হে বৈশাখ,
তুমি কি জানো—
তোমার আগমনে
আমার ভেতরে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে ওঠে?
যেন বহুদিন চাপা পড়ে থাকা কোনো শব্দ
হঠাৎ নিঃশ্বাস পায়।
আমি তোমায় দেখি—
রক্তিম ভোরের পর্দা সরিয়ে,
নতুন সূর্যের প্রথম স্পর্শে;
আর মনে হয়—
এই তো,
শুরু হলো আবার কিছু নতুন হওয়ার সম্ভাবনা।
কিন্তু আমি যখন তোমার ভিড়ে নামি, বৈশাখ,
তখন এক অদ্ভুত নীরবতা আমাকে ঘিরে ধরে—
চারদিকে রঙের বিস্ফোরণ,
শব্দের উল্লাস,
হাসির ভিড়,
আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি
নিজেকেই প্রশ্ন করি—
“এ কি সেই বৈশাখ—যাকে আমি এতদিন চিনি?”
আমি তো তোমাকে খুঁজেছিলাম
ভাষার ভেতরের গভীর মায়ায়,
মায়ের মুখের প্রথম ডাকের মতো স্নিগ্ধতায়,
আর আত্মার ভেতরে জমে থাকা
নতুন হওয়ার নীরব প্রতিজ্ঞায়।
কিন্তু তুমি কি শুধু এই কোলাহল, বৈশাখ?
এই সাজ, এই শব্দ, এই দৃষ্টির প্রতিযোগিতা?
আমি দাঁড়িয়ে থাকি—
ভিড়ের মাঝখানে, অথচ ভিড়ের বাইরে।
মনে হয়, আমি যেন কোনো আলাদা সময়ের মানুষ,
যে এখনও শব্দের চেয়ে নীরবতাকে বেশি বিশ্বাস করে।
হে নববর্ষ,
তুমি কি আমাকে ভুল বুঝছো?
নাকি আমিই তোমাকে
আমার মতো করে দেখতে চাইছি?
আমি চাই—
তোমার আনন্দ হোক নদীর মতো,
যার শব্দ আছে, কিন্তু চিৎকার নেই;
যার গভীরতা আছে, কিন্তু প্রদর্শন নেই।
আমি চাই না—
আমার হাসি কারো চোখে বন্দী হোক,
আমার আনন্দ কারো দৃষ্টির প্রতিযোগিতা হোক।
আমি চাই,
আমার আনন্দ হোক আমার ভেতরের প্রার্থনা।
হে বৈশাখ,
আমি কি খুব একা তোমার ভিড়ে?
নাকি এই একাকীত্বই আমাকে সত্যের দিকে টানে?
তুমি যদি সত্যিই নতুন হও—
তবে আমাকে শেখাও
নতুন হওয়া মানে শুধু রঙ নয়,
বরং ভেতরের ধুলো ঝেড়ে ফেলা।
আমি চাই—
তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হোক
নীরব অথচ গভীর,
যেখানে ভাষা কথা বলে না,
অথচ অনুভূতি সব বুঝে যায়।
হে বৈশাখ,
আমি তোমাকে খুঁজতে চাই না কোলাহলে,
আমি তোমাকে খুঁজে নিতে চাই
আমার নিজের নীরব আকাশে।
তুমি যদি পারো—
তবে এসো আমার মতো হয়ে,
আর যদি না পারো—
তবে আমাকে এমন এক হৃদয় দাও,
যাতে আমি তোমাকে
আমার ভেতরেই ধারণ করতে পারি।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমি জেনেছি —
নতুন বছর মানে শুধু দিন বদল নয়,
বরং নিজের ভেতর নতুন করে ফিরে আসা।
রঙিন কিছুও আমি ভালোবাসি, বৈশাখ—
কিন্তু সেই রঙে নেই কোনো দৃষ্টির বন্দীশালা,
নেই কারো চোখের জন্য সাজানো অভিনয়।
আমি ভালোবাসি আকাশের রঙ বদল,
গোধূলির নরম কমলা ছায়া,
বৃষ্টির পরে ভেজা পাতার সবুজ দীপ্তি—
যেখানে রঙ কথা বলে নীরবে,
কিন্তু কাউকে দেখানোর তাড়না নেই।
আমি ভালোবাসি নতুন বছরের আলো,
নতুন সূচনার উষ্ণতা,
ভেতরে ভেতরে জেগে ওঠা সম্ভাবনার গান—
যা আমার নিজের সাথেই বাজে,
অন্যের করতালির অপেক্ষা করে না।
হে বৈশাখ,
তোমার রঙ চাই আমি—
কিন্তু তা হোক অনুভবের জন্য,
প্রদর্শনের জন্য নয়;
হোক আত্মার শান্তির জন্য,
দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নয়।
আমি চাই—
আমার আনন্দ হোক এমন এক রঙধনু,
যা ভেতর থেকে ওঠে,
আর ভেতরেই মিলিয়ে যায়;
যার আলো কাউকে দেখাতে হয় না,
শুধু অনুভব করতে হয়।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমি বুঝেছি—
সৌন্দর্য তখনই বিশুদ্ধ,
যখন তা দেখানোর জন্য নয়,
বরং বাঁচার জন্য হয়।