Post

‘রৌজা’ গীতিকবিতা পর্ব (১৩)

June 9, 2024

Original Author আযাহা সুলতান

431
View

১২১ 
জীবনে একবিন্দু সুখ 
উপলব্ধি করতে পারিনি! 
তবু আমি সুখে আছি। 
সুখ যদিওবা আমাকে 
আপন বলেই মানেনি 
কী? শান্তিও নেই কাছাকাছি? 
তবু আমি সুখে আছি॥

“সুখচে তবে শান্তি ভালো 
জীবন হলো সাদাকালো, 
এই আলো এই আঁধার 
প্রহর কিছুটা আঁধার বেশি” 
তবু আমি সুখে আছি॥

সুখের রাজ্য গড়ে যদি 
ভোগী অশান্তির অসুখে! 
ওই সুখের সুখ কোথা। 
কুঁড়ের ঘরে যদি হয় 
আরামের ঘুম নিশ্চিন্তে 
বলো, এরচে বড় সুখ কোনটা? 
ওই সুখের সুখ কোথা॥

“স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল 
অর্থকড়ি সবকিছুর কূল, 
অর্থ ছাড়া জীবন অচল 
পুণ্য কামাইয়েও লাগে কড়ি” 
তবু আমি সুখে আছি॥ 
১১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৭—মানামা, আমিরাত


১২২ 
আমি এমনিতেই নিঃস্ব আছি 
আরও নিঃস্ব করো ঈশ্বর আমায়। 
কে কতটু হাসে বিদ্রূপের হাসি 
তা শুধু একবার দেখতে চাই॥

খুশি যারা হবে আমার নিঃস্বতে 
হায়, আমি যদি পারতাম দিতে, 
এমন কিছু—তাদের স্মরণীয় করায়—
তা শুধু একবার দেখতে চাই॥

কী মরা মরলাম আপনালিতেই 
আপনেরাই দেখি শত্রুবড় সবচে। 
ভাই দেখি বন্ধু দেখি সব স্বার্থেই 
স্বার্থশেষে কারে দেখি না কাছে॥

উপকার করলে অপকার জানি 
বুঝতে চেয়েছিলাম কতটা আমি, 
বুঝেছি—জলঢালা বালুচরে পুরাই—
আরও নিঃস্ব করো ঈশ্বর আমায়॥ 
১৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৭—মানামা, আমিরাত 

১২৩ 
প্রভু, 
যতক্ষণ রাখো দেহে প্রাণ 
স্থির রেখো আমার কদম 
সকল দুঃখকষ্টে অবিচল। 
কভু, 
দুর্বল করো না মনের জোর 
বিপদ-আপদ শত আসুক 
আত্মবিশ্বাস রেখো অটল॥

তোমার ওপর যত আস্থা 
কোনো 
অবস্থাতেই ভেঙো না তা, 
নত যদি করো মাথা—করো 
তোমার চৌকাঠের তল—
আত্মবিশ্বাস রেখো অটল॥

আমার 
এই—এতটু কামনা তবে 
না না—পেতে মোটেই না 
খাবারও ইচ্ছা না কাত্থেকে। 
তোমার 
কাছে একটু আবদার তবে 
অতটু চাওয়ারও বাঞ্ছা নেই 
এটুকু দ্বিকর করো আমাকে॥

তুমি পরীক্ষা করবে—করো 
কিন্তু 
যতই করো-না দরদ বড়, 
সততার দেয়াল ভাঙতে 
করো না চাহাতে দুর্বল—
আত্মবিশ্বাস রেখো অটল॥ 
৯ পৌষ, ১৪২৭—মানামা, আমিরাত 

১২৪ 
ফেলে সংসারের মোহে 
ভুলালে বন্দেগির রাহে 
বলো, কী দোষ বান্দার? 
তবু দোষী মানি নিজেরে 
খোদা মাফ করো হে 
ক্ষমা কি আছে আমার?।

বায়ান্নটি বছর পার করালে প্রভু 
তোমায় এমন করে একবারও 
ডাকালে না কভু! 
কী হতো জন্ম হতে 
মনটা তোমার পদে 
ঝুঁকে রাখলে আর—
বলো, কী দোষ বান্দার?।

