
ফ্রাঞ্জ কাফকার “দ্য মেটামরফোসিস”-এর কাহিনি সংক্ষেপে হলো যে, গ্রেগর নামের একজন ছেলে একদিন অর্ধেক প্রাণী, অর্ধেক মানুষ—এমন এক শরীরধারী হয়ে যায়। গ্রেগর পরিবারকে চালানোর জন্য একটি কোম্পানিতে চাকরি করত। কিন্তু তার শরীরের পরিবর্তনের কারণে তাকে একটি রুমে বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়। ফলে সে নিজের স্বাভাবিক কাজকর্ম কিছুই ভালোভাবে করতে পারে না। এমনকি তার এই শরীরকে আড়াল করে রাখত তার বাবা, মা ও বোন—যার নাম গ্রেতে—সবার কাছ থেকে। এভাবে তার জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ অবস্থা এবং পরিশেষে মৃত্যু।
এই উপন্যাসে যে বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—টাকার কাছে মানুষ বন্দি। যার কাছে টাকা আছে, তাকেই সবাই মূল্যায়ন করে। গ্রেগর যখন টাকা আয় করত, তখন সবাই তার কাছে আসত এবং তাকে ভালোবাসত। কিন্তু যখন তার শরীরের পরিবর্তন ঘটে এবং সে উপার্জনে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন সবাই তাকে পরিবারের বোঝা মনে করতে শুরু করে।
ভাই-বোনের সম্পর্কের টানাপোড়েনও এই উপন্যাসে লক্ষ করা যায়। কেননা শুরু থেকেই তার বোন গ্রেতে তার কাছে আসার চেষ্টা করেছে। যদিও গ্রেগর দেখতে ভয়ানক ছিল, তবুও গ্রেতে তার কাছে এসেছে। বোন যাতে ভয় না পায়, সেজন্য গ্রেগর নিজের শরীর ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যখন ভাড়াটিয়ারা তাদের বাড়ি থেকে চলে যায়, সে ঘটনাকে কারণ দেখিয়ে গ্রেতে নিজেও ভাইয়ের বিরোধিতা করে। তাই ভাই-বোনের সম্পর্কে একটি মনস্তাত্ত্বিক জটিল আবহাওয়া এই উপন্যাসে বিদ্যমান।
গ্রেগরের মধ্যে রয়েছে হতাশা, নিজের প্রতি ক্ষোভ এবং পারিপার্শ্বিক চাপ, যা তার মনকে করেছে ক্ষতবিক্ষত। গ্রেগরের মধ্যে বর্তমান সময়ের অনেক যুবকের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। কেননা চাকরি হারালে জীবন কেমন হয়ে ওঠে, তা গ্রেগর চরিত্রের মাধ্যমে বোঝা যায়। যদিও এখানে শরীরের পরিবর্তন একটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তবুও সমাজের নানাবিধ কারণে আমাদের অনিচ্ছায় যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, তার একটি অনন্য উদাহরণ এই উপন্যাসের গ্রেগর চরিত্র। বিরুদ্ধ পরিবেশেও টিকে থাকার চেষ্টা করেছে সে। পরিবারের কথা ভেবে পরিবর্তিত শরীর নিয়েও সে নিজের চাকরিতে যেতে চেয়েছিল। নিজের বস যখন বাড়িতে আসে, তখন সে কৌশলে নিজের অবস্থাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে, যা পাঠকের মনে কৌতূহলের সঞ্চার করে।
উপন্যাসের শেষের দিকে নিজের মেয়ে গ্রেতে-কে নিয়ে যেভাবে বাবা-মার প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনা দেখা যায়, যদি একইভাবে গ্রেগরের প্রতিও তাদের যত্ন ও সহমর্মিতা থাকত, তাহলে হয়তো গ্রেগর খুব সহজে নিজের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারত। বর্তমান সমাজের অনেক পরিবারের মতো এই পরিবারের নেতিবাচক দিকটিও অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক এই উপন্যাসে।