নামটি তালিকায় ছিল না…
কিন্তু সানু বুঝতে পারছিল না—এই না থাকা কেন এত ভারী, এত নিঃশব্দ, এত গভীরভাবে তার বুকের ভেতরে বসে যাচ্ছে।
ভিড়ের মধ্যে সে দাঁড়িয়ে ছিল। চারপাশে মানুষের অস্থির গুঞ্জন, কাগজে চোখ বোলানোর দ্রুত শব্দ, উত্তেজিত কণ্ঠস্বর আর আশার স্পন্দন। বাতাস যেন কাঁপছিল প্রত্যাশায়।
তার চোখ তালিকার সারিগুলোর ওপর বারবার ছুটে যাচ্ছিল।
একবার…
দুবার…
তিনবার…
প্রতিবার অক্ষরগুলো তার সামনে বদলে যাচ্ছিল। কখনো ঝাপসা, কখনো দূরে সরে যাচ্ছে, কখনো অচেনা হয়ে উঠছে।
হঠাৎ তার দৃষ্টি স্থির হলো।
সে থামল।
আবার ধীরে ধীরে শুরু থেকে পড়ল।
নিজের নামটি খুঁজে পাওয়ার জন্য সে যেন পুরো পৃথিবীর শব্দ থামিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু সত্য বদলায়নি।
তার নাম সেখানে নেই।
এই একটি লাইন তার জীবনের সেই মুহূর্তে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল—একটি অদৃশ্য দেয়ালের মতো, যার ভেতরে সে হঠাৎ বন্দী হয়ে গেছে।
চারপাশে আনন্দের বিস্ফোরণ।
কেউ তার বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
কেউ ফোনে দ্রুত খবর দিচ্ছে।
কেউ উচ্ছ্বাসে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
সেই আনন্দের ঢেউয়ের মাঝখানে সানু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার হাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। আঙুল কাঁপছিল। বুকের ভেতর যেন কেউ ধীরে ধীরে একটি ভারী পাথর রেখে দিয়েছে।
সে কাঁদতে চেয়েছিল।
কিন্তু চোখ থেকে পানি আসেনি।
কারণ তার ভেতরে তখন আরেকটি অনুভূতি কাজ করছিল—অবিশ্বাস।
“এটা হয়তো ভুল… হয়তো পরে ঠিক হয়ে যাবে…”
এই আশা মস্তিষ্কের এক কোণে জেগে উঠেছিল।
কিন্তু তালিকার অক্ষরগুলো নীরব সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
সানুর জন্ম হয়েছিল খুব সাধারণ এক গ্রামীণ পরিবারে।
কিন্তু সেই সাধারণতার ভেতরেই তার জন্য একটি অদৃশ্য পরিচয় গড়ে উঠেছিল।
সে ছিল সবার ছোট নয়, সবার বড়ও নয়। তবু পরিবারের আবেগের কেন্দ্রে তার অবস্থান স্থির হয়ে গিয়েছিল।
বাবা কাজ থেকে ফিরলে প্রথমেই তার নাম উচ্চারণ করতেন।
মা রান্নাঘর থেকে হাত মুছে এসে তার কপালে হাত রাখতেন।
ভাইবোনেরা তাকে রক্ষা করার ভঙ্গিতে কথা বলত—যেন সে একটু বেশি নরম, একটু বেশি সংবেদনশীল, একটু বেশি যত্নের দাবিদার।
এই যত্ন ছিল আশ্রয়।
কিন্তু সেই আশ্রয় ধীরে ধীরে তার চারপাশে অদৃশ্য সীমারেখা এঁকে দিয়েছিল।
ভালোবাসা তার জীবনের ভিত্তি ছিল।
কিন্তু সেই ভালোবাসার ভেতরে নীরবে জন্ম নিয়েছিল প্রত্যাশা।
“সানু কিন্তু খুব ভালো মেয়ে।”
“ও বড়দের কথা অমান্য করে না।”
“ও একদিন অনেক বড় হবে।”
এই কথাগুলো ছিল প্রশংসা।
কিন্তু তার অবচেতন মন এগুলোকে একধরনের চুক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেছিল।
সে ভাবত—তাহলে আমাকে প্রমাণ করতেই হবে।
স্কুলজীবনে সে ছিল গড়পড়তা ছাত্রী।
সে চেষ্টা করত। মন দিয়ে পড়ত। নোট বানাত। বারবার রিভিশন করত।
কিন্তু তার পড়া যেন স্মৃতির দেয়ালে স্থায়ীভাবে খোদাই হতো না।
পরীক্ষার হলে বসলে হঠাৎ তার মাথা ফাঁকা হয়ে যেত।
মনে হতো—তার ভেতরে কোনো অদৃশ্য মুছে দেওয়ার শক্তি কাজ করছে।
যে বিষয় সে জানে, সেই বিষয়ই যেন পরীক্ষার সময় তার থেকে সরে যায়।
এই অভিজ্ঞতা বারবার ঘটতে থাকায় তার ভেতরে একটি ভয় জন্ম নিল—
“আমার মাথা কি ঠিক নয়?”
