Posts

উপন্যাস

অপরাজিতা

February 18, 2026

MST. MOKARROMA SHILPY

10
View

০১ অপেক্ষার আগুন

তারিখটা ২৮ জানুয়ারি।

শীতের সকালের কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা ম্লান আলো ঘরের দেয়ালে লেগে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। আলোটা যেন ইচ্ছে করেই ম্লান—আজকের দিনের ভার সে নিজেও বুঝতে পারছে যেন। ঘরের বাতাসে এক ধরনের স্থিরতা, অথচ সেই স্থিরতার ভেতরে অদৃশ্য অস্থিরতা জমাট বেঁধে আছে।

অপরাজিতা বিছানার কিনারায় বসে আছে।

পেটে নয় মাসের সন্তান।
শরীর ভারী, পা ফুলে গেছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। হাঁটতে গেলেই কোমরে টান ধরে। শোয়া যায় না ঠিকমতো, বসাও কষ্টকর। মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। শরীর যেন তার নিজের কথা শোনে না।

তবু আজ তার শরীরের কষ্ট বড় নয়—
আজ তার মনের ভিতরই সবচেয়ে বেশি তোলপাড়।

আজ গেজেট প্রকাশের দিন।

এই কয়েকটি শব্দ যেন তার বুকের ভেতর ঢেউ তুলছে।
গেজেট।
প্রকাশ।
নাম।

এই দিনটির জন্যই সে কত বছর ধরে নিজেকে গড়ে তুলেছে!

কত আনন্দ অনুষ্ঠান এড়িয়ে গেছে।
বন্ধুর বিয়েতে যায়নি—কারণ সামনে পরীক্ষা।
কাজিনের গায়ে হলুদে দাঁড়িয়ে থেকেও তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে—কারণ সিলেবাস বাকি।
ঈদের ছুটিতে আত্মীয় বাড়ি না গিয়ে বই খুলেছে—কারণ সময় কম।
পিকনিক, ঘুরতে যাওয়া, জন্মদিনের আড্ডা—সবকিছুকে বলেছে, “পরে।”

কত বিয়েবাড়ি, কত ঘুরতে যাওয়া, কত ছোট ছোট সুখ—সবকিছুকে বলেছে, “পরে।”

সে যেন নিজের জীবনকে স্থগিত রেখেছিল একটি শব্দের জন্য—
“ক্যাডার।”

নিজের মনকে কতবার বুঝিয়েছে—
“এখন না, পরে।”
“এখন পড়তে হবে।”
“এখন থামলে চলবে না।”

মাঝে মাঝে মন বিদ্রোহ করেছে।
বলেছে—
“সবাই তো বাঁচছে, হাসছে, ঘুরছে… তুই কেন না?”

কিন্তু অপরাজিতা কঠোর হয়েছে নিজের সঙ্গেই।
নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলেছে—
“তুই পারবি। একটু কষ্ট কর। একদিন তোরই হবে।”

অপেক্ষা যেন আর সয় না।

ঘড়ির কাঁটা এগোয়।
মোবাইল ফোনটা তার পাশে রাখা।
প্রতি কয়েক মিনিট পরপর সে স্ক্রিন জ্বালিয়ে দেখে—কোনো নোটিফিকেশন এলো কি?
কেউ কিছু লিখলো?
গ্রুপে কেউ জানালো?

তার হাত কাঁপে।
শুধু উত্তেজনায় নয়—ভয়েও।

কারণ সে জানে, এই দিনটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
অথবা… আবারও তাকে ফেলে দিতে পারে শূন্যে।

তার জীবনের সবচেয়ে ঝলমলে সময়গুলো সে বিসর্জন দিয়েছে একটি পরিচয়ের আশায়—

বিসিএস ক্যাডার।

এই পরিচয় তার কাছে শুধু একটি চাকরি নয়।
এটা তার বাবার স্বপ্ন।
তার নিজের আত্মসম্মানের প্রশ্ন।
সমাজকে দেওয়া এক নিঃশব্দ উত্তর।
বহু বছরের ত্যাগের স্বীকৃতি।

নয় মাসের অন্তঃসত্তা শরীর নিয়ে আজ সে শুধু একজন গর্ভবতী নারী নয়—
সে একজন পরীক্ষার্থী,
একজন কন্যা,
একজন স্ত্রী,
একজন স্বপ্নবাহী মানুষ।

তার পেটের ভেতরে আরেকটি জীবন নড়ছে।
মাঝে মাঝে হালকা লাথি দেয়।
অপরাজিতা হাত রেখে বলে—
“আরেকটু অপেক্ষা কর বাবু… আজ মা’কে একটা খবর জানতে হবে।”

তার চোখে ভাসে বাবার মুখ।
সেই কাতর কণ্ঠ—
“আর কবে হবে তোমার বিসিএস?”

আজ যদি নামটা আসে—
সে প্রথমেই বাবার ছবির সামনে দাঁড়াবে।
বলবে—
“হয়ে গেছে বাবা… তোমার মেয়ে পেরেছে।”

কিন্তু যদি না আসে?

এই প্রশ্নটা তার বুকের ভেতর বরফের মতো জমে আছে।
সে ভাবতে চায় না।
ভাবলেই শ্বাস আটকে আসে।

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
বাইরে শীতের রোদ একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছে।
মা পাশের ঘরে কাশছেন।
বিজয় দূরে—৬০০ কিলোমিটার দূরে।

আজ সে একা।
একদম একা।

কিন্তু এই একাকিত্বের মধ্যেই সে বুঝতে পারে—
এই দিনটি তার জীবনের আগুনের দিন।
অপেক্ষার আগুন।
যে আগুন তাকে এত বছর পুড়িয়ে শক্ত করেছে।

সে চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে শ্বাস নেয়।
মনে মনে প্রার্থনা করে—
“হে প্রভু, এতদিন আমাকে ফেলেছো, আবার তুলেছো… আজ কী করবে তুমি?”