যেই রূপ দেখালে মানুষের 
ঘুমের ঘোরেও মনে পড়ের 
ভুললেও ভুলতে পারি না! 
চিনালে চিনালে জগতের 
যেসব ব্যবসা লেনদেনের 
জানালে—কাজে আসবে না!।

এখন কি সময় আর জিন্দেগি খুঁজি? 
জ্ঞান দিলে তো দিলে গো আনি 
শেষপ্রান্তে বুঝি! 
করি তো করি কতটু 
হয় তো হবে একটু 
নাহয় তো বেকার—
বলো, কী দোষ বান্দার?। 
২৪ পৌষ, ১৪২৭—মানামা, আমিরাত


১২৫ 
‘স্বগর্’ ‘স্বর্গ’ করে যারা মরছে আর মারছে 
প্রভু তুমি বলো, স্বর্গ কি তারা পেয়েছে? 
‘ধর্ম’ ‘ধর্ম’ করে যত যারা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে 
বলো, তারা প্রকৃত ধার্মিক হতে পারছে?।

ভালো দেখালে কেউ বোঝা চাই ভালো? 
কে জানে কার অন্তরে কত বিষকালো! 
বাইরের রূপে সাধুসন্ন্যাসী দেখা যাচ্ছে 
বলো, তারে কি সাধুমানব বলা যাবে?।

‘ইসলাম’ ‘ইসলাম’ করে যত যারা ছুটছে 
বলো, কতটুকু ইসলামে তত তারা আছে? 
‘কোরান’ ‘কোরান’ বলে উলটোপথে চলছে 
তুমি বলো, সে কোরান মোটেও বুঝছে?।

যতই-না দেখাবে দেখাও পরিষ্কার পথ 
বিপদী ঘুরেফিরে দেখবে শুধুই আপদ! 
‘বিপদ’ ‘বিপদ’ করে সুপথ যারা দেখাচ্ছে 
বলো, তারা আসলেই কি সুপথে আছে?।

যে-ধর্মকে করে দিলে তুমি পরিপূর্ণ কবে 
লক্ষ নবিরাসুল ও মুহাম্মদের শুভাগমনে! 
প্রতিষ্ঠিত করেই রাখলে কেয়ামত পর্যন্তে 
আবার কোন প্রতিষ্ঠার ডঙ্কা নতুন ঢঙে?।

তোমার কথা যদি হয় তবে ‘না’ ‘না’ 
আকাশ-পেটুকেরা দুঃসাহস পায় কোথা! 
ফেরকা ফেরকায় আর কত ফেরকা বাড়বে? 
কেন ওদের ডানহাত ধরছ না তা হলে?।

কুচক্রীর চক্র চক্রহারে কেবল বাড়ালে 
‘মার মার’ ‘কাট কাট’ কোথায় ইসলামে? 
এভাবে ধর্মপ্রতিষ্ঠা কোথায় তুমি বললে? 
দুষ্টের হাতে ধর্মের রশি ছেড়ে রাখলে!।

গাঁট্টিগাঁঠুরে বন্দি করলে ধর্মের সৌন্দর্য 
যাযাবরের জিন্দেগিতে কীসের ধর্মৈশ্বর্য? 
ধর্মের সৌন্দর্য বিনষ্টে যতসব মতলবি নামছে! 
বলো হে, চিল্লেটিল্লে এসব কোথা কোরানে?।

‘ধর্মে কিছুই অসুন্দর নেই’ তুমি বললে 
তবে গাঁট্টিগুঁট্টি থালাবাসন কোমরে বেঁধে 
এ ধর্মের শালীনতা শেখাল কে তাদেরকে? 
ধর্ম তোমার তুমি কেন হাসছ পরিহাসে!।

জানি, বিপথ-গুমরাহি করছ যারে তুমি 
পথ পাবে না সে সুপথেও আসি জানি! 
এটাই ইসলাম, থাকি-না যতই ইসলামে 
শয়তান তো ধোঁকা দেয় ফেরেশতা সেজে!।

আরও জানি তোমার ভূরি ভূরি আদেশ 
জানি না কে কতটু বোঝল সেই উপদেশ! 
আমরা তো দেখছি আজ কেবলই বিদ্বেষ 
দাবানলের মতো জ্বলছে হিংসায় দেশবিদেশ!।

