Posts

গল্প

পঞ্চাশটি জীবনের গল্প

March 12, 2026

Rongdhonu-Prokashoni

37
View

পঞ্চাশটি জীবনের গল্প

একটি সংকলন উপন্যাস

লেখক

Engr. M Mahafuj Sarker

রংধনু প্রকাশনী

২০২৫

প্রথম প্রকাশ: ২০২৫

সংস্করণ: প্রথম

© Engr. M Mahafuj Sarker, ২০২৫

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই বইয়ের কোনো অংশ লেখকের অনুমতি ছাড়া পুনর্মুদ্রণ, অনুবাদ বা যেকোনো মাধ্যমে পুনরুৎপাদন করা বেআইনি।

প্রকাশক: নীলপদ্ম প্রকাশনী

মুদ্রণ: ঢাকা প্রিন্টিং হাউস, ঢাকা

ISBN: 978-984-২০২৫-০৩-০৪

উৎসর্গ

সেই সকল মানুষদের জন্য

যাদের গল্প কেউ বলেনি

অথচ যাদের জীবনই সত্যিকারের সাহিত্য।

ভূমিকা

জীবন একটি মহাগ্রন্থ। প্রতিটি মানুষ তার নিজের জীবনের লেখক। কিন্তু অধিকাংশ গল্প লেখা হয় না — হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে, বিস্মৃতির গভীরে।

এই বইয়ের পঞ্চাশটি গল্প সেই হারিয়ে যাওয়া জীবনগুলোর কথা বলে। একজন রিকশাচালকের স্বপ্ন, একজন মায়ের নীরব ভালোবাসা, একটি নদীর মৃত্যু, একজন প্রবাসীর নস্টালজিয়া — এই গল্পগুলো কোনো বিশেষ মানুষের নয়, এগুলো আমাদের সবার।

লেখক হিসেবে আমার প্রয়াস ছিল মানুষের ভেতরের আলো-অন্ধকারকে সহজ ভাষায় তুলে ধরা। পাঠক হয়তো প্রতিটি গল্পে নিজেকে, নিজের পরিচিত কাউকে, বা নিজের জীবনের কোনো মুহূর্তকে খুঁজে পাবেন।

এই বইটি তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করেন — প্রতিটি সাধারণ জীবনেই একটি অসাধারণ গল্প লুকিয়ে আছে।