মোবাইল আবার হাতে নেয় সে।

অপেক্ষা।
শুধু অপেক্ষা।

আর সেই অপেক্ষার আগুনে বসে আছে—
একজন নারী,
যার নাম—
অপরাজিতা।

০২ যে মেয়েটি শুধু পড়তে চেয়েছিল

অপরাজিতা কোনো উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে নয়। তার বাবা অঢেল সম্পত্তির মালিক ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী—একজন আদর্শ শিক্ষক।

এই “আদর্শ শিক্ষক” কথাটা শুধু একটি পেশাগত পরিচয় ছিল না; এটি ছিল তার জীবনের দর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষের প্রকৃত সম্পদ জমি নয়, ঘর নয়, ব্যাংক ব্যালেন্স নয়; প্রকৃত সম্পদ শিক্ষা। আর সেই শিক্ষাই মানুষকে মাথা তুলে দাঁড়াতে শেখায়।

গ্রামের ভিটেমাটি, আত্মীয়স্বজন, সব ছেড়ে একদিন শহরে পা রেখেছিলেন তিনি। হাতে ছিল না জমি, ছিল না পুঁজি—ছিল শুধু স্বপ্ন।
স্বপ্ন—তার সন্তানরা শিক্ষিত হবে।

সেই গ্রামটা ছিল কাঁচা রাস্তার, সন্ধ্যা নামলেই যেখানে কেরোসিনের কুপির আলো জ্বলত। সেখানে থেকে শহরে আসা মানে ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে হাঁটা। আত্মীয়রা বলেছিল—
“এই বয়সে নতুন করে শুরু?”
“শহরে গিয়ে কী করবে?”

তিনি শুধু মৃদু হেসেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন—তার লড়াই নিজের জন্য নয়, সন্তানের জন্য।

শহরে এসে প্রথম যে ঘরটি ভাড়া নিয়েছিলেন, সেটি ছিল ছোট, স্যাঁতসেঁতে, ছাদের এক কোণে ফাটল। বর্ষাকালে পানি পড়ত। শীতকালে বাতাস ঢুকত। কিন্তু সেই ঘরেই গড়ে উঠেছিল আটটি সন্তানের স্বপ্নের ভিত্তি।

জীবনের ৫৯ বছর তিনি কাটিয়েছেন ধৈর্য আর সংযমকে সঙ্গী করে। ভোরে বেরিয়ে যেতেন স্কুলে, ফিরতেন বিকেলে। রাতের খাবারের পরও পড়াতেন টিউশনি। নিজের জন্য নতুন কাপড় কেনার আগে সন্তানের বই কিনেছেন। ঈদের সময় নিজের পাঞ্জাবি না নিয়ে মেয়ের জন্য নতুন ড্রেস এনেছেন।

অবসরের দিনটিতে যখন সহকর্মীরা ফুল দিলেন, বক্তৃতা দিলেন, তখন তার চোখে জল ছিল না—ছিল সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা।

সেদিন সবাই বলছিল—
“স্যার, এখন বিশ্রাম নেবেন।”

কিন্তু তিনি জানতেন, বিশ্রামের সময় তার এখনো আসেনি। কারণ তার ছোট মেয়ে তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।

সেই সময় অপরাজিতা অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে।

তার চোখে তখনও আগুন। স্বপ্নের আগুন। কিন্তু সংসারের আর্থিক হিসাব কষতে কষতে সেই আগুন কখনো কখনো দপ করে নিভে যেতে চাইত।

চার ছেলে, চার মেয়ে—সে অষ্টম সন্তান।
সর্বকনিষ্ঠ।
সবচেয়ে আদরের।

বড় ভাইরা তার দিকে তাকাত দায়িত্ব নিয়ে। বড় বোনেরা তার চুল বেঁধে দিত, পরীক্ষার আগে দোয়া করত। ঘরে যখনই কোনো ভালো খাবার রান্না হতো, মা বলতেন—
“ছোটটার জন্য একটু আলাদা করে রাখ।”

অন্য মেয়েদের মতো তাকে সংসারের কাজে নামতে হয়নি।
পড়াশোনা—এটাই ছিল তার একমাত্র দায়িত্ব।

সকালে ঘুম থেকে উঠে বই, দুপুরে বই, রাতে বই।
মা মাঝে মাঝে বলতেন—
“এই যে, একটু রান্নাঘরে আয়, শেখ।”

বাবা সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দিতেন—
“ওকে পড়তে দাও। ওর সময় নষ্ট কোরো না।”

এই কারণে তার বাবা-মাকে বহু কথা শুনতে হয়েছে।
আত্মীয়রা আড়ালে বলত—
“মেয়েকে এত পড়িয়ে কী হবে?”
“বিয়েই তো দিতে হবে!”
“শেষে তো রান্নাঘরেই যেতে হবে!”

পাড়ার মানুষও ঠোঁট উল্টে বলত—
“মেয়েদের এত স্বাধীনতা দিলে মাথায় চড়ে বসে।”

কিন্তু বাবা বলতেন,
—“আমার মেয়ে নিজের পরিচয়ে বাঁচবে।”

এই কথাটা তিনি শুধু উচ্চারণ করতেন না—তিনি বিশ্বাস করতেন।
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা থাকত, চোখে থাকত এক অদ্ভুত জেদ। যেন তিনি পুরো সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন—
“আমার মেয়েকে আমি থামাব না।”

অপরাজিতা ছোটবেলা থেকেই দেখেছে—তার বাবা কখনো অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। সেই দৃঢ়তা ধীরে ধীরে তার মধ্যেও ঢুকে গেছে।

