
(পর্ব ২)
বনসাই রহস্যের ১ম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন
তদন্ত যত এগোতে লাগল, রহস্য তত জটিল হতে শুরু করল। ইশতিয়াক রহমান বুঝতে পারছিলেন—এই কেসের আসল শক্তি প্রমাণে নয়, আচরণে। এবং আচরণ বলছে, এই বাড়ির ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে উত্তর।
প্রথমেই সামনে আসে মীরা সেন।স্বামীর মৃত্যুতে তার প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক ভাবে সংযত।চোখে জল আছে, কিন্তু সেই জল যেন ভয়ের সঙ্গে মিশে গেছে।অরিন্দমের মৃত্যুর পর পরই তাকে স্টাডি রুমের ড্রয়ারের কাছে কিছু খুঁজতে দেখা গেছে।পরে জানা গেল, অরিন্দম নতুন একটি উইল তৈরি করছিলেন—যেখানে সম্পত্তির বড় অংশ একটি ট্রাস্টের নামে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল।এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই পরিস্থিতি অন্য রূপ নেয়।
যদি উইল কার্যকর হতো, মীরা সেন আর আগের মতো সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতেন পারতেন না।বিলাস বহুল জীবন, সামাজিক প্রভাব—সবকিছু সীমিত হয়ে যেত নির্দিষ্ট ভাতার মধ্যে।ইশতিয়াক যখন আলমারির কাগজপত্র ঘাঁটছিলেন, মীরার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছিল। যেন কোনো গোপন দলিল হারিয়ে যাওয়ার ভয় তাকে গ্রাস করেছে।
তারপর আসে রাসায়নিকের প্রসঙ্গ। অরিন্দমের ব্যবসার খুঁটিনাটি বিষয়ে মীরা একেবারে অজ্ঞ ছিলেন না।ল্যাবরেটরিতে বহুবার তাকে দেখা গেছে।কোন রাসায়নিক কীভাবে কাজ করে—তার প্রাথমিক ধারণা ছিল।ঘটনার আগের দিন বিকেলে তাকে স্টোররুমে কিছু খুঁজতে দেখা গেছে বলে ও জানা যায়।
ইশতিয়াক শান্তভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “সেদিন রাতে কফি কে দিয়েছিল?”
মীরা বলেছিলেন, “হরিপদ।”
“আপনি কি পরে ঘরে গিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ… তবে খুব অল্প সময়ের জন্য।” তার কণ্ঠে দ্বিধা ছিল।
এদিকে তদন্তে উঠে আসে আরেক বিস্ফোরক তথ্য।অরিন্দমের ছোট ভাই অয়ন কোম্পানির তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা সরিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে হারিয়েছেন। বিষয়টি জানার পর অরিন্দম ব্যবসা বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।ব্যবসা বিক্রি মানেই অয়নের আর্থিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
পাড়ার কয়েক জন জানিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরে ভাইদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ চলছিল।আবার অয়ন ও মীরাকে একাধিকবার ব্যক্তিগত আলাপ করতে দেখা গেছে।তাদের কথোপকথন ছিল নিচু স্বরে, গোপনীয়। তাহলে কি দুজনের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়েছিল? নাকি তারা আলাদা আলাদা কারণে একই ফল চেয়েছিল?
অন্যদিকে রয়েছে তৃতীয় মানুষটি—এই বাড়ির দীর্ঘদিনের কর্মচারী। নীরব, নিয়মিত, সবার ভরসার জায়গা।তার উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক যে কেউ তাকে আলাদা করে ভাবেই না।অথচ কফি তিনিই দেন, গাছের পানি তিনিই দেন, স্টাডি রুমে যাতায়াত ও তারই সবচেয়ে বেশি। ইশতিয়াক ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন—এই খুন শুধু বিষের নয়, বিশ্বাসের। প্রশ্নগুলো একে একে মাথা তুলে দাঁড়ায়
— বিষ কি কফিতে ছিল না অন্য কোথাও?
বনসাইয়ের ভেজা মাটি কি কাকতালীয়?
