সকালটা তমার জন্য অন্যরকম ছিল।
নাস্তার টেবিলে বসে সে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।
সামনের ঘরটা যেন আজ হঠাৎ করে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
— “আমি কেন এত অস্থির?”
নিজেকেই প্রশ্ন করে তমা।
ঘরের ভেতর থেকে হালকা শব্দ আসে।
তমা আর দেরি না করে উঠে যায়।
রোহান চেয়ারে বসে একটা মোবাইল উল্টেপাল্টে দেখছে।
স্ক্রিনে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে হঠাৎ চমকে ওঠে।
— “এটার ভেতরে আমি কীভাবে ঢুকে গেলাম?!”
ভয় আর বিস্ময়ে বলে ওঠে সে।
তমা হেসে ফেলে।
— “ওটা আয়না না। ওটা ফোন।”
— “ফোন?”
রোহান মাথা চুলকায়। “এ যুগে জিনিসপত্রও কথা বলে নাকি?”
তমা হাসি থামাতে পারে না।
এই প্রথম সে খেয়াল করে—রোহান হাসলে তার গাল একটু ভেঙে যায়।
— “তুমি আজ বাইরে যাবে না,” তমা বলে।
— “কেন?”
— “কারণ তুমি বাইরে গেলে… ঝামেলা হবে।”
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে বলে,
— “আমি ঝামেলা চাই না, তমা। আমি শুধু… বাড়ি ফিরতে চাই।”
এই কথাটায় তমার বুকটা হালকা করে কেঁপে ওঠে।
— “আমি চেষ্টা করছি,” তমা নিচু স্বরে বলে।
“কিন্তু সবকিছুর উত্তর আমার কাছেও নেই।”
দু’জনের মাঝখানে আবার নীরবতা।
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়।
ঘরটা অন্ধকারে ডুবে যায়।
তমা অজান্তেই এক ধাপ পিছিয়ে যায়।
— “ভয় পাচ্ছ?”
রোহানের কণ্ঠ এবার আর দুষ্টু নয়।
তমা কিছু বলে না।
রোহান ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
খুব কাছে।
— “আমি এখানে আছি,” সে শান্ত গলায় বলে।
“শয়তান হলেও… তোমার ক্ষতি করব না।”
তমা তাকিয়ে থাকে তার চোখের দিকে।
এই চোখেই তো সে স্বপ্ন দেখেছিল।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়—
এটা স্বপ্ন না বাস্তব, সে আর বুঝতে পারছে না।
বিদ্যুৎ ফিরে আসে।
দু’জনেই যেন একসাথে হুঁশ ফিরে পায়।
তমা দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়।
— “তুমি আজ এই ঘরেই থাকবে,” সে তাড়াতাড়ি বলে।
“আর কোনো ঝামেলা না।”
রোহান মুচকি হাসে।
— “যেমন আদেশ, ম্যাডাম।”
তমা রাগ দেখাতে চায়, কিন্তু পারে না।
🌑
যেখানে থাকার কথা ছিল কয়েক ঘণ্টা,
সেখানে থেকে যাওয়া শুরু হয় দিনের পর দিন।
আর অজান্তেই, নীরবতার ভেতর জন্ম নিতে থাকে
এক অদ্ভুত টান…
রাত নামতেই ঘরটা আবার অদ্ভুত রকম শান্ত হয়ে যায়।
বাইরে হালকা বাতাস, জানালার পর্দা ধীরে দুলছে।
তমার ঘুম আসছিল না।
হঠাৎ সে খেয়াল করে—ঘরের আলোটা কেমন যেন কাঁপছে।
বাল্বটা ঠিকঠাক আছে, তবু আলো স্থির নয়।
— “রোহান?”
তমা নিচু স্বরে ডাকে।
কোনো উত্তর আসে না।
সে সামনের ঘরের দিকে এগোয়।
দরজাটা আধখোলা।
ভেতরে ঢুকতেই তমা থমকে যায়।
রোহান ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখ বন্ধ, দুই হাত সামান্য উঁচু করে ধরা।
আর তার চারপাশে—
ছায়াগুলো নড়ছে।
না, বাতাসে না।
ছায়াগুলো যেন নিজের ইচ্ছায় নড়ছে।
তমার বুক ধক করে ওঠে।
— “এটা কী করছ তুমি?!”
ভয়ে গলা কেঁপে যায়।
রোহান চোখ খুলে তাকায়।
এই চোখ আর আগের মতো নয়।
ভেতরে যেন কালো আগুন জ্বলছে।
— “আমি থামাতে পারছি না,”
রোহান ধীরে বলে।
“এই দুনিয়ায় এলে আমার শক্তি… নিজের মতো আচরণ করছে।”
হঠাৎ টেবিলের পাশের ছায়াটা লম্বা হয়ে দেয়ালে উঠে যায়।
আলমারির ছায়া যেন হাত বাড়াতে চায়।
তমা পেছনে সরে যায়।
— “তুমি তো বলেছিলে তুমি শুধু… শয়তান!”
রোহান তিক্ত হাসে।
— “ওটাই সমস্যা, তমা।
আমি শুধু শয়তান না…”
সে এক পা এগিয়ে আসে।
ঘরের আলো হঠাৎ নিভে যায়।
অন্ধকার।
কিন্তু সেই অন্ধকারে তমা স্পষ্ট দেখতে পায়—
রোহানের চারপাশে ছায়াগুলো তার কথা শুনছে।
— “আমি অন্ধকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারি,”
রোহানের কণ্ঠ গভীর হয়ে ওঠে।
“ছায়া, ভয়, মানুষের ভেতরের লুকানো অন্ধকার… সবই আমাকে টানে।”
তমার গলা শুকিয়ে আসে।
তবু সে সাহস করে বলে—
— “তাহলে… তুমি আমাকে আঘাত করছ না কেন?”
রোহান থেমে যায়।
ছায়াগুলো কাঁপে।
তার চোখের আগুন ধীরে ধীরে নিভে আসে।
— “কারণ তুমি আমাকে ভয় পাওনি,”
সে নিচু স্বরে বলে।
“তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলে… তখনও।”
হঠাৎ আলো ফিরে আসে।
ছায়াগুলো আবার স্বাভাবিক জায়গায় ফিরে যায়,
যেন কিছুই ঘটেনি।
রোহান ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পড়ে।
— “আমি যদি নিয়ন্ত্রণ হারাই,”
সে ফিসফিস করে বলে,
“এই দুনিয়া তোমার জন্য নিরাপদ থাকবে না।”
তমা ধীরে ধীরে তার কাছে আসে।
ভয় এখনো আছে,
কিন্তু তার চেয়েও বড় কিছু আছে—দয়া।
— “তুমি একা না,”
তমা আস্তে বলে।
“যতক্ষণ তুমি আমার বাড়িতে… আমি আছি।”
রোহান তার দিকে তাকায়।
এই প্রথম তার চোখে ভয় নয়—
আশা।
🌑
অন্ধকারের শক্তি আর মানুষের হৃদয়—
এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে রোহান।
আর তমা… সে হয়তো সেই একমাত্র আলো,
যে তাকে পুরোপুরি শয়তান হতে দেবে না।