রাতে পড়তে বসে সে মাঝে মাঝে বাবার দিকে তাকাত।
বাবা চশমা পরে খবরের কাগজ পড়ছেন।
চশমার কাচের ভেতর দিয়ে আলো ঝলসে উঠছে।
সে ভাবত—
“একদিন আমি বাবাকে গর্বিত করব।”

তার শৈশব ছিল বিলাসহীন, কিন্তু স্বপ্নসমৃদ্ধ।
সে বড় হয়েছে আদরে, কিন্তু দায়িত্ববোধে।
সে রান্না জানত না খুব ভালো, কিন্তু জানত নিজের লক্ষ্য কী।

সে শুধু পড়তে চেয়েছিল।
শুধু নিজের একটি পরিচয় চাইত।

আর সেই চাওয়ার পেছনে ছিল একটি পরিবারের নীরব ত্যাগ,
একজন শিক্ষকের অনমনীয় বিশ্বাস,
আর এক কন্যার অবিচল স্বপ্ন।
 

০৩ অবসরের পরের যুদ্ধ

বাবার অবসরের পর সংসারে নেমে এলো অর্থসংকট।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি, বই, হলের খরচ—সব মিলিয়ে বড় অঙ্ক।

অবসরের আগ পর্যন্ত যেটুকু নিয়মিত বেতন আসত, সেটিই ছিল সংসারের মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড হঠাৎ করেই যেন নরম হয়ে গেল। হাতে কিছু সঞ্চয় ছিল, কিন্তু আটজন সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের নিত্যপ্রয়োজন, ওষুধ, বাড়িভাড়া—সব মিলিয়ে হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে উঠল।

অপরাজিতা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে। সামনে আরও পথ বাকি। সেমিস্টার সিস্টেম—প্রতি কয়েক মাস পরপর পরীক্ষা, ফি জমা, বই কেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে যখন ফি জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ঝুলে থাকত, তার বুকের ভেতর ধকধক করত।

একদিন রাতে অপরাজিতা চুপ করে বসেছিল। মনে হচ্ছিল—
এবার বুঝি থেমে যেতে হবে।

সেদিন রাতটা ছিল অস্বাভাবিক নীরব। মা রান্নাঘর গুছিয়ে শুয়ে পড়েছেন। বাবা চুপচাপ বসে আছেন। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখের কোণে অদৃশ্য উদ্বেগ।

অপরাজিতা নিজের ঘরে এসে বই খুলেছিল ঠিকই, কিন্তু অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। হিসাব কষছিল—
এই সেমিস্টারের ফি…
বইয়ের দাম…
হলের খরচ…

তার মনে হচ্ছিল, সে কি স্বার্থপর? সংসারের এমন টানাপোড়েনে শুধু নিজের পড়াশোনার কথা ভাবা কি ঠিক?

মাথার ভেতর একটাই কথা ঘুরছিল—
“হয়তো এবার থামতেই হবে…”

ঠিক তখনই তার সেজ ভাই বলেছিল,
—“তুই শুধু পড়। টাকা আমি পাঠাবো।”

এই কথাটা ছিল না কোনো নাটকীয় ঘোষণা। ছিল খুব সাধারণ, খুব স্বাভাবিক স্বরে বলা একটি বাক্য। কিন্তু সেই বাক্য যেন অপরাজিতার জীবনে বজ্রপাতের মতো আলো ছড়িয়েছিল।

সে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ভাইয়ের দিকে।
—“কিন্তু তোমার নিজেরও তো সংসার আছে…”

ভাই হেসে বলেছিল,
—“তোকে নিয়ে বাবার স্বপ্ন আছে। তুই পড়। বাকিটা আমরা দেখবো।”

মাসে দুই হাজার টাকা।
সেই টাকা যেন ছিল আশীর্বাদ।

আজকের হিসেবে হয়তো সামান্য। কিন্তু তখন সেই দুই হাজার টাকা মানে ছিল—একটি সেমিস্টারের ভরসা, একটি স্বপ্নের টিকে থাকা, একটি মেয়ের এগিয়ে যাওয়ার সাহস।

প্রতি মাসের শুরুতে টাকা এলে অপরাজিতা হিসাব করে খরচ করত। একটা খাতা ছিল—খরচের খাতা। সেখানে লিখে রাখত—
ফি কত,
বই কত,
হলের খরচ কত,
বাকি কত রইল।

বাকি খরচ চালাতে সে টিউশনি করত—নিজ বিভাগের এক শিক্ষকের মেয়েকে পড়াতো। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে পড়তে বসত।

টিউশনি করতে যাওয়ার সময় সে কখনো ক্লান্তি প্রকাশ করত না। বিকেলের ক্লাস শেষ করে দ্রুত নোট গুছিয়ে ছুটত শিক্ষকের বাসায়। মেয়েটিকে মন দিয়ে পড়াতো। নিজের পড়া রিভিশনও হয়ে যেত অনেক সময়।

রাত হয়ে যেত ফিরতে ফিরতে।
পেটে সামান্য ভাত, শরীরে ক্লান্তি, চোখে ঘুম।

তবু নিজের বই খুলত।
কারণ সে জানত—এখন থামলে চলবে না।

কখনো কখনো গভীর রাতে পড়তে পড়তে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসত। কলম হাতে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ত। আবার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে বুক ধড়ফড় করত—
“সময় নষ্ট হয়ে গেল!”

