নীলুর ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে হঠাত একটি ম্যাসেজ এলো — প্রেরক অচেনা, তার প্রোফাইল পিকটিও অচেনা। সেই ভুয়া অ্যাকাউন্টের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক রহস্যময় মানুষ। কৌতূহলের টানে নীলু সেই অপরিচিত মানুষটিকে চেনার চেষ্টা করে। কারণ লোকটি কথার মায়াজালে ছোটো ছোটো চমকের টোপ ফেলে নীলুকে আরো বেশি কৌতুহলী করে তোলে।
লোকটির নীলুর জন্মতারিখ জানার কথা না। কিন্তু ঠিকই জন্মদিনে নীলুকে শুভেচ্ছা জানানো থেকে শুরু করে চমকে দেয়া উপহার পাঠায়। — সব কিছুই আসতে লাগল সেই রহস্যময় মানুষের কাছ থেকে। নীলুর ব্যক্তিগত সব তথ্য তার নখদর্পণে। একের পর এক চমকের রহস্যজালে নীলু ধীরে ধীরে লোকটির সাথে একটা প্রেমের সম্পর্কে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে।
কিন্তু গল্পের শেষে নীলু আবিষ্কার করে— সাবেত নামের লোকটি আসলে মানসিকভাবে একজন বিকারগ্রস্ত ভয়ঙ্কর মানুষ। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। নীলুর বিপদ থেকে বেরিয়ে আসার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
বিখ্যাত ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদের "দেবী" উপন্যাস অবলম্বনে অনম বিশ্বাসের "দেবী" সিনেমার গল্পাংশ এটি।
এখানে সাবেত হলো সেই ফিকশানাল একজন স্টকার যার চরিত্রে ইরেশ জাকের এবং নীলু চরিত্রে শবনম ফারিয়া অভিনয় করেন।
এবার স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় একটু যাওয়া যাক, পেছনে।
১৯৮৯ সালের ক্যালিফোর্নিয়া শহর। রেবেকা শেফার তখন একজন জনপ্রিয় মডেল এবং টেলিভিশন অভিনেত্রী, বয়স মাত্র একুশ।
ঠিকানা জোগাড় করে একদিন ১৯ বছর বয়সী এক পাগলাটে ভক্ত, রবার্ট জন বার্দো রেবেকার বাড়িতে উদয় হলো। রেবেকা সৌজন্যের খাতিরে বার্দোকে দেখা দিলেন এবং শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় জানালেন। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরেই বার্দো ফিরে আসে রেবেকার কাছে। দরজা খুলতেই বার্দো সোজা পিস্তল তাক করে রেবেকার বুক বরাবর গুলি করল। ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এই হত্যাকান্ডের প্রায় এক বছর আগে থেকে বার্দো চেষ্টা করে যাচ্ছিলো রেবেকার সাথে যোগাযোগ করার জন্য। "মাই সিস্টার স্যাম" সিরিজের সেটে গিয়েও সে একবার হাজির হয়, কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীদের কারণে ব্যর্থ হয়। পরে "ক্লাস স্ট্রাগল ইন বেভার্লি হিলস" সিনেমায় রেবেকাকে একটি রোমান্টিক দৃশ্যে সিনেমার পুরুষ চরিত্রের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে দেখে বার্দো মেনে নিতে পারেনি এবং সিদ্ধান্ত নেয় — রেবেকা-কে চরম শাস্তি দেয়ার। পরিণতিতে বার্দোর হাতে রেবেকার মৃত্যু ঘটে।
সেসময় ঘটনাটি আমেরিকান মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। পরের বছর, ১৯৯০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া আমেরিকার প্রথম অ্যান্টি-স্টকিং আইন পাস করে। বর্তমানে এই আইন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্যেই কার্যকর।
এবার আরেকটু পেছনে যাই, ১৯৮৪-৮৫ সালে।