Engr. M Mahafuj Sarker

ঢাকা, ২০২৫

সূচিপত্র

গল্প ০১ — প্রথম বৃষ্টি

গল্প ০২ — শেষ চিঠি

গল্প ০৩ — রঙিন ঘুড়ি

গল্প ০৪ — একটি নদীর মৃত্যু

গল্প ০৫ — মায়ের হাতের রান্না

গল্প ০৬ — ছায়াপথ

গল্প ০৭ — ভাঙা আয়না

গল্প ০৮ — বাবার চশমা

গল্প ০৯ — একটি অপেক্ষা

গল্প ১০ — লাল শাড়ি

গল্প ১১ — কুয়াশার সকাল

গল্প ১২ — নোনাজল

গল্প ১৩ — রাতের বাসে

গল্প ১৪ — পুরনো বাড়ি

গল্প ১৫ — একটি গান

গল্প ১৬ — শিউলি ফুল

গল্প ১৭ — ঋণ

গল্প ১৮ — খালি চেয়ার

গল্প ১৯ — জোনাকি রাত

গল্প ২০ — বর্ষার রাত

গল্প ২১ — কবিতার খাতা

গল্প ২২ — একটি কুকুরের গল্প

গল্প ২৩ — দেশান্তর

গল্প ২৪ — অপ্রেমের প্রেম

গল্প ২৫ — মধ্যরাতের ফোন

গল্প ২৬ — বৃদ্ধাশ্রম

গল্প ২৭ — শিক্ষকের ডায়েরি

গল্প ২৮ — নীরব সংলাপ

গল্প ২৯ — কাদামাটির ঘর

গল্প ৩০ — পরীক্ষার রাত

গল্প ৩১ — রিকশাওয়ালার স্বপ্ন

গল্প ৩২ — একটি চা-দোকান

গল্প ৩৩ — অচেনা শহর

গল্প ৩৪ — শেষ যাত্রা

গল্প ৩৫ — বইয়ের পৃথিবী

গল্প ৩৬ — অন্ধের দৃষ্টি

গল্প ৩৭ — বিকেলের আড্ডা

গল্প ৩৮ — বিদ্রোহী মেয়ে

গল্প ৩৯ — একটি ক্ষমা

গল্প ৪০ — মাঠের মাঝিরা

গল্প ৪১ — অন্ধকার সুরঙ্গ

গল্প ৪২ — সীমানার ওপারে

গল্প ৪৩ — রাতের আকাশ

গল্প ৪৪ — হারানো খেলনা

গল্প ৪৫ — শেষ বিকেল

গল্প ৪৬ — নাম না জানা ফুল

গল্প ৪৭ — দুই বন্ধু

গল্প ৪৮ — ছোট্ট মেয়ের প্রার্থনা

গল্প ৪৯ — প্রতিশোধ নয়

গল্প ৫০ — জীবন চলে যায়

গল্প ০১

প্রথম বৃষ্টি

সেদিন বিকেলে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। রাফি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল — বৃষ্টির নয়, মায়ের ফেরার। মা রোজ এই সময়ে বাজার থেকে ফেরেন। কিন্তু সেদিন আর ফেরেননি। পরের দিন সকালে হাসপাতাল থেকে ফোন এলো। রাফি বুঝতে পারল, প্রথম বৃষ্টি আর কখনো আগের মতো মিষ্টি লাগবে না।

গল্প ০২

শেষ চিঠি

বাক্সের তলায় পাওয়া পুরনো চিঠিটি পড়তে গিয়ে সুমনার হাত কাঁপছিল। বাবার হাতের লেখা। মৃত্যুর তিন দিন আগে লেখা। 'তোকে বলা হয়নি, মা — আমি তোকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম। কিন্তু ভালোবাসা বলতে জানিনি কখনো।' সুমনা সেই রাতে প্রথমবারের মতো বাবার জন্য কাঁদল।

গল্প ০৩

রঙিন ঘুড়ি

ছাদের কার্নিশে আটকানো ঘুড়িটা টানতে গিয়ে বৃদ্ধ করিম সাহেব পড়ে গেলেন। পাশের বাড়ির ছেলেটা ছুটে এলো। 'দাদু, লাগেনি তো?' করিম সাহেব হাসলেন। পঞ্চাশ বছর আগে এই ছাদেই তিনি স্ত্রীর সাথে ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন। আজ সেই ঘুড়িটাই ফিরে এসেছে — অন্য একটি শিশুর স্বপ্ন ভেঙে।

গল্প ০৪

একটি নদীর মৃত্যু

গ্রামের বুড়ো মাঝি জলিল প্রতিদিন নদীর পাড়ে বসে থাকেন। নদী এখন শুকিয়ে গেছে। যেখানে একসময় ঢেউ ছিল, সেখানে এখন ধুলো। জলিলের ছেলে বলল, 'বাবা, শহরে চলো।' জলিল বললেন, 'নদী গেলে মানুষও যায়, কিন্তু স্মৃতি যায় না।' সেদিন রাতে তিনি নদীর স্বপ্ন দেখলেন।

গল্প ০৫

মায়ের হাতের রান্না

প্রবাসে দশ বছর পর দেশে ফিরে কামাল প্রথম যা চাইল — মায়ের হাতের ডাল আর ভাত। মা রান্না করলেন। কিন্তু কামাল বুঝতে পারল, স্বাদ একই, কিন্তু মা এখন অনেক ধীরে হাঁটেন, হাত কাঁপে। দেশে আসতে দেরি হয়ে গেছে — মা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন তার অগোচরে।

গল্প ০৬

ছায়াপথ

রাত দুপুরে ছাদে উঠে আকাশ দেখার অভ্যাস ছিল সাদিয়ার। একদিন পাশের বাড়ির ছেলে আরিফও উঠে এলো। দুজনে চুপ করে আকাশ দেখল। 'ওই তারাটার নাম জানো?' আরিফ জিজ্ঞেস করল। সাদিয়া বলল, 'না।' আরিফ বলল, 'আমিও না। তবু দেখি।' সেই রাত থেকে দুটো মানুষের জীবন একই ছায়াপথে হাঁটতে শুরু করল।

গল্প ০৭

ভাঙা আয়না

আয়না ভাঙলে সাত বছর অশুভ — এই কথাটা নাসরিন কখনো বিশ্বাস করেনি। কিন্তু আয়না ভাঙার পরের সাত বছরে সত্যিই সব ভেঙে গেল — বিয়ে, সংসার, স্বপ্ন। অষ্টম বছরে সে বুঝল, আয়না নয়, ভাঙে মানুষের ভরসা। এবং সেটা জোড়া লাগানো যায়।