তার জীবন তখন একটাই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে—
বিসিএস।

বন্ধুরা কেউ কেউ বলত—
“এত চাপ নিস না।”
“একটা চাকরি হলেই তো হয়।”

কিন্তু তার কাছে বিসিএস ছিল শুধু চাকরি নয়।
এটা ছিল প্রমাণ—
সে পারবে।
বাবার ত্যাগ বৃথা যাবে না।
ভাইয়ের কষ্ট বিফলে যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির কোণে বসে সে অনেক সময় নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করত। ভাবত—
একদিন সে পরীক্ষার হলে বসে আছে।
একদিন ফলাফল বেরিয়েছে।
একদিন বাবার মুখে গর্বের হাসি।

অভাব তাকে ভাঙেনি।
বরং শাণিত করেছে।

অর্থসংকট ছিল তার প্রথম বড় যুদ্ধ।
কিন্তু সে শিখে গেল—
যে মানুষ স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে, তার জন্য দুই হাজার টাকাও পাহাড় সমান শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

সে থামেনি।

কারণ তার সামনে তখন একটাই শব্দ—
বিসিএস।
 

০৪  বিধাতার চপেটাঘাত

প্রিলিমিনারি—পাস।
রিটেন—পাস।
ভাইভা—ভালো।

প্রতিবারই মনে হতো, এবার বুঝি হবে।

কিন্তু ফলাফল বেরোলেই দেখা যেত—
নাম নেই।

ফলাফল প্রকাশের দিনগুলো তার জীবনে এক অদ্ভুত মানসিক ঝড় নিয়ে আসত। সকাল থেকেই বুক ধড়ফড় করত। ওয়েবসাইটে সার্ভার ডাউন। বন্ধুরা ফোন করছে—
“দেখেছিস?”
“তোর হয়েছে নিশ্চয়ই!”

সে কাঁপা হাতে রোল নম্বর মিলাত।
একবার…
দুইবার…
তিনবার…

তারপর হঠাৎ চোখ থেমে যেত।
রোল নম্বরের ধারাবাহিকতা শেষ।
তার নম্বর নেই।

প্রথমবার সে নিজেকে বুঝিয়েছিল—
“হয়তো প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না।”

দ্বিতীয়বার বলেছিল—
“পরেরবার আরও ভালো করবো।”

তৃতীয়বারের পর তার ভেতরের কোথাও যেন চুপচাপ ভেঙে পড়েছিল।

অপরাজিতা মাঝে মাঝে ভাবত—
বিধাতা কি তার সঙ্গে খেলা করছেন?

সে কি খুব বেশি চেয়েছে?
সে কি অন্যায় কিছু চেয়েছে?

সে তো শুধু চেয়েছিল নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে।
বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে।
ভাইয়ের কষ্টের প্রতিদান দিতে।

কিন্তু কেন বারবার চূড়ার এত কাছে গিয়েও ফিরে আসতে হয়?

সে যেন এক বিশাল পর্বতে উঠছে।
চূড়ার কাছে পৌঁছাতেই এক অদৃশ্য হাত তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।
সে পড়ে যায় তলানিতে।

এই পর্বত ছিল ক্লান্তিকর।
নিচে নেমে গেলে আবার শুরু থেকে উঠতে হয়।
আবার বই খুলতে হয়।
আবার সিলেবাস।
আবার নোট।
আবার অনিশ্চয়তা।

ফলাফল না হওয়ার পর কয়েকদিন সে কারও সঙ্গে কথা বলত না।
হলের বিছানায় চুপ করে শুয়ে থাকত।
ফেসবুক বন্ধ।
ফোন সাইলেন্ট।

বাবা ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন,
—“কেমন আছিস?”

সে হাসিমুখে বলত,
—“ভালো আছি, বাবা।”

কিন্তু সেই “ভালো” শব্দটার ভেতর কতটা ভাঙন লুকিয়ে ছিল, তা কেউ বুঝত না।

আবার উঠে।
আবার পড়ে।

প্রতিবার ব্যর্থতার পর সে নিজের ভুলগুলো খুঁজে বের করত। কোথায় কম হয়েছে? কোথায় সময় নষ্ট হয়েছে? কোন বিষয়ে দুর্বলতা রয়ে গেছে? সে বিশ্লেষণ করত, পরিকল্পনা বদলাত, রুটিন আরও কঠোর করত।

বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ চাকরি পেয়ে গেল। কেউ বিদেশে চলে গেল। কেউ বিয়ে করে নতুন জীবনে ব্যস্ত। সামাজিক মাধ্যমে সাফল্যের ছবিগুলো তার চোখে পড়ত। এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠত।

কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজের বই খুলে বসত।

তবু হারে না।

কারণ সে জানত—
এই ব্যর্থতা তাকে থামানোর জন্য নয়, তাকে আরও শক্ত করার জন্য।

কখনো গভীর রাতে পড়তে পড়তে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত। মনে হতো, আকাশটা বিশাল। হয়তো তার ভাগ্যও কোথাও লেখা আছে—শুধু সময় আসেনি।

সে নিজেকে প্রতিজ্ঞা করেছিল—
যতবার পড়ে যাবে, ততবার উঠবে।

কারণ অপরাজিতা জানে,
চূড়ায় পৌঁছাতে হলে পড়ে যাওয়াকে ভয় পেলে চলবে না।

আর তাই—
বারবার বিধাতার চপেটাঘাতের পরও
সে আবার বই খুলে বসে।

কারণ তার স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে।
 

০৫ শেষ কথাটি

এর মধ্যেই তার বাবা অসুস্থ হলেন।

হঠাৎ করেই নয়—ধীরে ধীরে। প্রথমে সামান্য দুর্বলতা, তারপর শ্বাসকষ্ট, তারপর হাসপাতালে যাওয়া। যে মানুষটি সারাজীবন অন্যকে শক্ত থাকতে শিখিয়েছেন, তিনি নিজেই একসময় হাসপাতালের বেডে নীরব হয়ে শুয়ে রইলেন।

হাসপাতালের সাদা দেয়াল, সাদা আলো, সাদা চাদর—সবকিছু যেন এক অদ্ভুত শূন্যতার প্রতীক হয়ে দাঁড়াল। করিডোরে অ্যান্টিসেপটিকের গন্ধ। মনিটরের টুংটাং শব্দ। ডাক্তারদের গম্ভীর মুখ।

অপরাজিতা বাবার শয্যার পাশে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার হাত ধরে রাখত। সেই হাত—যে হাত তাকে প্রথম বই ধরতে শিখিয়েছিল, যে হাত তার মাথায় রেখে বলেছিল, “আমার মেয়ে নিজের পরিচয়ে বাঁচবে।”

এখন সেই হাত দুর্বল। শিরা স্পষ্ট। শক্তি কমে গেছে।

হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে একদিন কাতর কণ্ঠে বলেছিলেন,
—“আর কবে হবে তোমার বিসিএস?”

