়া, ফ্যাকাশে ত্বক -জীবনটাকেই ফ্যাকাশে বানিয়ে দেয়। হৃদয় পাশে বসে থাকে,সেবা করে আর স্বান্তনা দেয়
“আমি এখানেই আছি তো”—শুধু এটুকুই বলতে পারে।
বাইরে হাসি, ভেতরে ঝড়।
একদিন কেমোথের ঘরে বসে আশার চোখে পানি জমে যায়।
হৃদয় হাত ধরে বলল,
“সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি পাশে আছি।”
আশার চোখে অদ্ভুত শান্তি।
কিন্তু কষ্ট আর লজ্জা ভেতরেই থাকে।
শাশুড়ির মৃত্যু যেন তাকে আরো মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে। এ ঘটনা হৃদয়কে সবসময় ব্যথিত করে।মনে ভাসত তার চেহারা সবসময়। নিজেকে প্রশ্ন করতো "আম্মা আমার উপর রাগ করে চলে গেলেন কি?"
কেমো থেরাপির সময়ও সে অপরাধবোধে কেঁপে উঠত।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আশা মুখে খাবার নিতে পারছেনা। শুধু তরল খাবার নল দিয়ে খায়। সারাদিনে এক চামচ খাবার। পানির পিপাসায় ভেতরটা খা খা করছে।মনেহয় আস্ত এক বালতি পানি দরকার। কিন্তু এক ফোঁটা পানির ঢোক গিলে খাওয়ার শক্তিটুকুও শরীরে নেই। তবুও ইশারা দিয়ে সবার কাছে বেঁচে থাকার জন্য দোয়া চাইছে। বাঁচার জন্য শেষ মুহুর্তে ও ছিল তার চরম তাগিদ। সে যেন একটিবারের জন্যে ও তার মৃত্যুর কথা ভাবতে চায়নি। কিন্তু হঠাৎ কি যেন ঘটে যায় তার মনের ভেতরে। হৃদয়কে ডাকতে থাকে,তাকে শেষ বারের মত প্রাণভরে দেখে আর মুখে বিড়বিড় করে ভেঙে ভেঙে বলতে থাকে-"আ-মা-কে ক্ষ-মা ক-রে দি-ও" এর মাঝেই তাকে দেখতে বিভিন্ন আত্মীয় স্বজন আসে। তার মাঝেই আসে তার প্রাণের প্রিয় ছোট্ট ভাইটি যাকে দেখার সুযোগ মেলেনি প্রায় পনের বছর। তার দিকে চোখ পড়তেই আশা যেন হারিয়ে যায় দূর সীমানায়, পৃথিবীর সমস্ত মায়া ছিন্ন করে তার প্রভুর সাথে একান্তে কথা বলতে চলে যায় চিরতরে শেষ প্রহরে।
হৃদয়—নীরব, দায়িত্বশীল, আত্মশুদ্ধ।
কেমোর দিনগুলো, মৃত্যুর পরে নীরবতা, অপরাধবোধ—সব তাকে পরিপক্ক করেছে।
বাজারে হাটলেও শব্দ কম।
ছোট ছেলেটি যেন বুঝতেই পারছেনা মা আসলেই আর কখনো ফিরেে আসবেনা। বড় মেয়ে মাকে স্মরণ করে কাঁদে। তবুও জীবন থেমে থাকেনা।
হৃদয় বুঝেছে—জীবন মানে শুধু থাকা নয়। দায়িত্ব, ভালোবাসা, স্মৃতি—এগুলো জীবনকে পূর্ণ করে।
বহুবছর কেটে গেছে। বড় মেয়ে মায়ের পছন্দের পেশা শিক্ষক হয়েছে, ছোট ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। বাজারের পাশের বাড়ি বদলেছে, কিন্তু দোলচেয়ার এখনও আছে। হৃদয় বারান্দায় বসে, হঠাৎ স্মৃতিরা উঁকি দেয়, দু এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে টুপ করে পরে হাতের পৃষ্ঠে, হাতে তার প্রাণপ্রিয় আশার হাসি মাখানো সেই ছবিটি
"যেন আশা সত্যিই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে, হাসিটা আজও যেন জীবন্ত ভালোবাসার মতো "