সেদিন ঠিক রাত বারোটা।
বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, জানালার কাচ বেয়ে নেমে আসছে পানির রেখা।
তমা জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখে ছিল গভীর এক শূন্যতা, মনে এক অদ্ভুত কল্পনা।
— “ইস… যদি এমন কেউ আসত, যে আমার স্বপ্নের রাজার মতো হতো…”
তমা ছিল একজন নোভেলপ্রেমী মেয়ে। সুযোগ পেলেই বইয়ের পাতায় হারিয়ে যেত সে। গল্প, কল্পনা আর স্বপ্ন—এই তিনটাতেই তার জগৎ।
ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও জানে না।
হঠাৎ তার চোখ খুলে যায়।
সে দেখে—তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই স্বপ্নের রাজা।
কিন্তু গল্পটা সেখানেই থেমে থাকেনি।
কারণ যাকে সে দেখছে, সে রাজা নয়… সে একজন ডিমন।
তমা বুঝতে পারে, সে আর তার নিজের জগতে নেই।
সে চলে এসেছে এক অচেনা জগতে—যেখানে আকাশের রং আলাদা, বাতাসের গন্ধ আলাদা, আর সময়ও যেন অন্যরকম।
সেই জগতেই তার দেখা হয় এক ছেলের সঙ্গে।
ছেলেটার নাম রোহান।
সে ওই জগতের শয়তান, দুষ্টু, বেপরোয়া—কথায় কথায় লুচ্চা টাইপ।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, ছেলেটা অসম্ভব সুন্দর।
হঠাৎ আকাশ ফেটে নামল প্রচণ্ড বৃষ্টি।
তমা দেখে, রোহান পানির মধ্যে ডুবে যাচ্ছে।
কোনো কিছু না ভেবে সে ছুটে যায় তাকে বাঁচাতে।
আর ঠিক তখনই—
দু’জনেই পানির নিচে তলিয়ে যায়।
তমার ঘুম ভেঙে যায়।
সে চোখ খুলে দেখে—সবই স্বপ্ন।
সে হালকা করে হাসে।
— “ছি! কী অদ্ভুত স্বপ্নই না দেখছিলাম…”
কিন্তু হাসিটা আর স্থায়ী হয় না।
কারণ তার চোখ পড়ে নিজের পায়ের দিকে।
দেখে—একজন ছেলে তার পায়ের কাছে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।
তমার বুক ধক করে ওঠে।
চিৎকার করতে গিয়েও নিজের মুখ নিজেই চেপে ধরে।
ভয়ে জোরে পা টান দেয়।
কিন্তু ছেলেটা—রোহান—এতটাই গভীর ঘুমে ছিল যে কিছুই টের পায় না।
তমা কখনো তার দিকে তাকায়, কখনো নিজের কাঁপতে থাকা হাতের দিকে।
— “এটা কী? আমি তো স্বপ্ন দেখছিলাম… তাহলে ও এখানে এলো কীভাবে?”
নিজেকে বোঝাতে বোঝাতে সে আবার শুয়ে পড়ে।
— “এটাও স্বপ্ন… এটা সত্যি না…”
ঠিক তখনই রোহানের ঘুম ভেঙে যায়।
সে দেখে, তার সামনে এক অচেনা মেয়ে শুয়ে আছে।
মেয়েটা কিছু একটা বিড়বিড় করে বলছে।
কথাগুলো শোনার জন্য সে তমার দিকে এগিয়ে আসে।
তমা চোখ খুলে দেখে—রোহান তার দিকে এগিয়ে আসছে।
ভয় আর আতঙ্কে তমা তাকে ঠেকাতে যায়, কিন্তু রোহান অনেক চালাক।
সে তমাকে ধরে ফেলে।
— “এই মেয়ে, তুই কে? আর এটা কোন জায়গা? এমন অদ্ভুত কাপড় পরে আছিস কেন?”
তমা অবাক হয়ে ভাবে—
“এই তো সেই ছেলেটা… যাকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম!”
কিন্তু কথা বলার আগেই রোহান জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
তমা শুধু তাকিয়েই থাকে।
— “এত অদ্ভুত ছেলে… কথা তো বলতে পারত!”