কণ্ঠে ছিল না অভিযোগ। ছিল না তাড়া। ছিল শুধু এক অদম্য অপেক্ষা।
একজন বাবার আজীবন লালিত স্বপ্নের শেষ প্রশ্ন।

অপরাজিতা কথা বলতে পারেনি। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। চোখ ভরে উঠেছিল পানিতে। সে বাবার হাত চেপে ধরে শুধু বলেছিল,
—“হবে বাবা… খুব শিগগিরই হবে।”

কিন্তু সে জানত না—সময় এত নির্মম হতে পারে।

এই ছিল শেষ কথা।

তারপর কয়েকদিনের মধ্যেই সবকিছু বদলে গেল।
ডাক্তারদের ছুটোছুটি।
পরিবারের উৎকণ্ঠা।
একটা দীর্ঘ রাত।

আর তারপর—নীরবতা।

বাবা চলে গেলেন।

যে মানুষটি সারাজীবন লড়াই করে গেছেন সন্তানদের জন্য, যিনি অভাবকে পাত্তা দেননি, যিনি অবসরের দিনেও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন—তিনি আর নেই।

অপরাজিতার পৃথিবী তখন শুন্য।

শূন্য মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়—
শূন্য মানে আশ্রয় হারানো।
শূন্য মানে এমন একজনকে হারানো, যার সামনে দাঁড়িয়ে সে বলতে পারত—“দেখো বাবা, আমি পারলাম।”

বাড়ির সেই চেয়ারটা খালি পড়ে থাকে।
বইয়ের তাকের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়—এই তো তিনি এসে বলবেন, “কী পড়ছিস?”

ফলাফল বেরোলেই আর কেউ ফোন করে জিজ্ঞেস করবে না—
“কেমন হলো?”

বাবার শেষ প্রশ্নটা তার কানে বারবার বাজতে থাকে—
“আর কবে হবে তোমার বিসিএস?”

এই প্রশ্ন এখন আর শুধু একটি প্রশ্ন নয়।
এটি হয়ে গেছে দায়।
এটি হয়ে গেছে অঙ্গীকার।
এটি হয়ে গেছে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।

অপরাজিতা কাঁদে। ভেঙে পড়ে। শূন্যতায় ডুবে যায়।
কিন্তু খুব গভীর এক জায়গায় সে অনুভব করে—
তার লড়াই এখন শুধু নিজের জন্য নয়।

এখন সে পড়বে—
কারণ বাবার স্বপ্ন অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

এখন সে লড়বে—
কারণ শেষ কথাটি উত্তরহীন থাকতে পারে না।

০৬ অথৈ সাগরে ভেসে থাকা কাঠখন্ড

একটি সরকারি ব্যাংকে চাকরি পেল সে।
স্বপ্নের বিসিএস নয়, কিন্তু টিকে থাকার ভরসা।

ফলাফল হাতে পেয়ে তার ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্মেছিল। আনন্দ—কিন্তু পূর্ণ নয়। স্বস্তি—কিন্তু তৃপ্তি নয়। যেন দীর্ঘদিন ডুবে থাকার পর মাথা একটু পানির উপর তুলতে পেরেছে, কিন্তু এখনো তীরে ওঠেনি।

চাকরিটা ছিল স্থিতিশীল। নিয়মিত বেতন। মাসের শেষে নির্দিষ্ট টাকা। সংসারের জন্য নিরাপত্তা। ভাইদের উপর চাপ কিছুটা কমলো। মায়ের মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।

তবু সে জানত—
এটা তার গন্তব্য নয়।
এটা কেবল এক বিরতি।

অফিসের প্রথম দিন সে নতুন শাড়ি পরে গিয়েছিল। ডেস্ক, ফাইল, রেজিস্টার, সিলমোহর—সবকিছু খুব নিয়মমাফিক। সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা। কাগজে সই। নোটিং। রুটিন।

এই জীবন নিরাপদ।
কিন্তু উত্তেজনাহীন।

সে মাঝে মাঝে অনুভব করত—
এই চাকরিটা যেন এক টুকরো কাঠখণ্ড। ডুবে যাওয়া মানুষ যেভাবে কাঠ আঁকড়ে ধরে বাঁচে, সে-ও তেমনই এটিকে আঁকড়ে আছে। বাঁচার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু উড়ার জন্য নয়।

এই চাকরির সূত্রেই জীবনে এলো বিজয়।
দূর শহরে কর্মরত, দায়িত্ববান, সংযত একজন মানুষ।

বিজয় ছিল কথায় কম, কাজে বেশি। প্রথম পরিচয় ছিল আনুষ্ঠানিক। ধীরে ধীরে কথা বাড়ল। সে অপরাজিতার চোখে ক্লান্তি দেখত, কিন্তু সেই ক্লান্তির আড়ালে এক অনমনীয় জেদও দেখত।

বিজয় একদিন জিজ্ঞেস করেছিল,
—“তুমি কি এখানেই থামবে?”