মেক্সিকান-আমেরিকান রিচার্ড রামিরেজ ছিলেন একজন সিরিয়াল কিলার। ১৯৮৫ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত সে কমপক্ষে চৌদ্দটি হত্যা, দুই ডজনেরও বেশি নির্যাতন, ধর্ষণ এবং ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছিলো। রামিরেজ এসব ঘটনা ঘটাতো রাতের অন্ধকারে। তাই মিডিয়া তাকে সাড়া জাগানো নাম দিয়েছিল — "নাইট স্টকার"। আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরে ক্যান্সারাক্রান্ত হয়ে মারা যান।
রিচার্ড রামিরেজকে নিয়ে মেগান গ্রিফিথসের তৈরি "দ্য নাইট স্টকার" চলচ্চিত্রটি ২০১৬ সালে আমেরিকায় মুক্তি পায়।
মানসিক বিকৃতি, দুষ্কৃতি, সিরিয়াল কিলার — এইসব ধূসর আলোচনা থেকে সরে এসে একটু সংগীতের দিকে মনোযোগ দেয়া যাক।
১৯৮৩ সালে রক ব্যান্ড "দ্য পুলিশ"-এর অ্যালবাম "সিনক্রোনিসিটি" প্রকাশিত হয়। সেই অ্যালবামে ব্রিটিশ শিল্পী স্টিং-এর কথা ও সুরে "এভরি ব্রেথ ইউ টেক" গানটি সেসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
গানের কথাগুলো ছিল এরকম —
"তুমি যতবার শ্বাস নাও, যতবার নড়াচড়া করো, যতবার সম্পর্ক ভাঙো, যতবার পদক্ষেপ ফেলো — আমি তোমাকে দেখছি।"
ভাবুন তো — বাস্তবে যদি কেউ আপনার অনুমতি ছাড়াই সারাক্ষণ আপনাকে অনুসরণ করত, কেমন লাগত?
এটাই একজন স্টকারের বৈশিষ্ট্য।
এবার একটু দেশের মাটিতে ফিরে আসি।
২০১৬ সালে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার একজন স্টকারের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ছুরিকাঘাতে মারাত্মক আহত হয়ে চার দিন পর ২৪ আগস্ট হাসপাতালে মারা যায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০১৫ সালেই ৩৬২ জন নারী স্টকিংয়ের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২২ জন হত্যার শিকার হন বা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। যদিও স্টকিং এর কারণে কত দুর্ঘটনা, মৃত্যু বা অপমৃত্যু বাংলাদেশে ঘটে তার ঠিক সঠিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশে নাই।
স্টকিং কী?
স্টকিং হলো কোনো ব্যক্তিকে অবাঞ্ছিত মনোযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগের মাধ্যমে ক্রমাগত হয়রান করার মতো কাজ, যার ফলে শারীরিক আঘাত বা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। স্টকারের কারণে অনেক সময় ভিকটিম তার চাকরি হারায়, ব্যক্তিগত সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্টকারের বৈশিষ্ট্য কী?
স্টকার টার্গেট ব্যক্তির সাথে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। ঘন ঘন ফোন করা, সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক ম্যাসেজ পাঠানো, এমনকি চিঠি বা উপহার পাঠানোর মাধ্যমে ভিকটিমকে হয়রান করে। এতে কাজ না হলে গোপনে লক্ষ্যব্যক্তিকে অনুসরণ করে। এমনকি ভিকটিমের বাড়ি বা কর্মক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে হাজির হয়ে যায়।
স্টকিং কি কোনো মানসিক রোগ?
সাধারণত ব্যক্তিত্বের বিকৃতি বা অস্বাস্থ্যকর মানসিকতাই স্টকারদের ক্ষতিকর আচরণের মূল কারণ। স্টকাররা মানুষের সাথে স্বাভাবিক যোগাযোগ ও মেলামেশায় অদক্ষ হয়ে থাকে। তারা বুদ্ধিমান এবং ভিকটিমকে স্টক করার পরিকল্পনা সযত্নে করে। স্টকিংকে মানসিক রোগ নয়, বরং এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর মানসিক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কেন মানুষ স্টকার হয়?
