রুশা আজ খুব ভোরেই বের হয়েছিল। মাথার ভেতর একরাশ তাড়া—দুজন রোগীকে দেখতে হবে, তারপর দ্রুত বাসা থেকে ব্যাগ নিয়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পৌঁছাতে হবে।
বাসা থেকে বের হবার আগেও রুশা তার প্রশিক্ষণের সময়সূচি দেখে নিল,ঠিক আছে কীনা। প্রশিক্ষণ পরিচালকের সর্বশেষ বার্তা দেখে সে নিশ্চিত হলো যে আজকে বিকেল পাঁচটার মধ্যেই তাকে পৌছাতে হবে।তার বাসা থেকে সেখানে যেতে দেড়-দু ঘন্টা লাগে। দুপুর গড়িয়ে তিনটা বাজতেই সে বেরিয়ে পড়ে। খাবার খাওয়ার সময় হয়নি—ভাবছিল, “পরে কোথাও কিছু খেয়ে নেবো।”
কিন্তু জীবন “পরে” বলে কিছু রাখে না সবসময়।
দুই ঘণ্টা বাসে ঠেলাঠেলি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রা—মানুষের ভিড়ে শরীর যেন নিজের অস্তিত্বটাই ভুলে যায়। তারপর আরও ত্রিশ মিনিট ভ্যানের পেছনে ঝুলে থাকা পথ। গন্তব্যে পৌঁছে রুশা একটুখানি হাঁফ ছাড়ল—“অবশেষে!”
কিন্তু সেই হাঁফটা বুকেই আটকে গেল। কেন্দ্রের প্রবেশপথে গার্ড বলল,
—“স্যার, আপনি আজ কেন এসেছেন? আপনাদের আসার কথা তো কাল।”
কথাটা যেন মাথার ভেতর বাজের মতো পড়ল।
“কাল?”
রুশা আবার ফোনটা বের করল। মেসেজটা খুলে দেখল। সে তো কয়েকবার পড়েছিল! নিশ্চিত হয়েছিল! তবুও—কীভাবে যেন সর্বশেষ মেসেজটা, সেখানে দেয়া সময়টা—সবকিছু উল্টে দিল।
হঠাৎ করেই নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা মানুষ মনে হতে লাগল।
“একটা ফোন দিতে পারতাম না? একবার নিশ্চিত হতে পারতাম না?”
চারপাশের সব শব্দ যেন দূরে সরে গেল। শুধু নিজের ভেতরের তিরস্কারগুলোই কাছে এসে বসলো।নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলো। সবচেয়ে লজ্জাজনক ছিল যে তাকে এত কষ্ট করে এসে একটি রাতের জন্য আবার ফিরে যেতেই হবে। নিজেকে সে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে -কি করে তার এত বড় ভুল হল?
কিন্তু ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই ছিল না। লজ্জা আর গ্লানি নিয়ে এক পা দুপা করে সে কেন্দ্র থেকে বের হয়। আবার সে ই ভ্যানে করে মোড়ে যাওয়া।
আবার সেই ধস্তাধস্তি করে বাসে ওঠা।
আবার সেই বাসের ভেতরের মানুষের ভিড়ে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আর গাদাগাদি মানুষের ভেতর নিজেকে হারিয়ে ফেলা।
এবার যাত্রাটা শুধু শরীরের ছিল না—মনেরও ছিল।
প্রতিটি ধাক্কায়, প্রতিটি ঝাঁকুনিতে রুশা নিজেকেই প্রশ্ন করছিল—
“আমি এমন করলাম কেন?”
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। আকাশ হঠাৎ কালো হয়ে এল।
বাস থেকে নেমে অটোরিকশায় উঠতেই বৃষ্টি নেমে গেল—ঝমঝম করে।
প্রচণ্ড বাতাস, বিদ্যুতের ঝলক, আর অঝোর বৃষ্টি।
অটোরিকশা থেকে নেমে রুশাকে দৌড়ে আশ্রয় নিতে হল একটা ছোট্ট ছাপড়ি দোকানের নিচে। প্রায় ত্রিশ মিনিট সে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল—ভিজতে ভিজতে, কাঁপতে কাঁপতে।
কাপড় ভিজে গেছে, ব্যাগ ভিজে গেছে, শরীর ঠান্ডায় কুঁকড়ে আসছে।
এই বৃষ্টির মধ্যে কোনো রিকশাও নেই।
অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে, বৃষ্টির ভেতরেই হাঁটতে শুরু করল সে।
প্রতিটি পা যেন কাদায় ডুবে যাচ্ছে, প্রতিটি মুহূর্ত যেন আরও ক্লান্ত করে দিচ্ছে তাকে। প্রতিটি পা ফেলছে আর ভাবছে “আজকের দিনটিই কেন এমন হলো?”
অবশেষে আত্মীয়ের বাড়িতে পৌঁছানো।
ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে আটটা।
ফ্রেশ হতে না হতেই হঠাৎ টের পেল—ক্ষুধা।
প্রচণ্ড, তীব্র, শরীর কাঁপিয়ে দেওয়া ক্ষুধা।
সকালে কিছু খাওয়া হয়নি।
দুপুর পেরিয়ে গেছে দৌড়ঝাঁপে।
এখন রাত।
কিন্তু ঘরে কোনো রান্না নেই।
রুশা একটুও না ভেবে নিজেই রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল।
শুকনো শুটকি, একটু আলু—এইটুকুই।
কিছুক্ষণ পর চুলার আগুনে তৈরি হল শুটকি ভর্তা আর আলুভাজি।
এক প্লেট ভাত নিয়ে বসলো সে।
প্রথম লোকমাটা মুখে দিতেই সে এক অবিশ্বাস্য স্বাদ পেল।
এত স্বাদ!
এত তৃপ্তি!
মনে হল, বহু বছর পর সে সত্যিকারের ভাত খাচ্ছে।
সারাদিনের ক্লান্তি, বৃষ্টি, ভিড়, ভুল—সব যেন সেই এক প্লেট ভাতের সাথে মিশে এক অদ্ভুত স্বাদ হয়ে উঠেছে।
খেতে খেতে হঠাৎ মনে হল—
“আজ তো আমার অন্য কোথাও থাকার কথা ছিল...”
কিন্তু সে আছে এখানে।
এই ভেজা কাপড়, এই ছোট্ট রান্নাঘর, এই এক প্লেট ভাতের সামনে।
জীবন কত সহজে সব হিসাব বদলে দেয়!
একটা ভুল, একটা মেসেজ—আর পুরো দিনটা অন্যরকম হয়ে গেল।
রুশা ধীরে ধীরে ভাত খেতে খেতে বুঝতে পারল—
জীবন আসলে গন্তব্যে পৌঁছানোর গল্প না,
জীবন হলো এইসব ভুল, বিড়ম্বনা আর হঠাৎ পাওয়া ছোট ছোট তৃপ্তির গল্প।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে।
আর ভেতরে—
এক প্লেট ভাতের মধ্যে গলে যাচ্ছে একদিনের সমস্ত বিড়ম্বনা।
84
View