উইল কি নিছক আর্থিক লড়াই, নাকি খুনের মোটিভ? নাকি এই পরিবারের বাইরের কেউ, যাকে এখনো সন্দেহের তালিকায় আনা হয়নি?
ঘর ভেতর থেকে বন্ধ।চাবি ভেতরেই। ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। তবু ও মৃত্যু নিখুঁতভাবে সংগঠিত। এইমুহূর্তে সন্দেহের তালিকায় তিনজন—স্ত্রী, ভাই, আর বিশ্বস্ত সহকারী। কিন্তু ইশতিয়াক জানেন, কখনো কখনো আসল সত্য এমন জায়গায় লুকিয়ে থাকে, যেখানে চোখ যায়না।
সেন ভিলার ওপর যেন অদৃশ্য এক চাপা অন্ধকার নেমে এসেছে। প্রতিটি মানুষ আলাদা ঘরে থাকলেও, তাদের চিন্তা যেন একই জায়গায় আটকে—অরিন্দম সেনের শেষ রাত। আর সেই রাত টিকেই ভেঙে ভেঙে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন গোয়েন্দা ইশতিয়াক রহমান। তিনি ডাইনিং টেবিলে বসে একটি সাদা কাগজ বের করলেন।শান্ত গলায় বললেন, “আমরা অনুভূতি দিয়ে নয়, সময় দিয়ে এগোব।” তারপর শুরু হলো টাইমলাইন তৈরি।
রাত ১০:০০ — অরিন্দম স্টাডি রুমে প্রবেশ করেন।
১০:১৫ — কফি পৌঁছায়।
১০:৩০ থেকে ১১:০০ — বাড়ির ভেতরে হালকা পায়ের শব্দ কেউ একজন শুনেছে।
১১:২০ — স্টাডির আলো নিভে যায়।
ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিষ শরীরে ঢোকার অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর তার প্রভাব শুরু হয়।অর্থাৎ, যদি মৃত্যু ঘটে থাকে প্রায় ১১ টার পর, তবে বিষ দেওয়া হয়েছিল ১০ টার কিছু আগে বা আশেপাশে।
কিন্তুপ্রশ্নহলো—কীভাবে?
কফিতে বিষ নেই।
গ্লাসে নেই।
খাবারে নেই।
তাহলে কি বিষ বাতাসে মিশেছিল?
ইশতিয়াক আবার স্টাডি রুমে ঢুকলেন। বনসাই গাছ গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।মাটিতে হাত দিলেন।শুকনো অংশের নিচে ভেজা স্তর।যেন উপরের আবরণ শুধু ঢেকে রাখার জন্য। তিনি স্প্রে বোতলটি পরীক্ষা করালেন। রিপোর্ট এল—তাতে অর্গানো ফসফেটের ক্ষীণ চিহ্ন পাওয়া গেছে।তবে সমস্যা হলো, বোতলে একাধিক মানুষের আঙুলের ছাপ।অরিন্দম, মীরা, এমন কি বাড়ির অন্যদেরও। অর্থাৎ বোতলটি সবার হাতেই গেছে। রহস্য আরও গভীর হলো।
*** প্রস্তাবিত লিংক : ফিক্শন ফ্যাক্টরি তে আমার অন্যান লেখা
তল্লাশির একপর্যায়ে ইশতিয়াক একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস উদ্ধার করলেন—নতুন উইলের খসড়া।কিন্তু সেটি অসম্পূর্ণ। শেষ পাতাটি নেই।সই করা হয়নি। ডায়েরির পাশে রাখা ছিল সেটি।ডায়েরির শেষ লাইনে কাঁপা হাতে লেখা— “আমি ভুল মানুষটাকে বিশ্বাস করেছি…” এই বাক্য যেন পুরো বাড়ির বাতাস ভারীকরে দিল। মীরা সেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।অয়ন চোখ নামিয়ে নিল।
কাকে বিশ্বাস করেছিলেন অরিন্দম? স্ত্রীকে? ভাইকে? নাকি অন্য কাউকে? ফরেনসিকের হিসাব বলছে—বিষের প্রভাব শুরু হয়েছিল উইল সই করার আগেই। অর্থাৎ, খুনের উদ্দেশ্য কি উইল আটকানো? নাকি অন্য কিছু?