২০০৯ সালে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জাস্টিসের গবেষক ক্যাট্রিনা বাউম ৩৪,১৬,৪৬০ জন স্টকিংয়ের শিকার ব্যক্তির উপর একটি জরিপ পরিচালনা করেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ মনে করেন তাদের স্টকার প্রতিশোধ ও ঘৃণার কারণে এটি করেছে। ৩২.৯ শতাংশ বলেছেন লক্ষ্যব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। আর ২৩.৪ শতাংশ মনে করেছেন মানসিক অস্থিরতাই এর পেছনে কাজ করেছে।
স্টকাররা সাধারণত হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রমে ভোগে না, তবে তাদের মধ্যে বিষণ্নতা, মাদকাসক্তির প্রভাব বা ব্যক্তিত্বের বিকৃতির লক্ষণ দেখা যায়।
স্টকারের পাঁচটি শ্রেণি
১৯৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়ান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্টকিং বিশেষজ্ঞ ড. পল মুলেন তার সহকর্মীদের নিয়ে ১৪৫ জন স্টকার রোগীর আচরণ বিশ্লেষণ করে স্টকিংকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন:
১. প্রত্যাখ্যাত স্টকার (Rejected)
সাধারণত আকস্মিক বিচ্ছেদের পর এই ধরনের আচরণ শুরু হয়। প্রেমিক বা প্রেমিকা, অভিভাবক, সহকর্মী বা বন্ধুর সাথে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াই এর মূল কারণ। সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার গোপন বাসনা থেকে এরা ভিকটিমকে স্টক করে। চেষ্টা ব্যর্থ হলে প্রতিশোধ নেওয়ার পথে হাঁটে।
২. ঘনিষ্ঠতা খোঁজা স্টকার (Seeking Intimacy)
এই ধরনের স্টকারের মনে গভীরভাবে গেঁথে থাকে যে ভিকটিম তাকে ভালোবাসে। অথচ বাস্তবে ভিকটিম তাকে চেনেও না। সাধারণত তারকা ও গ্ল্যামার জগতের মানুষেরা এই ধরনের স্টকারের শিকার হন। ২০০৯ সালে বিখ্যাত গায়িকা শানিয়া টোয়েন এমনই এক স্টকারের শিকার হয়েছিলেন — অচেনা স্টকার তাকে অসংখ্য প্রেমপত্র পাঠাত এবং বিনা নিমন্ত্রণে তার দাদির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পর্যন্ত হাজির হয়েছিল।
৩. অযোগ্য প্রার্থী স্টকার (Incompetent Suitor)
ড. মুলেনের মতে এরা ঘনিষ্ঠতা খোঁজা স্টকারদের মতোই, তবে সামাজিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে পড়া এবং সীমিত বুদ্ধিসম্পন্ন। ২০০৪ সালে ব্রিটিশ গায়িকা ব্রিটনি স্পিয়ার্স এমনই এক স্টকারের শিকার হন। সে অসংখ্য প্রেমপত্র, ইমেইল এবং নিজের ছবি পাঠানোর পাশাপাশি সরাসরি স্বীকার করত যে সে ব্রিটনিকে স্টক করছে।
৪. প্রতিশোধপরায়ণ স্টকার (Resentful)
এরা সম্পর্কের জন্য নয়, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ভিকটিমকে অনুসরণ করে। তাদের বিশ্বাস — তাদের সাথে অন্যায় হয়েছে এবং ভিকটিমকে সেই শাস্তি পেতে হবে। শৈশবে কড়া শাসনে বড় হওয়া এই ধরনের স্টকারদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ব্রিটিশ শিল্পী জন লেননের কুখ্যাত হত্যাকারী মার্ক চ্যাপম্যান এই ধরনের স্টকারের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
৫. শিকারি স্টকার (Predatory)
এই ধরনের স্টকাররা ভিকটিমের সাথে কোনো সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী নয়, বরং কোনো ধরনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ড. মুলেনের মতে এরা ভিকটিমকে শারীরিকভাবে, বিশেষ করে যৌনভাবে নির্যাতন করে। প্যারাফিলিয়া নামক যৌন মানসিক বিকৃতি এই ধরনের স্টকারের মূল কারণ।
এবার মিলিয়ে দেখুন — "দেবী" সিনেমায় নিলু'র প্রেমিকরূপী স্টকার আহমেদ সাবেত কোন ধরনের স্টকারের বৈশিষ্ট্য বহন করছে? সাবেত এখানে শেষ ধরণের শিকারী স্টকারের পর্যায়ে পড়ে।
আপনি কি স্টকিংয়ের শিকার?