কোথাও ধর্মবাদ কোথাও মানবতাবাদ 
দোহাইয়ে দুইয়ে করছে শুধু নিজস্বার্থহাত! 
নব্যধার্মিক নেমেছে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে 
আখেরি দুনিয়া বুঝি এটাকেই বললে?।

শান্তির ছায়াতলে যারা আসতে চাচ্ছে 
ভয়ের চোটে তারা ধর্মান্তরিত ভুলছে! 
যেন সত্তর হাজার ডিগ্রি আগুন জ্বেলে 
তুমি বসে আছ মানবজাহাঁ পুড়তে!।

এতই সহজ করলে কোরানের বাণী 
বঙ্কিম বোঝল না তোমার সেই জবানি! 
পথপায়িকেই কেবল বিপথগামী করছে 
বলো, তাদের স্থান আছে কোন রৌরবে?।

যেকথা শোনাতে বললে তা শোনাচ্ছি 
যা তুমি ইশারা করলে তা আমি লিখছি! 
অনেকে বললে বলুক আমাকে দোষী 
তোমার সৌন্দর্যে দেবে অসুন্দরে খামচি!।

আদেশ করবে তুমি যা ঘুমে ও জাগরণে 
পালন করব আমি তা অক্ষরে অক্ষরেই। 
তোমার সুন্দরের ধর্ম ও কর্মের রক্ষার্থে 
কথাজিহাদের বাণী লিখাও প্রভু আমৃতে্যু॥ 
১৮ ফাল্গুন, ১৪২৭—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম


১২৬ 
হে রব, 
তুমি তো জানো মনের খবর সব 
আমি আছি কোন মনোরথ; 
নিতে পারি তোমার শপথ 
তা হলে আমার গলদ?।

হে রব, 
আজীবন শুনে আসছি গল্পগপ 
মন বলবান তো সব বলবৎ; 
আমি হাঁটছি ধরে সেপথ 
তা হলে আমার গলদ?।

হে শান্তিকামী, 
আমি তো আগুন নিভাতে থামি 
তবে আমার জিন্দেগি উত্তপ্ত মরুভূমি! 
তবু হয়নি গামী-বিপথ—
তা হলে আমার গলদ?।

বন্ধু হে, 
আর কত রাখবে বন্দি নিঃস্বকরে? 
এবার তবে খুলে দাও-না বন্ধন; 
অভাবের দরদ ভুলি কিছুক্ষণ 
অভাব দূরি হোক সারাক্ষণ॥

বন্ধু তবে, 
ফরিয়াদ মাত্র এতটু তোমার কাছে 
নিজের জন্য করি না হা-হুতাশন; 
হাঁ, তাদের জন্যেই প্রার্থন 
অভাব দূরি হোক সারাক্ষণ॥


দ্বন্দ্ববাদের যে, 
মনমানসিকতা মন্দ বলে 
চার পাশ দোষে দোষী হবে তা হলে? 
আর চাই নে তবে কৈফিয়ত—
তা হলে আমার গলদ॥ 
১৯ ফাল্গুন, ১৪২৭—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম 

১২৭ 
প্রভু! 
বুঝে আসে না মোটেও 
দুনিয়ার এ নিয়মনীতি কিছু, 
যে তোমাকে করে না স্মরণ ভুলেও 
তারে তুমি করো কত উঁচু!।

তবু! 
বোঝার গভীরে নেমেও 
পারি নে বুঝতে একটুকিছু, 
যে তোমার মালা জপে ঘুমেও 
তারে তুমি রাখো এত নিচু!।

না না, 
এতেও কোনো অভিযোগ নেই 
হাঁ হাঁ, 
জানতে বড়ই ইচ্ছে করে; 
তোমার রশি ধরে আছে পিছু?
তারে তুমি রাখো এত নিচু!।

মন? 
মন আমার হলেও 
মনের মালিক হলে মাত্র তুমি, 
দুনিয়ার কাছে লুকাতে পারি সবটুকু 
তোমার কাছে করব বোকামি!।

ধন? 
ধন তোমার—তাতে ভুলেও 
অধিকার খাটাতে পারি না আমি, 
তুমি যারে খুশি তারে দিয়ে দাও 
অসন্তুষ্টি না আমার—না আমি॥

এবার শুনি? 
অসুবিধায় আমার মতো না যারা 
আরও বেকায়দায়? 
বাইরের সৌন্দর্য দেখি আমরা! 
হাঁ, অন্তরে পিছে বলে আছে কিছু—
তারে তুমি রাখো এত নিচু?। 
২০ ফাল্গুন, ১৪২৭—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম 

১২৮ 
ভাগ্যগুণে ভাগ্যদোষে 
ঘটবে সকল কিছু! 
এই কথাকে মাথায় নিয়ে 
আছি ভাগ্যের পিছু!