অপরাজিতা একটু চুপ করে থেকে বলেছিল,
—“স্বপ্নটা এখনো ছাড়িনি।”

বিজয় মৃদু হেসেছিল।
সে বুঝেছিল—এই মেয়েটি সাধারণ নয়। তার ভেতরে এক অসমাপ্ত যুদ্ধ চলছে।

তবু অপরাজিতার ভেতরের বিসিএসের স্বপ্ন নিভে যায়নি।

অফিস থেকে ফিরে সে এখনো বই খুলত। সহকর্মীরা কেউ বলত,
“এই বয়সে আর কত?”
কেউ বলত,
“চাকরি তো পেয়েছো, এখন স্থির হও।”

কিন্তু সে জানত—
স্বপ্নের বয়স হয় না।

রাতের নীরবতায় বাবার শেষ কথাটা আবার ভেসে উঠত—
“আর কবে হবে তোমার বিসিএস?”

সে জানত, সময় খুব বেশি নেই। বয়সসীমা এগিয়ে আসছে। সুযোগ কমে আসছে। তবু সে সিদ্ধান্ত নিল—আর একবার।

শেষবারের মতো সে ভাইভা দিল।
চাকরিতে জয়েন করার পর।

এবার প্রস্তুতি ছিল অন্যরকম। আগের মতো শুধু নিজের জন্য নয়—
বাবার জন্য।
নিজের অস্তিত্বের জন্য।
প্রমাণ করার জন্য যে সে মাঝপথে থামে না।

ভাইভার দিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে দেখেছিল। চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু ভয় নেই। অভিজ্ঞতা আছে, পরিপক্বতা আছে। আগের সেই কাঁচা মেয়েটি নেই—এখন সে জীবনের ঝড় দেখা একজন নারী।

বোর্ডে বসা সদস্যরা প্রশ্ন করছিলেন।
সে উত্তর দিচ্ছিল স্থির কণ্ঠে।
এবার তার কণ্ঠে অনিশ্চয়তা ছিল না—ছিল জীবনের অভিজ্ঞতা।

ভাইভা শেষে বেরিয়ে এসে সে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল।
কোনো উল্লাস নয়।
কোনো আতঙ্ক নয়।

শুধু এক নীরব প্রার্থনা—
“এবার কি হবে?”

তার হাতের মুঠোয় এখনো সেই কাঠখণ্ডের চাকরি আছে।
কিন্তু তার চোখ এখনো চূড়ার দিকে।

লড়াই শেষ হয়নি।

০৭ ভাঙনের দিন

সকাল থেকে অপেক্ষা।

সেই সকালটা ছিল অদ্ভুত ভারী। আকাশ মেঘলা ছিল কি না, সে মনে করতে পারে না—কিন্তু তার ভেতরের আকাশ নিঃসন্দেহে ভারী ছিল। অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও মন বসছিল না। ফোনটা বারবার হাতে নিচ্ছিল। ওয়েবসাইট চেক করছিল। সামাজিক মাধ্যমে গুঞ্জন—“আজই বেরোবে।”

দুপুর গড়াল।
বিকেল নামল।

প্রতিটি মিনিট যেন ঘণ্টার সমান দীর্ঘ। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, কিন্তু সময় যেন এগোয় না। বুকের ভেতর শব্দ হচ্ছে—ধক… ধক… ধক…

অবশেষে খবর এলো—
গেজেট বেরোল।

অপরাজিতা কাঁপা হাতে খুঁজছে।
পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা।

পিডিএফ স্ক্রল করছে। তালিকা দীর্ঘ। চোখ দ্রুত দৌড়াচ্ছে নামের সারির উপর দিয়ে। একবার ওপর থেকে নিচে। আবার নিচ থেকে ওপর। আবার রোল নম্বর মিলিয়ে দেখছে।

তার নাম নেই।

মুহূর্তেই তার ভেতরটা ভেঙে গেল।

কোনো শব্দ হলো না। কোনো ঝড় হলো না বাইরে। কিন্তু ভেতরে যেন সবকিছু একসঙ্গে ভেঙে পড়ল। বহু বছরের প্রস্তুতি, অসংখ্য রাতের জাগরণ, বাবার শেষ প্রশ্ন, নিজের অঙ্গীকার—সব একসঙ্গে ধুলিসাৎ হয়ে গেল।

পেটে নয় মাসের সন্তান।
স্বামী ৬০০ কিলোমিটার দূরে।
ঘরে অসুস্থ মা।

এই তিনটি সত্য একসঙ্গে তার বুকের ওপর চেপে বসল। সে একা। একেবারে একা।

তার শরীর ভারী। হাঁটতে কষ্ট হয়। নিঃশ্বাসে চাপ। এমন অবস্থায়ও সে ভেবেছিল—“হয়তো এবার হবে।”
কারণ এটাই ছিল শেষ চেষ্টা।

সে চিৎকার করতে চাইল—শব্দ বের হলো না।

গলা দিয়ে আওয়াজ উঠল না। শুধু বুক কেঁপে উঠল। হাত থেকে ফোনটা পড়ে যেতে যেতে সামলে নিল। চোখের সামনে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে গেল।

শুধু চোখ বেয়ে জল।

অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু কান্নার শব্দ নেই। যেন ভেতরের সব শব্দ শুকিয়ে গেছে।

দুই ঘণ্টা সে নিথর হয়ে পড়ে থাকল।
ফোন করল বহুজনকে।
পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক—দৌড়াল।

সে শেষবারের মতো নিশ্চিত হতে চাইল—কোনো ভুল হলো না তো? কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি? কোনো বাদ পড়া নাম? হয়তো কোথাও ভুল হয়েছে! হয়তো সংশোধিত তালিকা আসবে!

ফোনের পর ফোন। অনুরোধ। পরিচিতদের মাধ্যমে খোঁজ।
কেউ সহানুভূতি জানাল।
কেউ বলল, “দুঃখিত।”
কেউ বলল, “এবার হয়নি।”

কোনো লাভ হলো না।

শেষে বুঝল—
সবকিছু মানুষের হাতে থাকে না।

কিছু স্বপ্ন মানুষ গড়ে।
কিন্তু তার পরিণতি লেখা থাকে অন্য কোথাও।

সন্ধ্যা নেমে এলো। ঘরের বাতি জ্বলল। অসুস্থ মা দূর থেকে ডাকলেন—
“কী হয়েছে?”