এই প্রশ্ন তাকে ধীরে ধীরে নিজের ক্ষমতার ওপর সন্দেহ করতে শিখিয়ে দিল।
সে কারও সামনে অভিযোগ করত না।
কারও সামনে কাঁদত না।
তার ভেতরে একটি নীরব নিয়ম তৈরি হয়েছিল—
“যাকে সবাই এত ভালোবাসে, সে দুর্বল হলে চলবে না।”
এই নিয়ম তার মুখে হাসি ধরে রাখত।
কিন্তু ভিতরে সে নিজের আবেগকে লুকাতে লুকাতে ক্লান্ত হয়ে যেত।
দিনগুলো এভাবেই একে একে কেটে যেতে লাগল।
বিকেলের সময়গুলো ছিল তার একমাত্র পালানোর জগৎ।
তিনটি গ্রামের মাঝখানে বিস্তৃত মাঠ।
কাঁচা রাস্তা।
ধুলোমাখা বাতাস।
পুকুরের ধারে জড়ো হওয়া বন্ধুদের হাসি।
সানু সেখানে দৌড়াত।
সে তখন ভবিষ্যতের প্রতীক নয়।
সে তখন কেবল এক কিশোরী—যার শরীরে শক্তি আছে, কণ্ঠে স্বাধীনতা আছে, মনে স্বপ্ন আছে।
সেই মুহূর্তগুলোতে সে নিজের নাম ভুলে যেত।
কিন্তু সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে নেমে যেত, তখন বাস্তবতা আবার তার কাঁধে হাত রাখত।
আজানের ধ্বনি ভেসে এলে মনে হতো—খেলা শেষ।
সে ঘরে ফিরত।
রুম গুছাত। বই সাজাত। টেবিল পরিষ্কার করত।
বাড়ির লোকজন তাকে কাজ করতে বাধ্য করত না। বরং তারা চাইত সে পড়ুক।
তবু সে নিজেই ছোট ছোট কাজ খুঁজে বের করত।
হয়তো এটি ছিল তার ভেতরের অস্থিরতা লুকানোর উপায়।
সে নিজেকে বলত—
“আগে ঘর ঠিক করি, তারপর পড়া শুরু করব।”
কিন্তু সেই “তারপর” অনেক সময় তার জীবনে আর শুরু হতো না।
---
রাতে পড়তে বসে সে নিজের সঙ্গে নীরবে যুদ্ধ করত।
“সবাই চায় আমি ভালো করি। আমি কেন পারি না?”
এই প্রশ্ন তার মাথায় বারবার ঘুরতে থাকত।
প্রথমে এটি ছিল কৌতূহল।
পরে এটি পরিণত হলো আত্মঅভিযোগে।
সে জানত না যে মানুষের শেখার গতি, স্মৃতির ধরন, চিন্তার প্রক্রিয়া আলাদা।
সে কেবল দেখত—অন্যরা পারছে।
আর সে পারছে না।
এই তুলনা তার ভেতরে একটি নীরব অপরাধবোধ তৈরি করেছিল।
---
তার শ্যামলা রঙ নিয়েও ছোট ছোট মন্তব্য তাকে ভেতর থেকে আঘাত করত—
“বাবার মতোই রঙ পেয়েছ।”
“আরেকটু ফর্সা হলে হয়তো সুন্দর লাগত।”
এই বাক্যগুলো সরাসরি অপমান ছিল না।
কিন্তু এগুলো তার মনে একটি প্রশ্ন গেঁথে দিত—
সৌন্দর্য কি শরীরের রঙে সীমাবদ্ধ?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের মুখ গভীরভাবে দেখত।
তার চোখ নিজের চোখকে যেন প্রশ্ন করত।
তার যুক্তিবোধ বলত—না, সৌন্দর্য ভেতরে।
কিন্তু সমাজের ফিসফিসানি মাঝে মাঝে তার আত্মধারণাকে নড়ে দিত।
---
প্রাইমারি শেষের দিকে সরকারী গার্লস স্কুলে ভর্তি পরীক্ষাই ছিল তার প্রথম বড় প্রতিযোগিতামূলক যুদ্ধ।
সে প্রস্তুতি নিয়েছিল প্রাণপণে।
মা বলেছিলেন—
“চান্স পেলে তোকে নতুন জামা কিনে দেব।”
বাবা বলেছিলেন—
“আমার মেয়ে পারবেই।”
এই বাক্যগুলো তার ভেতরে আশা জ্বালিয়ে রেখেছিল।
ফল প্রকাশের দিন সে তালিকার সামনে দাঁড়িয়েছিল।
মানুষের ভিড় তাকে ঘিরে ছিল।
তার চোখ নাম খুঁজছিল।
একবার…
দুবার…
তিনবার…
নাম নেই।
এই মুহূর্তে তার ভেতরে একটি অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
এটি কাঁদার শব্দ নয়।
এটি চিৎকারের শব্দ নয়।
এটি ছিল গভীর শূন্যতার শব্দ।
বাড়ি ফিরে কেউ তাকে বকেনি। কেউ অপমান করেনি।
মা বলেছিলেন—
“আরও চেষ্টা করবি।”
বাবা কিছু বলেননি।
কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে ছিল একটি দীর্ঘশ্বাস।
সানু সেই দীর্ঘশ্বাস অনুভব করল।
আর তখন সে বুঝল—
ভালোবাসা হারায়নি।
কিন্তু তার ভেতরে একটি সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়ে গেছে।
সে ভাবল—
তার নাম নেই তালিকায়।
কিন্তু তার অস্তিত্ব কি কেবল একটি কাগজের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত?
হয়তো সে সেই দিন একটি গভীর সত্য উপলব্ধি করেছিল—
মানুষের জীবন কোনো পরীক্ষার ফল নয়।
মানুষের মূল্য কোনো তালিকার অক্ষরে সীমাবদ্ধ নয়।
আর স্বপ্ন, যতবার পড়ে যায়, ততবার নতুনভাবে উঠে দাঁড়াতে পারে।
তার ভেতরে একটি প্রশ্ন রয়ে গেল—
“আমার নাম নেই তালিকায়… তাহলে কি আমার ভবিষ্যতও কোনো অদৃশ্য তালিকার বাইরে পড়ে গেছে?”
কিন্তু এবার এই প্রশ্ন ভয় নয়।
এটি ছিল প্রতিজ্ঞার শুরু।