রমাদানের প্রস্তুতি
রমজানের চাঁদ দেখার আগের সন্ধ্যাটা যেন আলাদা এক অনুভূতিতে ভরা। আকাশে মৃদু নীল অন্ধকার নেমে আসে, আর মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসে কোরআন তিলাওয়াতের সুর। মনে হয়, পুরো পৃথিবী যেন অপেক্ষা করছে এক মহিমান্বিত অতিথিকে স্বাগত জানানোর জন্য—মাহে রমজান।
ছোট্ট শহরটার নাম ছিল শান্তিনগর। সেখানকার এক তরুণ, রায়হান, প্রতি বছরই রমজান আসার আগে অদ্ভুত এক অস্থিরতা অনুভব করত। কিন্তু এবারের অনুভূতিটা ছিল অন্যরকম। সে কয়েক মাস ধরে নামাজে গাফিল ছিল, দুনিয়ার ব্যস্ততায় ডুবে গিয়ে হৃদয়ের দরজাটা যেন বন্ধ করে ফেলেছিল।
একদিন জুমার খুতবায় ইমাম সাহেব বললেন,
“রমজান শুধু রোজার মাস নয়, এটা ফিরে আসার মাস। এটা সেই মাস, যখন বান্দা তার রবের কাছে নতুন করে নিজেকে সোপর্দ করে।”
রায়হানের বুকটা কেঁপে উঠল। সে ভাবল—আমি কি প্রস্তুত?
তার মনে পড়ল প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সেই বাণী, যেখানে তিনি বলেছেন, রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
সেদিন রাতে রায়হান তার আলমারির ওপর রাখা কোরআন শরিফটা নামিয়ে নিল। ধুলো জমে ছিল। সে হাত বুলিয়ে চোখ ভিজিয়ে ফেলল। মনে পড়ল—এই কিতাবই তো নাজিল হয়েছিল মাহে রমজানে। কুরআন শরিফ-এর প্রথম আয়াত নাজিল হয়েছিল লাইলাতুল কদরের এক পবিত্র রাতে।
পরদিন থেকে সে বদলে যেতে শুরু করল। ফজরের আগে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ল। মায়ের পাশে বসে বলল,
“আম্মু, এবারের রমজানটা আমি বদলে যেতে চাই।”
তার মা মৃদু হাসলেন। চোখে পানি নিয়ে বললেন,
“বাবা, রমজান আসেই মানুষের হৃদয় পাল্টাতে।”
শহরের বাজারে তখন ব্যস্ততা। খেজুর, ছোলা, মুড়ি—সব কিনছে মানুষ। কিন্তু রায়হানের মনে এবার অন্য প্রস্তুতি। সে ঠিক করল, শুধু নিজের জন্য নয়, গরিবদের জন্যও কিছু করবে। পাশের বস্তির কয়েকটা পরিবারকে ইফতারের দাওয়াত দিল। মনে পড়ল, প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, সে রোজাদারের সমান সওয়াব পায়।
চাঁদ দেখা গেল। মসজিদে তাকবির ধ্বনি উঠল—“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার!”
রায়হানের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মনে হলো, বহুদিন পর সে যেন নিজের রবের কাছে ফিরে এসেছে।
প্রথম সেহরির রাতে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“হে আল্লাহ, তুমি আমাকে এই মাসে মাফ করে দিও। আমার হৃদয়টা পরিষ্কার করে দাও।”
রমজানের দিনগুলো এগোতে লাগল। ক্ষুধা-তৃষ্ণা তাকে কষ্ট দিলেও, সে বুঝতে পারল—এ কষ্টই তার আত্মাকে শুদ্ধ করছে। প্রতিটি তারাবির রাতে সে যখন দাঁড়াত, মনে হতো তার ভাঙা হৃদয়টা যেন জোড়া লাগছে।
ঈদের চাঁদ ওঠার আগের রাতে রায়হান বুঝল—রমজান কেবল এক মাস নয়; এটা এক বিপ্লব, যা মানুষের ভেতরটা বদলে দেয়।
রমজান আমাদের শেখায়—দুনিয়ার কোলাহল ছেড়ে একবার নিজের আত্মার দিকে তাকাতে। শেখায় ক্ষমা করতে, কাঁদতে, ভালোবাসতে এবং ফিরে আসতে।
মাহে রমজান আসুক আমাদের সবার জীবনে নতুন আলো হয়ে। আমাদের হৃদয়গুলো হোক পবিত্র, আমাদের চোখের অশ্রু হোক তাওবার সাক্ষী।
আর যেন আমরা সবাই বলতে পারি—
“হে আল্লাহ, তুমি আমাদের রমজান কবুল কর"।
সুস্থ থাকুন, সুস্থ রাখুন
অসহয়কের সহায়ক হন
লেখক,
মো: ইমন আলী