গল্প ০৮

বাবার চশমা

বাবার মৃত্যুর পর ওই চশমাটা কেউ সরায়নি। টেবিলেই ছিল। একদিন ছোট ছেলে রিজওয়ান সেটা পরল — দুনিয়া ঝাপসা হয়ে গেল। সে বুঝল, বাবা সারাজীবন এই ঝাপসা দুনিয়া দেখেই হেসেছেন, সংসার চালিয়েছেন। চোখের জলে সেদিন চশমাটা আরো ঝাপসা হয়ে গেল।

গল্প ০৯

একটি অপেক্ষা

স্টেশনের বেঞ্চে বসে বৃদ্ধা রহিমা বেগম প্রতি শুক্রবার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করেন। ছেলে বলেছিল, 'আসব।' দশ বছর আগের কথা। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়। ছেলে আসে না। তবু রহিমা বেগম প্রতি শুক্রবার আসেন — কারণ অপেক্ষা করাটাই তার বেঁচে থাকার কারণ।

গল্প ১০

লাল শাড়ি

বিয়ের লাল শাড়িটা তিরিশ বছর সিন্দুকে ছিল। শেষ বয়সে স্বামী বললেন, 'একবার পরবে?' সে পরল। স্বামীর চোখে জল। 'প্রথম দিনের মতোই সুন্দর।' রাত্রে স্বামী মারা গেলেন। শাড়িটা আর সিন্দুকে রাখা হয়নি — প্রতিদিন পরা হয়। কারণ প্রতিদিনই শেষ দিন হতে পারে।

গল্প ১১

কুয়াশার সকাল

ভোরবেলা কুয়াশায় মাঠে হাঁটতে বেরিয়ে কৃষক আনসার দেখতে পেল একটি অপরিচিত মেয়ে কাঁদছে। জিজ্ঞেস করলে বলল, 'পথ হারিয়েছি।' আনসার তাকে গ্রামে নিয়ে এলো। মেয়েটি আর পথ হারায়নি। এক বছর পর সে আনসারের বাড়িতেই থাকে — শুধু পথ নয়, ঘরও খুঁজে পেয়েছে।

গল্প ১২

নোনাজল

সমুদ্রের পাড়ে বসে জেলেকন্যা পারুল ভাবত, ঢেউগুলো কোথা থেকে আসে। বাবা বলতেন, 'দূরের দেশ থেকে।' পারুল বড় হয়ে দূরের শহরে গেল। একদিন বুঝল, সমুদ্রের নোনাজল আর চোখের জলের লবণ একই — দুটোই বেদনার ঠিকানা।

গল্প ১৩

রাতের বাসে

রাত এগারোটার শেষ বাসে শুধু দুজন যাত্রী — এক বৃদ্ধ আর এক তরুণী। বৃদ্ধ বললেন, 'বাড়ি ফিরছ মা?' মেয়েটি বলল, 'হ্যাঁ।' কিন্তু সে জানত, তার কোনো বাড়ি নেই — সে যাচ্ছে হোস্টেলে। কিন্তু সেই মুহূর্তে বৃদ্ধের কণ্ঠে 'মা' ডাকটা শুনে মনে হলো, একটা বাড়ি আছেই।

গল্প ১৪

পুরনো বাড়ি

শহরে বিক্রি হয়ে যাওয়া পুরনো বাড়িটা ভাঙার আগে তানভীর একবার গেল। দেয়ালে তার আর বোনের উচ্চতার দাগ। মেঝেতে সেই ফাটল যেখানে বৃষ্টির পানি জমত। সে বুঝল, বাড়ি শুধু ইট নয় — প্রতিটি ফাটলে একটা স্মৃতি লুকিয়ে থাকে।

গল্প ১৫

একটি গান

মৃত্যুশয্যায় দাদু শুধু একটাই গান চাইলেন — 'আমার সোনার বাংলা।' নাতনি গাইল। দাদুর ঠোঁটে হাসি ফুটল। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। '৭১-এর সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ল। শেষ নিঃশ্বাসে বললেন, 'দেশটা রাখিস।' নাতনি সেই দায়িত্বের ভার বুকে নিল।

গল্প ১৬

শিউলি ফুল

শিউলি ফুল দেখলেই মিতার কষ্ট হয়। সেই শীতের ভোরে বান্ধবী চলে গিয়েছিল হঠাৎ। তখন উঠোনে শিউলি ঝরছিল। এখন প্রতি শরতে শিউলি ফোটে, মিতা কুড়ায় — যেন বান্ধবীর সাথে কথা বলে। ফুলের গন্ধে বলে, 'তুই ভালো আছিস তো?'