হা করে সব বসে আছি 
ভাগ্যে দেওয়া খাওয়া খাচ্ছি! 
কাজকর্ম দরকার কীসের 
যেমনে চলে চলুক নিচু! 
ভাগ্যগুণে ভাগ্যদোষে 
ঘটবে সকল কিছু॥

আরে আরে খাইছি হুঁচোট 
অন্ধসেজে হাঁটতে পারি! 
দোষ কেন এ আমার হবে 
ভাগ্যে দিলো মাথায় বারি!

এটাও ভাগ্য ওটাও ভাগ্যি 
দোষ কিছু না আমার আমি! 
এই জাতি কি মানুষ হবে 
ভাগ্যগানে থাকলে উঁচু? 
ভাগ্যগুণে ভাগ্যদোষে 
ঘটবে সকল কিছু॥ 
২১ ফাল্গুন, ১৪২৭—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম 

১২৯ 
কে তুমি আমাকে 
জাগালে ঘুমের থেকে 
মুসাফির পথ ভুলে? 
এই বাংলার নদীর কূলে। 


ছিলাম কী নিদ্রাসুখে 
চিন্তার বোঝা বাড়ালে ডেকে, 
অধম আমি জন্মি ভূতলে—
এই বাংলার নদীর কূলে॥

এখানে কত সৃষ্টিকারকেরা 
সৃষ্টি করে হলে মহান স্রষ্টা, 
আমি যেতে পারি মশাল জ্বেলে? 
এই বাংলার নদীর কূলে?।

কী ভূত চাপালে বুকে 
সরালে আরও বসে চেপে! 
না, হটবে না সে পিছে—
তবু মিনতি করি কী যে। 


দূর দূর করে তাড়ালে 
যায় কিছুটা দূরে সরে, 
আপদ দেখি আবার ঘাড়ে! 
তবু মিনতি করি কী যে॥

ওরে যা, সংসারের যা ক্ষতি 
বিরক্ত আর কত হবে বধূটি? 
মধুটি জড়ালে কী বধূর আঁচলে! 
এই বাংলার নদীর কূলে॥ 
২২ ফাল্গুন, ১৪২৭—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম


১৩০ 
ধন্য মা ধন্য 
জন্মেছি এজন্য 
তোমার আঁচলে 
বঙ্গভূমির কোলে। 
পূর্ণ তা পূর্ণ 
অপরূপরূপে সম্পূর্ণ 
পেয়েছি আলো ঝলমলে 
বঙ্গভূমির কোলে॥

পুকুরডোবা জলজলজ 
নদনদী ও বনবনজ, 
হাওয়াবাতাস যা বহালে 
পুণ্য হাঁ পুণ্য 
অনন্য এ ভূতলে 
বঙ্গভূমির কোলে। 
ধন্য মা ধন্য 
জন্মেছি এজন্য 
তোমার আঁচলে॥

এ-কর্ণফুলী হতে 
ও-কর্ণঝরা পর্যন্তে 
দেখে দেখে অপূর্বতা 
ভরবে না মন ভরবে না। 
জনম ও জনমে 
হাজারো জনমে 
এলে ও গেলে কিবা 
ভরবে না মন ভরবে না॥

শ্রেণিবিন্যাস গাছগাছালি 
সুশীতল ছায়ানিরালি, 
শ্যামলিমা শ্যামলে 
বর্ণ বাঃ বর্ণ 
কী সুবর্ণ মাটি বিছালে 
বঙ্গভূমির কোলে। 
ধন্য মা ধন্য 
জন্মেছি এজন্য 
তোমার আঁচলে॥ 
২৩ ফাল্গুন, ১৪২৭—ডি সি রোড, চট্টগ্রাম 

Comments

    Please login to post comment. Login