সে চোখ মুছে বলল,
“কিছু না।”

পেটে সন্তানের নড়াচড়া অনুভব করল।
হঠাৎ তার মনে হলো—
জীবন থেমে থাকে না।

আজ তার স্বপ্ন ভেঙেছে।
কিন্তু তার ভেতরে আরেকটি জীবন বেড়ে উঠছে।

বাবার স্বপ্ন পূরণ হলো না।
তার নিজের স্বপ্নও না।

তবু হয়তো এই ভাঙনই তাকে নতুন করে গড়বে।

২৮ জানুয়ারি—
তার জীবনের সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ভাঙনের দিন।

০৮  রাত ৩টা ৩০

রাত গভীর।

চারদিক নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। দূরে কোথাও হয়তো কুকুরের ডাক, কিংবা কোনো ট্রাকের ক্ষীণ শব্দ—তার বাইরে পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে।

ওয়াশরুম থেকে এসে বিছানায় পা দিতেই শরীরে অদ্ভুত অনুভূতি।

প্রথমে সে বুঝতে পারেনি। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর হঠাৎ শরীরের ভেতর দিয়ে এক উষ্ণ স্রোত নেমে গেল।

পানি ভেঙে গেছে।

এক মুহূর্তে তার বুক ধক করে উঠল।
এখন? এই সময়?

ঘড়িতে ৩টা ৩০।

রাতের এই গভীর প্রহরে সময়টা যেন আরও ভারী শোনায়। ৩টা ৩০—একটি নির্জন সময়, যখন মানুষ স্বপ্ন দেখে। আর সে দাঁড়িয়ে আছে বাস্তবের মুখোমুখি।

হাত কাঁপছিল। তবু নিজেকে সামলে ফোনটা হাতে নিল।

সে ফোন করল বিজয়কে।
কাঁপা কণ্ঠে বলল,
—“এম্বুলেন্স পাঠাও… এখনই।”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর তড়িঘড়ি গলা।
বিজয় দূরে—৬০০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার কণ্ঠস্বরই ছিল একমাত্র ভরসা।

বাড়ির ভেতরে তাড়াহুড়া শুরু হলো। মা অসুস্থ শরীর নিয়েও উঠে বসেছেন। ব্যাগ আগেই গুছানো ছিল—ছোট জামা, প্রয়োজনীয় কাগজ, রিপোর্ট।

বাইরে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন ভেসে এলো।
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে।

ভোর পাঁচটায় হাসপাতাল।

হাসপাতালের আলো তখনও ম্লান। নার্সদের দ্রুত পা ফেলা। স্ট্রেচারে শুইয়ে নেওয়া হলো তাকে। মনিটর লাগানো হলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

ডাক্তার বললেন—
“বাচ্চা সুস্থ। কিন্তু এখনই অপারেশন করতে হবে।”

কথাগুলো খুব পরিষ্কার, খুব পেশাদার।
কিন্তু তার কানে যেন ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছিল।

অপারেশন।
এখনই।

সে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। মনে পড়ল গত কয়েক মাসের ভাঙন, ২৮ জানুয়ারির দিন, অশ্রু, শূন্যতা। মনে পড়ল বাবার শেষ কথা। মনে পড়ল নিজের প্রতিজ্ঞা।

অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে অপরাজিতা শুধু বলছিল,
—“হে আল্লাহ, আমার কিছু হলে হোক, বাবুটাকে ভালো রেখো।”

এই প্রার্থনায় ছিল না নিজের জন্য দাবি।
ছিল নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ।

অপারেশন থিয়েটারের দরজা বন্ধ হলো। সাদা আলো। সবুজ পোশাক। ধাতব যন্ত্রের শব্দ। শীতল পরিবেশ।

অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হলো।

চেতনা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছিল। শব্দগুলো দূরে সরে যাচ্ছিল। আলো ম্লান হয়ে আসছিল।

হঠাৎ—

একটি কান্নার শব্দ।

তীক্ষ্ণ, পরিষ্কার, জীবন্ত।

তার সন্তানের প্রথম কান্না।

সেই কান্না যেন অপারেশন থিয়েটারের দেয়াল ভেদ করে তার হৃদয়ে এসে আঘাত করল। আধচেতন অবস্থাতেও সে শুনল। অনুভব করল।

অপরাজিতার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

এটি ব্যথার কান্না নয়।
এটি মুক্তির কান্না।
এটি পুনর্জন্মের কান্না।

এই কান্না যেন তার জীবনের সব পরাজয় মুছে দিল।

বিসিএস হয়নি।
বারবার ভেঙেছে স্বপ্ন।
বাবা নেই।

তবু জীবন তাকে নতুন এক পরিচয় দিল—
মা।

এই ছোট্ট কান্নার ভেতর সে খুঁজে পেল নতুন শক্তি।
নতুন মানে।
নতুন কারণ বেঁচে থাকার।

সেই রাত ৩টা ৩০—
যে সময় এক নারী ভেঙে পড়েছিল বহুবার,
সেই সময়েই সে আবার গড়ে উঠল।

তার সন্তান কাঁদছিল।
আর সেই কান্নায় অপরাজিতা প্রথমবারের মতো অনুভব করল—
সে হারেনি।
 

০৯  আলো

যখন শিশুটিকে তার কোলে দেওয়া হলো,
তার চোখে অশ্রু।
শরীরের যন্ত্রণা এখনও দগদগে। কোমর ব্যথা, দু’পা ব্যথা, হাত প্রায় অচল।

তবু সে শিশুটিকে এক হাত দিয়ে আলতো করে স্পর্শ করল।
মুখে হালকা হাসি, বুকের ভেতর গোপন এক আনন্দ।

