Posts

প্রবন্ধ

মাটির উর্বরতা সংকট: কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

June 2, 2026

মোছা: মোকাররমা শিল্পী

94
View

ভূমিকা

মানবসভ্যতার বিকাশে মাটির ভূমিকা অপরিসীম। কৃষির মূল ভিত্তি হলো উর্বর মাটি। একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য অনেকাংশে নির্ভর করে তার মৃত্তিকার স্বাস্থ্য ও উর্বরতার ওপর। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে একই জমিতে বারবার ফসল উৎপাদনের ফলে মাটির ওপর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে মাটির জৈব পদার্থ, পুষ্টি উপাদান এবং জীববৈচিত্র্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির উর্বরতা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং নিবিড় কৃষি অঞ্চলে মাটির অবক্ষয় প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফসলের গুণগত মান কমছে এবং কৃষকের লাভজনকতা হ্রাস পাচ্ছে।

মাটির উর্বরতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মাটি শুধু উদ্ভিদের আশ্রয়স্থল নয়; এটি উদ্ভিদের খাদ্য, পানি ও বায়ুর উৎস। সুস্থ মাটি উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে, পানি ধারণ করে, অণুজীবের বাসস্থান সৃষ্টি করে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি হেক্টরে ৬ টন ধান উৎপাদনের জন্য ধানগাছ মাটি থেকে প্রায় ১০৮ কেজি নাইট্রোজেন, ১৮ কেজি ফসফরাস, ১২০ কেজি পটাশিয়াম এবং ১১ কেজি সালফার গ্রহণ করে। দীর্ঘদিন ধরে এই পুষ্টি উপাদানগুলো যথাযথভাবে পুনঃস্থাপন না করলে মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে।

মাটির উর্বরতা হ্রাসের কারণ

বাংলাদেশে মাটির উর্বরতা হ্রাসের পেছনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ দায়ী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

*নিবিড় ও একমুখী কৃষি চাষাবাদ

*অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার

*জৈবসারের অপর্যাপ্ত প্রয়োগ

*ফসলের অবশিষ্টাংশ জমি থেকে অপসারণ

*ভূমিক্ষয় ও মাটির ক্ষয়

*ডালজাতীয় ফসলের চাষ কমে যাওয়া

*জমিকে বিশ্রাম না দেওয়া

*মাটি দূষণ

*জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, আদর্শ মাটিতে যেখানে প্রায় ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম।

জৈব পদার্থ: মাটির প্রাণ

মাটির উর্বরতার মূল ভিত্তি হলো জৈব পদার্থ। জৈব পদার্থ মাটির গঠন উন্নত করে, পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে, অণুজীবের কার্যক্রম সক্রিয় রাখে এবং উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।

গোবর, কম্পোস্ট, খামারজাত সার, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, সবুজ সার, খৈল এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ জৈব পদার্থের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। নিয়মিত জৈবসার প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা সম্ভব।

সবুজ সার ও ডালজাতীয় ফসলের ভূমিকা

মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির একটি সহজ ও কার্যকর উপায় হলো সবুজ সার ব্যবহার। ধৈঞ্চা, শনপাট, মুগ, বরবটি এবং অন্যান্য ডালজাতীয় ফসলের শিকড়ে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এই ব্যাকটেরিয়া বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটিতে সঞ্চিত করে।

ফলে—

*মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রোজেন বৃদ্ধি পায়;

*রাসায়নিক সারের প্রয়োজন কমে;

*মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি পায়;

*মাটির গঠন উন্নত হয়।

সমন্বিত সার ব্যবস্থাপনা: সময়ের দাবি

শুধুমাত্র রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল কৃষি ব্যবস্থায় মাটির স্বাস্থ্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বর্তমানে সমন্বিত সার ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সমন্বিত সার ব্যবস্থাপনা বলতে রাসায়নিক সারের সঙ্গে জৈবসার, সবুজ সার, জীবাণুসার এবং ফসলের অবশিষ্টাংশের সুষম ব্যবহারকে বোঝায়।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ শতাংশ রাসায়নিক সারের সঙ্গে ২ টন গোবর ও ১ টন ছাই ব্যবহার করলে প্রায় সমপরিমাণ ফলন পাওয়া যায়, অথচ মাটির স্বাস্থ্য অনেক বেশি উন্নত হয়।

জীবাণুসার ও ট্রাইকোডার্মার ব্যবহার

বর্তমান সময়ে পরিবেশবান্ধব কৃষিতে ট্রাইকোডার্মা ও অন্যান্য জীবাণুসারের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ট্রাইকোডার্মা—

*মাটির ক্ষতিকর ছত্রাক দমন করে;

*শিকড়ের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে;

*পুষ্টি উপাদান সহজলভ্য করে;

*মাটির জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি করে;

*ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

জীবাণুসার ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো এবং মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

ফসল পর্যায় ও শস্য বিন্যাস

একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ করলে মাটির নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই ফসল পর্যায় বা শস্য বিন্যাস অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধানের পরে ডাল, ডালের পরে সবজি বা তেলবীজ ফসল চাষ করলে—

*পুষ্টির ভারসাম্য বজায় থাকে;

*রোগ ও পোকামাকড় কমে;

*উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়;

*মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও মৃত্তিকা স্বাস্থ্য

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে কৃষির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ এবং লবণাক্ততা মাটির উর্বরতা হ্রাস করছে।

বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশের ফলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে অধিক তাপমাত্রার কারণে জৈব পদার্থ দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং মৃত্তিকার জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে।

তাই জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, সংরক্ষণমূলক কৃষি এবং টেকসই মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

মাটি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা

মাটি পরীক্ষা ছাড়া সারের সঠিক ব্যবহার সম্ভব নয়। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষকদের মাটি পরীক্ষাভিত্তিক ‘সার সুপারিশ কার্ড’ প্রদান করা হচ্ছে।

মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে—

*প্রয়োজনীয় সারের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা যায়;

*উৎপাদন খরচ কমে;

*সারের অপচয় রোধ হয়;

*মাটির স্বাস্থ্য বজায় থাকে।

ভবিষ্যৎ করণীয়

মাটির উর্বরতা রক্ষা ও বৃদ্ধির জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি—

#নিয়মিত মাটি পরীক্ষা করা;

#জৈবসার ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান;

#সবুজ সার ও ডালজাতীয় ফসলের চাষ বৃদ্ধি;

#সমন্বিত সার ব্যবস্থাপনা অনুসরণ;

#ট্রাইকোডার্মা ও জীবাণুসার ব্যবহার বৃদ্ধি;

#ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে ফিরিয়ে দেওয়া;

#শস্য পর্যায় অনুসরণ;

#ভূমিক্ষয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ;

#কৃষক প্রশিক্ষণ জোরদার করা;

#জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ।

উপসংহার

মাটি কেবল কৃষির একটি উপাদান নয়; এটি মানবজীবনের অস্তিত্বের ভিত্তি। মাটির উর্বরতা রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই জৈবসার, সবুজ সার, জীবাণুসার, শস্য পর্যায়, সমন্বিত সার ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

মাটিকে বাঁচাতে পারলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, আর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে টেকসই উন্নয়নের পথ আরও সুদৃঢ় হবে।

“সুস্থ মাটি, নিরাপদ খাদ্য, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।”

Comments

    Please login to post comment. Login