নিচের প্রশ্নগুলোর সাথে আপনার পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখুন:
১. সম্প্রতি কারো আচরণ কি আপনাকে ভয় পাইয়েছে?
২. ওই ব্যক্তি কি কখনো আপনাকে নির্যাতন করেছে?
৩. ওই ব্যক্তি কি কখনো আপনার কোনো সম্পদ নষ্ট করেছে?
৪. সে কি আপনার বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে অবাঞ্ছিতভাবে উপস্থিত হয়?
৫. সে কি আপনার বাড়ি বা কর্মক্ষেত্রের আশপাশে ঘোরাঘুরি করে?
৬. সে কি কখনো আপনাকে শারীরিক বা যৌন নির্যাতন করার চেষ্টা করেছে?
স্টকিংয়ের শিকার হলে কী করবেন?
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ব্রিটেনে ১০ লাখেরও বেশি নারী-পুরুষ স্টকিংয়ের শিকার হন, যাদের বেশিরভাগই নারী। বাংলাদেশে এ বিষয়ে যদিও সঠিক পরিসংখ্যান নাই তবুও প্রতিদিনের পত্রিকা আর অনলাইন সংবাদমাধ্যম খুললেই কিশোরী, তরুণীদের ইভটিজিং ও যৌন হয়রানির ঘটনা অহরহ চোখে পড়ে — যা থেকে এর ভয়াবহতা সহজেই অনুমান করা যায়।
যদি বুঝতে পারেন কেউ আপনাকে স্টক করছে, তাহলে যা করবেন:
১. পরিচিত কাউকে বিষয়টি জানান। স্টকাররা ভিকটিমের নীরবতার সুযোগ নেয়। ঘটনা ফাঁস হয়ে যাচ্ছে বুঝলে সে পিছিয়ে যায়।
২. স্টকারের যোগাযোগের চেষ্টা বা হয়রানির ঘটনাগুলোর রেকর্ড রাখুন। প্রয়োজনে পুলিশের কাছে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে।
৩. স্টকিংয়ের বেশিরভাগ ঘটনাই এখন ভার্চুয়াল মাধ্যমে ঘটে। তাই সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখুন।
৪. সহপাঠী, পরিবার ও সহকর্মীদের জানান, যাতে সবাই মিলে একটি নিরাপত্তার বলয় তৈরি হয়।
৫. নিজেকে অনিরাপদ মনে হলে দেরি না করে পুলিশে অভিযোগ করুন। প্রয়োজনে ৯৯৯-এ ফোন করুন।
পাঠক আপনার মধ্যে নীলুর মত ভিক্টিম বা সাবেত এর মতো স্টকারের বৈশিষ্ট্যগুলো নেইতো?
নীলুর মতো ফাঁদে পড়ার আগেই সচেতন হন। সাবেত হলে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
স্টকিং আসলে কোনো ধরণের ভালোবাসার প্রকাশ নয় — বরং এটা এক অস্বাস্থ্যকর চর্চা এবং এক ধরণের অপরাধ।
সচেতনতাই আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