গল্প ১৭

ঋণ

বাবার মৃত্যুর পর ঋণের কাগজগুলো দেখে মামুন অবাক হলো — প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নেওয়া ছোট ছোট ঋণ। বাবা কখনো বলেননি। মামুন একে একে সব শোধ করতে গেল। প্রতিটি বাড়িতে শুনল, 'তোমার বাবা ভালো মানুষ ছিলেন।' মামুন বুঝল, সত্যিকারের ঋণ শোধ হয় না।

গল্প ১৮

খালি চেয়ার

ডাইনিং টেবিলে বাবার চেয়ারটা এখনো খালি থাকে। কেউ বসে না। মা বলেন, 'ওটা তোমার বাবার।' তিন বছর হয়ে গেছে। ছেলেরা বলে, 'মা, সরিয়ে দাও।' মা বলেন, 'সরালে মনে হবে তিনিও চলে গেলেন।' চেয়ারটা থাকে — উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে।

গল্প ১৯

জোনাকি রাত

গ্রামের মাঠে জোনাকি পোকা ধরতে গিয়ে আট বছরের শিশু রাহুল প্রথমবার অন্ধকারকে ভালোবাসল। কারণ অন্ধকার না হলে জোনাকি জ্বলে না। বড় হয়ে সে লেখক হলো। কঠিন সময়গুলোকে বলত, 'এই অন্ধকারেই আমার আলো।'

গল্প ২০

বর্ষার রাত

প্রচণ্ড বর্ষায় রাস্তায় আটকে যাওয়া অপরিচিত দুজন মানুষ একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নিল। তারপর কথা হলো — ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বৃষ্টি থামল। দুজন দুদিকে হাঁটল। কিন্তু দুজনেরই মনে হলো, এই বৃষ্টি জীবনে না হলে কিছু একটা মিস হতো।

গল্প ২১

কবিতার খাতা

মৃত্যুর পর মায়ের বালিশের নিচে পাওয়া গেল একটি পুরনো খাতা। ভেতরে কবিতা। কেউ জানত না মা লিখতেন। প্রতিটি কবিতায় সন্তানের কথা — ব্যথার কথা, স্বপ্নের কথা। মেয়ে পড়তে পড়তে বুঝল, মা সারাজীবন কথা বলেছেন — শুধু তারা শুনতে পায়নি।

গল্প ২২

একটি কুকুরের গল্প

রাস্তার কুকুরটাকে প্রতিদিন রুটি দিত বৃদ্ধ মনির। একদিন মনির অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কুকুরটা তিন দিন তার দরজার সামনে বসে থাকল। প্রতিবেশীরা দেখল, জিজ্ঞেস করল। মনিরকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। কুকুরটার ভালোবাসা একটি জীবন বাঁচাল।

গল্প ২৩

দেশান্তর

ইতালিতে বিশ বছর কাজ করার পর রহিম দেশে ফিরল। গ্রাম বদলে গেছে। বাড়ি বদলে গেছে। বাবা-মা মারা গেছেন। শুধু পুকুরটা আছে। সে পুকুরে পা ডুবিয়ে বসে থাকল সন্ধ্যা পর্যন্ত। কারণ ওই পানিতেই তার শৈশব।

গল্প ২৪

অপ্রেমের প্রেম

তারা কখনো 'ভালোবাসি' বলেনি একে অপরকে। কিন্তু নীলা অসুস্থ হলে করিম ওষুধ নিয়ে আসত। করিম দুঃখী হলে নীলা চুপ করে পাশে বসত। ত্রিশ বছর পর করিম মারা গেলে নীলা বুঝল, শব্দহীন ভালোবাসাই আসলে সবচেয়ে গভীর।

