❝চতর্ভূত বাজাচ্ছে শরীরে... ভাবাৎ❞ এ কী কোন অপূর্ব সঙ্গীত বাজছে দেহজুড়ে নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোন জগতে অস্তিত্বের সন্ধানে রত ঋষির মনোসংযোগ চুরি করার কৌশল খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে আছেন কবি?
মাটিকে স্পর্শ করে প্রবাহিত হয় যে জলধারা সেখানেই কি জ্বলছে তবে দেহধারী শিখা? সমন্বয়— গান বাজবে, হয়তো কোথাও আচমকাই থেমে যাবে সুর...
আমরা ছুটে চলেছি অদৃশ্য সেই সুরের পিছুপিছু কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই ছুটে চলা? মৃত্যুর ভয় নাকি নতুন করে জীবন প্রাপ্তির আনন্দ? সবকিছুকেই মেপে দেখবো অনুভবের নিক্তিতে।
❝অসময় বলেছিল—
সময়ে এসো, গিয়েছি... বলেছে অপেক্ষা!❞
সময় আর অসময়ের এই দ্বিমুখী দ্বন্দ্বের মাঝেই প্রতিভাত হয় একটি চক্র। যে চক্রটি সক্রিয় কিন্তু স্থির নয়। সীমা নেই আছে শুধু অনন্ত রহস্যের পথ এজন্যই হয়তো ❝সিঙ্গুলারিটি জ্যোৎস্নায় ফিরে যেতে চায়❞ কবি ঋজু রেজওয়ান।
ক্ষণিক পরেই চূর্ণ হয় বাসনা কেননা সম্মুখে নতুন প্রাচীর সামান্য অগ্রসর হলেই দেখা যায়— ❝পানকৌড়ির ঠোঁট দুটি ঘাসের ছায়ায়।❞ একের পর এক সাজানো নতুন ছক যেন ❝ মায়াবী রাতের পরে বিরহীর অপেক্ষায় মিহিমিহি শিশির❞ কোন।
প্রতিটি কবিতায়ই ভিন্ন অনুভব কিন্তু দৃশ্যের আড়ালে কোথাও না কোথাও প্রতিটি পঙক্তির সাথেই রয়েছে মানব জীবনের গভীর যোগাযোগ। রহস্যময় অরণ্যের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে আশ্চর্য ভ্রমে অস্তিত্বের আলো দৃশ্যমান হয়। এমনই ঘোরের ভিতর অভিজাত খেয়ালে হৃদয়ে আঘাত করে বিভিন্ন পঙক্তি। তাই হয়তো বলে উঠি—
"সেই ভালো! চেতনার সেই আলো— বিভূতির রঙে যত খনন করেছি, পানাম নগর! দেহের ভেতর, প্রত্নভূমি—"
মানবদেহ-ই কি তবে কবির ভাষায় জীবন্ত জাদুঘর? যেখানে রয়েছে ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ এমনকি আধ্যাত্মিক মুক্তির চূড়ান্ত পথ। এমন কবিতাই তো পড়তে চাই, যে কবিতা পড়ে অনুসন্ধান আর কল্পনার মিশ্রণে পাঠক হিসেবে আমি নিজেই নির্মাণ করে নেবো নতুন জগত। গ্রেট, এভাবে কতদূর যাওয়া যায় আসলে!
হাঁটছি তবে পথ ফুরাচ্ছে না, ঘোর কাটছে না, সময় নদীর স্রোতের মতো বহমান কিন্তু তার স্থায়ী চিহ্ন থেকে যাবে চেতনায়। ঋজু রেজওয়ান বহুমুখী— ভাষার বিচিত্রিতা, শব্দের প্রকৃতি, ইমেজের কোলাহলে এঁকেছেন ❝অলৌকিক ছায়া❞। তাইতো তিনি লৌকিক জগতের উর্ধ্বে বসে সন্ধান করছেন পরমাত্নার। যুক্তি আর বুদ্ধি যেখানে পরাজিত সেখানে বিশ্বাসই মুক্তির একমাত্র উপায়। তাই হয়তো কবি বলেছেন— "মেঘের পাটে রঙিন চাঁদায়— সাতটি সুতোয় সাড় বেঁধেছে, একিন করেছি..."
দারুণ ব্যাপার। সত্যি বলতে তার এই কবিতার জগতটা এমনভাবে নির্মিত যেখানে ভ্রমণই মুখ্য অর্থাৎ পাঠক হিসেবে এই ভ্রমণটা উপভোগ করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আবারও পাঠ করি— "রাতের আঁধার! উঁকিঝুঁকি দেয়, রঙিলা / যখনই ছড়িয়ে পড়ে... রজস্বলা, শলা; / সান্ধ্যশলার ভঙ্গির পথে... খুঁজি রহস্য!"
পরক্ষণেই জাগতিক সীমাবদ্ধতা ভুলে যাই, স্পষ্ট হয় মায়াবী রুপ। রহস্যের জট খুলতে খুলতে দাঁড়িয়ে আছি এখন চিত্রকল্পের ওপারে। ভারতীয় দর্শন, মহাজাগতিক জটিলতা, গাণিতিক বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের মতো আরও বহুবিধ বিষয়ের মিশ্রণেই ঋজু রেজওয়ান গেয়েছেন তার গান, আয়োজন করে এ সঙ্গীত শুনলাম।
সবশেষে অল্প কথায় সামান্য পাঠক হিসেবে এটুকুই বলতে পারি— মহাকালই নির্ণয় করবে বাংলা কবিতার ধারায় এ কাব্যের শিল্পসফলতা। আরও বিস্তারিত ভাবে আলাপ করতে পারলে অবশ্য ভালো লাগতো তবে সময়ের অভাবে সেটা পেরে উঠলাম না৷