Posts

গল্প

গল্প: বনসাই রহস্য: (পর্ব ১)

February 18, 2026

Moytri Roy

Original Author Moytri Roy

Translated by English

45
View

শীতের সেই সকালে কুয়াশাটা যেন একটু বেশিই জেদি ছিল। লেকভিউ রোডের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা আভিজাত্যের প্রতীক ‘সেন ভিলা’ সাদা চাদরে ঢাকা পড়ে ছিল। সাধারণত সকাল সাতটার মধ্যেই বাড়িটিতে প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে—গাড়ির হর্ন, মালি বিনোদের খুরপির শব্দ, আর বারান্দায় বসে অরিন্দম সেনের খবরের কাগজ ওল্টানোর আওয়াজে চারদিক সরগরম থাকে। কিন্তু সেদিন ছিল অস্বাভাবিক নীরবতা। 

সকাল সাড়ে আটটায় পুরনো ভৃত্য হরিপদ হাতে চায়ের ট্রে নিয়ে বারবার অরিন্দম বাবুর স্টাডি রুমের দরজায় টোকা দিলেও কোনো সাড়া পেল না; দরজাটি ভেতর থেকে আটকানো। অদ্ভুত ঠাণ্ডা অনুভব করে সে মীরা সেনকে ডাকলে তিনিও ধাক্কা দিয়েও কোনো উত্তর পাননি। শেষমেশ পাড়ার লোকজন ডেকে তালা ভাঙা হলে দরজা খুলতেই দেখা যায়, স্টাডি টেবিলের পাশে মেঝেতে অরিন্দম সেন পড়ে আছেন—চোখ দুটো অর্ধেক খোলা, যেন শেষ মুহূর্তে কিছু দেখার চেষ্টা করছিলেন, আর মুখে জমে আছে যন্ত্রণার নীলচে ছাপ।

বনসাই রহস্য

***

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করতেই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। স্টাডি রুমটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ—একেবারে নিখুঁত ‘লকড-রুম মিস্ট্রি’। দরজার চাবি ছিল ভেতরেই, আর জানালাগুলোতে মজবুত লোহার গ্রিল বসানো; বাইরে থেকে কারও প্রবেশের সামান্য চিহ্নও নেই। ঘরের ভেতর সবকিছু অস্বাভাবিক রকম গোছানো। স্টাডি টেবিলের ওপর ল্যাপটপ এখনো স্লিপ মোডে, স্ক্রিনে ক্ষীণ আলো জ্বলছে। পাশে অর্ধেক খাওয়া কফির কাপ, কাপে হালকা দাগ জমে গেছে—যেন শেষ চুমুকটি আর নেওয়া হয়নি। বুকশেলফের বইগুলো যথাস্থানে, কাগজপত্র ছড়ানো নয়, কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। দামী ঘড়ি, মোবাইল, নগদ অর্থ—সব অক্ষত। প্রথম নজরে বিষয়টি স্বাভাবিক মৃত্যুই মনে হয়েছিল, হয়তো হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন অরিন্দম সেন।

কিন্তু বিকেলের দিকে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসতেই চিত্র বদলে যায়। চিকিৎসকরা জানান, মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ নয়—বিষক্রিয়া। আর সেটিও সাধারণ কোনো বিষ নয়, বরং ধীরগতিতে কার্যকরী এক অর্গানোফসফেট যৌগ, যা শরীরে প্রবেশের অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর লক্ষণ প্রকাশ করতে শুরু করে। অর্থাৎ, অরিন্দম বাবু ধীরে ধীরে অসুস্থ বোধ করছিলেন—শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা অনুভব করার যথেষ্ট সময় ছিল তাঁর। তবুও তিনি দরজা খুলে সাহায্য চাননি, কাউকে ডাকেননি। এই অস্বাভাবিক নীরবতা এবং নিখুঁতভাবে বন্ধ ঘর পুলিশকে আরও ধাঁধায় ফেলে দেয়। তদন্ত যখন একপ্রকার অচলাবস্থায় পৌঁছায়, তখনই কেসটি তুলে দেওয়া হয় অভিজ্ঞ গোয়েন্দা ইশতিয়াক রহমানের হাতে—যিনি জটিল রহস্যের জাল খুলতে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন।

***    ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন: ট্যালেন্ট স্টেজ (প্রতিভা মঞ্চ) ইউটিউব চ্যানেল

গোয়েন্দা ইশতিয়াক রহমান স্বভাবতই ধীরস্থির ও পর্যবেক্ষণপ্রবণ মানুষ। ঘটনাস্থলে প্রথম দিন তিনি কাউকে সরাসরি জেরা না করে পুরো সেন ভিলার পরিবেশ, মানুষের আচরণ এবং ঘরের বিন্যাস গভীরভাবে লক্ষ্য করতে শুরু করলেন। তাঁর বিশ্বাস—খুনি যতই চালাক হোক, পরিবেশ কখনো মিথ্যে বলে না। অরিন্দম সেন ছিলেন ৫৬ বছর বয়সী এক সফল রাসায়নিক ব্যবসায়ী, যিনি নিজের পরিশ্রমে একটি বড় কেমিক্যাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করতেন তিনি; ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, নির্দিষ্ট সময়ে অফিস, আর রাত ১০টার পর স্টাডি রুমে একান্ত সময় কাটানো ছিল তাঁর অভ্যাস। সেই সময়টুকু ছিল শুধুই তাঁর—বই পড়া, ব্যক্তিগত ডায়েরি লেখা, আর সবচেয়ে বেশি সময় দিতেন তাঁর প্রিয় বনসাই ও বিরল গাছগুলোর পরিচর্যায়। ছোট ছোট টব সাজানো থাকত জানালার ধারে; প্রতিটি গাছের সঙ্গে যেন তাঁর এক ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল।

বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকতেন তিনজন—স্ত্রী মীরা সেন, ছোট ভাই অয়ন সেন এবং বহু বছরের বিশ্বস্ত ভৃত্য হরিপদ। উপরিভাগে পরিবারটি শান্ত ও সচ্ছল মনে হলেও ইশতিয়াক দ্রুত বুঝতে পারলেন, এই নীরবতার আড়ালে চাপা টানাপোড়েন রয়েছে। অরিন্দমের মৃত্যুর পর মীরা দেবীর চোখে শুধু শোক নয়, এক ধরনের গভীর আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট—যেন তিনি কিছু জানেন, কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছেন। অন্যদিকে ছোট ভাই অয়ন অস্বাভাবিকভাবে সংযত থাকার চেষ্টা করছে; প্রশ্ন না করলেও তার অস্থির হাত আর এড়ানো দৃষ্টি ইশতিয়াকের নজর এড়ায় না। মনে হচ্ছে, সে কোনো তথ্য গোপন করছে—অথবা এমন কিছু জানে, যা প্রকাশ পেলে পুরো রহস্যের মোড় ঘুরে যেতে পারে।

*** আমার অন্য গল্প: নিঃশব্দ শিক্ষক

পরদিন সকালে ইশতিয়াক রহমান আবার স্টাডি রুমে ঢুকলেন। আগের দিনের মতোই ঘরটি নিস্তব্ধ। জানালার কাঁচে কুয়াশার আস্তর, টেবিলে গুছিয়ে রাখা কাগজপত্র, বুকশেলফে সারি সারি বই—সবকিছু যেন অস্বাভাবিকভাবে নিখুঁত। চারদিকে একবার তাকিয়ে তিনি শান্ত গলায় বললেন, “ঘরটা বড্ড বেশি পরিষ্কার, তাই না?” 

তাঁর সহকারী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পরিষ্কার হওয়া কি খারাপ স্যার?” 

ইশতিয়াক মৃদু হেসে বললেন, “পরিষ্কার হওয়া খারাপ নয়। কিন্তু যে মানুষটা প্রতিদিন রাত জেগে কাজ করে, ডায়েরি লেখে, গাছের যত্ন নেয়—তার টেবিলে অন্তত একটা খোলা কলম বা অর্ধেক লেখা নোট থাকার কথা। এখানে সবকিছু এমনভাবে সাজানো, যেন কেউ ইচ্ছে করে দৃশ্যটা তৈরি করেছে।”

তিনি কফির কাপটি হাতে নিলেন। কফি শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে, মানে বেশ অনেকক্ষণ আগেই রাখা হয়েছিল। ফরেনসিক জানিয়েছে, কফিতে বিষের কোনো চিহ্ন নেই। অর্থাৎ বিষ অন্য কোনো পথে শরীরে প্রবেশ করেছে। কিন্তু কীভাবে? ঘর ভেতর থেকে বন্ধ, জানালায় গ্রিল, ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই—তাহলে কি অরিন্দম নিজেই কিছু স্পর্শ করেছিলেন, না কি অজান্তেই শ্বাসের সঙ্গে বিষ ঢুকে গেছে শরীরে?

এই ভাবনার মাঝেই ইশতিয়াকের চোখ আটকে গেল ঘরের কোণে রাখা একটি ছোট জাপানিজ বনসাই গাছের দিকে। অরিন্দমের প্রিয় শখ। গাছটি সতেজ, কিন্তু টবের মাটি অস্বাভাবিকভাবে ভেজা—যেন কিছুক্ষণ আগেই স্প্রে করা হয়েছে। অথচ পরিবারের দাবি, ঘটনার পর থেকে ঘরে কেউ ঢোকেনি।

তিনি নিচু হয়ে বনসাইয়ের পাশে রাখা স্প্রে বোতলটি তুললেন। মুখের কাছে আনতেই ভ্রু কুঁচকে গেল। এক ধরনের তীব্র, তিতা রাসায়নিক গন্ধ। সাধারণ পানির মতো নয়। তিনি বোতলটি আলোয় ধরে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন, “কখনো কখনো খুনি দরজা ভাঙে না… জানালাও নয়। সে ভরসা করে অভ্যাসের ওপর।”

সহকারী বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। ইশতিয়াকের দৃষ্টি তখন গাছ থেকে সরে গিয়ে থামল টেবিলের ডায়েরির ওপর—ডায়েরির শেষ পাতাটি অর্ধেক খোলা। সেখানে কাঁপা হাতে লেখা একটি অসম্পূর্ণ বাক্য…

“আমি ভুল মানুষটাকে বিশ্বাস করেছি…”

কাকে বিশ্বাস করেছিলেন অরিন্দম? বনসাই কি শুধু গাছ, নাকি সেটিই ছিল নিখুঁত খুনের অস্ত্র? আর যদি বিষ স্প্রে করা হয়ে থাকে, তবে কে জানত তার এই রাতের একাকী অভ্যাসের কথা?

ইশতিয়াক জানতেন, উত্তর খুব কাছে। কিন্তু সেই উত্তরই হয়তো খুলে দেবে পরিবারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর এক সত্যের দরজা।

রহস্য এখানেই শেষ নয়…
 

পরের পর্বে উন্মোচিত হবে—বিশ্বাসঘাতকতার আসল মুখ।

বিভিন্ন ধরনের লেখা পড়ার জন্য ক্লিক করুন "ডিজিটাল পেন্সিল "

Comments

    Please login to post comment. Login