গল্প ২৫

মধ্যরাতের ফোন

রাত তিনটায় ফোন। অপরিচিত নম্বর। হালিমা ধরল। ওপাশে কান্না। একটি মেয়ে। 'আমি আর পারছি না।' হালিমা ঘণ্টাখানেক কথা বলল — একজন অপরিচিত মানুষের সাথে। সকালে মেয়েটি আবার ফোন করল, 'ধন্যবাদ। আপনি না থাকলে আজ আমি থাকতাম না।' হালিমা বুঝল, মধ্যরাতের ফোনও জীবন বাঁচায়।

গল্প ২৬

বৃদ্ধাশ্রম

বৃদ্ধাশ্রমে এসে আজিজ সাহেব প্রথম রাতে ঘুমাতে পারলেন না। ছেলেদের কথা ভাবলেন — তারা ব্যস্ত, এটাই বাস্তব। পরের দিন পাশের ঘরের বৃদ্ধার সাথে পরিচয় হলো। তিনিও একাকী। দুজনে বিকেলে বাগানে হাঁটেন। একাকীত্বও ভাগ করলে হালকা হয়।

গল্প ২৭

শিক্ষকের ডায়েরি

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সিদ্দিক সাহেবের পুরনো ডায়েরিতে প্রতিটি ছাত্রের নাম। কে ডাক্তার হয়েছে, কে উকিল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি পাতা যার নামে — সে একটি ছোট মুদির দোকান চালায়। সিদ্দিক সাহেব লিখেছেন, 'সেই সবচেয়ে সৎ।' সাফল্যের মাপকাঠি কে নির্ধারণ করে?

গল্প ২৮

নীরব সংলাপ

বধির দম্পতি রোকেয়া আর মকবুল পঁচিশ বছর সংসার করেছেন ইশারায়। শব্দ ছাড়াই বুঝতেন একে অপরকে। প্রতিবেশীরা বলত, 'কষ্টের জীবন।' রোকেয়া হাসতেন। কারণ তারা জানতেন, শব্দের চেয়ে বড় ভাষা হলো দৃষ্টি।

গল্প ২৯

কাদামাটির ঘর

বন্যায় ঘর ভেসে গেছে — তৃতীয়বারের মতো। কিন্তু সালেহা কাঁদেনি। ছেলে বলল, 'মা, শহরে চলো।' সালেহা বললেন, 'এই মাটিতে তোর বাবাকে পুঁতেছি। এই মাটি ছেড়ে যাব না।' পরের বার আবার কাদামাটি দিয়ে ঘর বানালেন।

গল্প ৩০

পরীক্ষার রাত

পরীক্ষার আগের রাতে বিদ্যুৎ গেল। মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ছিল নয়ন। মা পাশে বসে পাখা করছিলেন। ভোরবেলা নয়ন ঘুমিয়ে পড়ল। মা সারারাত জেগেছিলেন — পাখা করতে করতে। পরীক্ষায় নয়ন প্রথম হলো। ফলাফলের কাগজটা মাকে দিল, বলল, 'এটা তোমার।'

গল্প ৩১

রিকশাওয়ালার স্বপ্ন

রিকশা চালিয়ে ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানালেন আলতাফ। সমাবর্তনে বসে আলতাফের চোখ ভেজা। ছেলে মঞ্চে উঠল। আলতাফ ভাবলেন, 'তিরিশ বছরের প্যাডেলের প্রতিটি ঠেলা আজ সার্থক।' বাড়ি ফেরার পথে রিকশায় বসে আলতাফ গাইলেন।

গল্প ৩২

একটি চা-দোকান

শহরের কোণের চা-দোকানটায় রোজ আসেন বিভিন্ন মানুষ — অফিস কর্মী, রিকশাচালক, শিক্ষার্থী। মালিক কাইয়ুম কারো নাম না জানলেও মুখ চেনেন। কেউ দুঃখী থাকলে এক কাপ বেশি দেন, কথা বলেন। তার দোকান শুধু চা বিক্রি করে না — সান্ত্বনাও বিক্রি করে।

গল্প ৩৩

অচেনা শহর

নতুন শহরে এসে মরিয়ম প্রথম মাস কথাই বলেনি কারো সাথে। দ্বিতীয় মাসে পাশের ফ্ল্যাটের বুড়ি এসে বললেন, 'চা খাবে?' সেই এক কাপ চায়ে একটি বন্ধুত্ব শুরু হলো। শহর আর অচেনা লাগেনি।

