শুক্রবার।
অফিসিয়ালি ছুটির দিন। অথচ এমন এক সকাল, যেদিন ছুটির অনুভূতিটাই অপরাধ মনে হয়। কারণ খবর এসেছে—ডিরেক্টর স্যার আসবেন। সেন্টার ভিজিট করবেন। ফলে “আজ না গেলেও চলবে” ধরনের আরামদায়ক চিন্তাগুলো ভোরেই বাতিল হয়ে গেছে।
দুপুর গড়ানোর আগেই রেডি হয়ে বের হলাম।
বাসার দরজা খুলে করিডোরে পা রাখতেই একটা নিস্তব্ধতা টের পেলাম। ছুটির দিনের বিল্ডিংগুলো এমনই হয়—অস্বাভাবিক শান্ত। দূরে কোথাও প্রেসার কুকারের শব্দ, কারও টিভির মৃদু আওয়াজ, আর ফাঁকা করিডোরে নিজের স্যান্ডেলের শব্দ পর্যন্ত শোনা যায়।
লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে বাটনে চাপ দিলাম।
ঠিক তখনই পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খোলার শব্দ পেলাম। বুঝলাম, কেউ একজন বের হচ্ছেন। হয়তো উনিও নামবেন।
লিফট এসে গেল। দরজা খুলল। আমি ভেতরে ঢুকে এক সেকেন্ড থামলাম। মাথার ভেতর খুব ছোট্ট একটা দ্বিধা—আমি কি চলে যাব? নাকি অপেক্ষা করব?
মুহূর্তের মধ্যেই নিজের কাছেই ব্যাপারটা খারাপ লাগল। মুখ ফসকে বলে ফেললাম—
—ভাই, যাবেন নাকি?
হাত দিয়ে লিফটের দরজাটা আটকে ধরলাম।
উনি দ্রুত এগিয়ে এলেন। ঢুকে হাসিমুখে বললেন—
—কেমন আছেন?
—আলহামদুলিল্লাহ। আপনি?
লিফট নামতে শুরু করেছে। ছোট্ট জায়গার ভেতর পরিচিত ভদ্রতার কথাবার্তা।
—ছুটির দিনেও অফিস যাচ্ছেন নাকি?
আমি হালকা হেসে বললাম—
—ডিরেক্টর স্যার আসবেন তো… তাই আরকি।
তারপর উনি জিজ্ঞেস করলেন—
—বাবুরা ভালো আছে?
আমি বললাম—
—জি… ওরা রূপনগর গেছে।
—রূপনগর?
—জ্বি, ওদের নানাবাড়ি।
কথাগুলো মুখে হচ্ছিল, কিন্তু চোখ ছিল মেঝের দিকে। কেন জানি না, আমি মানুষের সাথে কথা বলার সময় অনেক সময় নিচের দিকে তাকিয়ে থাকি। যেন শব্দগুলো চোখ দিয়ে না, শুধু মুখ দিয়েই বের হয়।
লিফট নিচে পৌঁছে গেল।
দরজা খোলার পর আমি যেন কথার মধ্যেই হাঁটতে শুরু করলাম। সামনের দিকে এগোচ্ছি, কথা বলছি, অথচ আশপাশের কিছুই খেয়াল করছি না।
হঠাৎ মনে হল, পাশের ভাইটা আর সাড়া দিচ্ছেন না।
তবু হাঁটছিলাম।
ঠিক তখনই কানে এল একটা শব্দ—
—এই…
প্রথমবার গুরুত্ব দিলাম না। মনে হল অন্য কাউকে ডাকছে।
আরেকটু পরে আবার—
—এই!
এবার পেছন ফিরে তাকালাম।
তারপর যেন বুকের ভেতর বড়সড় একটি ধাক্কা খেলাম।
লিফটের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন অতিরিক্ত পরিচালক স্যার।
তিনি সম্ভবত পুরো সময়টাই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর আমি—আমি তাকে দেখিইনি। সালাম দিইনি। উল্টো তিনি ডাকছেন, আর আমি নির্বিকারভাবে সামনে হাঁটছি।
মুহূর্তের মধ্যে মাথার ভেতর সব শুকিয়ে গেল।
আমি তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে বললাম—
—সরি স্যার… আমি আসলে…
স্যার কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন—
—তুমি কি আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটো?
আমি আরও ছোট হয়ে গেলাম।
—স্যার, সত্যিই বুঝতে পারিনি…
কথাগুলো বলতে বলতে নিজের কণ্ঠও কেমন দুর্বল শোনাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ তিনি তাকিয়ে রইলেন। তারপর গলার স্বর একটু নরম হলো।
—ঠিক আছে। আমি বুঝতে পেরেছি ভুল করেই এটা হয়েছে। বুঝতে পারলে তো করতে না।
আমি দ্রুত বললাম—
—স্যার, ডিরেক্টর স্যার আসবেন… তাই একটু তাড়াহুড়োয় ছিলাম…
তিনি শুধু বললেন—
—আচ্ছা, আসো।
তারপর হাঁটতে শুরু করলেন।
ঘটনাটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। খুব ছোট্ট একটা ব্যাপার। পৃথিবীর হিসেবে তুচ্ছ।
কিন্তু আমার ভেতরে সেটা শেষ হয়নি।
অফিসের পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আছে যেগুলো বাইরে থেকে একদম সাধারণ, অথচ ভেতরে অদ্ভুত একটা দাগ কেটে যায়।
কারণ সেখানে ভুলের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় নিজের ভদ্রতা হারিয়ে ফেলার ভয়।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো—
আমি সেদিন সত্যিই আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিলাম না।
আমি শুধু নিজের ভেতরের ভিড়ের মধ্যে হাঁটছিলাম।