তদন্তে উঠে এল ব্যাংক স্টেটমেন্ট। বিপুল পরিমাণ অর্থ তহবিল থেকে সরানো হয়েছে।জুয়া, ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার—সব মিলিয়ে আর্থিক বিপর্যয়। অরিন্দম ব্যবসা বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। ব্যবসা বিক্রি মানেই অয়নের আর্থিক নিরাপত্তা শেষ। ঘটনার আগের রাতে অয়নের ফোনে একাধিক কল আসে।কল রেকর্ডে দেখা যায় উত্তেজিত কথোপকথন। কিন্তু মোবাইল লোকেশন বলছে—সে বাড়ির ভেতরেই ছিল। অর্থাৎ সুযোগ ছিল।মোটিভ ও ছিল। কিন্তু সরাসরি প্রমাণ নেই।
সবচেয়ে বড় ধাঁধা—বন্ধ ঘর। দরজা ভেতর থেকে লক।চাবি টেবিলের ওপর। কিন্তু ইশতিয়াক খেয়াল করলেন অরিন্দম সাধারণত দরজা লক করলে চাবি দরজাতেই রেখে দিতেন। এবার চাবি টেবিলে কেন? কেউ কি বেরিয়ে গিয়ে কৌশলে বাইরে থেকে লক করেছে? নাকি অরিন্দম নিজেই অসুস্থ বোধ করার পর উঠে দরজা লক করেছিলেন? যদি তাই হয়—তাহলে তিনি সাহায্য চাননি কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারছেনা। এখন সন্দেহ সমানভাবে তিনজনের ওপর দাঁড়িয়ে—
মীরা সেন — আর্থিক স্বার্থ, গোপন উইল, অসঙ্গত উত্তর।
অয়ন — তহবিল কেলেঙ্কারি, আর্থিক চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব।
বাড়ির বিশ্বস্ত সহকারী — যাতায়াতের সুযোগ, নীরব উপস্থিতি, দৈনন্দিন অভ্যাসের ঘনিষ্ঠতা।
কিন্তু প্রমাণ কাউকেই সরাসরি দোষী করছেনা। ইশতিয়াক ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন— এইখুন পরিকল্পিত। বিষ দেওয়া হয়েছেএমনভাবে, যেন মৃত্যু স্বাভাবিক মনে হয়।ঘর সাজানো হয়েছে এমনভাবে, যেন সবকিছু ঠিকঠাক লাগে। এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়— খুনি জানত অরিন্দমের প্রতিদিনের অভ্যাস, সময়, একাকীত্ব।
রাত গভীর।সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ইশতিয়াক একা স্টাডি রুমে দাঁড়িয়ে। তিনি হঠাৎ বনসাইয়ের টবটি উল্টে দিলেন।মাটি ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ছোট কাঁচের শিশি। খালি। তিনি শিশিটি হাতে তুলে আলোয় ধরলেন। চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা।
“খুনি শুধু বিষ দেয়নি…” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “সে জানত কখন দিতে হয়।”
কিন্তু প্রশ্ন এখনো রয়ে গেল— এই বাড়ির ভেতরেই কি সে লুকিয়ে আছে? নাকি সবাইকে ভুল পথে চালিত করে কেউ বাইরে থেকে সুতো টানছে? রহস্য এখন আরও গভীর।সত্য খুব কাছে… তবু নাগালের বাইরে।
পরের পর্বে— ইশতিয়াক এমন একটি আচরণ লক্ষ্য করবেন, যা সন্দেহের পাল্লা হঠাৎ একদিকে ঝুঁকিয়ে দেবে। কিন্তু সেটিই কি সত্যের শেষ কথা?
আমার অন্যান্য বাংলা গল্প পড়তে চোখ রাখুন:
📖 প্রতিলিপি: Bangla Story Profile
💻 Digital Pencil: Bangla Web Site
🌸Talent Stage: Bangla Youtube Channel
***পারলে একবারের জন্য হলেও ওয়েবসাইট গুলোতে ঘুরে আসুন, আশা করি নিরাশ হবেন না।