গল্প ৩৪

শেষ যাত্রা

মৃত্যুর আগে বৃদ্ধ হাবিব বললেন, 'একবার গ্রামে নিয়ে যাও।' পরিবার নিয়ে গেল। তিনি মাঠে দাঁড়ালেন, মাটি স্পর্শ করলেন, বললেন, 'এই মাটিতে জন্মেছি, এই মাটিতেই শুতে চাই।' দু'দিন পর মারা গেলেন গ্রামেই। শেষ যাত্রার ইচ্ছা পূর্ণ হলো।

গল্প ৩৫

বইয়ের পৃথিবী

গ্রামের লাইব্রেরির বই পড়ে পড়ে বড় হয়েছিল রুমা। শহরে এসে বড় হয়েছে, কিন্তু সেই পুরনো বইগুলোর কথা ভুলেনি। একদিন সে সেই গ্রামে ফিরে গেল — লাইব্রেরিটায়। বইগুলো ধুলো পড়ে আছে। সে পরিষ্কার করল, নতুন বই কিনে দিল। কারণ সেই লাইব্রেরিই তার জীবন গড়েছিল।

গল্প ৩৬

অন্ধের দৃষ্টি

জন্মান্ধ ছেলে সাবের পৃথিবীকে চেনে গন্ধে, শব্দে, স্পর্শে। সে বলে, 'আমি সকালকে পাখির গানে দেখি, বৃষ্টিকে দেখি শব্দে।' যারা দুই চোখে দেখেও অনেক কিছু দেখে না — তারা কি সত্যিই সাবেরের চেয়ে বেশি দেখতে পায়?

গল্প ৩৭

বিকেলের আড্ডা

বিশ বছর ধরে একই বেঞ্চে বসে আড্ডা মারেন পাঁচ বন্ধু। কেউ ডাক্তার, কেউ কৃষক। কেউ বড়লোক, কেউ গরিব। কিন্তু বিকেল পাঁচটায় সব পার্থক্য মুছে যায়। তারা শুধু বন্ধু। সেই বেঞ্চটাই তাদের সমতার প্রতীক।

গল্প ৩৮

বিদ্রোহী মেয়ে

পরিবার বিয়ে দিতে চেয়েছিল। তমা রাজি হয়নি — পড়াশোনা শেষ করবে বলে। সবাই বলল, 'অবাধ্য মেয়ে।' দশ বছর পর তমা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এখন সেই পরিবার গর্বিত। তমা ভাবে, বিদ্রোহই কখনো কখনো সঠিক পথ।

গল্প ৩৯

একটি ক্ষমা

বিশ বছর পর ভাই-বোনের ঝগড়া মেটানো হলো বৃদ্ধ মায়ের মৃত্যুশয্যায়। মা বললেন, 'ঝগড়া মনে থাকবে না, ভাই-বোন মনে থাকবে।' দুজনে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরল। মা চলে গেলেন শান্তিতে। তাঁর শেষ উপহার ছিল একটি ক্ষমা।

গল্প ৪০

মাঠের মাঝিরা

ধান কাটার মৌসুমে মাঠে কাজ করতে আসা শ্রমিকরা রাতে গান গায়। সেই গান গ্রামের বাতাসে ভাসে। শহর থেকে আসা ছেলেটি সেই গান শুনে থমকে দাঁড়ায়। বুঝতে পারে, সভ্যতার সব গান এই মাঠের মানুষদের কাছ থেকেই জন্ম নিয়েছে।

গল্প ৪১

অন্ধকার সুরঙ্গ

বিষণ্নতায় ডুবে থাকা রাফিয়া ভাবত, এই অন্ধকার কাটবে না কখনো। একদিন এক মনোবিদের কাছে গেল। তিনি বললেন, 'সুরঙ্গের শেষেও আলো থাকে।' রাফিয়া বলল, 'আমি তো সুরঙ্গেই আটকে আছি।' 'তাহলে হাঁটতে থাকো।' সে হাঁটল। আলো পেল।

গল্প ৪২

সীমানার ওপারে

সীমান্তের দুই পাশে দুই বৃদ্ধ — এপারে বাংলাদেশের হাফিজ, ওপারে ভারতের হরিদাস। দেশভাগের আগে তারা একই গ্রামে ছিল। এখন কাঁটাতারের বেড়া। প্রতিদিন হাত নাড়েন। কথা হয় না। কিন্তু দুজনের চোখে একই ভাষা — হারানো ভালোবাসার ভাষা।