গল্প এখানেই শেষ নয়।
রোহান আধুনিক দুনিয়ায় পথ হারায়, পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, আর শেষমেশ আবার তমার কাছেই ফিরে আসে।
মিথ্যে পরিচয়, অচেনা সম্পর্ক, আর এক ছাদের নিচে বসবাস—
এভাবেই শুরু হয় তাদের অদ্ভুত গল্প।
🌑
এটা কেবল শুরু…
ভবিষ্যতে আছে ভালোবাসা, ঝগড়া, রহস্য আর এমন এক সত্য—যা তমার পুরো জীবন বদলে দেবে
ভোরের আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকতেই তমার ঘুম ভাঙে।
সারা রাত প্রায় একচুলও ঘুম হয়নি। মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন—
— “ও সত্যিই এখানে?”
ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে সে দরজার দিকে তাকায়।
বাড়ির সামনের ছোট ঘরটায় কেউ নড়ছে।
তমার বুক কেঁপে ওঠে।
সে আস্তে পায়ে এগিয়ে যায়। দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়।
রোহান।
সে মেঝেতে বসে আছে, চারপাশে তাকাচ্ছে এমনভাবে—যেন এই দুনিয়াটা কোনো জাদুঘর।
ফ্যানটা ঘুরছে দেখে সে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখে, আবার ভয় পেয়ে হাত সরিয়ে নেয়।
— “এটা… বাতাস দেয় কীভাবে?”
নিজের সাথেই কথা বলছে সে।
তমা হালকা করে গলা খাঁকারি দেয়।
রোহান চমকে উঠে দাঁড়ায়।
— “তুই!”
— “চুপ! আস্তে কথা বলো,” তমা ফিসফিস করে বলে। “বাড়ির সবাই ঘুমাচ্ছে।”
রোহান চারপাশে তাকায়।
— “এটা কোন রাজ্য? আমি এখানে এলাম কীভাবে?”
তমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
— “এটা রাজ্য না… এটা আমার বাড়ি। আর তুমি… ভুল জায়গায় চলে এসেছ।”
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তার চোখে সেই দুষ্টু ভাবটা নেই, বরং আছে বিভ্রান্তি।
— “আমি তো শুধু একটা মেয়েকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম…”
সে ধীরে বলে।
তমার বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে।
— “আমি জানি,” তমা নিচু স্বরে বলে। “কারণ সেই মেয়েটা আমি।”
দু’জনের মাঝখানে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে।
বৃষ্টির শব্দ নেই, স্বপ্নের জগত নেই—তবু যেন বাস্তবটা আরও বেশি অবিশ্বাস্য।
— “শোনো,” তমা সাহস করে বলে,
“আমি জানি না তুমি কীভাবে এখানে এসেছ। কিন্তু একটাই শর্ত—তুমি ঝামেলা করবে না।”
রোহান হালকা হাসে।
— “আমি যদি শয়তান হই, তবু কথা রাখি।”
তমা প্রথমবারের মতো ঠিক করে তার দিকে তাকায়।
পুরোনো ধাঁচের পোশাক, এলোমেলো চুল…
কিন্তু চোখ দুটো—অদ্ভুতভাবে গভীর।
— “আমি তোমাকে একটা উপায়ে বাড়ি ফেরাতে পারি,” তমা বলে।
“কিন্তু তার আগে… তোমাকে ভালো মানুষ হয়ে থাকতে হবে।”
রোহান ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
— “ভালো মানুষ?”
— “হ্যাঁ। এখানে এটা দরকার,” তমা মুচকি হেসে বলে।
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে মাথা নাড়ে।
— “ঠিক আছে, স্বপ্নের মেয়ে। আমি চেষ্টা করব।”
তমা হঠাৎ থমকে যায়।
— “আমার নাম তমা।”
রোহান হালকা হাসে।
— “আমি জানি।”
এই হাসিটাই তমার অজান্তেই বুকের ভেতর কোথাও নরম একটা কাঁপন তুলে দেয়।
🌸
অচেনা জগৎ, অদ্ভুত চুক্তি—
এই ছাদের নিচেই শুরু হতে চলেছে এমন এক সম্পর্ক,
যা স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকবে