Posts

কবিতা

অস্তিত্বের শেকড়ে তুমি

March 13, 2026

মোছা: মোকাররমা শিল্পী

94
View

বাবা,

খুব ভোরবেলায় তোমাকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
যখন আকাশ এখনো পুরো জেগে ওঠেনি,
মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসে ফজরের আজান,
আর পৃথিবী তখন নরম নীরবতায় ঢেকে থাকে—
সেই সময়টাতেই হঠাৎ মনে হয়,
তুমি যেন এখনও আছো।

মনে হয়, তুমি ধীরে ধীরে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছো,
মসজিদে যাওয়ার আগে
নরম স্বরে সবাইকে ডেকে বলছো—
“উঠো, নামাজের সময় হয়েছে।”

বাবা,
আজও ভোর হয়,
আজানও হয়,
মানুষও মসজিদে যায়—
শুধু তোমার সেই মধুর ডাকটা
এই ঘরে আর শোনা যায় না।

বাবা,

বাসা থেকে দূরে কোথাও গেলে
আজও মনে হয়—
কেউ যেন দরজার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

হয়তো তুমি,
নিঃশব্দে আমার পথের দিকে তাকিয়ে।

পেছন ফিরে তাকাই কখনও কখনও—
ভাবি,
এই বুঝি তোমাকে দেখব।

কিন্তু বাতাস ছাড়া
সেখানে আর কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না।

বাবা,

আমার বাচ্চারা যখন দুষ্টুমি করে,
কখনও একটু জোরে কথা বলে,
তখন হঠাৎ মনে পড়ে
তোমার সেই নরম কণ্ঠ।

তুমি থাকলে হয়তো বলতে—

“ওদের কিছু বলো না,
বাচ্চা বলেই তো দুষ্টুমি করে।
বুঝলে কি আর করত?”

তোমার মতো করে
বাচ্চাদের মন বোঝে—
এমন মানুষ পৃথিবীতে খুব কমই হয়, বাবা।

বাবা,

এখন আর কারও সঙ্গে
একেবারে মন খুলে গল্প করতে পারি না।

অনেকেই কথা শোনে,
কিন্তু আমার মনের ভেতরের শব্দগুলো
শোনার মতো মানুষ ছিল একজনই—
সে তুমি।

আমার মুখের ভাষা অনেকেই বুঝত,
কিন্তু আমার মনের ভাষা
বুঝতে শুধু তুমি।

বাবা,

তোমার মতো করে
আমার কাজের প্রশংসা করে
উৎসাহ দিয়ে বলার মতো
আজ আর কেউ নেই—“খুব ভালো হয়েছে মা,
চালিয়ে যাও।”

তাই মাঝে মাঝে
কোনো কাজেই আর আগ্রহ জাগে না।

বাবা,

খুব মনে পড়ে সেই সকালগুলো—
তুমি আমায় সাইকেল করে স্কুলে পৌঁছে দিতে।

তারপর সেই একই সাইকেলে
তাড়াহুড়ো করে অফিসে চলে যেতে।

আজ আমার ছেলেও স্কুলে যায়,
কিন্তু বলো সে তোমার মতো
একজন বাবাকে কোথায় পায়?

বাবা,

মনে পড়ে সেই কনকনে শীতের রাতগুলোও।
চারদিক নিস্তব্ধ,
হিমেল বাতাসে জানালার কাচ কেঁপে উঠত।

আমি তোমার কোলে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতাম,
তুমি গরম চাদর মুড়িয়ে দিতে আমাকে,
আর সেই চাদরের ভেতরেই
আমাকে বুকে জড়িয়ে রেখে
খাতা লিখতে লিখতে
ধীরে ধীরে পড়াতে।

সেই উষ্ণতা, সেই আশ্রয়—
আজও যেন আমার শরীরের ভেতর কোথাও রয়ে গেছে।
কিন্তু সেই রাতগুলো আর ফিরে আসে না, বাবা।

বাবা,

যখন দেখি কেউ
মসজিদে নামাজ ধরার জন্য
দ্রুত পায়ে হাঁটছে—
হঠাৎ মনে হয়
এই বুঝি আমার বাবা।

প্রতিদিন রান্না শেষেও
তোমার কথা খুব মনে পড়ে।

কারণ এখন আর কেউ
মিষ্টি হেসে বলে না—

“মা, দারুণ হয়েছে রান্না।”

আর প্রতিবার খেতে বসলে
তোমাকে আরও বেশি মনে পড়ে, বাবা।

তোমার হাতের মমতা মাখানো খাবারের স্বাদ
আমি আর কোথাও পাই না।

তাই কখনও কখনও মনে হয়—
খাওয়া যেন আর শুধু খাওয়া নয়,
একটা যুদ্ধের মত কষ্ট 

কারণ প্রতিটি গ্রাসে
তোমার অভাবটা
হয়ে ওঠে আরও স্পষ্ট ।

বাবা,

যেদিন খুব ক্লান্ত হয়ে
বিছানায় ঢলে পড়ি,
সেদিনও তোমাকে খুব মনে পড়ে।

কারণ এখন আর কেউ
আমার মশারি টাঙিয়ে দেয় না,
কেউ আদর করে
গায়ে চাদরটাও জড়িয়ে দেয় না।

বাবা,

আমার বাচ্চাদের কেউ শাসন করতে গেলে
আমার চোখে জল এসে যায়।

কারণ তুমি থাকলে বলতে—

“থাক ওদের বলো না কিছু

ওরা তো বড় নয়,বাচ্চা মানুষ—

দুষ্টুমি তো একটু করবেই।”

বাবা,

এখন চারপাশে শুধু হিসাব দেখি—
স্বার্থের হিসাব।

তোমার মতো কাউকে আর বলতে শুনি না—

“আমার কিছু লাগবে না,
আমার এতেই চলবে।”

এখন শুধু শুনি—
“আমারটা কোথায়?”

বাবা,

বাচ্চাদের যখন পড়তে বসাই
তখন তোমাকে আরও বেশি মনে পড়ে।

সারাদিন অফিস করে এসে
তুমি কত ধৈর্য নিয়ে আমাকে পড়াতে।

ইংরেজির কঠিন গ্রামারও
কত মধুর আর নরম স্বরে বুঝিয়ে দিতে।

আজ আমার বাচ্চাদেরও
এমন একজন মানুষ খুব দরকার ছিল।

কিন্তু বলো তো বাবা—
তোমার মতো মানুষ
এই পৃথিবীতে কোথায় পাওয়া যায়?

বাবা,

আমি যখন কোনো ভুল করতাম,
তুমি কখনও কঠিন হতে না।

মমতা দিয়ে,
ধীরে ধীরে
আমাকে বুঝিয়ে দিতে।

তোমার সেই ভালোবাসা দেখে
অনেক সময় নিজেই কেঁদে ফেলতাম।

আজ সেই মানুষটা নেই
যে আমার ভুলগুলোকে
আদরে ঠিক করে দেবে।

আজও তোমাকে ছাড়া
আমি অনেকটা বিকল হয়ে আছি, বাবা।

তবুও জীবন থেমে থাকে না—
জীবন এগিয়ে চলে

তার নিজের নিয়মে

কিন্তু একটা কথা জানো—

তুমি কোথাও হারিয়ে যাওনি।

বাবা, তুমি আছো
আমার প্রতিটি স্মৃতিতে,
আমার প্রতিটি অভ্যাসে,
আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে।

তবুও মাঝে মাঝে
ভোরের নীরবতায়
আমি হঠাৎ চমকে উঠি—

মনে হয়,
তুমি বুঝি আবার ডাক দিলে—

“মা, উঠো…
নামাজের সময় হয়েছে।”

তারপরই বুঝতে পারি—
ডাকটা আর কেউ দেয়নি।

শুধু আমার বুকের ভেতর
তোমার স্মৃতিই
আজান হয়ে বাজে।

বাবা,
খুব মনে পড়ে তোমায়।

তোমার মেয়েটা
আজও আগের মতোই
প্রতিটি ভোরে
তোমার সেই ডাকের অপেক্ষায় থাকে।

Comments

    Please login to post comment. Login