মানুষ সবসময় যা দেখে, তা-ই কি সত্যি দেখে?
কখনো কখনো আমরা চোখ খুলে হেঁটে যাই, কথা বলি, উত্তর দিই, এমনকি হাসিও—তবু আশপাশের অনেক কিছু আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। কারণ মানুষের চোখের চেয়েও ব্যস্ত তার ভেতরের পৃথিবী।
সেদিন শুক্রবার ছিল। ছুটির দিন। অথচ আমার মাথার ভেতর ছুটির কোনো আরাম ছিল না। অফিসে যেতে হবে। ডিরেক্টর স্যার আসবেন। দায়িত্ব, প্রস্তুতি, সময়মতো পৌঁছানো—এসব ছোট ছোট চাপ অদৃশ্যভাবে মনকে দখল করে রেখেছিল।
আমি বাসা থেকে বের হলাম।
লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পাশের ফ্ল্যাটের একজন বের হলেন। আমি ভদ্রতা করে লিফট আটকে রাখলাম। তারপর স্বাভাবিক কথাবার্তা—কেমন আছেন, অফিস যাচ্ছেন, বাবুরা কোথায়…
সবকিছু খুব সাধারণ।
কিন্তু এখন মনে হয়, সেই মুহূর্তে আমি পুরোপুরি সেখানে ছিলাম না। আমার শরীর লিফটে ছিল, মুখ কথোপকথনে ছিল, কিন্তু মন অন্য কোথাও ছুটছিল। হয়তো অফিসে। হয়তো দায়িত্বের চাপে। হয়তো এমন কিছু অদৃশ্য ভাবনায়, যেগুলোর নামও আমি জানি না।
এই অবস্থাটা অদ্ভুত।
মানুষ তখন সামনে থাকা মানুষকেও পুরোপুরি দেখে না। শব্দ শুনেও শোনে না। চোখ খোলা রেখেও অনেক কিছু এড়িয়ে যায়।
লিফট নিচে নামল। আমি হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিলাম। তারপর কেউ ডাকল—
“এই…”
আমি শুনলাম, কিন্তু নিজের জন্য শুনলাম না।
আবার ডাকল।
পেছনে ফিরে দেখলাম, আমার অতিরিক্ত পরিচালক স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি সম্ভবত পুরো সময়টাই সেখানে ছিলেন। অথচ আমি তাকে দেখিনি। সালাম দিইনি। এমনকি তিনি ডাকছেন, সেটাও বুঝিনি।
মুহূর্তের মধ্যে আমার ভেতরে যে অনুভূতিটা তৈরি হয়েছিল, সেটা শুধু ভয় না। সেটা ছিল নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাওয়ার অনুভূতি।
কারণ আমাদের সমাজে কিছু অলিখিত নিয়ম আছে।
কাউকে সম্মান দেখানো শুধু আচরণ নয়, নিজের চরিত্রেরও প্রকাশ। আর আমি হঠাৎ মনে করলাম, আমি যেন সেই পরীক্ষায় ফেল করেছি।
যদিও ঘটনাটা ছিল নিছক অমনোযোগ।
স্যার পরে বলেছিলেন,
“বুঝতে পারলে তো করতে না।”
এই কথাটা আমাকে অদ্ভুতভাবে নাড়া দিয়েছিল।
কারণ সত্যিই তো—মানুষের অধিকাংশ ভুল ইচ্ছাকৃত নয়। তবু কিছু ভুল আমাদের দীর্ঘ সময় তাড়া করে বেড়ায়। বাইরে থেকে সেগুলো খুব ছোট দেখায়, কিন্তু ভেতরে তারা একধরনের প্রতিধ্বনি তৈরি করে।
আমি পরে ভাবছিলাম, আমরা আসলে কতবার এমন করি?
কতবার কেউ আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, আর আমরা খেয়ালই করি না?
কতবার কেউ ডাক দেয়, আর আমরা নিজের চিন্তার শব্দে সেটাকে হারিয়ে ফেলি?
কতবার আমরা বাস্তবের চেয়ে নিজের মাথার ভেতরের ভিড়ের মধ্যে বেশি হাঁটি?
হয়তো আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় ক্লান্তি এখানেই—
সে কখনো পুরোপুরি কোনো জায়গায় উপস্থিত থাকে না।
তার শরীর এক জায়গায়, মন আরেক জায়গায়, আর চিন্তা আরও দূরে।
তাই সেদিন আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিলাম না।
আমি শুধু নিজের ভেতরের অগোছালো শব্দগুলোর মধ্যে হাঁটছিলাম।