এই শিশুই তার আলো।
একটি ছোট্ট প্রাণ, যার নরম নিঃশ্বাস, যার ক্ষুদ্র হাত—সবকিছুই তাকে জীবন দিচ্ছে।

বাবা হারানোর শোকের মাঝে একমাত্র ভরসা।
যে হাত আর নেই তার পাশে, সেই ভরসার জায়গায় এখন জন্ম নিয়েছে নতুন এক শক্তি।

শিশুর চোখে তাকিয়ে সে বুঝল—
এই ছোট্ট প্রাণের জন্যই তার প্রতিটি যন্ত্রণার অর্থ।
এই আলোই তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে।

এক মুহূর্তে সব ব্যথা যেন কমে গেল।
হৃদয়ের গভীরে অদ্ভুত শান্তি।
এমন শান্তি, যা শুধু মায়ের মনই অনুভব করতে পারে।

এই ছোট্ট শিশুটি—নবজন্মের এক আলো।
যার দিকে তাকিয়েই সে ভুলে যায় অতীতের সব দুঃখ, সমস্ত পরাজয়।

শুধু একটাই অনুভূতি বাকি—
কৃতজ্ঞতা।
অসীম কৃতজ্ঞতা স্রষ্টার কাছে।

আজ তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
একটি আলো—অপরাজিতার জীবনের অন্ধকারে ঝলমলে এক দীপ্তি।
 

১০ বিস্ময়

দেশে এক সংস্কার বিপ্লব।

হঠাৎ একদিন—
অপরাজিতা বিসিএসের চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পেল।

ঘর জুড়ে আনন্দের এক অদ্ভুত নীরবতা।
মা কাঁদলেন।
ক্লান্ত, ভীত, কিন্তু সন্তানের জন্য গর্বিত।
বুকের ভেতর আবেগের ঢেউ, চোখে অশ্রু।

ভাই-বোন কাঁদলেন।
হাসি আর কান্নার মিলিত ছাপ।
যে মানুষটি এত বছর অদৃশ্যভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছিল—আজ তার জন্য আনন্দে ভাসছে।

অপরাজিতা কাঁদল।
কাঁদল শুধু নিজের জন্য নয়।
কাঁদল বাবার স্বপ্ন পূরণের জন্য।
কাঁদল তার লড়াই, তার কষ্ট, তার অপেক্ষার জন্য।

কাঁদল কৃতজ্ঞতায়।
সবকিছু যা হারানো মনে হয়েছিল—এখন তার চোখের সামনে জীবিত।

চোখের কোণে অশ্রু।
হৃদয়ে উত্তাপ।
মনে বারবার ধ্বনি—
“এটাই ছিল অপেক্ষার অর্থ।
এটাই ছিল লড়াইয়ের ফল।”

বিস্ময়ের মুহূর্ত।
শুধু আনন্দ নয়—একটি প্রমাণ,
যে জীবন যতই কঠিন হোক, ধৈর্য ও বিশ্বাসের ফল কখনো নষ্ট হয় না।

সেই দিনটি অপরাজিতার জন্য শুধু চাকরির নয়,
জীবনের বিজয়ের দিন।
একটি স্বপ্ন যা বহু বছর ঝরে পড়েছে,
আজ পূর্ণ হলো।

মা কাঁদলেন, ভাই-বোন কাঁদলেন, অপরাজিতা কাঁদল—
সবাই কাঁদল কৃতজ্ঞতায়।
একটি পরিবার, এক নারী, এক স্বপ্ন—সব মিলিয়ে এক বিস্ময়।
 

১১ ছয় বছর পর

আজ তার ব্যাচের চাকরির ছয় বছর।

সময়ের হিসাব—ছয় বছর।
কিন্তু সে পিছিয়ে চার বছর।
চার বছর জীবনের এক টুকরো, যা লেগে আছে দায়বদ্ধতার ভারে।

চাকরির প্রয়োজনে দূরে থাকতে হয়।
দূরত্ব যে শুধু ভৌগোলিক নয়, তা সে জানে।
মায়ের অসুস্থতার খবর আসে, কিন্তু সে যেতে পারে না।
প্রশিক্ষণের কঠিন সময়গুলো কাটাতে হয় দূর থেকে।

অসুস্থ মাকে রেখে যেতে হয়।
একসময় মা কেও হারিয়ে ফেলে সে এই প্রশিক্ষণের মাঝেই। প্রিয় সন্তানকে রেখে কাটাতে হয় অসংখ্য রাত।
যে হাত সবকিছু ভরসা দিয়েছিল—সে হাতে হাত দিতে পারে না।
যে চোখ সবকিছু দেখত—সে চোখের দিকে তাকাতে পারে না।

আজ তার সন্তানের পঞ্চম জন্মদিন।
কিন্তু সে পাশে নেই।
প্রাণের এক অদৃশ্য দূরত্ব।
মনের ভেতর আঘাত, চোখের কোণে অশ্রু।

অপরাজিতা নিজেকে প্রশ্ন করে—
সে কি পাষণ্ড মা?

না।

সে একজন সংগ্রামী মা।
যিনি নিজের স্বপ্ন, সন্তান ও পরিবারকে একসাথে বাঁচাতে জানে।
একজন অফিসার।
যিনি দায়িত্বের সঙ্গে নিজের পরিচয় রেখেছেন।
একজন মানুষ।
যিনি দুঃখ, যন্ত্রণার মাঝেও স্বপ্ন বাঁচান।

আর সবচেয়ে বড় কথা—
সে অপরাজিতা।

যিনি হার মানেননি।
যিনি লড়েছেন।
যিনি ভালোবেসেছেন।
যিনি বেঁচে আছেন।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, তার পরিচয় অটল।
অপরাজিতা—এক নাম, এক লড়াই, এক নারী।

 

Comments

    Please login to post comment. Login