গল্প ৪৩

রাতের আকাশ

শহরের আলোয় তারা দেখা যায় না। সেজন্য শিশু আর্যান মনে করত, তারা শুধু গল্পে থাকে। গ্রামে গিয়ে প্রথমবার রাতের আকাশ দেখে সে বলল, 'বাবা, তারা সত্যিই আছে!' বাবা বুঝলেন, অনেক সত্যিকারের জিনিস শুধু নিরিবিলিতে দেখা যায়।

গল্প ৪৪

হারানো খেলনা

মেলায় হারিয়ে যাওয়া পুরনো একটি খেলনা গাড়ি বিশ বছর পর পুরনো বাজারে পেল মামুন। কিনে নিল। বাড়ি ফিরে ছেলের হাতে দিল। ছেলে খুশি হলো। মামুন ভাবল, কিছু জিনিস হারায় না — ঘুরে ঘুরে আবার ফিরে আসে।

গল্প ৪৫

শেষ বিকেল

ক্যান্সার আক্রান্ত লাইলা জানত আর বেশিদিন নেই। সে প্রতিটি বিকেলকে উপভোগ করত পূর্ণভাবে — সূর্যাস্ত, পাখির গান, বাতাসের স্পর্শ। মৃত্যুর আগের বিকেলে সে বলল, 'প্রতিটি বিকেলই শেষ বিকেলের মতো সুন্দর, যদি তুমি বুঝতে পারো।'

গল্প ৪৬

নাম না জানা ফুল

বাগানে একটি ফুল ফোটে প্রতি বছর, কিন্তু কেউ তার নাম জানে না। মালি বলে, 'নাম না থাকলেও ফোটে।' শিশুটি বুঝল, পরিচয় না থাকলেও সুন্দর হওয়া যায়। বড় হয়ে সে সেই শিক্ষাটাই জীবনে নিয়ে চলল।

গল্প ৪৭

দুই বন্ধু

একজন ধনী, একজন গরিব — কিন্তু পঞ্চাশ বছরের বন্ধুত্ব। ধনী মারা গেলে উইলে লেখা, 'আমার অর্ধেক সম্পদ যাবে আমার সেই বন্ধুকে যে আমাকে মানুষ বানিয়েছে।' নাম — গরিব বন্ধুর। সম্পদ দিয়ে বন্ধুত্বের মাপ হয় না — কিন্তু বন্ধুত্ব দিয়ে মানুষের মাপ হয়।

গল্প ৪৮

ছোট্ট মেয়ের প্রার্থনা

পাঁচ বছরের মেয়ে রাইসা প্রতিদিন নামাজের পরে বলে, 'আল্লাহ, বাবাকে ভালো রেখো।' বাবা শুনতে পেয়ে বাইরে গিয়ে কাঁদেন। কারণ তিনি জানেন, একটি শিশুর নির্ভেজাল দোয়াই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থনা।

গল্প ৪৯

প্রতিশোধ নয়

যে মানুষটি তাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, তার বিপদে সাহায্য করল সাজেদা। সবাই অবাক। সাজেদা বলল, 'প্রতিশোধ নিলে আমিও তার মতো হয়ে যাই।' সে মানুষটি পরে কেঁদে বলল, 'তুমি আমাকে মানুষ করেছ।' ক্ষমাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

গল্প ৫০

জীবন চলে যায়

পঞ্চাশটি গল্প পড়ার পর পাঠক থামলেন। বইটি বন্ধ করলেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। রাস্তায় মানুষ চলছে — প্রতিটি মানুষের ভেতরে এরকম পঞ্চাশটি গল্প লুকিয়ে। কেউ বলে, কেউ বলে না। কিন্তু জীবন চলতে থাকে — নীরবে, অবিরাম।

লেখক পরিচিতি

Engr. M Mahafuj Sarker

Engr. M Mahafuj Sarker একজন বাংলাদেশী সিভিল ও এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ার এবং লেখক। পেশাগত জীবনে প্রকৌশলী হলেও সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, আবেগ এবং সংগ্রাম তাঁর লেখার মূল উপজীব্য।

তিনি বিশ্বাস করেন, একজন প্রকৌশলী যেমন কংক্রিট ও ইস্পাত দিয়ে সেতু নির্মাণ করেন, তেমনি একজন লেখক শব্দ দিয়ে মানুষের হৃদয়ে সেতু নির্মাণ করেন। পঞ্চাশটি জীবনের গল্প তাঁর সেই সেতু নির্মাণের প্রথম প্রয়াস।

Comments

    Please login to post comment. Login